ফিরে যেতে চান

দিঘাপতিয়া জমিদারির রাজবাড়ি, বর্তমান উত্তরা গণভবন (ছবি ইন্টারনেট)

এ জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা হলেন দয়ারাম। তাঁর বংশ পরিচয় ও বাল্য জীবন সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না। অল্প বয়সে তিনি পিতা-মাতাকে হারিয়ে নাটোরের  রাজা রামজীবনের আশ্রয় লাভ করেন। নাটোর জমিদারি উত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নাটোর জমিদারির সূচনা থেকেই তিনি দীর্ঘ দিন তার দিউয়ান  (দেওয়ান) ছিলেন।

১৭১৬ সালে যশোরের ভূষণা পরগণার জমিদার সীতারাম বাংলার নবাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে নাটোরের জমিদার রামজীবন নবাবের পক্ষে দয়ারামকে সীতারামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠান। দয়ারাম যুদ্ধে জয়ী হন এবং জমিদার বাড়ির লুন্ঠিত সামগ্রী রামজীবনের হাতে পৌঁছে দেন। এর ফলে তিনি রামজীবনের অতি বিশ্বস্ত পাত্র হন। নবাব সীতারামের জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে রামজীবনের নামে বন্দোবস্ত দেন। রামজীবন খুশি হয়ে দয়ারামকে কিছু পুরস্কার দিতে চাইলে তিনি সীতারামের আরাধ্য দেবতা কৃষ্ণজী গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রামজীবন দয়ারামকে কৃষ্ণজীসহ তার সেবার জন্য একটা তালুকের মৌরসি স্বত্ব প্রদান করেন এবং নাটোর জমিদারির দেওয়ান নিযুক্ত করেন। এছাড়াও দয়ারামের কর্তব্যের পুরস্কার হিসেবে আরো কিছু তালুক দান করেন। ক্রমান্বয়ে ভাতুরিয়ার তরফ নন্দকুজা, বগুড়া ও ময়মনসিংহ এর তরফ মৌখিলাসহ দুমরাই, তরফ মহল কালনা, যশোরের তরফ সামিলপুর প্রভৃতি মহাল তার অধিকারে আসে। এভাবে দিঘাপতিয়ার জমিদারির সৃষ্টি হয়।

 
রামকান্তকে রামজীবন মৃত্যুর পূর্বে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন এবং দয়ারামকে তাঁর অভিভাবক নিয্ক্তু করেন। শ্রীকালীনাথ চৌধুরী তাঁর রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস গ্রন্থে তথ্য দিয়েছেন, রামকান্তর বাবার নাম রসিকরায়। রসিকরায়ের দুই পুত্রের মধ্যে রামকান্ত ছিলেন কনিষ্ঠ। রসিকরায়ের বাবার নাম ছিল পাঁচু রায়। মৃত্যুর পূর্ব পর্র্যন্ত দয়ারাম রামকান্ত ও রাণী ভবানীর অভিভাবক ও দেওয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দয়ারাম বিদ্যানুরাগী ছিলেন। তিনি অনেক চতুষ্পাঠী ও মন্দির নির্মাণ করেন। তিনি ১৭৬০ সালে পাঁচ কন্যা এক পুত্র রেখে পরলোক গমন করেন। 
দয়ারামের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হন পুত্র জগন্নাথ রায়। তাঁর জমিদারির সময় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর হিসেবে পরিচিত ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। ফলে প্রজাদের নিকট থেকে খাজনা আদায় সম্ভব হতো না। স্ত্রী নন্দরাণী বুদ্ধির বলে ও নিজস্ব আবাদী জমি, হাল, গরু, বিক্রি করে সরকারি রাজস্ব প্রদান করে জমিদারি রক্ষা করেছিলেন। নন্দরাণীর বয়স যখন ৩৮ তখন ১৭৯২ সালে জগন্নাথ মৃত্যুবরণ করেন। একমাত্র পুত্র প্রাণনাথের বয়স তখন মাত্র ৫ বছর হওয়ায় জমিদারি কোর্ট অব ওয়ার্ডসে যায়। প্রাণনাথ যখন জমিদারি ফিরে পেয়েছিলেন তখন জমিদারির রাজস্ব বাবদ কোম্পানীকে বিশ হাজার টাকা ও নাটোর জমিদারকে ত্রিশ হাজার টাকা দিতে হতো। 


১৮২৭ সালে প্রাণনাথের মৃত্যু হলে তাঁর দত্তক পুত্র প্রসন্ননাথ জমিদারির উত্তরাধিকারী হন। ১৮২৭ হতে ১৮৬২ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করেন। দিঘাপাতিয়ার রাজ পরিবারকে তিনি নতুনভাবে বিকশিত করেন। তিনি অনেক জনহিতকর কাজ করেন। ১৮৫৪ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি তাঁকে রাজাবাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেন। দিঘাপাতিয়ার রাজবাড়িটি (বর্তমান) তিনিই নির্মাণ করেন। ১৮৫০ সালে তিনি নাটোর-রাজশাহী সড়ক নির্মাণে ৩৫ হাজার টাকা দান করেন। এছাড়া নাটোর বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয় ও রামপুর-বোয়ালিয়ার বিদ্যালয় ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের জন্য ১,০৪,৫৬৭ টাকা দান করেন। ১৮৫৭ সালে তিনি রাজশাহী সহ-ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন। 
তাঁর মৃত্যুর পর বিধবা পত্নী রাণী ভবসুন্দরী ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত জমিদারি পরিচালনা করেন এবং ১৮৬৭ সালে প্রসন্ননাথের দত্তক পুত্র প্রমথনাথ জমিদারির উত্তরাধিকারী হন। প্রমথনাথ ১৮৭১ সালে রাজা বাহাদুর খেতাবে ভূষিত হন। ১৮৭৭ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৮৮৩ সালে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুরবণ করেন। তিনি ৬ হাজার টাকা ব্যয়ে রামপুর-বোয়ালিয়ার একটি বালিকা বিদ্যালয় ও ১২ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন। রাজশাহী এসোসিয়েশন ও রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি দেড় লাখ টাকা দান করেন। 
প্রমথনাথের দুই স্ত্রীর চার পুত্র ছিল। প্রথম পক্ষের পুত্র ছিলেন প্রমদানাথ। বসন্তকুমার, শরৎকুমার ও হেমেন্দ্রকুমার রায় ছিলেন দি¦তীয় স্ত্রীর সন্তান। প্রমথনাথ মৃত্যুর পূর্বে তার মূল জমিদারি প্রমদানাথকে এবং স্বোপার্জিত সম্পত্তি বসন্তকুমার, শরৎকুমার ও হেমেন্দ্রকুমারকে উইল করে যান। ফলে তার মৃত্যুর পর  জমিদারি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। 
দিঘাপাতিয়া জমিদারির অংশ: প্রমথনাথের মৃত্যুর সময় প্রমদানাথ অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় জমিদারি কোর্ট অব ওয়ার্ডসে ন্যস্ত  হয় এবং ১৮৯৪ সালে ২৯ জানুয়ারি জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৯৭ সালে তিনি রাজা ও ১৮৯৮ রাজা বাহাদুর উপাধি লাভ করেন। ১৯০৯, ১৯২০ ও ১৯২৬ সালে তিনি আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি অনেক জনহিতকর কাজ সম্পাদন করেন। রাজশাহী চিকিৎসালয়ের জন্য ১৫ হাজার টাকা, লেডি ডাফরিন ফান্ডের জন্য ২০ হাজার টাকা, রাজশাহী মৌমাছি পালনের জন্য ৩৪ বিঘা জমি, রাজশাহী কৃষি কেন্দ্রের জন্য ৮০ বিঘা জমি, দাতব্য খাতে বছরে ২৫ টাকা ও রাজশাহী কলেজের জন্যও কিছু দান করেন। মৌখালিতে একটি চিকিৎসালয় ও একটি বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি ভেঙ্গে পড়লে তিনি তা পুনরায় নির্মাণ করেন। প্রমদানাথের মৃতু্যুর পর উত্তরাধিকারী হন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রতিভানাথ। তাঁর আমলেই জমিদারি প্রথার বিলুপ্ত ঘটে।


দয়ারামপুর রাজ এস্টেস: প্রমথানাথ তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর তিন পুত্র বসন্ত কুমার রায়, শরৎকুমার রায় ও হেমেন্দ্র কুমার রায়কে যে স্বোপার্জিত সম্পত্তি উইল করে যান তাতেই দয়ারামপুর রাজ এস্টেট প্রতিষ্ঠিত হয়। এ রাজ এস্টেটের প্রথম দায়িত্বভার গ্রহণ করেন বড় ভাই বসন্ত কুমার রায়। তিনি এমএ পাস করেন এবং আইনে ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর স্ত্রীর অকাল মৃত্যু ঘটার কারণে তিনি নিঃসন্তান অবস্থাতে মারা যান। তাঁর জনহিতকর কাজের মধ্যে রাজশাহী কলেজে বসন্তকুমার এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট অন্যতম। বসন্ত কুমারের মৃত্যুর পর শরৎ কুমার দয়ারামপুর রাজ এস্টেটের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। শরৎকুমার কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ ও বিলেতে লেখাপড়া করেন। ১৯১৮ সালে তার স্ত্রী কিরণলেখা মৃত্যুবরণ করেন। সরকার তাঁকে কোন খেতাব প্রদান না করলেও কৃতিত্বের ফলেই হয়তো জানসাধারণ তাকে রাজা বলেই সম্বোধন করতো। তাঁর বহুল কৃতিত্বের মধ্যে দয়ারামপুরে তিনশ বিঘা জমির উপর মাতার নামে রাণী দ্রবময়ী ফার্ম নামে কৃষি খামার প্রতিষ্ঠা। এ খামারের সঙ্গে তিনি গো-বর্ধন ফার্মও চালু করেন। এছাড়াও তিনি দয়ারামপুরে হাঁস মুরগির খামার, চিনি কল, দয়ারামপুর রাজবাড়িতে বিশাল গ্রন্থাগার, বসন্তকুমার এম ই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উদ্যোগেই রাজশাহীতে একটি কৃষি ফার্ম স্থাপিত হয়। রাজা প্রমদানাথ এ ফার্মের জন্য ৮০ বিঘা জমি দান করেন। এ ফার্মের উপরই পরবর্তীতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতাল নির্মিত হয়। রাজশাহীর যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতির লক্ষ্যে রাজশাহী এসোসিয়েশন রেলপথ স্থাপনের জন্য যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তিনি তার নেতৃত্ব  দেন এবং ১৯২৯-১৯৩০ সালে আব্দুলপুর-আমনুরা রেলপথ স্থাপিত হয়। শরৎকুমার ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। অত্র অঞ্চলের শিক্ষা সাংস্কৃতির বিকাশের লক্ষ্যে অনেক মূল্যবান কর্ম সম্পাদন করে গেছেন। তার গুরুত্বের উপর ভিত্তি করেই রমাপ্রসাদ চন্দ্র The Indo Aryan Races  রচনা করেন। বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি গঠন ও বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব। অনেক কর্মসম্পাদন শেষে ১৯৪৬ সালের ১২ এপ্রিল তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের সমাপ্তি ঘটে। মৃত্যুকালে তাঁর ৫ পুত্র ছিল।