ফিরে যেতে চান

শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা

শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা

শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার নবনির্মিত প্রধান গেট (ছবি- ২০১৬)

ভিতরে অফিসের বিপরীতে পুকুরের পশ্চিম-উত্তর পাশে উদ্যান ও চিড়িয়াখানা স্থাপনের নাম ফলক এবং নিচে প্রধান ফটকের ভিতর অংশে জিরাফের মূর্তির নিচে শিশু প্লাবনী (ছবি- ২০১১)

শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার প্রাথমিক নাম ছিল রেসকোর্স ময়দান। দেশ স্বাধীনের পর উদ্যান এবং উদ্যানের সঙ্গে চিড়িয়াখানার সংযোগ ঘটে নাম পায় রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা। ২০০৮ সালে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নামকরণ হয় শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা। অবশ্য গত শতাব্দীর ৯০ দশকের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর এর প্রধান গেটে  শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা নাম সম্বলিত সাদাকালো সাইন বোর্ড স্থাপন করা হয়েছিল। কয়েক বছর পর সাইন বোর্ডটি আর দেখা যায়নি।
ব্রিটিশ আমলে ইংরেজরা আমাদের দেশে ঘোড়দৌড় রেস খেলার প্রচলন করে। খেলা দেখা ও বাজি ধরায় প্রচণ্ড উত্তেজনা সৃষ্টি হতো। শহরাঞ্চলেই ঘোড়দৌড় মাঠ বা রেসকোর্স ময়দান  ছিল। রেসের নেশায় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতেন। অনেকে এ খেলায় সর্বস্বান্ত হয়েছে। কার্যত আয়োজকরাই লাভবান হয়েছে। রাজশাহী শহরের রের্সকোর্স ছিল পদ্মার পাড়ে। এখন এ রেসকোর্স ময়দান শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা।৯৭
কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার এক পুরনো তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, রেসের পর এখানে টমটম দৌড় বা ঘোড়াগাড়ি দৌড়ও হতো। রেস ও টমটমদৌড় বন্ধ হওয়ার পর রাজশাহীর রেসকোর্স ময়দান দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত ছিল। উদ্যান প্রতিষ্ঠায় তৎকালীন মন্ত্রী এএইচএম কামারুজ্জামান ও জেলা প্রশাসক আহম্মদ আব্দুর রউফ এর প্রচুর ভূমিকা ছিল। তাদের প্রচেষ্টায় ১৯৭২ সালে রাজস্ব বিভাগ হতে অনুমতি প্রাপ্ত ৩২৭৬ একর এ জমিতেই কেন্দ্রীয় উদ্যান স্থাপিত হয় ও ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫শ টাকার ১টি প্রকল্প তৈরি করে টেস্ট রিলিফের টাকায় লেক খনন, সাইট উন্নয়ন ও কিছু বৃক্ষ রোপণের ব্যবস্থা করা হয়। মূল্যবান গাছের চারা রোপণ, ফুল গাছের কেয়ারি ও কুঞ্জ তৈরি, লেক ও পুকুর খনন, কৃত্রিম পাহাড় তৈরি অর্থাৎ সামগ্রিক কাজ শুরু হয় ১৯৭৪- ৭৫ ও ১৯৭৫-৭৬ সালে। তৎকালীন জেলা প্রশাসক শফিউর রহমান ও নজরুল ইসলামের সময়ে কিছু দষ্প্রাপ্য বৃক্ষরোপণ ও উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালানো হয়। তখন বাগানে ২টি বানর ছিল। ১৯৭৫ সালের শেষ ভাগে আব্দুর রহিম খানের প্রচেষ্টায় পটুয়াখালির জেলা প্রশাসক আব্দুস সাত্তারের নিকট এক জোড়া হরিণ এনে রাখা হয়েছিল। তবে তখন চিড়িয়াখানা স্থাপনের চিন্তা-ভাবনা ছিল না। হরিণ দুটির বংশ বিস্তার হয়ে ১৮টিতে দাঁড়ালে রক্ষণাবেক্ষণের অসুবিধার সৃষ্টি হয়। যার কারণে ১২টি হরিণ ঢাকা চিড়িয়াখানায় দান করা হয়। সে সময় সুষ্ঠু পরিচর্যার অভাবে বাগানের মূল্যবান বৃক্ষের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল। 
প্রকৃত পক্ষে ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ তারিখে চিড়িয়াখানা আরম্ভ হয়। জেলা পরিষদের সীমিত অর্থ, রাষ্ট্রপতির ১০ লাখ টাকার অনুদান এবং পরবর্তীতে বিভাগ উন্নয়ন বোর্ড হতে প্রাপ্ত ১০ লাখ টাকায় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার উন্নয়ন ব্যবস্থা নেয়া হয়। সম্ভবত ১৯৮৩ সালে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আব্দুস সালাম একটি বড় ড্রামে এক জোড়া ঘড়িয়ালের বাচ্চা ছেড়ে দিয়ে চিড়িয়াখানার পত্তন করেন। ১৯৮৫ সালে জেলা প্রশাসক (পরে বিভাগীয় কমিশনার) ছৈয়দুর রহমান ও জেলা পরিষদের প্রকৌশলী আব্দুর রহিমের প্রচেষ্টায় একটি পূর্ণাঙ্গ চিড়িয়াখানায় উন্নীত হয়। ১৯৮৬ সালের জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা উন্নয়নে ব্যয় হয় ৩৪ লাখ ৮১ হাজার ৪৯২ টাকা। ৩ জুন ১৯৮৬ তারিখে বিএডিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) আনসার আলী উদ্যান ও চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করে ১টি গভীর নলকূপ স্থাপনের ব্যবস্থা করেন। তার পূর্বে এখানে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে উদ্যান, পশুপাখি ও মাছ সংরক্ষণে বিঘ্ন ঘটতো। উন্নয়ন ও সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন জেলা পরিষদের কাছ থেকে প্রকল্পটি কিনে নিয়েছে। ১৯৯৬ সালের ২৬ নভেম্বর স্থানীয় সরকার , পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী জিল্লুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়র মো. মিজানুর রহমান মিনুর কাছে প্রকল্পটি হস্তান্তর করেন।  
২০০৮ সালে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নামকরণ হয় শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা এবং চিড়িয়াখানাটি সংস্কারের একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। তার মেয়াদে মহাপরিকল্পনার সার্বিক কর্মসূচির প্রায় ষাট শতাংশ বাস্তবায়ন হয়। যাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৬ কোটি টাকা। মহাপরিকল্পনার বিচিত্র কর্মসূচির মধ্যে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে দৃশ্যায়ন, লেকের পাড় বাঁধাই করা হয়। ৬ নভেম্বর ২০১১ তারিখে লেকের উপর একটি কার্ভ সেতু ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে সুদৃশ্য গেট ও আর একটি কার্ভ সেতু উদ্বোধন করা হয়। এছাড়া ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে ফেরিজ হুইল নির্মাণ হয়। নির্মাণ করা হয়েছে প্রধান ফকটসহ সুদৃশ্য প্রাচীর, প্রধান ফটকের সুদৃশ্য লেকসহ গাড়িপার্ক। এর সঙ্গেই আছে পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা। পশু-পাখির আস্তানাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পশ্চিমে। পাখিদের জন্য ৫০ ফুট উঁচু বিশাল আকৃতির এভয়ারী স্থাপনের ব্যবস্থা আছে মাস্টার প্ল¬্যানে। পাখি বান্ধব এভয়ারী নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। নয়নাভিরাম পুকুর ও লেকের পাড় বাঁধাই এর পর পরী সদৃশ্য ভেনাস দ্বীপ স্থাপন করা হয়েছে লেকের মাঝখানে। ওয়াকওয়েগুলোকে করা হয়েছে মনোরম। দক্ষিণের পাহাড়কে নয়নাভিরাম দৃশ্যে নিয়ে এসে তার উপর ফোয়ারা স্থাপনের কাজ চলছে। ছোট-বড় সবার জন্য বিনোদনের একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসাবে শিশুদের চিত্তকে প্রফুল্লকরণের উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে ফেরিজ হুইল ও চিলড্রেন কর্ণার। ফেরিজ হুইল ও চিলড্রেন কর্ণার ২০১৩ সালের ৭ আগস্ট উদ্বোধন করা হয়েছে। পার্কের প্রাকৃতিক পরিবেশকে মনোরমকরণের উদ্দেশ্যে আরো সবুজের কারুকার্য করা হচ্ছে। পুরনো বসার আসনগুলোয় টাইলসের মাধ্যমে মানোন্নয়ন করা হয়েছে। পিকনিক কর্ণারগুলোকে করা হয়েছে অধুনা পদ্ধতিতে উন্নয়ন। 
২৬ জুন ২০০৩ এর এক তথ্যানুসারে কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার পশুপাখি: ২টি সিংহ, ১টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ১৯৪ টি চিত্রল হরিণ, ২টি মায়া হরিণ, ২৬ টি বানর, ৯টি বেবুন, ৪টি গাধা, ২টি ভাল্লুক, ১টি ঘোড়া, ২টি সাদা ময়ূর, ৩টি দেশি ময়ূর, ৮৫ টি তিলা ঘুঘু, ৬৮টি দেশি কবুতর, ৪টি সজারু, ২৮টি বালি হাঁস, ২টি ওয়াক পাখি, ১টি পেলিকেন, ৬টি টিয়া, ৪টি ভুবন চিল, ৪টি বাজপাখি, ১টি হাড়গিল, ৩টি হুতুম পেঁচা, ৯টি শকুন, ২টি উদবিড়াল, ২টি ঘড়িয়াল, ১টি অজগর। 
১৩ আগস্ট ২০১৫ তারিখে এ উদ্যানের ভিতরের ভিআইপি বিশ্রামাগারের বারান্দায় রাখা বোর্ড থেকে নিমোক্ত ৩৮ প্রকারের ২৮০ টি পশুপাখির পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। সেগুলো ভাল্লুক ১, বানর ২৫, বনবিড়াল ২, গাধা ৭, উদবিড়াল ১, চিত্রা হরিণ ৪৭, মায়া হরিণ ১, হনুমান ২, বেবুন ২, ঘোড়া ১, খরগোস ৫, ঘড়িয়াল ৩, অজগর ১, কচ্ছপ ৫, বক ৬, বড় বক ১, বড় বক (রাজিন)১, ওয়াক পাখি ১, পেলিকেন ১, টিয়া ৯, মাছ মুরাল ১, চিল ৬, হুতুম পেঁচা ২, হাড়গিলা ১, রাজহাঁস ৪১, শকুন ১, বালি হাঁস ৭, তিলা ঘুঘু ৪০, সাদা ময়ূর ১, কাকাতুয়া ১, পাতিহাঁস ১, হটি কবুতর ১১, দেশি কবুতর ৩০, কালিম পাখি ১, চখা ৭, বাজপাখি ১, চিনা হাঁস ২ ও গজার মাছ ৪০।
দর্শনার্থীদের জন্য লেকে আছে প্যাডেল বোট, নাগর দোলা। প্রধান প্রবেশ পথে জিরাফের ভাস্কর্য ও মৎস্যকুমারী ফোয়ারা সোন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। কৃত্রিম পাহাড়ে উঠলে চোখে পড়ে বিস্তৃত পদ্মা। যার  দখিনা বাতাসে প্রাণ জুড়ায়। 
রাজশাহীর মানুষ ছাড়াও প্রতিদিন শিক্ষা সফরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের এখানে আগমন ঘটে। শীতকালে বন ভোজনের দল আসে প্রচুর। বনভোজন স্পটের জন্য নির্ধারিত ফি দিতে হয়। সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ মূল্যও নির্ধারিত। ৯ জুন ২০০৩ তারিখের এক তথ্য মোতাবেক কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার জনবল ৪৭ জন। মাসিক গড় আয় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী বর্তমান জনবল ৪৬জন। এছাড়াও দৈনিক মজুরিভিত্তিতে বেশ কিছু লোক কর্মরত আছেন।