ফিরে যেতে চান

এ দেশের ভূমি ব্যবস্থার ইতিহাসে যে জমিদার বংশসমূহ বিশালত্ব অর্জন করেছিল সেগুলোর মধ্যে নাটোর জমিদার বংশ অন্যতম। এর আয়তন বৃদ্ধি পেতে পেতে তের হাজার বর্গমাইল পর্যন্ত  পৌঁছেছিল। তবে ১৭৯৩ সাল থেকে এর আয়তন ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে এবং এর ধ্বংসপ্রাপ্ত উপরই ছোট বড় অনেক জমিদার গজিয়ে ওঠে। 
পুঠিয়া জমিদারির তহশিলদার কামদেবের পুত্র রঘুনন্দন নাটোর জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা। রঘুনন্দন ও তার ভাই রামজীবন পুঠিয়া জমিদারিতে ফারসি ভাষা শেখার সুযোগ এবং সেরেস্তায় চাকরি পান। রঘুনন্দনের তীক্ষè মেধার কারণে পুঠিয়ার জমিদার দর্পনারায়ণ মুর্শিদাবাদে নবাব মুর্শিদকুলি খানের দরবারে জমিদারির উকিল নিযুক্ত করেন। এখানে তিনি মেধার বলে নবাবের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়ে দেওয়ান পদে উন্নীত হন। তিনি ১৭০৬ সালে পরগণা বাণগাছির জমিদারি রাজস্ব অনাদায়ে বাজেয়াপ্ত করে রামজীবনকে বন্দোবস্ত দিয়ে নাটোর জমিদারির সূচনা করেন। উক্ত সালেই তিনি নবাবের অনুগ্রহে দিল্লী থেকে রাজা বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত হন এবং নাটোর রাজবাড়ি নির্মাণ করেন।  

নাটোর জমিদারির রাজবাড়ি (ছবি ইন্টারনেট)


১৭২৪ সালে রঘুনন্দনের মৃত্যুর ফলে রামজীবন সমগ্র জমিদারির মালিক হন। নবাবের নিকট থেকে তিনি ফৌজদারি ও দেওয়ানি ক্ষমতা লাভ করেন। নবাবের প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠার কারণে তিনি পদাতিক সৈন্য ও তোপাদি রাখারও অনুমতি পান। পুঠিয়া জমিদারিতে তার উত্থান হয়েছিল বলে এ জমিদারির কোন অংশে হস্তক্ষেপ না করে আজীবন কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে ১৭৩০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
নাটোর জমিদারের পরবর্তী উত্তরাধিকার ছিলেন রামজীবনের দত্তক পুত্র রামকান্ত (১৭৩০-১৭৪৮)। রামকান্ত মৃত্যুর পর স্ত্রী রানি ভবানী ১৭৪৮ হতে প্রায় পঞ্চাশ বছর জমিদারি পরিচালনা করেন। তার দুই পুত্র অকালে মারা যান। একমাত্র কন্যা ছিলেন তারা ঠাকুরানি। তারার বিয়ে হয়েছিল নওগাঁ জেলার মহাদেবপুরের খাজুর গ্রামের রঘুনন্দন লাহিড়ীর সঙ্গে। রাণী ভবানীর বাসনা ছিল জামাতাকে জমিদারির দায়িত্ব অর্পণ করে নিজে ধর্ম-কর্ম করবেন। কিন্তু ১৭৫১ সালে জামাতার মৃত্যু হলে তিনিই জমিদারি পরিচালনা করতে থাকেন। তারা জমিদারিতে মাকে খুব সহযোগিতা করেন। রাজশাহীতে তাঁকে ঠাকুরাণী মহাশয় বলে সম্বোধন করা হতো। আমলাদের দ্বারা ব্যাপক দুর্নীতি ও ফাঁকিবাজীর শিকার হলে রানি ভবানী তাঁর দত্তক ৪০ বছর বয়সী রামকৃষ্ণকে জমিদারি অর্পণ করেন। কিন্তু তিনি জমিদারির ক্রমশ পতন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে ১৭৯৫ সালে ভগ্নহৃদয়ে মৃত্যুবরণ করেন। যার ফলে রানি ভবানী অবসর পরিত্যাগ করে আবারো জমিদারির ভার গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনিও জমিদারির ক্ষয় ঠেকাতে ব্যর্থ হন এবং ১৮০২ সালে পরলোক গমন করেন। তার মৃত্যুর পর রামকৃষ্ণর দুই পুত্র বিশ্বনাথ ও শিবনাথ জমিদারি লাভ করেন। জমিদারি দুভাগে বিভক্ত হয়ে বিশ্বনাথ পান পিতার জমিদারির অংশ (বড় তরফ)। শিবনাথ পান নাটোর শহরের দেবোত্তর সম্পত্তি।
(খাজুরের লাহিড়ী জমিদার বাড়িতে এখন বাস করেন মুর্শিদাবাদের ইসলামপুর থেকে আগত মুসলমান । আব্দুল করিম বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তি এ বাড়ির অংশীদারের একজন)।
বড় তরফ : ১৭৯৮ সালে বিশ্বনাথ জমিদারির অংশলাভ করেন। তাঁর মৃত্যুকালে কোন পুত্র সন্তান না থাকায় রাণী কৃষ্ণমণি গোবিন্দ চন্দ্রকে ১৮১৪ সালে দত্তক গ্রহণ করেন। ১৮১৪ সাল থেকে ১৮২৯ সাল পর্যন্ত জমিদারি কোর্ট অব ওয়ার্ডসে ছিল। বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে গোবিন্দ চন্দ্র ১৮২৯ সালে জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৮৩৬ সাল পর্যন্ত জমিদারি পরিচালনা করে মারা যান। তিনি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যাবার কারণে তার বিধবা রাণী শিবেশ্বরী স্বামীর অনুমতিপত্র অনুসারে গোবিন্দনাথকে দত্তক গ্রহণ করেন। তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত রাণী কৃষ্ণমণি জমিদারি পরিচালনা করেন। কোন কারণে মনোমালিন্যের ফলে মা শিবেশ্বরী গোবিন্দনাথের দত্তক বাতিলের জন্য মামলা করেন। মামলার রায়ে জজকোর্ট শিবেশ্বরীর পক্ষে গেলেও হাইকোর্ট ও প্রিভি কাউন্সিল গোবিন্দনাথকে দত্তক হিসেবে বহাল রাখে। তবে মামলাটি শেষ হবার পূর্বেই শিবেশ্বরী ও গোবিন্দনাথ মৃত্যুবরণ করেন।  গোবিন্দনাথও নিঃসন্তান হওয়ায় তাঁর বিধবা রাণী ব্রজসুন্দরী জগদিন্দ্রনাথকে ১৮৬৯ সালে ২ বছর বয়সে দত্তক গ্রহণ করেন। জগদিন্দ্রনাথ রায় ছিলেন তৎকালীণ যুগে বাংলার একজন সাহিত্যি, রাজনীতিক, সমাজ সেবক, খেলোয়াড়। তিনি ১৮৭১ সালে মহারাজা উপাধিতে ভূষিত হন এবং ১৯২৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় কলকাতায় ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পর পুত্র যোগীন্দ্রনাথ রাজা হন এবং তাঁর আমলেই জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হয়। তিনি মহারাজা উপাধি পেয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে জয়ন্তনাথ ও ইন্দ্রোজিত নামে দুই পুত্র ছিল। 
ছোট তরফ : শিবনাথও তার ভাই বিশ্বনাথের মত নিঃসন্তান ছিলেন। তাই ১৮১৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দত্তক পুত্র আনন্দনাথ দেবোত্তর সম্পত্তির অধিকারী হন। ১৮৬৬ সালে আনন্দনাথ সিএমআই ও রাজাবাহদুর উপাধি লাভ করেন। তাঁর চার পুত্র ও দুই কন্যা ছিল। তাঁরা চন্দ্রনাথ, কুমুদনাথ, নগেন্দ্রনাথ, যোগেন্দ্রনাথ, স্বর্ণময়ী ও মুক্তলতা। ১৮৬৭ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করলে জ্যেষ্ঠ পুত্র চন্দ্রনাথ ছোট তরফের রাজা হন। তিনি রাজা বাহাদুর খেতাব পান এবং ১৮৭২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁর ভাই যোগেন্দ্রনাথ রাজা হন। তাঁর জীবদ্দশাতেই একমাত্র পুত্র জিতেন্দ্রনাথ মৃত্যুবরণ করেন। জিতেন্দ্রনাথ স্ত্রী হেমাঙ্গিনী ও পুত্র ধীরেন্দ্রনাথকে রেখে ইন্তেকাল করেন। ফলে যোগেন্দ্রনাথ মৃত্যুর পূর্বেই পুত্রবধু হেমাঙ্গিনীকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। রাণী হেমাঙ্গিনীর পুত্র ধীরেন্দ্রনাথ প্রাপ্ত বয়স্ক হলে ছোট তরফের রাজা হন। তাঁর  আমলেই জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়। তিনি ১৯৫৫ সালে কলকাতায় মারা যান।
(বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস গ্রন্থে মো. মাহবুবর রহমান  রচিত বরেন্দ্রের রাজা ও জমিদার প্রবন্ধে হেমাঙ্গিনীর পুত্রের নাম প্রথমে ধীরেন্দ্রনাথ ও শেষের দিকে বীরেন্দ্রনাথ উল্লেখ আছে)।