ফিরে যেতে চান

বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষির উপর নির্ভরশীল। এ দেশের বেশির ভাগ মানুষের পেশা বা জীবিকার ভিত্তি গড়ে উঠেছে কৃষিকে কেন্দ্র করে। রাজশাহীর মানুষও তা থেকে পৃথক নয়। তবে অফিস ভবন, ঘর-বাড়ি, কল-কারখানা, দোকান-পাট স্থাপনের ফলে ও নগরীতে আবাদি জমি জমি না থাকার কারণে গ্রাম থেকে নগরীর মানুষের কাজ-কর্মে ভিন্ন রূপ দেখা যায়। বিষয়টি এ রকম যে গ্রামের কৃষকেরা জমিতে ধান উৎপাদন করেন; আর নগরীর শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা ঐ ধানেরই চাউল বানিয়ে বা কেনা-বেচার লাভে জীবিকা নির্বাহ করেন।
রাজশাহী বিভাগীয় ও জেলা নগরী হওয়ার কারণে এখানে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অফিস ও বিভিন্ন বেসরকারি  প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এছাড়াও আছে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা ইত্যাদি। এসব প্রতিষ্ঠানে বেশির ভাগ শিক্ষিত মানুষই চাকুরি করে। 
এখানে উল্লেখযোগ্য শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেনি। ফলে এখানকার মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও বড় বড় শিল্পপতির সৃষ্টি হয়নি। এখানকার বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে কোল্ড স্টোরেজের মালিক, পরিবহনের মালিক, ঠিকাদার ইত্যাদি। এছাড়াও জীবন ধারণের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বেচার জন্য সব ধরনের ব্যবসায় এখানে হয়ে থাকে। উত্তরাঞ্চলের প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র হওয়ায় এখানে বেশ কিছু ক্লিনিক ও ফার্মেসি গড়ে উঠেছে। মোবাইল ফোন চালু হওয়ার পর থেকে এখানে ফোন ফ্যাক্সের ব্যবসা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বর্তমানে মোবাইল ফোন সেট মানুষের হাতে হতে চলে যাওয়ায় ফোন-ফ্যাক্সের ব্যবসা নেই বললেই চলে।  মোবাইল ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা আছে। মহানগরীতে জেলা আদালত থাকায় বেশ কিছু মানুষ আইন ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। ঋতু অনুসারে বিভিন্ন ফল যেমন- আম, লিচু, কাঁঠাল, পেঁপে, কলা ছাড়া অন্যান্য জেলা থেকে আগত আনারস, তরমুজ, খিরা ও বিভিন্ন সবজির ব্যবসার সঙ্গে  অনেকে জড়িত।
রাজশাহী মহানগরী সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শ্রমিক রিক্সাচালক। স্থানীয় মানুষ ছাড়াও রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড় প্রভৃতি জেলার লোকজন মহানগরীর বিভিন্ন বস্তিতে ভাড়া থেকে রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং নিজ বাড়িতে টাকা পাঠান। গত শতাব্দীর আশির দশকে খরার কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির পর মারাত্মক অভাব দেখা দিলে ঐ এলাকার লোকজন আহারের অন্বেষণে রাজশাহী মহানগরী আগমন করেন। সেই থেকে তাঁদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। অটোরিক্সা চালু হওয়ার পর মহানগরীর একাডেমিক শিক্ষিত বেকার যুবক এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন পরিবহন যেমন বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, কার, বেবি, টেম্পুর ড্রাইভার ও হেলপার হিসেবে বেশ কিছু শ্রমিক জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। রাজশাহী মহানগরীতে শিল্পের প্রসার না ঘটলেও চিনিকল, পাটকল, হোটেল, বিভিন্ন রকমের দোকানে শ্রমিকরা কাজ করে থাকেন। 
রাজশাহী মহানগরীতে এক সময় অনেক পুকুর ছিল। ক্রমশ মানব বসতির ঘনত্বের কারণে এসব পুকুর ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তবে এখনও অনেক পুকুর আছে। পদ্মা নদীর মাছ ধরে ও এসব পুকুরে মাছ চাষ করে অনেক জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ী জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রেও অনেক শ্রমিক কাজ করে থাকেন।
কলাইয়ের রুটি বিক্রি করেও অনেক নারী-পুরুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। বেশিরভাগ কলাই এর রুটির দোকান রাস্তার ধারে ফুটপাত সংলগ্ন জায়গায়। পলিথিন, ছালা, টিনের চালা, চাটাই ইত্যাদির ছাউনির নিচে বেশিরভাগই কলাই এর রুটির দোকান সাজানো হয়। গামলা, খোলা, বেলনা-পিড়ি, কয়েকটা থালা-গ্লাসই কলাই রুটি দোকানদারের পসার। গরম গরম কলাইয়ের রুটি রাজশাহীর মানুষের একটি জনপ্রিয় খাবার। বর্তমান শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে কলাইয়ের রুটির দোকানের অবকাঠামোগত পরিবর্তন হতে শুরু করে। অনেক কলাইয়ের রুটির দোকান এখন আধুনিক হোটেলের মতো। রাউন্ড টেবিল-চেয়ারে কাস্টমার বসিয়ে  রুটি সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
রাজশাহী মহানগরীর আর একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা হলো কোচোয়ান (টমটম গাড়ির চালক)। টমটম এক সময় রাজশাহীর উল্লেখযোগ্য বাহনও ছিল। আধুনিক ইঞ্জিনের ক্রমোন্নতি ফলে টমটমের সংখ্যা বর্তমানে নিতান্তই কম। তবে এখনও টিকে আছে। 
রাজশাহী মহানগরীর পূর্বকালের অনেক পেশার পরিবর্তন ও বিলুপ্ত ঘটেছে। এক সময় সরষে থেকে তেল বানিয়ে বাজারে বা পাড়ায় পাড়ায় বিক্রি করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এদের বলা হতো সাহাজি। মহানগরীর পশ্চিমে কাঠালবাড়িয়া এলাকা ও হেতমখাঁ এলাকায় এখনও সাহাজিপাড়া আছে। ঐ পেশায় আর কেউ নিযুক্ত নাই বললেই চলে।তবে মিলে তেল ভাঙানো হয়। একদা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার ঘোষ বা গোয়ালা  ছিলেন। বর্তমানে এ পেশার মানুষের সংখ্যাও নগণ্য। বুলনপুরের একটি মহল্লা, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের পূর্ব পাশের একটি মহল্লাসহ কয়েকটি এলাকা এখনও ঘোষপাড়া নামে পরিচিত। কোর্ট অঞ্চলের ভেড়িপাড়ায় এক সময় ভেড়ার লোম দিয়ে কম্বল বানানো হতো। ঐ পেশারও বিলুপ্ত ঘটেছে। এ পেশার মানুষও এসেছিল বিহার থেকে। মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা যেমন হড়গ্রাম, বেলদারপাড়া, সাহেব বাজারের পাশে কুমারপাড়ায় এক সময় মাটির হাড়ি, চাড়ি, পুতুল, কুয়ারপাট, প্রভৃতি জিনিস তৈরি হতো। এ সব মৃৎ শিল্পীদের বলা হতো কুমার। এ পেশারও বিলুপ্ত ঘটেছে। কুমারের বংশধরদের কেউ কেউ এখন প্রতিমা তৈরি করেন। মাল পরিবহণের জন্য মহানগরীতে এক সময় গরুরগাড়ির প্রচলন ছিল। গরুরগাড়ির চালকদের বলা হতো গাড়োয়ান। মহানগরীর পঞ্চপটির একটি এলাকা এখনও গাড়োয়ানপাড়া নামে পরিচিত। বর্তমানে মহানগরীতে গরুরগাড়ির প্রচলন নাই। এক সময় ঠেলাগাড়ি ছিল। এরও বিলুপ্ত ঘটেছে। এ সব গাড়ির পরিবর্তে এসেছে রিক্সাভ্যান।