ফিরে যেতে চান

বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীর অফিসার্স মেস (প্রাচীন বড়কুঠি)

বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমী রাজশাহী মহানগরীর পূর্ব-দক্ষিণ দিকে ১৩ মাইল দূরত্বে চারঘাট উপজেলায় পদ্মার দক্ষিণ তীরে সারদায় অবস্থিত। প্রতিষ্ঠাকালে সারদা ছিল একটি গ্রাম।৭ ২০১১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায় একটি ইউনিয়নের নাম সারদা। ব্রিটিশ সরকার মেদিনীপুর জমিদারি কোম্পানির নিকট থেকে রেশম কুঠি (রেশম ও নীল কুঠি) ক্রয় করে ১৯১২ সালের অক্টোবর মাসে পুলিশ ট্রেনিং কলেজের সূচনা করে।৭ ¬¬ এর প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হয়েছিলেন মেজর এইচ চ্যামনি (H. Chamney)| ১৯৬৩ সালে পুলিশ ট্রেনিং কলেজকে পুলিশ একাডেমীতে উন্নীত করা হয়।২ তবে এস জাকির হোসেন ১৯৬৪ সালে পুলিশ একাডেমীতে উন্নীত হবার কথা বলেছেন।৮১৪
২০১২ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমী প্রকাশিত বুকলেটে ইন্ট্রোডাকশন টু বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমী (Introduction to Bangladesh Police Academy- BPA) প্রবন্ধে তৎকালীন অধ্যক্ষ নাইম আহমেদের প্রদত্ত তথ্যানুসারে বাংলা ও আসাম প্রদেশের প্রয়োজনে ১৯১২ সালের জুলাই মাসে পুলিশ ট্রেনিং কলেজটি স্থাপন হয়। সরকার ১৪২.৬৬ একর জমিসহ কুঠিটি কিনেছিল ২৫ হাজার রুপিতে। ২০১৭ সালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট জান্নাতুল হাসান সংকলিত বুকলেটের তথ্যানুসারে বর্তমানে একাডেমীর চত্বর ২৪২.৬৬ একর।
এ একাডেমীতে ৫টি ক্যাটাগোরিতে বিভিন্ন কোর্সে বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং দেয়া হয়। কোর্সসমূহ ১. বেসিক ট্রেনিং কোর্স, ২. ইন সার্ভিস ট্রেনিং কোর্স, ৩. স্পেসালাইজড ট্রেনিং কোর্স, ৪. কোর্সেস অফারড টু আদার গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন, ৫. ফরেন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল পার্টনারশিপ অ্যান্ড এনগেজমেন্ট।৮১২  বর্তমানে এখানে কনস্টেবল থেকে এএসপি র‌্যাংকিংয়ের ফোর্স ট্রেনিং পেয়ে থাকেন।৮১৩
পুলিশ একাডেমী যে রেশম ও নীল কুঠিতে স্থাপন করা হয় তাকে কেউ কেউ ডাচ নির্মিত অবকাঠমো বলছেন। যেমন- ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে ইন্টারনেটে উইকিপিডিয়ায় (WikipediA) দেখা যায় প্রফেসর ড. কাজী মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান, এবিএম হুসেন (ABM Hussan, Architecture, Cultural Survey of Bangladesh Series-2, Asiatic Society of Bangladesh) সারদার কুঠিকে ১৭৮১ সালে ডাচদের নির্মিত বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা আরো তথ্য উপস্থান করেন, ১৮৩৫ সালে ডাচদের নিকট থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কুঠিটি অধিগ্রহণ করে। তবে বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর রাজশাহী (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়, ১৯৯১, পৃষ্ঠা ৫৪) গ্রন্থে দেখা যায়, ১৭৬৩ খ্রি. ফকিরেরা রাজশাহীর রামপুর-বোয়ালিয়ার ইংরেজ কুঠি আক্রমণ এবং কুঠির এজেন্ট বেনেটকে বন্দী করে পাটনায় প্রেরণ করা হয় এবং সেখানেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। এ তথ্যানুসারে ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহীতে ডাচদের অবস্থান ছিল না। তাছাড়া ডব্লু ডব্লু হান্টার এ স্টাটিসটিক্যাল অ্যাকাইন্ট অব বেঙ্গল ভলিউম-৮ এর ৮৩ পৃষ্ঠায় তথ্য দিয়েছেন, ১৮৩৫ সালে  কোম্পানি প্রাইভেট বাণিজ্য ত্যাগ করে ও তার রাজশাহী জেলার কারখানাগুলো মেসার্স রবার্ট ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানির নিকট বিক্রয় সূত্রে হস্তান্তর করে। ও’ ম্যালি তথ্য দিয়েছেন, এ কুঠি ১৮৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মেসার্স রবার্ট ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানির  নিকট বিক্রি করে দেয়। এ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ডাচ না ইংলিশ ছিল তা ডব্লু ডব্লু হান্টার ও ও’ ম্যালি উল্লেখ করেননি। তবে আলোচনা প্রসঙ্গে মনে হয় এ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল ইংলিশ।
এ একাডেমীর সাবেক অধ্যক্ষ এস জাকির হোসেন Police Academy at Sardah : Its Growth and Development (The District of Rajshahi Its Past and Present, Editor S.A. Akanda, IBS (RU) Seminar Vol. 4, 1981) প্রবন্ধে ও সাবেক অধ্যক্ষ নাইম আহমেদ Introduction to Bangladesh Police Academy- BPA (Bangladesh Police Academy (Booklet), Sardah, Rajshshi, 1912)প্রবন্ধে ডাচ নির্মিত কুঠি হিসেবে পরিচয় উপস্থাপন করেছেন।
তবে এ বিষয়ে আরো অনুসন্ধান প্রয়োজন। কারণ ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পঞ্চম রিপোর্টের ১নং ভলিউমের তথ্যানুসারে বাংলার নবাব ১৭২৫ সালে বোয়ালিয়ার বড়কুঠি রেশম কারখানাসহ রাজশাহী জমিদারি রামজীবনের নিকট অর্পণ করে (বিস্তারিত প্রকৃতি ও আবাসন অধ্যায় ‘প্রাচীন কুঠি ও আবাসন’)। আবার ডব্লু ডব্লু হান্টার (WWW. Hunter. B.A, LL.D.) এ স্টাটিসটিক্যাল অ্যাকাইন্ট অব বেঙ্গল ভলিউম-৮ এর ৮২ পৃষ্ঠায় অষ্টাদশ শতাব্দীতে দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক রাজশাহী জেলায় একটি রেশম কারখানা স্থাপনের তথ্য দিয়েছেন। হান্টারের গ্রন্থটিতে ১৮৩২ সালে কোম্পানির ২টি প্রধান ফ্যাক্টরির তথ্য পাওয়া যায়। যার একটি রামপুর বোয়ালিয়ায় (রাজশাহী মহানগরীর বড়কুঠি) ও অন্যটি সারদায়। Bengal District Gazetters (Calcutta: Bengal Secretariat Book DEPT, 1916)  গ্রন্থের ১০৭ পৃষ্ঠায় L.S.S. O’Malley লিখেছেন, ..The Duth lad a central factory (the present Bara Kothi) at Rampur Boalia,...তিনি ১০৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, After the British assumed the rule of the country, the East India Company devoted special attention to the development of the silk trade and maintained two head factories, one at Rampur Boalia and the other at Sardah.সুতরাং সারদার কুঠি ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি না ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নির্মাণ করেছিল এ বিষয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। যাহোক এ কুঠিতে এক সময় ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেশম ফ্যাক্টরি ছিল। ১৮৩৩ সালে ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বড়কুঠি থেকে তাঁদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয় এবং ১৮৩৫ সালে মেসার্স রবার্ট ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানির নিকট বিক্রি করে দেয়। পরবর্তীতে স্থানান্তর হয় বেঙ্গল সিল্ক কোম্পানি ও তারপর যায় মেদিনীপুর জমিদারি কোম্পানির নিকট।৭ কোম্পানি আমলের ইমারত এখনও বিদ্যমান। প্রাচীন বড় কুঠি ভবন বর্তমানে পুলিশ অফিসার্স মেস, ছোট কুঠি নামে পরিচিত ভবন বর্তমান অধ্যক্ষর বাংলো। শতাব্দী প্রাচীন একটি ভবনে ২০০৮ সালে মিউজিয়াম স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও বেশ কিছু সুরম্য ভবন ও নান্দনিক পরিবেশ বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীর চত্বর সৌন্দর্যময় করে তুলেছে।