ফিরে যেতে চান

বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষির উপর নির্ভরশীল। এ দেশের বেশির ভাগ মানুষের পেশা বা জীবিকার ভিত্তি গড়ে উঠেছে কৃষিকে কেন্দ্র করে। রাজশাহী মহানগরীর মানুষও তা থেকে ব্যতিক্রম নয়। তবে অফিস ভবন, ঘর-বাড়ি, কল-কারখানা, দোকান-পাট গড়ে ওঠার ফলেও নগরীতে আবাদী জমি না থাকার কারণে গ্রাম থেকে নগরীর মানুষের কাজ কর্মে ভিন্ন রূপ দেখা যায় । রাজশাহী বিভাগীয় ও জেলা নগরী হওয়ার কারণে এখানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অফিস ও বিভিন্ন  বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এ ছাড়াও আছে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা ইত্যাদি। এসব প্রতিষ্ঠানে বেশির ভাগ শিক্ষিত মানুষই চাকরি করেন।

রাজশাহীর কৃষির প্রধান প্রযুক্তি লাঙ্গল। মহিষের চেয়ে লাঙ্গলে গরুর ব্যবহার বেশি। যন্ত্র প্রযুক্তি প্রসারের ফলে লাঙ্গলের ব্যবহার ক্রমশ কমে আসছে। (ছবিতে রাজশাহী মহনগরীর পশ্চিম উপকণ্ঠে বশড়ি গ্রামের মো. আব্দুল হাকিম ও তাঁর মজুর- ২০১১)

আটা-চালের মিল। বর্তমানে বড় বড় আটা-চাল মিলের কারখানা নির্মাণের ফলে এ সব আটা-চালের মিলের চাহিদা ক্রমশ কমে যাচ্ছে (ছবি- ২০১১, ৩নং ওয়ার্ড)

এখানে উল্লেখযোগ্য শিল্প কারখানা গড়ে উঠেনি। এর ফলে এখানকার মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও বড় বড় শিল্পপতির সৃষ্টি হয়নি। এখানকার বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে কোল্ড স্টোরেজ, পরিবহণ, ঠিকাদার ইত্যাদি। এছাড়াও জীবন ধারণের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বেচার জন্য সব ধরনের ব্যবসায় এখানে হয়ে থাকে। উত্তরাঞ্চলের প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র হওয়ায় এখানে বেশ কিছু ক্লিনিক ও ফার্মেসি গড়ে উঠেছে। মোবাইল ফোন চালু হওয়ার পর থেকে এখানে ফোন ফ্যাক্সের ব্যবসা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বর্তমানে মোবাইল ফোন সেট মানুষের হাতে হাতে চলে যাওয়ায় ফোন-ফ্যাক্সের ব্যবসা নেই বললেই চলে। মোবাইলে ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা আছে। 
মহানগরীতে জেলা আদালত থাকায় এখানকার বেশ কিছু মানুষ আইন ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। ঋতু অনুসারে বিভিন্ন ফল যেমন- আম, লিচু, কাঁঠাল, পেঁপে, কলা ছাড়া অন্যান্য জেলা থেকে আগত আনারস, তরমুজ, খিরা ও বিভিন্ন সবজির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষ।
 

নাপিত। দেশ স্বাধীনের পরও বেশ কিছুকাল এভাবে গাছতলার নিচেই থাকতো নাপিতের আয়োজন। বর্তমানে তা সেলুন ও পার্লার নামে উন্নীত হচ্ছে (ছবি- ২০১১, ২নং ওয়ার্ড আমবাগান)

রাজশাহী মহানগরীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শ্রমিক রিক্সা চালান। স্থানীয় মানুষ ছাড়াও রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড় প্রভৃতি জেলার লোকজন মহানগরীর বিভিন্ন বস্তিতে ভাড়া থেকে রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং নিজ বাড়িতে টাকা পাঠান। গত শতাব্দীর আশির দশকে খরার কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির পর মারাত্মক অভাব দেখা দিলে ঐ এলাকার লোকজন আহারের অন্বেষণে রাজশাহী মহানগরী আগমন করেন। সেই থেকে তাদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। অটোরিক্সা চালু হওয়ার পর মহানগরীর একাডেমিক শিক্ষিত বেকার যুবক এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হচ্ছে।
বিভিন্ন পরিবহণ যেমন বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, কার, বেবি, টেম্পুর ড্রাইভার ও হেলপার হিসেবে বেশ কিছু শ্রমিক জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। রাজশাহীতে শিল্পের প্রসার না  ঘটলেও চিনিকল, পাটকল, হোটেল, বিভিন্ন রকমের দোকানে শ্রমিকরা কাজ করে থাকেন।

গোষ্ঠী অনুসারে একই পেশার বিভিন্ন নাম মুচি, চামার, চর্মকার বা রবিদাস। সাধারণত চামারপাড়া, সুইপার কোয়ার্টার, হরিজন পল্লী এ রকম বিশেষ নামের মহল্লায় তাঁদের বাস। রাস্তার ধারেই তাঁদের পসার। এখন পাকা ও টিনশেডেও কাউকে কাউকে দোকান বসাতে দেখা যায়।

রাজশাহী মহানগরীতে এক সময় অনেক পুকুর ছিল। ক্রমশ মানব বসতির ঘনত্বের কারণে এসব পুকুর ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তবে এখনও অনেক পুকুর আছে। পদ্মা নদীর মাছ ধরে ও এ সব পুকুরে মাছ চাষ করে অনেক জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ী জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। ইমারত নির্মাণের  ক্ষেত্রেও অনেক শ্রমিক কাজ করে থাকেন। 
কলাইয়ের রুটি বিক্রি করেও অনেক নারী-পুরুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। বেশিরভাগ কলাইয়ের রুটির দোকান রাস্তার ধারে ফুটপাত সংলগ্ন জায়গায়। পলিথিন, ছালা, টিনের চালা, চাটাই ইত্যাদির ছাউনির নিচে বেশিরভাগই কলাইয়ের রুটির দোকান সাজানো হয়। গামলা, খোলা, বেলনা-পিড়ি, কয়েকটা থালা-গ্লাসই কলাই রুটি দোকানদারের পসার। গরম গরম কলাইয়ের রুটি রাজশাহীর মানুষের একটি জনপ্রিয় খাবার। বর্তমান শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে কলাইয়ের রুটির দোকানের অবকাঠামোগত পরিবর্তন হতে শুরু করে। অনেক কলাইয়ের রুটির দোকান এখন আধুনিক হোটেলের মতো। রাউন্ড টেবিল চেয়ারে কাস্টমার বসিয়ে  রুটি সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
রাজশাহী মহানগরীর আর একটি পেশা হলো কোচোয়ান (টমটম গাড়ির চালক)। টমটম এক সময় রাজশাহীর উল্লেখযোগ্য বাহনও ছিল। আধুনিক ইঞ্জিনের ক্রমোন্নতির ফলে টমটমের সংখ্যা বর্তমানে নিতান্তই কম। তবে এখনও টিকে আছে। 
রাজশাহী মহানগরীর পূর্বকালের অনেক পেশার পরিবর্তন ও বিলুপ্ত ঘটেছে। এক সময় সরষে থেকে তেল বানিয়ে বাজারে বা পাড়ায় পাড়ায় বিক্রি করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এদের বলা হতো সাহাজি। মহানগরীর পশ্চিমে কাঠালবাড়িয়া এলাকা ও হেতমখাঁ এলাকায় এখনও সাহাজিপাড়া আছে। ঐ পেশায় আর কেউ নিযুক্ত নাই বললেই চলে। একদা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘোষ বা গোয়ালা ছিলেন। 
বর্তমানে এ পেশার মানুষের সংখ্যাও নগণ্য। বুলনপুরের একটি মহল্লা, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের পাশের একটি মহল্লাসহ এখনও কয়েকটি এলাকা ঘোষপাড়া নামে পরিচিত। কোর্ট অঞ্চলের ভেড়িপাড়ায় এক সময় ভেড়ার লোম দিয়ে কম্বল বানানো হতো। ঐ পেশারও বিলুপ্তি ঘটেছে। এ পেশার মানুষ এসেছিল বিহার থেকে। মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা যেমন হড়গ্রাম, বেলদারপাড়া, সাহেব বাজারের পাশে কুমারপাড়ায় এক সময় মাটির হাড়ি, চাড়ি, পুতুল, কুয়োরপাট, প্রভৃতি জিনিস তৈরি হতো। এ সব মৃৎ শিল্পীদের বলা হতো কুমার। এ পেশারও প্রায় বিলুপ্তি ঘটেছে। কুমারেরা মাটির প্রতিমাও তৈরি করতো। এখনও কেউ কেউ করেন। মাল ও মানুষ বহনের জন্য এক সময় গরুরগাড়ির ব্যাপক প্রচলন ছিল। গরুরগাড়ি চালকদের বলা হতো গাড়োয়ান। মহানগরীর পঞ্চপটির একটি এলাকা এখনও গাড়োয়ানপাড়া নামে পরিচিত। বর্তমানে মহানগরীতে গরুরগাড়ির সংখ্যা একবারেই নগণ্য। মহানগরীতে ঠেলাগাড়ি নেই। এ বাহনের জায়গাটি দখলে নিয়েছে রিক্সাভ্যান।
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে মহানগরীর যে পরিবর্তর হয়েছে, সমগ্র মহানগরবাসীর জীবনযাত্রার মান সেভাবে উন্নতি হয়নি। চাকুরিজীবী ও তুলনামূলক বড় ব্যবসায়ীরা মোটামুটি স্বচ্ছলভাবে জীবন যাপন করে। জীবন ধারণের ব্যয় ক্রমশ বৃদ্ধি পেলেও শ্রমিকদের পারিশ্রমিক সে হারে বাড়ছে না। ফলে তাঁরা নগর সভ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে অসমর্থ হচ্ছেন। এতে তাঁদের অর্থনৈতিক ভিত্তি ক্রমশ ক্ষয় হচ্ছে। পরিবারের সম্প্রসারণ ও দারিদ্র্যতার কারণে ভিটামাটি বিক্রি করে অনেকে সরকারি জমিতে বিশেষ করে সড়ক, রাস্তা, রেলপথের ধারে বসতি গড়ে তুলছে। বসতি গড়ে ওঠার আর একটি কারণ হলো দেশের বিভিন্ন অনুন্নত এলাকার দরিদ্র মানুষের শহরমুখী প্রবণতা। এ সব ভাসমান মানুষ মহানগরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে ও রিক্সা চালিয়ে অল্প আয় দিয়ে কোন রকম পেটের ভাত ও মাথা গুঁজার ঠাঁই হিসেবে বসতিতে আশ্রয় গ্রহণ করে।