ফিরে যেতে চান

দরগা হুজরাখানা, মসজিদ ও সমাধি

সংস্কারের পর হুজরাখানা


হুজরাখানা: রাজশাহী শহরের দক্ষিণে পদ্মা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত দরবেশ শাহ মখদুম রূপোশের সমাধি ও দরগা মসজিদ অবস্থিত। এখানকার হুজরাখানাটি এ শহরের সর্বপ্রাচীন ইমারত ও সর্বপ্রথম মসজিদ বলে অনুমিত হয়। বর্তমানে প্রাচীর বেষ্টিত সমাধি প্রাঙ্গণের পশ্চিম পাশে এটি অবস্থিত। ইট ও চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত এক গম্বুজ বিশিষ্ট এ ইমারতটির পশ্চিম দেয়ালে ক্ষুদ্র ও স্বল্প গভীরতা সংবলিত একটি মিহরাব এবং পূর্ব দেয়ালে একটি ছোট্ট প্রবেশপথ বিদ্যমান। প্রায় বর্গাকার কক্ষটির ভিতরের আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৮-১০এবং পূর্ব-পশ্চিমে ২.৭৫ মি. (৯-০)। প্রবেশপথের উচ্চতা ১.৫৫মি. (৫-১) ও প্রস্থে  ৯২ মি. (র্৩-র্০র্ )। সমগ্র ইমারতটি একটি বিশাল গম্বুজে আচ্ছাদিত এবং চার কোণায় চারটি সরু চূড়া সংযুক্ত। উচ্চতা ৩.৪৮ মি. (১র্১-র্৫র্ ) এবং বহির্ভাগে গম্বুজটির ব্যাস ৪.৭৮ মি. (১র্৫-র্৯র্ )। কক্ষটির ভিতরে দুই সারিতে ৮/১০ জন মুসল্লি নামাজ পড়তে পারে। একমাত্র প্রবেশপথটি ব্যতীত আর কোন দরজা-জানালা নেই। এ কক্ষে বসেই শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) সাধনা করতেন বলে এটিকে সাধন পিঠও বলা হয়। বর্তমানে ইমারতটির অভ্যন্তর ও বহির্ভাগের দেয়াল এবং গম্বুজ আধুনিক টাইলস দ্বারা আচ্ছাদিত। প্রবেশপথের সম্মুখে একটি ক্ষুদ্র বারান্দা পরবর্তীতে সংযোজিত হয়েছে। এর উত্তর পাশে একটি টিনের ছাউনিযুক্ত ও গ্রীল দ্বারা ঘেরা উন্মুক্ত কক্ষে মহাকাল গড়ের অত্যাচারী দেও রাজার নরবলি দেয়ার প্রস্তর নির্মিত বেদী প্রদর্শিত রয়েছে।
তিন গম্বুজ মসজিদ: দরগার খাদেমের ভাষ্য অনুযায়ী ১৯৬৯ সালে এ তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি ভেঙে ফেলে তদস্থলে গম্বুজবিহীন দ্বিতল বিশিষ্ট বিশাল আকারের বর্তমান মসজিদটি নির্মিত হয়েছে এবং এর সম্প্রসারণ ও নির্মাণ কাজ এখনো চলছে। তবে যেটুকু তথ্য পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় যে, এখানকার অতীতের তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির আয়তন ছিল বহির্ভাগে ১২.১৮৪.৮৮ মি. (৪র্০-র্০র্ ১র্৬-র্০র্ ) এবং অভ্যন্তরে ১০.৩৬৩.৩০ মি. (৩র্৪-৫.র্৫র্ ১র্০-১র্০র্ )। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব, উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে চারটি তাক ও একটি করে দুটি জানালা এবং পূর্ব দেয়ালে সমপরিমাপের তিনটি প্রবেশপথ ছিল। মিহরাব তিনটির মধ্যে কেন্দ্রীয় মিহরাবটি পার্শ্ববর্তী অপেক্ষা বড়। সম্পূর্ণ ইটের তৈরি এ ইমারতটি বাংলার নবাবী আমলে নির্মিত বলে জনশ্রুতি আছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মসজিদের সম্মুখে পর পর দুটি বারান্দা ও একটি মিনার সংযোজিত হয়েছিল। নবনির্মিত এ মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে একটি মাত্র মিহরাব, পূর্ব দেয়ালে পাঁচটি প্রবেশপথ, দক্ষিণে একটি অযুখানা, সম্মুখে একটি বারান্দা এবং বারান্দার সম্মুখে আবার টিনের ছাউনিযুক্ত আরেকটি বারান্দা সংযোজিত রয়েছে। তবে কোন মিনার নেই। মোটকথা বর্তমান মসজিদটিতে পূর্বের কোন শৈলীই ধরে রাখা হয়নি। সম্পূর্ণটাই আধুনিক স্থাপত্যে নির্মিত। মসজিদ ও দরগার সম্মুখস্থ পুকুরটিরও (মহাগড় দিঘির অংশ বিশেষ) চারিধার পাকা করে নির্মিত।
সমাধি:  দরগা প্রাঙ্গণে অবস্থিত শাহ মখদুম রূপোশের সমাধিসৌধটি বর্গাকারে নির্মিত। এর অভ্যন্তরীণ পরিমাপ ৫.২৭ মি. (১র্৭-৩.র্৫র্ )। কক্ষে অবস্থিত মূল সমাধির দৈর্ঘ্য ২.৯১ মি. (র্৯-র্৭র্ ) ও প্রস্থ ১.৮৩ মি. (র্৬-র্৭র্ )। সমগ্র ইমারতটির উপরিভাগ একটি বৃহৎ গম্বুজে আচ্ছাদিত। সৌধটির দক্ষিণে একটি প্রবেশপথ রয়েছে। প্রবেশপথের চৌকাঠ কালো পাথরে নির্মিত। চৌকাঠের পাথরে নানা রকম নকশা উৎকীর্ণ রয়েছে। নকশাসমূহের বিষয়বস্তুর মধ্যে পেঁচানো লতাপাতার পাড় নকশা, বিট বা দানা নকশা, শিকলঘন্টা, গোলাপ ও কদমা নকশা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে চৌকাঠের উপরিস্থিত প্রস্তরে এক সারি পাখির ঠোঁটের ন্যায় নকশাও (মেওয়া ফলের ন্যায়ও মনে হয়) পরিলক্ষিত হয়। অতি সুক্ষ্ম কারুকার্যে ভরা এ পাথরের চৌকাঠটি যে কোন হিন্দু কিংবা বৌদ্ধ মন্দিরে ধ্বংসবশেষ থেকে সংগৃহীত তা সহজেই অনুমিত হয়। এছাড়া সৌধটির চার কোণায় চারটি সরু চূড়া বিদ্যমান। সমাধি কক্ষের ভিতরে শাহ মখদুম (রহ.) এর কবর ফলকের পশ্চিম পাশে সামান্য সরে আরেকটি কবর ফলক রয়েছে। এটি হযরত শাহ নূর (রহ.) এর কবর বলে জানা যায়। সমাধি কক্ষের অভ্যন্তর ও বহির্দেয়াল বর্তমানে সম্পূর্ণটাই আধুনিক টাইলসে সজ্জিত। দরগার দক্ষিণ প্রবেশপথের উপরে ফারসি ভাষায় লিখিত একটি শিলালিপি উৎকীর্ণ রয়েছে। উক্ত শিলালিপি অনুসারে জনৈক আলীকুলী বেগ ১০৪৫ হিজরীতে (১৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে) ইমারতটিতে গম্বুজ নির্মাণ করেন। অর্থাৎ এ শিলালিপি দ্বারা অনুমিত হয় যে, ১৬৩৪ সনের পূর্ব থেকেই এ সমাধিসৌধের অস্তিত্ব ছিল। পরবর্তীতে এটি ভগ্নদশাগ্রস্ত হলে আলীকুলী বেগ (রহ.) এর সংস্কার পূর্বক গম্বুজটি পুনরায় নির্মাণ করেন।
 

হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (র.) এর সমাধিগৃহ