ফিরে যেতে চান

দুবলহাটি জমিদারি অতি প্রাচীন। নওগাঁ শহর থেকে পাঁচ মাইল দূরে এর অবস্থান। কালীনাথ চৌধুরীর মতানুসারে জগৎরাম রায় এ বংশের আদি পুরুষ। পাল আমলে অর্থাৎ আনুমানিক ৭৫০-১১৫০ খ্রিস্টাব্দে এ বংশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। জগৎরাম রায় থেকে হরনাথ রায় পর্যন্ত ৫৩ জন পুরুষ জমিদারি পরিচালনা করেন। এ জমিদারি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে খান সাহেব মোহাম্মদ আফজাল মনে করেন, জগৎরাম রায় একজন শুড়ি জাতীয় লবণ ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি বাণিজ্য উপলক্ষে দুবলহাটির নিকট কশবা গ্রামে বাসস্থান নির্মাণ করে বিল অঞ্চল ইজারা পত্তন গ্রহণ করেন। এ বংশের অভ্যুদয়কালে জগৎরাম জঙ্গলময় ও জলমগ্ন দেশে এক ক্ষুদ্র অর্ধ স্বাধীন ভূম্যধিকারী ছিলেন।
এ জমিদারিতে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ খুব কম ছিল। বেশির ভাগই ছিল বিল এলাকা। তাই মুসলিম শাসনামলে বার্ষিক ২২ কাহন কৈমাছ রাজস্ব হিসেবে ধার্য ছিল। ষোলো শতক থেকে কৃষ্ণরাম রায় চৌধুরীর আমল পর্যন্ত এ জমিদারির ইতিহাস পাওয়া যায়। কৃষ্ণরামের আর এক ভাই ছিল রঘুরাম। দুভাইয়ের সাথে মনোমালিন্য হওয়ার ফলে জমিদারি দু’ভাগ হয় এবং জমিদার  বাড়িও কশবা থেকে স্থানান্তরিত হয়। বড় ভাই কৃষ্ণরাম পায় জমিদারির নয় আনা এবং ছোট ভাই রঘুরাম পায় সাত আনা অংশ। কৃষ্ণরাম বসতি স্থাপন করেন বলিহারের নিকট মৈনম গ্রামে এবং রঘুরাম বসতি স্থাপন করেন দুবলহাটিতে। 
নয় আনি শাখা : কৃষ্ণরাম পুত্র সন্তান ব্যতীত পরলোক গমন করেন। তাঁর বিধবা স্ত্রী পরপর চারজন দত্তক গ্রহণ করলেও সবাই মৃত্যুবরণ করে। এ কারণে রাণী সকল সম্পত্তি বিক্রি  করে দেন। তাঁর দেবর সাত আনি শাখার জমিদার রঘুরামের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকায় তিনি সমস্ত সম্পত্তি বলিহার ও দামনাশ জমিদারির নিকট বিক্রি করেন। এভাবে নয় আনি শাখার অবসান ঘটে।
সাত আনি শাখা : রঘুরামের পর পুত্র রঘুনাথ জমিদারির মালিক হন। তিনি মৃত্যুর পূর্বে মোট জমিদারির দুই আনা স্ত্রী বিদ্যাধরী চৌধুরানী এবং ১৪ আনা পুত্র পরমেশ্বরকে লিখে দিয়ে যান। শিবনাথ ও কাশীনাথ নামে পরমেশ্বরের দুই পুত্র ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর শিবনাথ জমিদারির মালিক হন। তাই বিদ্যাধরী তার দুই আনা অংশ কাশীনাথকে দান করেন। তিনি দুই আনা অংশ নিয়ে যমুনার তীরে শৈলগাছীতে বসতি স্থাপন করেন। এভাবে শৈলগাছী জমিদারির উদ্ভব হয়। 
শিবনাথের পর কৃষ্ণনাথ জমিদারি প্রাপ্ত হন। কৃষ্ণনাথের আমলেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়। কৃষ্ণনাথের পুত্র আনন্দনাথ জমিদারি লাভ করেন। আনন্দনাথের পুত্র সন্তান না থাকায় মৃত্যুর পর স্ত্রী মঞ্জুরী দুবলহাটির জমিদারির ভার গ্রহণ করেন। তাঁর বুদ্ধিমত্তার ফলে অনেকগুলো নতুন মহাল দুবলহাটির জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয়। হরনাথকে দত্তক গ্রহণ করে তিনি স্বামীর শেষ ইচ্ছা বাস্তাবায়ন করেন। অল্প সময়ের মধ্যে দত্তক পুত্রের সঙ্গে মনোমালিন্য হলে দত্তক রদের মামলা দায়ের করেন। নিম্ন ও উচ্চ আদালত দত্তক বহাল রাখে। মৃত্যু পুর্বে মা-ছেলের সঙ্গে আপোষ হয়। তাই তিনি ১৮৫৩ সালে জমিদারির দায়িত্ব হরনাথকে অর্পণ করেন। 
হরনাথের পুর্বে এ জমিদারি রাজশাহী জেলার বার্বেকপুর পরগণার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু তিনি রাজশাহী ছাড়াও বগুড়া, দিনাজপুর, ফরিদপুর এবং সিলেট জেলাতেও জমিদারি বিস্তার করেন। জমিদারি পরিচালনা ও জনহিতকর কাজে তিনি যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দেন। এ সব কর্মের জন্য তিনি ১৮৭৫ সালে রাজা ও ১৮৭৭ সালে রাজা বাহাদুর উপাধি লাভ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ছিল রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য ২১ জানুয়ারি ১৮৭৩ তারিখে সরকারকে বার্ষিক ৫ হাজার টাকা আয়ের প্রায় এক লাখ টাকার সম্পত্তি দান; ১৮৬৪ সালে নিজ বাড়িতে বাড়িতে অবৈতনিক মধ্য শ্রেণি ইংরেজি স্কুল স্থাপন, অতিথিশালা স্থাপন প্রভৃতি। ১৮৭৪ সালে দুর্ভিক্ষে তিনি অনেক ক্ষুধার্ত মানুষকে সহযোগিতা করেন। 
তার বিরুদ্ধে প্রজা বিদ্রোহ একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। হাঁসাইগাড়ীর আস্তান মোল্লার নেতৃত্বে ১৮৯৩ সালে প্রায় ৫০ হাজার প্রজা বিদ্রোহী হয়ে খাজনা প্রদান বন্ধ রাখেন। খাজনার হার ও বিল অঞ্চলের জমি পত্তনের হার প্রচুর বৃদ্ধি করায় এ বিদ্রোহ ঘটে। এ ব্যাপারে ৭ বছর মামলা চলার পর অবশেষে হরনাথের দুই স্ত্রী প্রজাদের নিকট ক্ষমা চান এবং সেটেলমেন্ট অফিসারের মধ্যস্থতায় মীমাংসা হয়। 
হরনাথ মৃত্যুর পূর্বে তাঁর দুই পুত্র ঘনদানাথ রায় চৌধুরী এবং ক্রীঙ্কারীনাথ রায় চৌধুরীর নামে জমিদারি উইল করে যান। ঘনদানাথ রায় চৌধুরীকে  দেন নয়আনা এবং ক্রীঙ্কারীনাথ রায় চৌধুরীকে দেন সাত আনা। উইলে উল্লেখ ছিল, তাঁর মৃত্যুর সময় সন্তানদ্বয় নাবালক থাকলে তাঁর সাবালকত্ব প্রাপ্তি পর্যন্ত জমিদারি পরিচালনা করবেন বিধবা রাণী।