ফিরে যেতে চান

রাজশাহী প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের অংশ, ব্রিটিশ আমলের বিখ্যাত জেলা, পাকিস্তান আমলের জেলা ও বিভাগীয় শহর এবং বাংলাদেশের জেলা ও বিভাগীয় শহর। তাই দেখা যায় শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনেই এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা পূর্ব থেকেই উন্নত।  
প্রাচীন আমলে বরেন্দ্র অঞ্চলের মধ্যে দিয়েই বিভিন্ন রাস্তা গৌড়, রংপুর, দিনাজপুর প্রভৃতি স্থানের সঙ্গে সংযোগ ছিল। মূলত মধ্যযুগ বা মুসলিম শাসনামলে এ মহানগরীর উপর দিয়ে যে রাস্তা তৈরি হয় তা থেকেই বৃহৎ সড়ক পথের শুরু। মোগল আমলে সৈন্য সামন্ত বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতের জন্য এ মহানগরীর উপর দিয়ে যে রাস্তা তৈরী হয় তা থেকেই বৃহৎ সড়ক পথের শুরু। মোগল আমলে সৈন্য সামন্ত বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতের জন্য এ মহানগীর উপর দিয়ে যে পথ ব্যবহার হতো তা শাহী পথ নামে পরিচিত ছিল। ১৮২৫ সালে রাজশাহী জেলা শহর হওয়ার পর সড়ক পথের আমূল পরিবর্তন আসে। অর্থাৎ পাকাকরণ আরম্ভ হয়। পাক শাসনামলে মহাসড়কের উন্নতি ঘটে। রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের রড-সিমেন্ট-পাথরের ঢালাই করা হয়। দেশ স্বাধীনের পর উন্নয়নের জন্য যোগাযোগের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ১৯৭৬ সালে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজশাহী মহানগরীর সড়ক উন্নয়নে এ প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ অবদান আছে। ১৯৮৭ সালে রাজশাহী পৌরসভা কর্পোরেশনে উন্নীত হলে রাস্তা উন্নয়নের নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। বিশেষ করে গত শতাব্দীর ৯০ দশকের শুরু থেকেই যে উন্নয়ন কার্যক্রম আরম্ভ হয়, তাতে রাজশাহী মহানগরীর রাস্তার ব্যাপক উন্নতি ঘটে। অলি-গলিসমূহ ক্রমশ পিচে মুড়ে একটি পরিচ্ছন্ন মহানগরীতে পরিণত হয়। 
বর্তমান রাজশাহী হতে তিনটি মহাসড়ক তিন দিকে গেছে। এগুলো নাটোর রোড, চাঁপাইনবাবগঞ্জ রোড ও নওগাঁ রোড নামে পরিচিত। রাজশাহী মহানগরীর সঙ্গে এ রাস্তা তিনটির সংযোগ স্থান রাজশাহী মহানগরীর প্রবেশ দ্বার। প্রবেশ দ্বার তিনটি হলো পূর্বে নাটোর রোডের মাসকাটাদিঘি, পশ্চিমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রোডের কাশিয়াডাঙ্গা এবং উত্তরে নওগাঁ রোডের সন্তোষপুর। 
রাজশাহী-নাটোর রোড ও প্রথম পাকা রাস্তা: এটা রাজশাহী মহানগরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান পথ। এ পথই রাজধানী ঢাকা, উত্তরাঞ্চলসহ দেশের অন্যান্য জেলার সঙ্গে সড়ক পথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। এ পথ দিয়ে নাটোর থেকে বগুড়া এবং বগুড়া থেকে বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, বৃহত্তর পাবনা এবং যমুনা ব্রিজ অতিক্রম করে রাজধানী ও পূর্ব অঞ্চলের যে কোন জায়গায় যাওয়া যায়। আবার যশোর, খুলনা যাওয়া যায়। এ পথটি কখন কে তৈরি করেছিল সে সব তথ্য পাওয়া যায় না। ইংরেজ আমলে নাটোর জেলা সদর থাকাকালীন সময়ে নাটোর হতে রাজশাহী (বোয়ালিয়া বন্দর) যাতায়াতের জন্য সাধারণ রাস্তা হিসেবে এটা ব্যবহার হতো। ১৮২৫ সালে রাজশাহী (বোয়ালিয়া) জেলা সদরে পরিণত হলে এ পথের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ পথের উন্নতি ও সংস্কারের জন্য সরকার রাজশাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে জমিদারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ফলে দিঘাপতিয়ার জমিদার রাজা প্রসন্ননাথ রায় ১৮৫৪ সালে ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে এ পথের সংস্কার সাধন করেন। তখন থেকেই এ পথ নাটোর রাজপথ নামে পরিচিত লাভ করে।১ পরবর্তীতে সরকার ও জমিদারদের প্রচেষ্টায় পথটির ক্রমশ উন্নতি ঘটে। রাস্তার দুপাশে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গাছ লাগানো হয়। কিন্তু রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য উনিশ শতকের নব্বই দশকে গাছগুলি কাটা হয়। সম্ভবত ১৮৮৮ সালে রাজশাহী শহর হতে ১২ মাইল রাস্তা ১২ ফুট চওড়া করে পাথর ও খোয়া দিয়ে পাকা করা হয়েছিল। রাস্তাটি প্রশস্ত ছিল ২০ ফুট এবং রাজশাহী জেলার তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মি. নিকোলাস উইলিয়াম ম্যাকেনজি রাস্তাটি পাকাকরণে তত্ত্বাবধান করে। এ রাস্তা থেকে রাজশাহী জেলায় রাস্তা পাকাকরণের সূচনা হয়েছিল। তবে ১৯৩০ (?) সালের পূর্বে নগরীর অভ্যন্তরে দু-একটি রাস্তা পাকা হয়েছিল বলে জানা যায়।১  পাকিস্তান আমলে রাস্তাটি সিমেন্ট, পাথর, রড দিয়ে ঢালাই করে পাকা হয়েছিল। এখন পিচ পাথর খোয়া দিয়ে পুনঃসংস্কার করা হয়েছে।  
সড়ক ও জনপথ বিভাগ আরআরএমপি-২ কর্তৃক ১৯৯৫-১৯৯৬ অর্থ বছরে নাটোর রোডের রাজশাহী শহর অংশ ব্যতীত রাস্তাটি পুনঃনির্মাণ করে এবং শহরাংশের ২.২৫ কিমি (তালাইমারী-উৎসব বা কল্পনা সিনেমা হল) পিএমপি কর্তৃক পুনঃনির্মাণ করা হয় ২০০১-২০০২ অর্থ বছরে।৫৮
চাঁপাইনবাবগঞ্জ রোড/পাবনা রোড: রাজশাহী মহানগরী থেকে সড়কটি রাজাবাড়ি, কুমরপুর, প্রেমতলী, গোদাগাড়ি হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে প্রবেশ করেছে এবং রাস্তাটি কানসাট সোনা মসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। সোনা মসজিদ স্থল বন্দর (স্থল শুল্ক স্টেশন) স্থাপন হওয়ার পর রাস্তাটির গুরুত্ব ও যানবাহন চলাচলের সংখ্যা বেড়ে যায়। 
এ পথের ইতিহাস প্রাচীন। এক সময় এ পথকে বাদশাহী পথ বলা হতো। ফন ডেন ব্রুক ও রেনেল তাঁদের বঙ্গ নকশায় এতদাঞ্চলের সর্ব প্রাচীন বৃহৎ সামরিক পথ (Great Military Road’s) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী সময়ে মি. হান্টার ও জেলা গেজিটীয়ার লেখকগণ মুসলিম শাসনামলের একটি প্রাচীন সামরিক পথ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।১ মোগল সেনাপতি ও যুবরাজ খুররমের ভ্রমণ প্রসঙ্গে আইন-ই-আকবরী ও বাহার-ই-স্থান ঘাইবীর ইঙ্গিত অনুসারে কাজী মোহাম্মদ মিছের তাঁর রাজশাহীর ইতিহাস গ্রন্থে (২য় খণ্ড) এ পথকে মোগল আমলে নির্মিত সামরিক পথ বলে মন্তব্য করেছেন। পাবনার চাটমোহর এবং রাজশাহীর আলাইপুর, নাজিপুর, শাহপুর, ফতেপুর প্রভৃতি স্থানে মোগল  সেনাদের গড় বা দুর্গ ছিল। এ সব স্থানে সৈন্য সামন্তদের গমনাগমনের জন্য এ পথটি ব্যবহার করা হতো। তাই এ পথটি প্রাচীন পথের স্মৃতি চিহ্ন। পাকিস্তান আমলেও কোথাও কোথাও এটাকে শাহী পথ বলা হতো। তথন এ পথটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, হুজরাপুর, সুলতানগঞ্জ, গোদাগাড়ী, কুমারপুর, রাজশাহী মহানগরী হয়ে বাঘা পর্যন্ত এবং বাঘা হয়ে নাটোরের লালপুরের মধ্যে দিয়ে পাবনার চাটমোহর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আবার চাটমোহর হতে মির্জ্জাপুর, নবগ্রাম, হাণ্ডিয়াল, তাড়াশ, নিমগাছী হয়ে বগুড়ার শেরপুরে পৌঁছেছিল। মি. হান্টারের রাজশাহী জেলার একাউন্টে এটা রামপুরা-বোয়ালিয়া (রাজশাহী মহানগরী) হতে পাবনা পর্যন্ত (৪২ মাইল) পাবনা রোড নামে উল্লেখ আছে। নদী প্রবাহ পরিবর্তনের কারণে ও সংস্কারের ফলে এটা বিভিন্ন জেলায় ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। রাজশাহী মহানগরী হতে পাবনা পর্যন্ত পাবনা রোড, রাজশাহী মহানগরী হতে গোদাগাড়ী পর্যন্ত গোদাগাড়ী রোড ও গোদাগাড়ী হতে মালদহের গৌড় পর্যন্ত মালদহ রোড নামে পরিচিত ছিল। রাজশাহী মহানগরী হতে চাঁপাই নবাবগঞ্জ পর্যন্ত এটা এখন রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রোড নামে পরিচিত। রাজশাহী মহানগরীর প্রাচীন বাজার সাহেবগঞ্জে (পদ্মা গর্ভে বিলীন) নাটোর রোড হতে বাহির হয়ে এ রোডটি আচিনতা খাল, সারদা, চারঘাট, মীরগঞ্জ, বাঘা, বিলমাড়িয়া, লালপুর হয়ে পাবনা জেলায় প্রবেশ করেছিল। এ পথটির বহুলাংশ পদ্মার গর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কারণে এবং গুরুত্ব হ্রাসের ফলে রাজশাহী মহানগরবাসীর স্মৃতিপট হতে এ রোডের নাম প্রায় মুছে গেছে।

রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক: রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ এ আঞ্চলিক মহাসড়ক ১৯৯৬-১৯৯৭ অর্থ বছরে রাজশাহী শহরাংশ ব্যতীত আরআরএমপি-২ কর্তৃক সড়ক ও জনপথ বিভাগ পুনঃনির্মাণ করে।৫৮ এ মহাসড়কটি রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুরনো সড়কের উত্তর পাশ দিয়ে পূর্বগামী হয়ে কুমরপুর ও রাজাবাড়ি মধ্যবর্তী স্থান বিজয় নগরে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ সড়কে মিলিত হয়েছে এবং নগরীর পশ্চিম দ্বার কাশিয়াডাঙ্গায় কাজী নজরুল ইসলাম সরণীতে (কাশিয়াডাঙ্গা-লক্ষ্মীপুর) মিলিত হয়ে ওখানেই পৃথক হয়ে সিটি বাইপাস নাম ধারণ করে প্রবাহিত হয়ে রাজশাহী-নওগাঁ রোডকে নওদাপাড়া নামক স্থানে অতিক্রম করে বেলপুকরগামী হয়েছে। এ সড়ক নির্মাণে দেশি-বিদেশি কোম্পানি অংশ গ্রহণ করে। সম্ভবত বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য দাতা গোষ্ঠীর আর্থিক সহায়তায় রাস্তাটি নির্মিত হয় বলে বিশ্বরোড নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। 
রাজশাহী-নওহাটা-চৌমাসিয়া সড়ক (রাজশাহী-নওগাঁ সড়ক): এ সড়কটি নগরীর রেলগেট (শহীদ কামারুজ্জামান চত্বর) হতে রাজশাহী নওহাটা, মোহনপুর, কেশরহাট, মান্দা ব্রিজ পার হয়ে নওগাঁর নওহাটা নামক স্থানে মহাদেবপুর-নওগাঁ রোডে মিলিত হয়েছে। এ সড়ক থেকে অনেক রাস্তা বিভিন্ন স্থান থেকে বের হয়ে বিভিন্ন দিকে গেছে। এর পূর্ব নাম ছিল নওহাটা পথ। রাজশাহীর নওহাটায় বিমান বন্দর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ সড়কটি রাজশাহী মহানগরীর অভ্যন্তরে বিমান বন্দর রোড নামে পরিচিত হয়ে উঠে।  এ রাস্তাটির দৈর্ঘ্য বেশি দূর ছিল না। কাজী মোহাম্মদ মিছেরের (২য় খণ্ড) গ্রন্থে দেয়া আছে মাত্র সাড়ে নয় মাইল। ১৯৯৬-১৯৯৭ অর্থ বছরে সড়ক ও জনপথ বিভাগ Road Rehabilitation & Maintenance Project-2 (RRMP-2) এর মাধ্যমে সড়কটির সংস্কার ও দীর্ঘায়িত করা হয়। ২০ শতকের ৯০ দশকে মান্দা ফেরিঘাটে ব্রিজ হওয়ার পর থেকে রাস্তাটির যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো সুবিধা হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রতিবেদন অনুসারে এ সড়কের নাম রাজশাহী-নওহাটা-চৌমাসিয়া সড়ক। 
ছোট রাস্তা: মহানগরী হতে আরো কতকগুলো ছোট ছোট রাস্তা বের হয়ে বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়েছে। যেমন- দামকুড়া রাস্তা, দারুশা রাস্তা, খড়খড়ি রাস্তা, হরিয়ান রাস্তা। 
দামকুড়া রাস্তা : এ রাস্তাটি মহানগরীর পশ্চিম দ্বার কাশিয়াডাঙ্গার মোড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রোড হতে বের হয়ে পবা থানার দামকুড়া হাটের উপর দিয়ে গোদাগাড়ির কাকনহাটে পৌঁছেছে। 
দারুশা রাস্তা: এ রাস্তাটি মহানগরীর হড়গ্রাম বাজারের অক্ট্রয় মোড় হতে বাহির হয়ে রাজশাহী কোর্ট ষ্টেশনের নিকট রেলপথ, কাজী নজরুল ইসলাম সরণী (কাশিয়াডাঙ্গা-লক্ষ্মীপুর), সিটি বাইপাস রোড অতিক্রম করে দারুশা গেছে। খড়খড়ি রাস্তা (RUET রাস্তা): এ রাস্তাটি কাজলা অক্ট্রয় মোড় হতে নাটোর রোড থেকে বাহির হয়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (RUET ) এর পূর্ব পাশ দিয়ে খড়খড়ি হয়ে বাগমারা থানার মোহনগঞ্জে অন্য রাস্তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।