ফিরে যেতে চান

গুলাই রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি উপজেলার বরেন্দ্র অঞ্চলের একটি এলাকার নাম। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার (১৮৪৮-১৯৩৬) নামের এক ভাগ্যান্বেষী এ এলাকাই জমিদারির পত্তন ঘটান। হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার রাজশাহী মহানগরীর কাদিরগঞ্জে পঞ্চাশ বিঘা চত্বরে যে বাসভবন নির্মাণ করেছিলেন, তা মিয়াবাড়ি নামে পরিচিতি পেয়েছিল।৬৭৫ জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতি, দেশের স্বাধীনতা অর্জন, সমাজসেবা, স্থানীয় সংস্কৃতি চর্চা, শিক্ষার বিকাশ, বিশেষত ব্রিটিশ আমলে অনগ্রসর মুসলিম জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির ক্ষেত্রে এ পরিবারটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। রাজশাহী সম্পর্কিত বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থ ও বিদ্যমান বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় পরিবারটির কৃতিত্ব। ১৮৭২ সালে স্থাপিত রাজশাহী এসোসিয়েশনের প্রথম মুসলমান নির্বাহী সদস্য ছিলেন হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার।৬৭৫ ১৯১০ সালে স্থাপিত বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতিকে  সহযোগিতা প্রদান (বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির অমর কৃতিত্ব বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর), ১৯১৪ সালে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম নামের জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান, ১৯২৭ সালে দি মুসলিম ক্লাব স্থাপন (বর্তমানে হযরত শাহ মখদুদ ইনস্টিটিউট), ১৯৩৬ সালে ইয়াং মেনস এসোসিয়েশন স্থাপন এবং এসোসিয়েশনের মাধ্যমে লাইব্রেরি, হোমিও চিকিৎসালয় স্থাপন, নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন, হাজি লাল মোহাম্মদ ইদগাহ্সহ প্রভৃতি ব্রিটিশ আমলের জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপনে এ পরিবারটির অবদান খুঁজে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে স্থাপিত নওদাপাড়ায় হামিদপুর পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ও এ পরিবারের জনকল্যাণ দৃষ্টান্ত। স্বাধীন বাংলাদেশ স্থাপনের অন্যতম জাতীয় নেতা শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান এ পরিবারেরই সন্তান। তাঁর কর্মজীবন ও কৃতিত্ব এ গ্রন্থের ভিন্ন অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ২০০৮ সালে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়ে রাজশাহী মহানগরীর উন্নয়ন সাধনে সক্ষম হন। তাঁর কর্মজীবন ও কৃতিত্ব এ গ্রন্থের ভিন্ন অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রজন্ম পরম্পরায় চার প্রজন্ম রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় গবেষকগণ এ পরিবারটির রাজনৈতিক কার্যক্রমকে চার পুরুষের রাজনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের জ্যেষ্ঠ কন্যা আনিকা ফারিহা জামান অর্না রাজনীতিতে সক্রিয়। বর্তমানে সে বাংলাদেশ ছাত্র লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ সভাপতি। প্রভুত্বহীন চেতনায় থেকে সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক কর্ম বিকশিত হলে আগামীতে পরিবারটি পঞ্চ প্রজন্মের রাজনীতি শিরোনামে খ্যাতি অর্জন করতে পারে। রাজনীতি ও সমাজ সেবা ছাড়াও সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় এ পরিবারটি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়। হাজি লাল মোহাম্মদ সরদারের এক পুত্র মুহম্মদ আব্দুস সামাদ বিভিন্ন শিরোনামে গ্রন্থ রচনা ও পত্রিকা সম্পাদনার জন্য রজাশাহীর গুণীজন হিসেবে অমর হয়ে আছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘শুভ্র রজনীগন্ধা’ (১৯৯৮), ‘দিগ-দিগন্ত’ (১৯৮৪), ‘সুবর্ণ দিনের বিবর্ণ স্মৃতি’ (১৯৮৭)। রাজশাহী বার্তা শিরোনামের পত্রিকাটি তিনিই সম্পাদনা করতেন। সোনার দেশ পত্রিকাটি সাপ্তাহিক হিসেবে ১৯৭০ সালে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের পৃষ্ঠপোষকতাতেই চালু হয়। যার প্রকাশিকা ছিলেন শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের সহধর্মিণী জাহানারা জামান। এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন আমজাদ হোসেন। পরে সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ভাষা সৈনিক সাইদ উদ্দিন আহমদ।

মহনগরীর কাদিরগঞ্জে গুলাই জমিদারির মিয়াবাড়ি (ছবি-জানুয়ারি ২০১৭)

মোগল আমল থেকে বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে বিভিন্ন জমিদারির উত্থান হয়। এ সকল জমিদার পরিবারের অনেক সদস্যকেই ব্রিটিশ উপনিবেশিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেলেও ধারাবাহিকভাবে বর্তমান প্রজন্ম পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার সন্ধান পাওয়া যায় না। কিন্তু ১৯৫১ সালের ‘২৮’ আইন অনুসারে ১৯৫১ সালের ১৫ মে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন কার্যকর১ হওয়ার পর এ পরিবারটির রাজনৈতিক ভূমিকা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে দেখা যায়। যার ফলে এ পরিবারের সন্তান এএইচএম কামারুজ্জামান নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিরও দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবর্তমানে ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে ঐতিহাসিক অবদান রাখতে সক্ষম হন শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান। হাজি লাল মোহাম্মদ সরদারের মাধ্যমে এ কৃতি পরিবারটির রাজশাহী শহরে আবাসন শুরু হয়েছিল। তাঁর পূর্ব পুরুষের নিবাস ছিল রাজশাহী জেলার পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ মাজারের দক্ষিণে ভেলনা নামক গ্রামে। তিনি এ গ্রামেই ১৮৪৮ সালে একটি কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম দেলওয়ার হোসেন সরদার। চৌদ্দ বছর বয়সে পিতৃবিয়োগ ঘটলে পরের বছরই হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে রাজশাহী মহানগরীতে (তৎকালীন নাম রামপুর বোয়ালিয়া) আসেন। ১৮৬৩ সালে কাদিরগঞ্জ মহল্লায় চালাঘর নির্মাণ করে তাঁর বসবাস শুরু হয়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিধবা মা ও পালিত ভ্রাতুস্পুত্র। লেখাপড়া না জানা এ মানুষটি শহুরে জীবনের প্রথমে সড়ক নির্মাণের কুলি ও শ্রমিক তত্ত্বাবধানের আয়ে জীবিকার অন্বেষণ আরম্ভ করেন। তাঁর কাজ তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার সিএইচ নেলসনের দৃষ্টিকে আকৃষ্ট করে। এ ইঞ্জিনিয়ার তাঁকে আরো বড় কন্ট্রাক্ট দেন ও ইটভাটা করতে উৎসাহিত করেন। ব্যবসায় তিনি ব্যাপক সাফল্য লাভ করেন। এভাবে কঠোর প্রচেষ্টায় তিনি অল্প সময়ের মধ্যে অনেক অর্থের মালিক হন ও রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার অন্তর্গত গুলাইয়ের জমিদারির পত্তন করেন। তিনি ১৯২৪ থেকে ১৯২৬ ও ১৯৩০ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য (এমএলসি) নির্বাচিত হন। সমাজসেবায়ও তাঁর খ্যাতি ছিল। হাজি লাল মোহাম্মদ সরদারের এক পুত্র আব্দুল হামিদ মিয়া (১৮৮৭-১৯৭৬) বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও পাকিস্তান শাসনামলে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ) ছিলেন।

আব্দুল হামিদ মিয়ার এক পুত্র শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। রাজনৈতিক ভূমিকা তাঁকে দেশের অন্যতম জাতীয় নেতাতে পরিণত করে। তিনি ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের প্রবাসী সরকারের স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হন ও ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের অন্তর্গত মুজিবনগরে (বৈদ্যনাথতলা আমবাগানে) শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দেলনের সময় তিনি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সেক্রেটারী জেনারেল নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালের ২০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেসনে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অধিষ্ঠিত ছিলেন। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্য  ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর অন্য ৩ জন জাতীয় নেতার সঙ্গে তাঁকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা  করে।

শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের জ্যেষ্ঠ পুত্র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ২০০৮ সালের ৪ আগষ্ট রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সমর্থিত নাগরিক কমিটির প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মেয়র হিসেবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফকরুদ্দিন আহমদের নিকট শপথ বাক্য পাঠ করেন এবং ২০০৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো. রেজাউন নবী দুদুর নিকট থেকে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ৩য় নির্বাচিত মেয়রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।