ফিরে যেতে চান

রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার অফিসের গেট (ছবি-২০১৬)

উচ্চ পর্যায় থেকে বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের দি¦তীয় স্তর ও মাঠ পর্যায়ের প্রথম স্তর বিভাগীয় প্রশাসন। অর্থাৎ সচিবালয়ের পরবর্তী নিম্ন ধাপে বিভাগ। বিভাগীয় প্রশাসনের প্রধান কর্মচারীর পদবি কমিশনার। বাংলাদেশ বর্তমানে ৮টি বিভাগে বিভক্ত। সেগুলো ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ। এছাড়া কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে বিভাগকরণের প্রক্রিয়া চলছে।৬০০ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে সর্ব প্রথম বাংলায় যে কয়টি বিভাগ স্থাপন হয়েছিল রাজশাহী তার মধ্যে একটি। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের শাসনামলে দশসালা বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পরিবর্তনের পর বাংলা ও উড়িষ্যার কলিকাতা, মুর্শিদাবাদ, পাটনা ও ঢাকায় কোর্ট অব সার্কিট স্থাপন করা হয়। ১৮২৯ সালে এ কোর্ট  অব সার্কিট উঠিয়ে দিয়ে রেভিউনিউ কমিশনার পদ সৃষ্টি হয়। তখন থেকে রাজশাহী বিভাগের উৎপত্তি।৫৭৫ ব্রিটিশ সরকার কমিশনার পদ সৃষ্টির জন্য The Bengal Revenue Commissioners Regulation,1829 ,১৮২৯ জারি করে।৫৭৬ এ অ্যাক্ট জারির পূর্বে কোর্ট অব সার্কিটের প্রধান কর্মচারীর পদ কমিশনার ছিল কি না ও মুর্শিদাবাদে স্থাপিত কোর্ট অব সার্কিটের নাম রাজশাহী ছিল কি না- এ বিষয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। শ্রীকালীনাথ চৌধুরী রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস গ্রন্থে নাটোরের মহারাজা রামকৃষ্ণের কারাবাস সম্পর্কে  উল্লেখ করেন, ‘কোম্পানির রাজস্বের অনেক টাকা মহারাজার নিকট পাওয়ানা হইল। নিজ রাজসাহী জন্য সিক্কা ১৭০৩৫৫ টাকা এবং বাজে মহাল জন্য সিক্কা ৯৮৫০/১৪ গণ্ডা মোট ২৬৮৮৪২১৪ গণ্ডা রাজস্ব মহারাজার নিকট কম্পানীর পাওয়ানা। এত টাকা আদায়ের কোন উপায় না দেখিয়া ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ৬ মার্চ তারিখে রাজসাহী বিভাগের কমিশনার মহাত্মা জে.এইচ.হারিংটন সাহেব মহারাজাকে অতি সম্মানের সহিত নজর বন্দী স্বরূপ উপযুক্ত কারাবাসে রাখিলেন।’ শুরুতে রেভিনিউ ছাড়াও জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট তার অধীনেই ছিলেন। অর্থাৎ কমিশনার একই সঙ্গে রাজস্ব, বিচার ও প্রশাসনিক  দায়িত্ব পালন করতেন।৫৭৫ 
সূচনাই রাজশাহী বিভাগের সদর দপ্তর রাজশাহী জেলা বা তৎকালীন বোয়ালিয়া শহরে স্থাপন হয়েছিল না। ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত বিভাগের সদর দপ্তর বর্তমান ভারতের পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরে ছিল। ১৮৭৫ সালে মুর্শিদাবাদ জেলা রাজশাহী বিভাগ হতে প্রেসিডেন্সি বিভাগের  অন্তর্ভুক্ত হলে তৎকালীন রামপুর বোয়ালিয়া বা বর্তমান রাজশাহী মহানগরীতে স্থানান্তরিত হয়েছিল এবং ছিল ১৮৮৮ সাল পর্যন্ত। সে সময় এ মহানগরীর সঙ্গে রেলপথের যোগাযোগ না থাকার কারণে ১৮৮৮ সালে বিভাগের সদর দপ্তর নিয়ে যাওয়া হয় জলপাইগুড়িতে।৬১২ সে সময় জলপাইগুড়ি রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এক তথ্যে দেখা যায় উড়িষ্যাসহ তৎকালীন বাংলাকে ৯টি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। সেগুলো ১.বর্ধমান, ২.প্রেসিডেন্সি, ৩.রাজশাহী, ৪.ঢাকা, ৫.চট্টগ্রাম, ৬.পাটনা, ৭.ভাগলপুর, ৮.উড়িষ্যা, ৯.ছোটনাগপুর। ১৮৯২ সালের তথ্যে দেখা যায়, বর্তমান বাংলাদেশের অংশ ছিল সম্পূর্ণ ঢাকা বিভাগ এবং প্রেন্সিডেন্সি, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগের অংশ বিশেষ। প্রেসিডেন্সি বিভাগে ছিল চব্বিশ পরগনা, কলকাতা, নদীয়া, খুলনা ও মুর্শিদাবাদ জেলা। ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল ঢাকা, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ  জেলা। রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল দিনাজপুর, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, পাবনা, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলা। চট্টগ্রাম বিভাগে ছিল চট্টগ্রাম, নোয়াখালি ও ত্রিপুরা।৫৭৬ ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ হলে দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে।
এর ফলে বিভাগীয় সদর দপ্তর স্থাপিত হয় রাজশাহী শহরে। টিআইএম নূরুন্নবী চৌধুরী রাজশাহী বিভাগের কমিশনার নিযুক্ত হন। তিনি তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার জনৈক তালুকদারের কাছে বিভাগীয় চার্জ গ্রহণ করেন। বর্তমানে নগরীর মিয়াপাড়ায় অবস্থিত গোয়েন্দা অফিস (দিঘাপাতিয়ার জমিদারের বাড়ি) রাজশাহী বিভাগীয় শাসন দপ্তর স্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তীতে রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার পশ্চিমে বিভাগীয় প্রশাসনের ভবন নির্মিত হয় এবং দিঘাপাতিয়ার রাজবাড়ি থেকে সেখানে স্থানান্তরিত হয়। বিভাগীয় কমিশনারের বর্তমান কার্যালয় ভবনের দেয়ালে স্থাপিত লিখা অনুযায়ী এ ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন বিভাগীয় কমিশনার শফিউল  আলম ১৯৭৮ সালের ৩১ জুলাই।
প্রথমে ১৯৮৪ সালে রাজশাহী বিভাগের মহকুমাসমূহ জেলায় উন্নীত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, রংপুর ও দিনাজপুর জেলা নিয়ে রাজশাহী বিভাগ ছিল। ১৯৮৪ সালে মহকুমাগুলো জেলায় পরিণত হলে রাজশাহী বিভাগের অধীনে জেলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬টি। ২০১০ সালের ১২ জুলাই রংপুর বিভাগ স্থাপন হলে রাজশাহী বিভাগের প্রশাসনিক এরিয়া কমে আসে। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট রাজশাহী বিভাগের আওতায় থেকে অবশিষ্ট আটটি জেলা নিয়ে গঠিত হয় রংপুর বিভাগ।৪২০ 
বিভাগীয় কমিশনারের কাজ হলো সাধারণ প্রশাসন, রাজস্ব প্রশাসন ও ফৌজদারী আইন প্রশাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের কাজের তদারক। তিনি তাঁর আওতাধীন জেলাসমূহের জেলা প্রশাসক ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের উপর কর্তৃত্ব করেন। কৃষি, পশু পালন, খাদ্য, পূর্ত, নগর উন্নয়ন, শিক্ষা, বন, মৎস্য, স্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, সমবায় ইত্যাদি বিভাগের  আঞ্চলিক ও বিভাগীয় অফিসসমূহের তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় সাধন করেন। আবগারী ও চাকরি সংক্রান্ত এবং রাজস্ব আপীল শুনে এবং বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প পরীক্ষা নিরীক্ষা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেন।