ফিরে যেতে চান

রাজশাহী মহানগরীতে প্রাচীনকালে নির্মিত কোন মন্দির স্থাপত্যের নিদর্শন নেই। এখানে মুসলমানদের আগমনের পূর্বে মহাকালগড়ের (রাজশাহী মহানগরীর প্রাচীন নাম) মহাকালদেও মন্দিরের কথা শোনা গেলেও সে সময়ের কোন প্রত্ননিদর্শন পাওয়া যায় না। যেসব মন্দির এখনো টিকে রয়েছে সেগুলোর সবই ঊনবিংশ কিংবা বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে নির্মিত। মূলত ১৮২৫ সালে জেলা সদর দপ্তর নাটোর হতে রাজশাহীতে স্থানানান্তর হলে এ শহরে স্থানীয় রাজা-জমিদারদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায় এবং জমিদারদের অনেকেই এখানে বাসবভন নির্মাণ করেন। অবশ্য এর আগে থেকেই রাজশাহীতে হিন্দু জনবসতি বেশি ছিল এবং ক্রমান্বয়ে তা আরো বৃদ্ধি পায়। এ সময় জমিদার ও স্থানীয় হিন্দু অধিবাসীদের প্রচেষ্টায় রাজশাহীতে অনেক মন্দির নির্মাণ হয়েছিল। এ সব মন্দিরের কয়েকটি পরিত্যক্ত। পরিত্যক্ত মন্দিরগুলো স্থানের নামানুসারে মঠ নামে রাজশাহীবাসীর নিকট পরিচিত। যেমন সপুরা মঠ, সপুরা মঠপুকুর, ছঘাটি মঠ, শিরোইল মঠ ইত্যাদি। 
মঠের আভিধানিক অর্থ সন্ন্যাসীদের আশ্রম বা আখড়া; মন্দির; টোল; বিদ্যাপিঠ ইত্যাদি। রাজশাহীর এ মঠগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে লিখিত কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে লোকশ্রুতি অনুযায়ী মঠগুলো সন্ন্যাসীদের আশ্রম বা বিদ্যাপিঠ হিসেবে ব্যবহার হয়নি। এগুলো দেবালয় বা উপাসনা গৃহ। শিব লিঙ্গ স্থাপন ছিল সব মঠেই। এখনও কোনটিতে আছে। কোনটি স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে দেখা যায়, মঠগুলোর পরিত্যক্ত ভগ্নদশার অবকাঠামো ঘিঁষে নির্মাণ হয়েছে আবাসিক ভবন। কোনটি হয়েছে আবাসন। আবার কোনটির চত্বর ব্যবহার হচ্ছে ব্যবসার কাজে। মঠগুলো নিয়ে স্থানীয় গবেষণামূলক গ্রন্থে ও পত্রিকায় প্রবন্ধও ছাপা হয়। তার মধ্যে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর অনুসন্ধানী প্রবন্ধটি ‘রাজশাহী শহরের প্রত্ন ইমারত’ শিরোনামে রাজশাহী মহানগরী: অতীত ও বর্তমান গ্রন্থে এবং ‘রাজশাহী জেলার ঔপনিবেশিক স্থাপত্য’ শিরোনামে বরেন্দ্রের বাতিঘর অগ্রযাত্রার ৫ বছর গ্রন্থে ছাপা হয়। পরিত্যক্ত মঠগুলো সম্পর্কিত এ যাবৎকাল প্রকাশিত প্রবন্ধগুলোয় কে বা কারা মঠগুলোর স্থপতি, কি উদ্দেশ্যে নির্মাণ হয়েছিল, কেন পরিত্যক্ত হলো? ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর অনাবিস্কারই থেকে গেছে। এ জন্য সুষ্ঠু গবেষণার অভাবকে দায়ী করা যায়। 
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এ মঠগুলোর সূচনা ও অতীত সম্পর্কে স্থানীয় মানুষ অজ্ঞাত। তার বিবিধ কারণে উল্লেখ করা যায়, মঠগুলোর আশেপাশের বর্তমান জনবিন্যাস নির্মিত হয়েছে ১৯৪৭ সালের পর। ধর্মীয় সংস্কৃতিতে তাঁরা মুসলমান হওয়ায় এ সব  হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি যত্নবান হননি বা দেখভাল করেননি। তৎকালীন সময়ের কুলিন হিন্দু পরিবারের ব্যক্তিগত উদ্যোগেই মঠগুলো তৈরি হয়েছিল ও তাঁরাই সেখানে উপাসনা করতেন। প্রকট বর্ণবাদের যুগে সর্ব সাধারণের প্রবেশ অনাধিকারে থেকে যাওয়ার ফলে মঠগুলো সংস্কারের বিষয় বর্তমান হিন্দু সমাজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। মঠ নির্মাতা শিবভক্ত কুলিন হিন্দুরা ছিলেন ছোটখাট জমিদার, ভূস্বামী বা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। বলা যায় ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-ভারত সীমানা চিহ্নিত হবার পর তাঁরা উত্তরাধিকার না রেখেই ভারতে গমন করেন। ফলে তাঁদের পবিত্র প্রতিষ্ঠানগুলো অরক্ষিত ও অবহেলায় প্রহর গুণতে আরম্ভ করে। তবে আবাসন ও আর্থিক প্রয়োজনে এক সময় সেগুলোর আশেপাশে গৃহ ও ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে উঠতে শুরু করে। এ সব মঠ ছাড়াও মহানগরীতে অনেক মন্দির বিদ্যমান। এসব মন্দিরের কিছু পারিবারিক এবং কিছু সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। মন্দিরসমূহের নির্মাণ উপকরণ হিসেবে ইট, চুন-সুরকি, লোহা ও কাঠ ব্যবহৃত হয়েছে। কতিপয় মন্দিরে সামান্য প্রস্তরের ব্যবহারও পরিলক্ষিত হয়। ছাদের আকৃতি অনুসারে যথাক্রমে চৌচালা মন্দির, ক্ষুদ্র চূড়া মণ্ডিত শিখর মন্দির, শিরাল গম্বুজ বিশিষ্ট মন্দির এবং সমতল ছাদ বিশিষ্ট মন্দির চার শ্রেণিতে বিভক্ত করে সে সব মন্দিরের বিদ্যমান নিদর্শনসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করা হলো।