ফিরে যেতে চান

আদিম খোলস ছেড়ে মানুষ যখন সভ্যতার আলো জ্বালাতে শিখেছিল তখন থেকেই তারা নিজেদের প্রয়োজনে বিভিন্ন জীব জন্তুর ব্যবহার করতো। ওই সব জীব-জন্তুর মধ্যে ঘোড়া হয়তো অন্যতম। আধুনিক যন্ত্রযান আবিস্কারের আগে ঘোড়া ছিল মানুষের অন্যতম প্রাচীন বাহন। সে যুগে ঘোড়ার পিঠে চড়ে মানুষ দেশ-বিদেশ ছুটে বেড়াত। খুব সাহসী, বিশ্বস্ত ও প্রভুভক্ত পোষ্য প্রাণি হিসেবে ঘোড়া রণক্ষেত্রে ব্যবহার হতো কিছুকাল পূর্বেও। রাজা-বাদশারা অশ্বারোহী সৈন্য পালতো। ইতিহাসের সেই আঁচল ধরেই ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী শহরের ঘোড়ায় টানা টমটম গাড়ির ব্যবহার শুরু হয়েছিল। টমটম হল এক ঘোড়ায় টানা দুই চাকার গাড়ি বিশেষ। টমটমওয়ালারা কোচোয়ান নামে পরিচিত।  

টমটম


রাজশাহীতে এক সময় অনেক গরিব মুসলমান টমটম চালাতেন এবং এখনও চালান। এ সময় ভারতের উত্তর প্রদেশের বালিয়া অঞ্চল থেকে আগত দোসাদ বর্ণের হিন্দুরা টমটম চালাতেন।৪ এখন তাঁদেও দেখা যায় না। টমটম ছিল তাঁদের জীবিকার উপায়। সেকালে রাজশাহীর প্রধান যানই ছিল টমটম। টমটমে বর যাত্রারও রেওয়াজ ছিল। বরযাত্রার জন্য লাল, নীল, হলুদ, বাহারি রংয়ের কাগজ কেটে সাজানো হতো টমটম গাড়ি। আর ঘোড়াকেও পরানো হতো লাল ফিতা বা লাল কাগজের মালা। ফিরতি পথে বর-কনেকে সামনের দিকে পাশাপাশি বসিয়ে ঘরে আনা হতো। গ্রাম বাংলার নানী-দাদীরা টমটমে চড়ে স্বামীর ভিটায় প্রথম যাত্রার স্মৃতি আওড়ায় আজও। সোনালী রোদ মাথায় করে যাত্রীরা টমটম চলার দুলুনিতে মেঠোপথে ঘোড়ার খুরের ছোপ ছোপ ছান্দিক আওয়াজে সুখ-দুঃখের গল্পও পাড়তেন। 
বর্তমানে যান্ত্রিক যুগে রাজশাহীর সেই ঐতিহ্যবাহী যান প্রায় বিলুপ্তির পথে। গবেষক এবনে গোলাম সামাদ তাঁর রাজশাহীর ইতিবৃত্ত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আমার মনে পড়ে আমি যে স্কুলে পড়তাম তার একজন শিক্ষক রাজশাহীর টমটম নিয়ে একটা গান বেঁধেছিলেন। গানটা গীত হয়েছিল আমাদের স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী সভার উৎসবে। মনে পড়ে, গানটার কিছুটা অংশ ছিল এ রকম-
রাজশাহীর টমটম
(রে ভাই) রাজশাহীর টমটম।
বায়া নহাটা যাবেন
এখুনি রেডি পাবেন
শেয়ারে গেলেই হবে
পয়সা কিছু কম।
পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে
আরামে ঘাড় বেঁকিয়ে 
চলবে যে গম গম।।
দেশ স্বাধীনের প্রাক্কালে রাজশাহীতে টমটমের সংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজারটি। তৎকালীন প্রধান যানবাহন হিসেবে গ্রাম থেকে শহরে এবং শহর থেকে গ্রামে যাত্রীসমেত ধান, চাল, গম, ডাল, আলু, পটল, কপি, বেগুন ইত্যাদি মালামাল বহনে টমটম গাড়ি ব্যবহার হত। রাজশাহী শহরের কেন্দ্র সাহেব বাজার বড় মসজিদের পাশে, সোনাদিঘি মোড়, রেলগেট, হড়গ্রাম বাজার ঢালুর মোড়ে টমটমের স্ট্যান্ড ছিল। সে সময় শহরের পথঘাট এত উন্নত ছিল না। গ্রাম্য পথগুলোর কথা তো ভাবাই যায় না। বর্ষার সময় পথিককে জুতো-স্যান্ডেল হাতে নিয়ে হাঁটতে হতো, তেমনি গরমের দিনে ছিল ধুলার হিড়িক। তাই টমটম যাত্রাতে ছিল সুবিধা। এসব স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন গোদাগাড়ী, তানোর, মোহনপুর, পুঠিয়া, চারঘাট প্রভৃতি থানায় টমটম ছেড়ে যেত। মোটরযানের সংখ্যা কম ছিল বলে তৎকালীন মহকুমা শহর নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্তও ছিল টমটমের গতি। 
দেশ স্বাধীনের পর থেকেই রাজশাহী শহরের হাল বদলাতে থাকে। আশির দশকের প্রথম ভাগে মহকুমাগুলো জেলা ও থানাগুলো উপজেলায় উন্নীত হওয়ায় রাজশাহী শহরের সঙ্গে সংযোগ রাস্তাগুলোর উন্নয়নের প্রসার ঘটা শুরু হয়। পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার ফলে নব্বই এর দশকের শুরু থেকেই রাজশাহী মহানগরীতে লাগে আমূল পরিবর্তনের হওয়া। রাস্তাঘাটের প্রসারসহ শুরু হয় বিটুমিন-ইট-পাথরের শক্ত ঢালাই। পাশাপাশি গ্রামের পথগুলোতে ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ ও পাকাকরণের কাজ শুরু হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই রাজশাহী মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী থানাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। এর ফলে পিচ পথে টমটমের কাঠের চাকার বদলে নামে রাবারের চাকার চল। বাস, মিনিবাস, ট্রাক, টেম্পো, মোটর সাইকেল, রিকশা ক্রমশ রোধ করতে থাকে ঐতিহ্যবাহী টমটমের গতি। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে টমটম খাবি খেতে খেতে রাজশাহী শহরের প্রাচীন ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রেখেছে আজও। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্স শাখার প্রদত্ত লাইসেন্স অনুসারে (৭ এপ্রিল ২০০৩) টমটমের সংখ্যা ২২টি। তাদের বর্তমান হালহকিকত মর্মস্পর্শীও বটে। তাঁদের প্রতিদিনের গড় আয়ে অবলা পরিশ্রমী জানোয়ারটাকে যেমন ভরপেট খোরাক দিতে পারে না, তেমনি নিজেদের অভাব ছেঁড়া সংসারেও ঠিকমত তালি দেয়া হয় না। কোন রকম বেঁচে থাকা যাকে বলে। ভূষি, বুট, লালি গুড়ের জন্য যেখানে প্রতিদিন কম করে একশ টাকার প্রয়োজন সেখানে পঞ্চাশ-ষাটেই চালাতে হয়। বাকিটা নিজেদের সংসারে ঢেলে দিয়ে সঞ্চয়ের কথা এরা ভাবতেও পারে না।৫৯ 
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ২০১৫ সালের ২৮ জুন প্রদত্ত তথ্যানুসারে লাইসেন্সধারী টমটমের সংখ্যা ৩৩টি। প্রকৃত পক্ষে এ পরিমাণ টমটম রাজশাহী মহানগরীতে নেই। ২০১৫ সালে ২৩ জুলাই দৈনিক নতুন প্রভাতের প্রতিবেদন অনুসারে মাত্র ৬টি টমটম চলে মহানগরীতে। তাঁদের মধ্যে দুজন নূর বকশ (৭০) ও নূর মোহাম্মদ (৬৫)। এ দুই কোচোয়ান নওহাটা পৌরসভা থেকে রাজশাহী মহানগরীতে যাতায়াত করেন। তাঁদের প্রতিদিনের আয় মাত্র ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা। অথচ একটি ঘোড়ার খাবারই লাগে ১২৫ থেকে ১৫০ টাকা।৫৪২ ২০১৬ সালের প্রথম দিকে সংগৃহীত তথ্যানুসারে মাত্র ৪টি টমটম মহানগরীতে চলে। তাঁরা কেউ মহানগরীর বাসিন্দা নন। ২ জন মহানগরীর পশ্চিম ও ২ জন মহানগরীর উত্তর দিক থেকে আসেন।