ফিরে যেতে চান

রাজশাহী ধর্ম প্রদেশ ও উত্তম মেষপালক ক্যাথিড্রাল

উত্তম মেষপালক ক্যাথিড্রাল ( উত্তর পাশ) ও তার দেয়ালে সংযুক্ত শিলালিপি

উত্তম মেষপালক ক্যাথিড্রাল মহানগরীর পশ্চিম অঞ্চলে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সরণি (কাশিয়াডাঙ্গা-লক্ষ্মীপুর টিবির মোড় সড়ক) এর উত্তর পাশে ডিংগাডোবাই অবস্থিত। স্থানীয় মানুষের কাছে পল্লীটি বাগানপাড়া বা খ্রিষ্টানপাড়া নামেও পরিচিত। পল্লীর জনগোষ্ঠী উপজাতি বা আদিবাসী খ্রিষ্টান। তাঁদের পাশে বাঙালি খ্রিষ্টান ও মুসলমানরাও বাস করেন। বাঙালি খ্রিষ্টানরা উপজাতি বা আদিবাসী খ্রিষ্টানদের চেয়ে অনেক স্বচ্ছল| 
এ ক্যাথিড্রালটি ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের। এখানে ধর্মপল্লী স্থাপনের পূর্বে এ অঞ্চলের ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা আন্ধারকোঠা পল্লীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। এখানে ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সুনির্দিষ্ট আগমনকাল সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় না। ১৯৫০ সালে শহরে কিছু সংখ্যক ক্যাথলিক খ্রিষ্টান দেখা যেত। ১৯৫২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মহিষবাথানে তাঁদের জন্য প্রথমবার খ্রিষ্টযাগ অর্পণ করা হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে ফাদার পিনোস ও ফাদার কাস্তন মহিষবাথানে তাঁদের জন্য একখন্ড- জমি কিনেন। সেখানে ১৯৫৭ সালে একটি মাটির গির্জাঘর নির্মাণ করা হয়েছিল এবং ১৯৫৭ সালের ১৬ জুলাই কার্মেল এর মা মারীয়ার পর্ব দিনে ফাদার পিনোস খ্রিষ্টযাগ উৎসর্গ করেন। কিন্তু সেখানকার পরিবেশ তাঁদের পছন্দ না হওয়ার কারণে জমিটি চার্চ অব বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর কোর সাহায্য সংস্থার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল আন্ধারকোঠা ধর্মপল্লী থেকে। পরবর্তীতে শহরের একটা ভাড়াবাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৭৫ সালে মহিষবাথানে তাঁরা নিজস্ব ভবন নির্মাণ করেন। ১৯৭৬ সালে জাকোমেল্লীর অর্থায়নে ডিংগাডোবায় কিছু জমি কেনা হয় এবং ১৯৭৯ সালে সেখানে রোগীদের আশ্রয় কেন্দ্র ও ১৯৮২ সালে গির্জাঘর নির্মাণ করা হয়। ১৯৮৩ সালে আন্ধারকোঠা থেকে পৃথক হয়ে ডিংগাডোবা ধর্মপল্লী উন্নীত হয়। এ পল্লীর প্রথম পালক পুরোহিত ছিলেন ফাদার স্টেফান গমেজ সিএসসি। পরবর্তীতে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমাজ কল্যাণ বিভাগে অধ্যাপনা করেছিলেন। করেছিলেন। ধর্মপলস্নীটি Exalation of the Holy Cross এর নিকট উৎসর্গ করা হয়। ১৯৯০ সালের ১২ জুন পোপ জন পল রাজশাহী ধর্ম প্রদেশের ঘোষণা দেন। তখন থেকে ডিংগাডোবা ধর্মপল্লীকে ক্যাথিড্রাল ধর্মপল্লীর মর্যাদা দেয়া হয়ে থাকে। ধর্ম প্রদেশের দ্বিতীয় বিশপ পৌলিনুস কস্তা ২০০৩ সালে এখানে অতি মনোরম একটি নতুন গির্জা নির্মাণ করে নাম দেন ‘উত্তম মেষপালক ক্যাথিড্রাল গির্জা’। ২০০৩ সালের ৮ ডিসেম্বর এ গির্জাটির উদ্বোধন করা হয়।৭২৬
উত্তম মেষপালক ক্যাথেড্রাল গির্জা এর বিশপ ভবন মহানগরীর ১৭ নং ওয়ার্ডের নওদাপাড়ার উত্তরে অমরপুর মহল্লায়। বিশপ ভবন ক্যাম্পাসের আয়তন প্রায় ৪বিঘা।  জায়গাটি নিপেন নামের এক ব্যক্তির নিকট থেকে ক্রয় করা হয়েছিল। ১৯৯২ সালের ৫ জানুয়ারি এখানে নতুন বাড়ির জমি আশির্বাদ করা হয়েছিল। ১৯৯২ সালের ১ ডিসেম্বর নতুন ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে আট টায়  আর্চবিশপ আন্দ্রিয়ানো বার্ণাদিনি ডিডি ভবনটি উদ্বোধন ও আশির্বাদ করেন।৭২৭

১৯৯০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় প্যাট্রিক ডি রোজারিও রাজশাহী ধর্ম প্রদেশের প্রথম ধর্মপালের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিশপ ভবন নির্মাণের পূর্বে তিনি প্রথমে ডিঙ্গাডোবা যাজক ভবনের দোতলায় ছিলেন ৪৯ দিন। তারপর উপশহর ২নং সেক্টরের ৯নং বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।৭২৭
রাজশাহীতে ক্যাথলিক খ্রিষ্টান ধর্ম সম্প্রসারণ সম্পর্কে জানা যায়, রাজশাহী মহানগরীর ৫/৬ কিলোমিটার পশ্চিমে পদ্মার উত্তর তীরে রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের আন্ধারকোঠার পাহাড়িয়া জনগোষ্ঠী সর্ব প্রথম দীক্ষা গ্রহণ করেন। এ জনগোষ্ঠীর আন্ধারকোঠা নিবাসী হাবিল বিশ্বাসের তথ্য অনুযায়ী তাঁর দাদার পিতা কালা চাঁদ সরকার সপরিবারে সর্ব প্রথম রাজশাহী আসেন। আন্ধারকোঠা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পূর্বে বর্তমান সোনাইকান্দি বিজিবি ক্যাম্পের জায়গাটিতেই বসতি স্থাপন করেছিলেন। জায়গাটি ছিল ইংরেজদের মেদিনীপুর জমিদারী কোম্পানীর এস্টেট। পরে কোম্পানী তাঁদের নিকট জায়গাটি হস্তান্তর করে। সরকার পরবর্তীতে পাহাড়িয়াদের নিকট থেকে জায়গাটি ক্রয় ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করে। ফলে পাহাড়িয়ারা বর্তমান আন্ধারকোঠা পল্লীতে স্থানান্তরিত হন। এ জায়গাটিও ছিল মেদিনীপুর জমিদার কোম্পানীর এস্টেট। একইভাবে তাঁরা মালিকানা প্রাপ্ত হন। প্রথমে ক্যাথলিক মিশনের প্রেমচাঁদ নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর থেকে আন্ধারকোঠায় এসে ধর্ম শিক্ষা দেন। পরবর্তীতে ক্যাথলিক মিশনের ফাদার সানতিনো তাভেজ্জা (পরবর্তীতে বিশপ) ১৯০৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্ধারকোঠায় দীক্ষাস্নান দান করেন। ফাদার তাভেজ্জার এটা ছিল প্রথম দীক্ষাস্নান প্রদান। তিনি সে সময় ভবরপাড়া ধর্মপল্লীতে কর্মরত ছিলেন। তিনি তাঁর ভ্রাম্যমান কাটেখ্রিষ্ট তুসতু বিশ্বাসকে সঙ্গে এনেছিলেন। এ তুসতু বিশ্বাসই প্রথম পাহাড়িয়াদের ধর্মশিক্ষা দিয়েছিলেন এবং ধর্মপিতা হয়েছিলেন। নব দীক্ষিত বিশ্বাসী পিতা হিসেবে সবাই তাঁর পদবি গ্রহণ করেছিলেন। ফলে রাজশাহীর পাহাড়িয়ারা এখনও নামের পদবি বিশ্বাস ব্যবহার করেন।৭২৬ 

হাবিল বিশ্বাসের মতে, প্রথম দিকে নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর থেকে মিশন পরিচালিত হতো। এ সময় পাহাড়িয়ারা জমি দান করলে মিশন আবাসনের জন্য টিনশেডের মাটির বাড়ি, স্কুল, চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করে। এর প্রায় ৮/১০ বছর পর বর্তমান দ্বিতল ভবনটি তৈরি হয়। মিশন চত্বরের পরিমাণ প্রায় একশ বিঘা। সবই তাঁরা বিনামূল্যে দান করেন। তখন থেকেই পাহাড়িয়াদের খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ আরম্ভ হয়। তাঁদের ভাষায়, বরেন্দ্র অঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে পাহাড়িয়ারাই সর্ব প্রথম সনাতন থেকে খ্রিষ্টানে ধর্মান্তরিত হন। বর্তমান প্রায় শতকরা নিরানব্বই ভাগ পাহাড়িয়াই খ্রিষ্টান। এর মধ্যে প্রায় নব্বই শতাংশই ক্যাথলিক। নয় শতাংশ অন্যান্য চার্চভুক্ত। শতকরা মাত্র একভাগ পূর্বতন সনাতন ধর্মে আছেন। 
আন্ধারকোঠা মিশনের কেন্দ্র থেকে সব মানুষকে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। বর্তমানে  স্কটল্যান্ড, ভ্যাটিক্যান, নরওয়ে ভিত্তিকসহ বিভিন্ন খ্রিষ্টান মিশন বরেন্দ্র অঞ্চলে ধর্মের আদর্শ প্রচারে ব্যাপক কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। উপজাতি বা আদিবাসীরাও উল্লেখযোগ্য হারে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করছেন।