ফিরে যেতে চান

বন্যা রাজশাহীর প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রায় প্রতি বছরই বন্যা হানা দেয়। পদ্মার পানি ও বর্ষার বৃষ্টিপাত বন্যার প্রধান কারণ। বন্যার কবল থেকে রক্ষার জন্যই মূলত মহানগরীর দক্ষিণ ধার ঘেঁষে সুদীর্ঘ বাঁধের সূচনা। ঘন ঘন বন্যা হওয়ার পশ্চাতে মূূলত ফারাক্কা ব্যারেজই দায়ী । এ ব্যারেজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রাখা এবং বর্ষা মৌসুমে বিশাল জলরাশির চাপে দরজা খুলে দেয়ার ফলে ভারতের কিছু অঞ্চল এবং রাজশাহীসহ পদ্মার পাশর্^বর্তী এলাকা বন্যার আক্রমণের শিকার হয়। বর্তমানে বাঁধের কারণে পদ্মার পানি রাজশাহী  মহানগরীতে প্রবেশ করতে না পারলেও হুমকির সম্মুখীন হয় এবং বাধেঁর ওপাশের মানুষের বাড়ি-ঘর বন্যায় ডুবে যাওয়ায় তাঁরা নিরাশ্রয় হয়ে মহানগরীর বিভিন্ন বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় , ক্লাব ইত্যাদিতে আশ্রয় খুঁজে। এর ফলে নগরবাসীরও ভোগান্তির শেষ থাকে না । ঐসব বন্যা প্লাবিত জমি ও মানুষ মহানগরীর আহার ও অন্যান্য সমস্যা মিটিয়ে  থাকেন। বন্যা কবলিত মানুষের  জন্য রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা প্রতিটা ত্রাণ শিবিরে স্বাস্থ্য কর্মী নিয়ে টিম গঠন করে চব্বিশ ঘণ্টা চিকিৎসা সেবা ও সাধ্যমত বিনা পয়সায় ঔষধ সরবরাহ করে। এছাড়াও আশ্রয় শিবির ও অন্যান্য সমস্যা সমাধানে যথাসাধ্য চেষ্টা করে। রেড ক্রিসেন্ট  সোসাইটি, রাজনৈতিক সংগঠনসমূহ, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও সমস্যাগ্রস্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়। 

রাজশাহী মহানগরীর পদ্মা পাড়ের বন্যা প্লাবিত এলাকা

রাজশাহীতে বন্যা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হলেও উল্লেখযোগ্য কয়েক বছরের বন্যা ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি সাধন করে। ১৮৩৮ সালে রাজশাহীতে প্রবল বন্যা হয়েছিল।  পদ্মার তীরে যেটুকু বাঁধ ছিল ১৮৫৬ সালের বন্যা তা প্রায় ভেঙ্গে ফেলেছিল। ১৮৬৫ ও ১৮৭৯ সালে এত প্রবল বন্যা হয়েছিল যে মহানগরীর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বারাহী নদীটি বালি ভর্তি হয়ে নালায় পরিণত হয়েছিল।১১৭ এ বন্যায় কয়েক স্থানে বাঁধ ও বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে গিয়েছিল লোকজন বাধ্য হয়েই বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিল ।  বন্যা  নেমে যাওয়ায় শহরে মহামারীর প্রাদুর্ভাবে অনেক লোক মারা গিয়েছিল এবং খাদ্য সংকট দেখা দেয়ায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। ১৮৬৫ সালের বন্যার পর প্রায় ৭ মাইল লম্বা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল।৪ 
এরপর ১৯৩৮ সালে আবারো প্রচণ্ড বন্যা হয়। এ বন্যায় পাঠানপাড়ার পুরোনো বাঁধ ভেঙ্গে শহরের পাঠানপাড়া, দরগাপাড়া, হোসেনীগঞ্জ  প্রভৃতি এলাকা ডুবে গিয়েছিল। এ বন্যা নবাবগঞ্জেরও প্রচুর ক্ষতিসাধন করেছিল। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশে যে বন্যা হয়েছিল রাজশাহী শহর তাতে তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে বর্তমান নাটোর জেলার ক্ষতির পরিমাণ ছিল বেশি। ১৯৭১ সালে বন্যা আবারো প্রবল বেগে রাজশাহীতে হানা দেয়। এ বন্যায় পদ্মার বাঁধ ভাঙ্গার উপক্রম হয়েছিল। তবে নগরীর পশ্চিমে রায়পাড়া-বশড়ির চালনা সাঁকোর গেট ভেঙ্গে ঐ অঞল বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল। 
 দেশ স্বাধীনের পরও রাজশাহী শহরে বন্যার আঘাত আসে। ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যা বেশি স্থায়ী ছিল। বাঁধের কারণে বন্যা শহরের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারলেও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। বাঁধের ওপাশের বন্যা কবলিত অসহায় মানুষ নগরীতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। 
১৯২২ সালের সেপ্টেম্বরের শেষভাগে প্রবল বর্ষণে রাজশাহী বেশ ক্ষতিগস্ত হয়েছিল। এ বর্ষণে জেলার প্রায় ১২০০ বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয়। এ প্লাবনের ফলে ২,২২,৬০৫ একর জমির আমন ধানের ৭৫ শতাংশ ধ্বংস হয় এবং ৬৩,৯৬০ একর জমির অন্যান্য ফসল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ।৪ ১৯৬৮সালের জুন মাসের শেষের দিকে টানা ১০ দিনের বর্ষণে বন্যার সৃষ্টি করে তৎকালীন রাজশাহী জেলার ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। এ বন্যায় বর্তমান নওগাঁ ও নাটোর জেলার ক্ষতি হয়েছিল বেশি। ৫০,০০০ একর জমির ফসল ডুবে গিয়েছিল এবং আউশ ও আমন ধান অধিকাংশ নষ্ট হয়েছিল।১১৭ 
অতি বর্ষণে রাজশাহী মহানগরীর বেশ কিছু রাস্তায় পানি জমে যেত । অপরিকল্পিত বাড়ি-ঘর নির্মাণে কারণেই এ অবস্থা হতো। সম্প্রতি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ড্রেনেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে।