ফিরে যেতে চান

নওগাঁ সদর থেকে দশ মাইল পশ্চিমে বলিহার অবস্থিত। এর আদি নাম কুড়মুড়ি বা কুড়মৈড়। বলিহার জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা হলেন নৃসিংহ চক্রবর্তী। তিনি বলিহারের খাঁ জমিদার পরিবারে বিয়ে করে শ্বশুরের নিকট থেকে যে একটি তালুক পান তা থেকেই এ জমিদারির সূচনা হয়। নৃসিংহের পুত্র গোপাল ও প্রোপৌত্রদের আমলে জমিদারির বিকাশ লাভ করে। গোপালের পুত্র রামকান্ত স্যানাল । তিনি রায় উপাধি পেয়েছিলেন। কৃষ্ণদাস, রামরাম, প্রাণকৃষ্ণ ও বিষ্ণুরাম নামে রামকান্তের চার পুত্র ছিল। রংপুরের বাহিরবন্দ, ভিতরবন্দ ও স্বরূপপুর পরগণার জমিদারির রাণী সত্যবতীর ছোট বোনকে বিয়ে করে কৃষ্ণদাস স্বরূপপুর পরগণার লক্ষণপুরের জমিদারি প্রাপ্ত হন। এ সুবাদে রামরাম ও প্রাণকৃষ্ণ ভিতরবন্দ জমিদারিতে উচ্চ পদে চাকরি পান এবং পরবর্তীতে চক্রান্ত করে জমিদারি দখল করেন। দুভাই পরগণাটিকে দু অংশে ভাগ করে নেন রামরাম সাড়ে আট আনা ও প্রাণকৃষ্ণ সাড়ে সাত আনা অংশের অধিকারী হন। পরবর্তীবতে রামরামের বংশধরেরা ভিরবন্দেই থেকে যায়। কিন্তু প্রাণকৃষ্ণের বংশধরেরা বলিহারে বসতি স্থাপন করেন।
প্রাণকৃষ্ণের রামচন্দ্র ও জ্ঞাননাথ নামে দুই পুত্র ছিল। প্রাণকৃষ্ণের পর বলিহার জমিদারির উত্তরাধিকারী হন রামচন্দ্র। তিনি বাংলার নবাব সুজাউদ্দৌলার নিকট থেকে রায় চৌধুরী খেতাব লাভ করেন। রামচন্দ্রের পুত্র নীলকন্ঠ ও নীলকন্ঠের পুত্র রাজেন্দ্ররায় জমিদারি প্রাপ্ত হন। নাটোরের মহারানি ভবানীর দত্তক পুত্র রামকৃষ্ণের (মৃত্যু ১৭৯৫ খ্রী.) কন্যা কাশীশ্বরকে বিয়ে করে রাজেন্দ্ররায় বগুড়া জেলার ডিহি দারীগাছা ও চুপিনগর, রাজশাহীর ডিহি নন্দননগর ও সপুরা, মুর্শিদাবাদের খালগোলা, ডোমকল ও মৃদাৎপুর, পাবনার খিদিরপুর প্রভৃতি তালুক যৌতুকের ভিত্তিতে মালিক হন। ১৮২৩ খ্রি. রাজেন্দ্ররায় নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে তৃতীয় স্ত্রী আনন্দময়ী দেবী ২৩৯ জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২৯ বছর জমিদারি পরিচালনা করেন। স্বামীর ইচ্ছানুযায়ী আনন্দময়ী শিবপ্রসাদ রায়কে দত্তক গ্রহণ করেন। শিবপ্রসাদ যুব অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তিনটি বিয়ে করেও পুত্র সন্তান লাভ করেননি। শাশুড়ি আনন্দময়ীর উদ্যোগে শিবপ্রসাদের দ্বিতীয় স্ত্রী হর সুন্দর দেবী  ১৮৪৫ সালে ১১ বছরের কৃষ্ণেন্দ্ররায়কে দত্তক নেন। কৃষ্ণেন্দ্ররায় ১৮৩৪ সালে নাটোরের খাজুরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শিবচন্দ্র লাহিড়ী। বলিহার জমিদারিতে তাঁকে বাংলা, সংস্কৃত, ফারসি ও ইংরেজি ভাষা ও সঙ্গীত শাস্ত্রে জ্ঞানদান করে বিশেষভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। (প্রথম প্রকাশনায় নাটোরের স্থলে ভুলক্রমে নওগাঁ লেখা হয়েছিল) 
 কৃষ্ণেন্দ্র রায় ২১ বছর বয়সে ১৮৫৪ সালে জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করে ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৪ বছর জমিদারি পরিচালনা করেন। তিনি জমিদারির শ্রীবৃদ্ধি করেন। ১৮৭৬ সালে তার জমিদারির আয়তন ছিল ১৮০১৩ একর। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও গীতিকার। সমাজকল্যাণমূলক ও প্রজাহিতকর কর্মকাণ্ডের জন্য সরকার তাঁকে ১৮৮০ সালে রাজা এবং ১৮৮৭ সালে রাজা বাহাদুর উপাধি প্রদান করেন। রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠার পশ্চাতে তাঁর অবদান আছে। ১৮৭২ সালের ২১ জুলাই রাজশাহী এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠায় তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার এক বছর পরই তিনি এর সভাপতি হন। প্রজাদের সঙ্গে তিনি অবাধ মেলামেশা করতেন। 
কৃষ্ণেন্দ্ররায়ের কোন সন্তান ছিল না বলে শরদিন্দুকে দত্তক গ্রহণ করেন। শরদিন্দুর পুত্র বিমলেন্দু রায় এ বংশের শেষ জমিদার ছিলেন।