ফিরে যেতে চান

আধুনিক রাজশাহী মহানগরীর বিকাশে রেশম সবচেয়ে বড় উপাদান হিসেবে কাজ করে। রাজশাহীর পলিমাটি রেশম চাষের উপযোগী ছিল। ফলে রেশম চাষ থেকে বাণিজ্য ও শিল্প গড়ে উঠে। তবে ঠিক কত সাল থেকে রাজশাহী মহানগরীতে রেশম চাষ শুরু হয়েছিল তা নির্দিষ্ট করা জটিল। শ্রী কালীনাথ চৌধুরী তাঁর ‘রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “ বর্তমান বোয়ালীয়া নগরীতে ৭০ বৎসরের পূর্বে, দুই চারি ঘর রেশম ব্যবসায়ী ব্যতীত, কোন ভূম্যধিকারীর নিবাস চিহ্ন লক্ষিত হয় না। খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে ওলন্দাজেরা বোয়ালীয়াতে একটা কুঠী নির্মাণ দ্বারা, রাজশাহী অঞ্চলে রেশমের ব্যবসা আরম্ভ করেন। পরে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ কুঠী ওলন্দাজদিগের নিকট ক্রয় করেন। সমপ্রতি তাহা “বড়কুটী” নামে ওয়াটসন কোম্পানির সম্পত্তি।” 
ওলন্দাজ বা ডাচরা রাজশাহীতে রেশম চাষ বা ব্যবসার সূচনা করলেও সময়ের নির্র্দিষ্টতা যথাযথ নয়। ষোড়শ শতাব্দিতে কুঠি স্থাপন হলে রামপুর বোয়ালিয়া ব্যবসা কেন্দ্র হিসাবে প্রসিদ্ধ হতো এবং সপ্তদশ শতাব্দির ১৬০৯ সালে অত্র এলাকা ভ্রমণকালে আব্দুল লতিফ তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করতেন। বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে পানি ও সড়ক পথ নির্ণয়কল্পে ওলন্দাজ গভর্নর ফন ডেন  ব্রুক ১৬৬০ সালে যে নকশা তৈরি করেন তাতে বোয়ালিয়ার কথা উল্লেখ করেন।১ প্রকৃতপক্ষে ইউরোপের সঙ্গে ভারতবর্ষের বাণিজ্য সম্পর্ক অনেক পূর্ব থেকেই ছিল। পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কোদাগামা ১৪৯৮ সালে পানি পথে ভারত আগমনের১ পর নতুন মাত্রা যোগ হয়। পুর্তগিজরা প্রায় একশ বছর একচেটিয়া ব্যবসা করে। মধ্যযুগে পশ্চিমবঙ্গের হুগলিতে মুসলমানদের একমাত্র বাণিজ্য কেন্দ্রেও তারা বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করে।১ তবে তারা রাজশাহীতে আসেনি।৪ ১৬০২ সালে ওলন্দাজরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে। ১৬০৯ সালে মাদ্রাজের উত্তরাঞ্চল কালিকটে, ১৬৪৫-১৬৬০ সালে নাগাপট্টমে ও ১৬৪৫- ১৬৫০ সালের মধ্যে বাংলার চূচুঁড়াতে বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করে। চূচুঁড়াতে বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপনের পর বাণিজ্য সমপ্রসারণের জন্য তারা বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত শুরু করে। ১৬৩৪ সালে আলী কুলি বেগ (রহ.) কর্তৃক শাহমখদুম (রহ.) এর মাজার সংস্কার ও মহরম উৎসবের ফলে বুয়ালিয়া তখন একটি পরিচিত এলাকা। ফলে বোয়ালিয়া তাদের নজর কাড়ে এবং ১৬৬০ সালে ফন ডেন ব্রুকের নকশায় উঠে আসে। সুতরাং ১৬৬০ সালের পর কোন এক সময় তৎকালীন বোয়ালিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মাজার শরীফের পূর্ব-দক্ষিণ পাশে কুঠি স্থাপন করে এবং স্থানীয় চাষী/ শ্রমিকদের দাদন দিয়ে রেশমচাষ ও বাণিজ্য শুরু করে। সুতরাং বড়কুঠি রাজশাহী মহানগরীর প্রথম পাকা দালান বা ভবন নয়; শাহ মখদুম (রহ.) এর মাজার শরীফই প্রথম পাকা দালান। 
১৭৫৭ সালে ইংরেজরা বাংলার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের বেশ কিছু দিন পর ওলন্দাজদের নিকট থেকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বড়কুঠি কিনে নিয়ে রেশম ব্যবসা শুরু করে। এ কোম্পানি রাজশাহী থেকে ১৮৩৩ সালে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়৪ এবং ১৮৩৫ সালে মেসার্স রবার্ট ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানির নিকট বিক্রি করে দেয়।৬১২ মেসার্স রবার্ট ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানির নিকট থেকে বড়কুঠি কিনে নেয় ইংরেজদের মেদিনীপুরের জমিদার কোম্পানি।৪ বিস্তারিত ২য় অধ্যায়: বড়কুঠি)
বোয়ালিয়াতে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও কুঠি ও কারখানা স্থাপন করেছিল। জনৈক কলিনসনের ১৭৮৪ সালের  বিবরণী অনুযায়ী ফরাসিরা ১৭৭৫ সালে প্রথমে একটি ছোট বাড়ি ভাড়া নিয়ে রেশম সুতা প্রস্তুতের কারবার শুরু করেছিল। পরে অবশ্য কুঠি স্থাপন করেছিল।
রেশম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে রামপুর বোয়ালিয়ার আর্থ-সামাজিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন হতে শুরু করে। ইউরোপীয় ও দেশীয় বণিকদের গমনাগমনে রেশম ও নীল ছাড়াও পণ্য বিনিময়ের সূত্রপাত হয়। জেলার বিভিন্ন স্থানে রেশম চাষ শুরু হওয়ার কারণে ব্যবসার প্রয়োজনেই সে সব স্থানের মানুষের আনাগোনাও বৃদ্ধি পায়। দাঁড়-বৈঠা আর পালের সঙ্গে পদ্মায় বয়তে শুরু করে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের জাহাজ। পণ্য আমদানি-রপ্তানির ছোট-বড় জাহাজ পদ্মার রামপুর বোয়ালিয়ার তীরে নোঙ্গর করা শুরু করলে কয়েকটি ঘাটের উদ্ভব হয়। নদীর এ ঘাট থেকেই গঞ্জ ও বন্দরের রূপ লাভ করেছিল। ফলে স্থানীয় মানুষ কৃষির সাথে ভিন্ন পেশায় জীবিকা অর্জনের সুযোগ পায়। রেশমের সুতা বয়ন ছাড়াও অনেকে গঞ্জে বিভিন্ন পণ্যের ছোট পসার বসায়। রেশম চাষী ও বণিকদের মাঝখানে আড়তদার নামে এক ধরনের মধ্য শ্রেণি ব্যবসায়ীর  উদ্ভব হয়। স্থানীয় ভূস্বামী বা জোতদাররা বেশি মুনাফার জন্য রেশম কারখানাও তৈরি করে। সরাসরি  ইউরোপে না গেলেও তাঁরা ছোট ছোট কোম্পানি গঠন করে ইউরোপীয় কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসা করতো।১ কাজী মোহাম্মদ মিছেরের ‘রাজশাহীর ইতিহাস’ গ্রন্থে এ রকম ঊনিশটি দেশি কোম্পানির উল্লেখ আছে। তাঁদের মধ্যে রাজশাহী অধিবাসীর ৯টি, বর্গীয় হাঙ্গামার সময় মুর্শিদাবাদ থেকে আগতদের ৫টি, ভারতের ইউপির ২টি, বিহারের ১টি, ভারতের যোধপুরের ১টি, ভারতের আহমদাবাদের ১টি। শহর ও আশেপাশের এলাকায় এ সব কুঠি স্থাপন হয়েছিল। 
১৭৪১ সালে বিহার প্রদেশের মারাঠা বর্গীদের মুর্শিদাবাদ লুটপাট ও আক্রমণ হতে রক্ষার জন্য মুর্শিদাবাদ থেকে মোহাজেরদের আগমন বোয়ালিয়ার সমৃদ্ধির গতিকে বৃদ্ধি করে। সে সময়ের নবাব আলীবর্দী খানের ডেপুটি গভর্নর নওয়াজেশ খান রাজধানীর  গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-সম্পত্তি, পরিজনবর্গসহ গোদাগাড়ীর আলী বারোইপাড়া নামক স্থানে আগমন করেন। সে সময় বোয়ালিয়াতেও একটি বসতি স্থাপন হয়।১