ফিরে যেতে চান

(২০০৯-২০১০ সালে সংগৃহীত তথ্য)

প্রকৃতিগতভাবে ভৌগলিক অবস্থান মানুষের আহারে প্রভাব ফেলে। যে অঞ্চলে যে খাদ্য উৎপাদন ও সংগ্রহ করা যায়, তা সে অঞ্চলের খাদ্যাভাসে পরিণত হয়। তবে সভ্যতার ক্রম বিকাশ, আবাস ভূমির পরিবর্তন প্রভৃতি কৃত্রিম কারণ জনপদের খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনে। অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ তাঁর হাজার বছরের বাঙ্গালি সংস্কৃতি গ্রন্থে আবিস্কার করেছেন বাঙ্গালির রকমারি খাবারের অনেকগুলোই ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে এসেছে। এসব খাবার আমদানির ক্ষেত্রে পর্তুগিজদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। 

আম (ছবি-ইন্টারনেট)

রাজশাহী শহরেও যুগে যুগে বহু মানুষের আগমন ঘটেছে। সামাজিক, রাজনৈাতিক ও বিভিন্ন  কারণে মানুষ তাঁদের আবাসন পরিবর্তন করে নতুন বসতির সূচনা করে। তাঁরা সঙ্গে করে তাঁদের সংস্কৃতিও বহন করে এনেছেন। এসব আগত মানুষের মধ্যে ১৭৪২-৪৩ সালে মুর্শিদাবাদের নবাব বংশীয় মানুষ, রেশম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে উড়িষ্যা, মহারাষ্ট্র, ইউপির মানুষ এবং ১৯৪৭ সালের পর বিহার, মালদা, মুর্শিদাবাদ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগোষ্ঠী। বিভিন্ন সময়ে চাকুরি, ব্যবসা ও অন্যান্য কারণে বিভিন্ন জেলার মানুষেরও আগমন ঘটেছে।
রাজশাহী মহানগরীর ভূমি নদীর পলি থেকে উদ্ভব হয়েছে। মহানগরীর অভ্যন্তরে অনেক পুকুর ছিল এবং এখনও আছে। এছাড়া আশেপাশে ছোট-বড় নদ- নদী, বিলে পরিপূর্ণ। এ সব মিঠা পানির জলাশয়ে বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যেত। এখন ব্যাপকভাবে চাষ হয়। পলি দ্বারা গঠিত সমভূমিতে ধান, গম, আখ, যব, বিভিন্ন ধরনের ডাল ও শাক-সবজি অনায়াসে জম্মে। দেশের প্রাচীন লাল মাটি ধান চাষের উপযোগী। অবশ্য এখন সবজির আবাদও বৃদ্ধি পেয়েছে। ধানের খড় ও সমভূমির ঘাস খেয়ে জীবিকা নির্বাহ করে এ জাতীয় পশু গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া, পাখিদের মধ্যে মুরগি, হাঁস এখানকার মানুষ লালন-পালন করে। মহানগরবাসীর খাদ্যাভাসে এসব ফসল, মাছ, পশু-পাখি যুক্ত হয়েছে। প্রধান খাবারের মধ্যে ভাত, রুটি, সবজি, ডাল, মাছ, গোস্ত ইত্যাদি। বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে বাঙ্গালি সমাজে রুটি খাওয়া শুরু করে। কলমী, পাট, পালং, লাউ, পটলের লতি, কচুর লতি, পুঁই, লটে ইত্যাদি শাক এখানকার মানুষ অনেক পূর্ব থেকে খেয়ে আসছে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি ইউরোপীয় সবজি। দক্ষিণ আমেরিকার সবজি টমেটো ভারতবর্ষে নিয়ে আসে ইংরেজরা। সেখান থেকেই রাজশাহীতে আসে। টমেটো এক সময় কারও কারও কাছে বিলেতি বেগুন হিসাবেও পরিচিত ছিল। 
অস্টম শতাব্দী থেকে পাহাড়পুর ও ময়নামতিতে তৈরি পোড়া মাটির ফলকে মাছ কাটা ও ঝুড়িতে মাছ নিয়ে যাওয়ার ছবি আছে। তা থেকে পরিচয় পাওয়া যায় মাছ এ অঞ্চলের প্রাচীন খাবার। তবে মুরগি, গরু, খাসি ইত্যাদির মাংস খাওয়ার সূচনা করেন ভারত থেকে আগত মানুষরাই। তেলে ভাজা বিরিয়ানি, পোলাও, গোস্তের চপ, নেহারী, পরটা, লিট্টি ইত্যাদি রসনা বিলাস এসেছে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মানুষের কাছ থেকেই। পুরি, পরোটা, পাপড়, বেগুনি, পিঁয়াজি, লুচি ইত্যাদি খাবারগুলো হয়ত উত্তর ভারতের মানুষের কাছ থেকে এসেছে। পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি মসলার ব্যবহার নিয়ে আসে উত্তর ভারতের মানুষ। 
খেজুরের রস, তালের রস, গুড়, চিনি মিশিয়ে ক্ষির, পায়েস, নাড়ু, ধুপি , ভাপা পিঠাসহ বিভিন্ন ধরণের পিঠা, কলায়ের রুটি, বারভাজা, গুড়-আটার কদমা ইত্যাদি রাজশাহীর স্থানীয় খাবার। দুধ, ছানা, মাখন, চিনি, আটা, চালের বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু খাবার কতকাল থেকে প্রচলন আছে বলা মুসকিল। চিড়া, মুড়ি, মুড়ির নাড়ু, মুড়িমুড়কি, চালের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু ইত্যাদি বাঙ্গালির খাবার। ফিরনিও এসেছে উড়িষ্যা, মহারাষ্ট্র, ইউপির দিক থেকে। মহরম উৎসবকে কেন্দ্র করে সেরমল বিক্রির সূচনা করে শিয়া বংশোদ্ভূত মানুষ। ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলের শুরু থেকেই সেরমল বিক্রি আরম্ভ হয়। ভারতীয়দের মিস্টির সঙ্গে ছানা মিশিয়ে রসগোল্লা তৈরি শিখিয়েছে পর্তুগিজরা। ভারতের অন্য অঞ্চল থেকে রাজশাহীতে এসেছে। খাজা এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে। রসে কদম, সন্দেস এসেছে নাটোর থেকে। পাঁউরুটি পর্তুগিজরা আমদানি করে ভারতে। তারপর রাজশাহীতে আসে। বিস্কুট, কাটলেট আমদানি করে ইংরেজরা। 
ফেরিওয়ালার দই, কটকটি, হাওয়াই মিঠাই বা দিল্লি¬র লাড্ডু এসেছে অন্য জেলা থেকে।  ২০০৬ সাল থেকে মনিবাজারের ফুডকর্ণারে দোসা নামের এক ধরণের সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার বিক্রি হচ্ছে। এ খাবারটি এসেছে ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে।  রাজশাহী আমের জন্য বিখ্যাত। তবে আম ছাড়াও লিচু, পেয়ারা, বরই, জাম, জামরুল, কাঁঠাল, আমড়া, আতা, সফেদা, কামরাঙ্গা, পেঁপে, কলা, খেজুর, ডালিম,তেতুল,জলপাই, তরমুজ, লেবু, বাতাবি লেবু, নারিকেল, বেল, কদবেল ইত্যাদি রাজশাহী মহানগরী ও আশেপাশে অঞ্চলে প্রচুর জম্মে। আতা, আনারস, সফেদা ভারতে নিয়ে আসে পর্তুগিজরা। এসব মৌসুমি  ফল বাজারে বিক্রি হয়। এছাড়া ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত আপেল, কমলা, আঙ্গুর, বেদানা ইত্যাদি ফল সব ঋতুতেই পাওয়া যায়। আম, বরই, তেঁতুল, ইত্যাদির আচার বাঙ্গালির খাবার। আলু ও মরিচ ভরতবর্ষে আমদানি করে পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা। সেখান থেকে আসে রাজশাহীতে। খাজুর ও তালের রসের তাড়ি বহুকাল থেকেই প্রচলন আছে। সরবত পান আসে ভারত থেকে।