ফিরে যেতে চান

সিটি চার্চ, রাজশাহী (দক্ষিণ পাশ)

সিটি চার্চ, রাজশাহী খ্রীষ্টিয়ান মিশন হাসপাতাল সংলগ্ন শ্রীরামপুরে অবস্থিত। ইংলিশ প্রেসবিটারীয়ান মন্ডলীর পক্ষ থেকে রেভা. বিহারীলাল সিং ১৮৬২ সালে একটি মিশন কেন্দ্র খোলেন। দু বছরের মধ্যে তিনি অনেকগুলি পাঠশালা, একটি উন্নতমানের স্কুল গৃহ, একটি প্রার্থনা গৃহ ও মিশনারীদের জন্য একটি বাসগৃহ নির্মাণ করেন।১১১ বিহারীলাল সিং কর্তৃক স্থাপিত প্রার্থনা গৃহটি বর্তমান সিটি চার্চ কি না তার তথ্য পাওয়া যায় না। এবনে গোলাম সামাদ তাঁর রাজশাহীর ইতিবৃত্ত গ্রন্থে তথ্য প্রদান করেছেন, রাজশাহী প্রেসবিটারিয়ান গীর্জাটি প্রথমে স্থাপন করেন এক নীল কর সাহেব। পরে তিনি প্রেসবিটারিয়ান মিশনারীদের দান করেন।৪ 

সিটি চার্চের প্রধান ফটকের অভ্যন্তরে রাস্তার পূর্ব পাশ সংলগ্ন বিলুপ্ত ভবন (ছবি- ২০১১)

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখ রোববার সকাল সোয়া নটায় চার্চের ভিতরে প্রবেশ করে দেখা যায় এর পশ্চিম দেয়ালে একটি শিলালিপি। ইংরেজি অক্ষরে উপরের অংশে লেখা আছে-
To the glory of god and loving memory of Rev. Behari Lal Singh Missionary of the Free Church in Calcutta for 21 years And of this place from 1862 till his death in 1874.
This tablet is erected by his lovig children.
চার্চের মূল কক্ষের পিছনের ছোট ঘরের পূর্বমুখী দরজার কাছে মেঝেয় লিখা আছে-
Built 1862
Repaired 1909
চার্চের মূল কক্ষের বারান্দায় সদর দরজার পূর্বপাশের দেয়ালে সম্প্রতি আর একটি শিলালিপি স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে লিখা আছে-
Built 1862
Repaired 1909
Repaired again in 1979
Renovation in 2015
এ শিলালিপির কোনটিই চার্র্চটি স্থাপন কালের নয়। বর্তমান মিশন কম্পাউন্ডে অবস্থানরত ৬৮ বছর বয়স্ক ডেনিস মনোজ বিশ্বাসের নিকট থেকে ২০১৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চার্চ পরিদর্শন কালে জানা যায়, চার্চের অভ্যন্তরে শিলালিপিটি স্থাপন করেছিলেন রেভারেন্ড বিহারীলাল সিংয়ের সন্তানেরা রেভারেন্ড বিহারীলাল সিংয়ের মৃত্যুর পর। চার্চের মূল কক্ষের পিছনের ছোট ঘরের পূর্বমুখী দরজার কাছে মেঝেয় লিখা হয়েছিল ১৯০৯ সালের পরে। সুতরাং এ শিলালিপিগুলোর কোনটাই তথ্যের যথাযথ মৌলিক উৎস হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। সঠিক তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য আরো গবেষণা প্রয়োজন। চার্চ কম্পাউন্ডের মধ্যে নীলকরদের বসবাসের সন্ধান পাওয়া যায়। তা থেকে অনুমান করা যায়, চার্চটি নীলকর সাহেবের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল ১৮৬২ সালে রেভারেন্ড বিহারী লাল সিং আসার পূর্বে। রেভারেন্ড বিহারী লাল সিং আসার পর হয়তো মিশন কম্পাউন্ডেই ক্ষুদ্র আকারে প্রার্থনা কক্ষ স্থাপন করেছিলেন। ২০১৬ সালের ১২ আগস্ট ডেনিস মনোজ বিশ্বাস জানান, মিশন কম্পাউন্ডে ছোট একটা চার্চ আছে। সেটা পূর্বে চার্চ ছিল না। তবে সাহেবরা প্রার্থনা করতেন। পরে সেটা চার্চে পরিণত করা হয়।৭২৫
এ চার্চের প্রাক্তন পুরোহিত রেভা. প্রিয় কুমার বারুই (১৯৩২-৮৩) এর কন্যা প্রফেসর মনিকা মান্নানের নিকট থেকে ১৩ ডিসেম্বর ২০০৩ তারিখে জানা যায়, ১৯৭৯ সালে এ চার্চের ছাদ সংস্কার করা হয়। বর্তমান এটা চার্চ অব বাংলাদেশের (পূর্বের প্রেসবিটারীয়ান এর পরিবর্তিত নাম) অধীনস্ত। এ চার্চ নয় সদস্য বিশিষ্ট সেশন কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়। চার্চের পুরেহিত কমিটির সভাপতি।
চার্চের প্রতিষ্ঠাতা রেভা. বিহারীলাল সিং ১৮৩১ সালে কোলকাতার এক রাজপুত পরিবারে জন্ম নেন। রেভা. ম্যাকডোনাল্ড কর্তৃক ১৮৪৩ সালের ১৩ আগষ্ট তিনি বাপ্তাইজিত হয়েছিলেন। তিনি ফ্রি চার্চ অব স্কটল্যান্ডের দক্ষ কর্মী ছিলেন। বিলেতে থাকাকালীন ইংলিশ প্রেসবিটারীয়ান মন্ডলী এ দেশে মিশন খুলে কাজ করার জন্য তাঁকে নিমন্ত্রণ জানায়। সাগ্রহে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে দেশে ফিরে তিনি রামপুর-বোয়ালিয়াতে (রাজশাহী মহানগরীতে) ১৮৬২ সালে মিশন খুলেন। দুই বছরের মধ্যে তিনি অনেকগুলো পাঠশালা, একটি উন্নতমানের বিদ্যালয় গৃহ এবং মিশনারীর জন্য একটি বাসগৃহ নির্মাণ করেন। তিনি একজন সহকারীর জন্য আবেদন পাঠিয়েও না পেয়ে একাকী স্কুল পরিদর্শন, বাইবেল ক্লাস পরিচালনা, বাইরে সুসমাচার প্রচার, পারিবারিক প্রার্থনা, রবিবারিক ইংরেজি ও বাংলা উপাসনা পরিচালনা করতেন। কঠোর পরিশ্রমের ফলে অল্প দিনেই তাঁর স্বাস্থ্য¨ ভেঙ্গে পড়েছিল। বিধায় তিনি ভগ্ন স্বাস্থ্য¨ নিয়েই বিলেত গমন করেছিলেন।১১১
চার্চের গেইট থেকে কম্পাউন্ডের ভিতরে রাস্তার পূর্ব পাশে একটা লাল রঙের ভবন ছিল। কয়েক বছর আগে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেখা গেছে ভবনটি বিদ্যমান। বয়স্ক ডেনিস মনোজ বিশ্বাসের নিকট থেকে ২০১৬ সালের ১২ আগস্ট সন্ধ্যার পূর্বে জানা যায়, ভবনটিতে এক সময় নীলকর সাহেবরা বাস করতেন। পরবর্তীতে সহকারী ভারতীয় হাই কমিশনার থাকতেন। তারপর কিছুকাল ইপিআর থাকতো। দেশ স্বাধীনের পর ইপিআরেরা ভবনটি ছেড়ে দেয়। বিলুপ্তির পূর্বে মিশন হাসপাতালের স্টাফরা বাস করতেন। চার্চ কম্পাউন্ডের পাদ্রী সাহেবের বাসভবন নির্মাণ করা হয় দেশ স্বাধীনের পর। সেখানে দেশীয় পাদ্রীরা বাস করেন। বিদেশী পাদ্রীরা বাস করতেন মিশন স্কুল কম্পাউন্ডে। স্কুল বাউন্ডারির বাইরে পশ্চিম-উত্তর কোণার লাল ভবনে তাঁরা থাকতেন। সেখানে এখন ভিন্ন অফিস। ভবনটি ১৯২০-১৯২২ সালের দিকে নির্মাণ করা হয়েছিল। ডেনিস মনোজ বিশ্বাসের শোনা কথা, বর্তমান সিটি চার্চের জায়গায় অন্য গির্জা ছিল। ভূমিকম্পে সেটি ভেঙে যায়। বর্তমান চার্চের প্রাচীন নাম ইংলিশ প্রেসবিটারীয়ান চার্চ। পরবর্তীতে বিভিন্ন মতের কয়েকটি মন্ডলী একত্রিত হয়ে নাম হয়েছিল ইউনাইটেড চার্চ। দেশ স্বাধীনের পর হয় চার্চ অব বাংলাদেশ।