ফিরে যেতে চান

পুঠিয়া জমিদারির রাজবাড়ি (ছবি-ইন্টারনেট)

সম্রাট আকবরের শাসনামলে পুঠিয়া জমিদারি বা রাজবংশের প্রতিষ্ঠা লাভ করে। অনুমান করা হয় ১৫৯০ সালে এ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা হয়ে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সাড়ে তিনশ বছরেরও বেশি স্থায়ী ছিল। এ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতার নাম পীতাম্বর। ১৫৩৮-১৫৭৬ সাল পর্যন্ত বাংলায় আফগান শাসন থাকায় এর বিভিন্ন অংশ আফগান জায়গীরদারের অধীনে ছিল। পুঠিয়া যে পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিল তা লস্করখান নামক একজন আফগান জায়গীরদারের অধীনে ছিল। তার নামানুসারে পরগণার নাম ছিল লস্করপুর। মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ লস্কর খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সে সময় বৎসাচার্য নামে পুঠিয়ায় এক সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ (এক আশ্রমের পরিচালক) ছিলেন। মূলত তার পরামর্শের ভিত্তিতেই মানসিংহ লস্করখানকে পরাজিত করেন। এর ফলে মানসিংহের বাৎসাচার্যের প্রতি প্রচণ্ড ভক্তি স্থাপন হয় এবং লস্করখানের বাজেয়াপ্ত জায়গিরদারি তাকে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। কিন্তু বাৎসাচার্যের বিষয় সম্পত্তির উপর কোন মোহ না থাকায় মানসিংহের প্রস্তাবে অসম্মতি জানান। তবে জ্যেষ্ঠ পুত্র পীতাম্বর জায়গিরদারি নিজের নামে বন্দোবস্ত নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং মানসিংহ তা সম্রাটের নিকট থেকে অনুমোদন সংগ্রহ করেন। এভাবে পুঠিয়ার জমিদারির সূচনা হয়। পীতাম্বর  জমিদারির আয়তন বৃদ্ধি করেন এবং পুঠিয়া রাজবাড়ি নির্মাণ করেন। ষোড়শ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে এখানে পুঠিয়া রাজবংশের আবাসস্থল নির্মিত হলেও চতুষ্পার্শ্বের অনেকগুলো মৌজা অন্তর্ভুক্ত ছিল। জমিদারি বিলুপ্তির সময় ১৯৫০ সালে পুঠিয়ার আয়তন ছিল ৩১৯৭.৪৬ একর ও জনসংখ্যা প্রায় ৫৫০০ জন। 
পীতাম্বর নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার ভ্রাতা নীলাম্বর জমিদারি পান। সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁকে রাজা উপাধিতে ভূষিত করেন। তখন থেকেই এ বংশ রাজবংশ হিসেবে খ্যাত। নীলাম্বরের পর তার দুই পুত্র আনন্দরাম ও পুষ্পরাক্ষ জমিদারির উত্তরাধিকারী হন। জানা যায়, পুষ্পরাক্ষ তাহিরপুর রাজবংশের অর্ধেক সম্মপত্তি লাভ করেছিলেন। পুষ্পরাক্ষ নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যাওয়ার করণে বড় ভাই আনন্দরামই সকল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। আনন্দরামকে দিল্লীর সম্রাট রাজা উপাধি দেন। তাঁর পর একমাত্র পুত্র রতিকান্ত জমিদার হন। সম্রাট রতিকান্তকে ব্রাহ্মণকুলের প্রধান উপাধি ঠাকুর নামে আখ্যায়িত করেন। রতিকান্তের তিন পুত্র ছিল এবং শেষ দুই পুত্র নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যাওয়ায় জ্যেষ্ঠ পুত্র রামচন্দ্র সকল সম্পত্তির উরাধিকারী হন। তার চার পুত্র রূপনারায়ণ, নরনারায়ণ, দর্প নারায়ণ ও জয়নারায়ণের মধ্যে জেষ্ঠ্য পুত্র রূপনারায়ণ নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তৃতীয় পুত্র দর্পনারায়ণ ও চতুর্থ পুত্র জয়নারায়ণ চৌপুখুরিয়া ও শিরোইলে পৃথক জমিদারি পত্তন করেন। এর ফলে দ্বিতীয় পুত্র নরনারায়ণ পুঠিয়া জমিদারির মালিক হন। এরপর নরনারায়ণের পুত্র প্রেমনারায়ণ, তারপর প্রেমনারায়ণের একমাত্র পুত্র অনুপনারারয়ণ জমিদারি লাভ করেন। সে সময় পুঠিয়া জমিদারি ১৫টি পরগণায় বিস্তৃত ছিল। মুর্শিদকুলি খানের আমলে রাজস্ব বন্দোবস্ত ছিল ১,২৫,৫১৬/- টাকা। অনুপনারায়ণের পর তাঁর চারপুত্র যথাক্রমে নরেন্দ্র নারায়ণ, মোদনারায়ণ, রুপেন্দ্রনারায়ণ ও প্রাণ নারায়ণের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। ফলে জমিদারি চারভাগের মধ্যে প্রত্যেকই বড় ভাইকে আধা আনা করে ছেড়ে দিলে নরেন্দ্র নারায়ণ সাড়ে পাঁচ ছোট তিন ভাই প্রত্যেকে সাড়ে তিনআনা করে সম্পত্তির মালিক হন। এ সাড়ে পাঁচ আনা থেকেই নরেন্দ্র নারায়ণের পরবর্তী বংশধর পাঁচ আনার জমিদার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।  
নরেন্দ্র নারায়ণ বা পাঁচ আনি বংশধর : ভুবনেন্দ্র নারায়ণ, সুরেন্দ্র নারায়ণ, রঘুনারায়ণ, শিবেন্দ্রনারায়ণ, রুদ্রনারায়ণ নামে রাজা নরেন্দ্র নারায়ণের পাঁচ পুত্র ছিল। সুরেন্দ্র নারায়ণ ও রঘুনারায়ণ অকালে মৃত্যুবরণ করেন। জ্যেষ্ঠ ভাই ভুবেন্দ্র নারায়ণ শিবেন্দ্র নারায়ণ ও রুদ্রনারায়ণকে জায়গিরদারি বাবদ সামান্য সম্পত্তি দিয়ে সমস্ত সম্পত্তি দখল করেন। তিনি জমিদারি বৃদ্ধিও করেন। বাংলা ১২১৩ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করলে একমাত্র পুত্র জগন্নারায়ণ সকল সম্পত্তির মালিক হন। কিন্তু জগন্নারায়ণের চাচাত ভাই কৃষ্ণেন্দ্র নারায়ণ (রুদ্রনারায়ণের পুত্র) পৈতৃক সম্পত্তি স্বত্ব দাবি করে মামলা করেন। মামলার রায়ে কৃষ্ণেন্দ্র নারায়ণ অর্ধেক সম্পত্তি লাভ করেন। ফলে পাঁচআনি জমিদারি বিভক্ত হয়ে এক অংশ বড় তরফ আর এক অংশ ছোট তরফ নামে অভিহিত হয়। বড় তরফের অংশ পৌঁনে তিন আনা হলেও এ অংশই পরবর্তীতে পাঁচ আনি অংশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। 
পাঁচ আনি বড় তরফ : জগন্নারায়ণের আমলে জমিদারির আয়তন বৃদ্ধি পায়। তিনি ১৮০৯ সালে রাজা বাহদুর খেতাব পান। ব্রিটিশ সরকার এও ঘোষণা করেন, জগন্নারায়ণের পুত্র-পৌত্রাদি বংশানুুক্রমে রাজা বাহাদুর খেতাব ভোগ করবেন। তার একটা মাত্র পুত্র ছিল। কিন্তু পুত্রটা ছিল চিররোগা। তাই জগন্নারায়ণ স্ত্রী ভুবনময়ীকে দত্তক পুত্র গ্রহণের জন্য অনুমতি পত্র লিখে দেন। রাজা জগন্নারায়ণ ১৮১৬ সালে (বাংলা ১২১৩) মারা যান এবং চিররোগা পুত্রটি বাংলা ১২২৬ সালে মারা যান। তাই বিধবা রাণী ভুবনময়ী জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং হরেন্দ্র নারায়ণকে দত্তক গ্রহণ করেন। ভুবনময়ী অত্যন্ত প্রজাদরদী ছিলেন । তিনি কন্যা কালীশ্বরী দেবী ও দৌহিত্র গোবিন্দ প্রসাদ খাঁকে লস্করপুর পরগণার কয়েকটি মৌজা দান করেন। পরবর্তীতে এ সম্পত্তিতে খাঁ বাবু জমিদার বংশের উৎপত্তি ঘটে। বাকি সম্পত্তি হরেন্দ্র নারায়ণ পান। 
বাংলা ১২৫৮ সালে হরেন্দ্র নারায়ণ মারা গেলে তার একমাত্র পুত্র যোগেন্দ্র নারায়ণ ১১ বছর বয়সে জমিদারি লাভ করেন। কিন্তু অপ্রাপ্ত বয়সের কারণে সম্পত্তি কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনে চলে যায়। ১৫ বছর বয়সে বাংলা ১২৬২ সালের বৈশাখ মাসে ৫ বছর ৭ মাস বয়সী শরৎ সুন্দরীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বাংলা ১২৬৭ সালে কোর্ট অব ওয়ার্ডসের কাছ থেকে তিনি জমিদারির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রজাদের নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলে জয়ী হয়েছিলেন। এ আন্দোলন করতে গিয়েই অনিয়মিত আহার ও অনিদ্্রায় তার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছিল। যার ফলে রাজশাহী মাহনগরীতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলা ১২৬৯ সালের ২৯ বৈশাখ মাত্র ২১ বছর ১১ মাস বয়সে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেন। 
মৃত্যুর পুর্বেই যোগেন্দ্রনারায়ণ জমিদারি রাণী শরৎ সুন্দরীর নামে উইল করে দেন। যোগেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যুর সময় শরৎ সুন্দরী অপ্রাপ্ত বয়সী হওয়ায় জমিদারি কোর্ট অব ওয়ার্ডসে চলে যায়। তিনি প্রজা দরদী ছিলেন। তাই কোর্ট অব ওয়ার্ডসের দেয়া ভাতায় প্রজা কল্যাণ কর্ম সম্পন্ন করতে থাকেন। এমনকি তিনি বিয়ের সময় প্রাপ্ত যৌতুক-জায়গির সম্পত্তির আয় থেকেও প্রজাদের কল্যাণে ব্যায় করেন। তার এ গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন জেলা কালেক্টর সরকারের নিকট রিপোর্ট করেন এবং তার রিপোর্টের ভিত্তিতেই ১৬ বছর বয়সেই শরৎ সুন্দরী কোর্ট অব ওয়ার্ডসের কাছ থেকে জমিদারির দায়িত্বভার পান। তিনি বাংলা ১২৮১ সালে রাণী এবং ইংরেজি ১৮৭৭ সালে দিল্লীর দরবার থেকে মহারাণী উপাধি পান। 
শরৎ সুন্দরী দু’দফায় জমিদারি পরিচালনা করেন। বাংলা ১২৭২ হতে ১২৯০ সাল পর্যন্ত আঠারো বছর তিনি সুষ্ঠুভাবে জমিদারি পরিচালনা করে জমিদারির সম্পত্তি বৃদ্ধি করেন এবং আয় বৃদ্ধি করেন প্রায় দ্বিগুণ। 
বাংলা ১২৬২ সালে ২১ ফাল্গুন রাজা যোগেন্দ্রনারায়ণ লিখিত পত্রে শরৎ সুন্দরীকে দত্তক পুত্র গ্রহণের অনুমতি দান করেছিলেন। তাই শরৎ সুন্দরী নিঃসন্তান হওয়ায় বাংলা ২১ মাঘ রাজশাহীর গুনাইপাড়া নিবাসী কেশবচন্দ্র চক্রবর্তীর দ্বিতীয় পুত্র  রজনীকান্তকে দত্তক গ্রহণ করে নাম রাখেন যতীন্দ্র নারায়ণ। বাংলা ১২৮৭ সালের ২৪ ফাল্গুন যতীন্দ্র নারায়ণের বিয়ে হয় ঢাকা জেলার অন্তর্গত ধল্লা গ্রামের ভুবনমোহন রায়ের কন্যা হেমন্ত কুমারীর সাথে। বাংলা ১২৯০ অব্দে শরৎ সুন্দরী যতীন্দ্রনারায়ণের হাতে জমিদারি অর্পণ করে চিরন্তন তীর্থবাসের উদ্দেশ্যে বারাণসী যাত্রা করেন। বাংলা ১২৯১ সালে যতীন্দ্রনারয়ণের মৃত্যু হলে তিনি পুঠিয়ায় ফিরে এসে দ্বিতীয় দফায় জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষীর চক্রান্তে জমিদারি অধিকার হবার অপ্রাপ্ত বয়স্কা পুত্র বধুর সঙ্গে তার মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। এতে মনঃকষ্ট পেয়ে তিনি পুত্রবধুর বয়ঃপ্রাপ্ত কাল পর্যন্ত জমিদারি কোর্ট অব ওয়ার্ডসের তত্ত্বাবধানে নেয়ার জন্য রাজশাহী কালেক্টরের নিকট আবেদন করেন এবং বাংলা ১২৯৩ অব্দের ১০ ফাল্গুন বারাণসীর উদ্দেশ্যে পুনরায় যাত্রা করেন। কিন্তু শরীরের অবস্থা প্রচণ্ড খারাপ হওয়ার ফলে মাত্র ১০ দিন শয্যায় থেকে ঐ সালের ২৫ ফাল্গুন ৩৭ বছর ৫ মাস ৫ দিন বয়সে বারাণসীতেই মৃত্যুবরণ করেনে। 
শরৎ সুন্দরীর মৃত্যুর পর হেমন্তকুমারী জমিদারি লাভ করেন এবং বাংলা ১৩৪৯ অব্দ পর্যন্ত পরিচলানা করেন। তিনি শাশুড়ীর কৃতকর্ম অনুসরণ করে অনেক জনহিতকর কাজ করেছিলেন। তার কাজের মধ্যে রাজশাহী কলেজে রাণী হেমন্তকুমারী হোস্টেল, হেমন্তকুমারী সংস্কৃত কলেজ এবং মহারাণী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস উল্লেখযোগ্য। তিনিও মহারাণী উপাধি পেয়েছিলেন। সুরেন্দ্রবালা নামে তার একমাত্র কন্যা সন্তান ছিল। কিন্তুু তাঁকে জমিদারি না দিয়ে কুমার অমিয় নারায়ণ, কুমার শচীন্দ্র নারায়ণ ও কুমার নিখিলেশ্বর নামে তিন দৌহিত্রকে উত্তরাধিারিত্ব দান করেন। এ দৌহিত্রগণ এক চুক্তির ভিত্তিতে রাজ এস্টেট বিভক্ত না করে একত্রে এজমালিতে পরিচালনার ব্যবস্থা করেছিলেন। এদের মধ্যে কুমার শচীন্দ্র  নারায়ণ দীর্ঘদিন যুক্তবঙ্গের ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন। পাকিস্তান আমলে তিনি সংবিধান রচনার জন্য গঠিত গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
পাঁচ আনি ছোট তরফ : রাজা পাঁচ আনি ছোট তরফের প্রথম পুরুষরাজা কৃষ্ণেন্দ্রনারায়ণ। মামলার মাধ্যমে কৃষ্ণেন্দ্র নারায়ণ পৈতৃক স্বত্ব ফিরে পেলেও একটি ফৌজদারি মামলার আসামী হওয়ার আশংকায় তিনি গা ঢাকা দিয়ে জীবন-যাপন শুরু করেন এবং এ অবস্থাতেই মারা যান। তার দুই স্ত্রী ছিল। কিন্তু কোন পক্ষেরই সন্তান ছিল না। তাই মৃত্যুর পূর্বে দত্তক গ্রহণের অনুমতি পত্র লিখে যান। বিধাব দুই স্ত্রীই দত্তক গ্রহণ করেন। দত্তকদের বিষয়ে পরস্পর মামলা হয়। দীর্ঘদিন মামলা  চলার পর প্রথম রাণীর দত্তক গ্রহণ বৈধতা পায় এবং ছোট রাণীর অসিদ্ধ ঘোষিত হয়। প্রথম রাণীর দত্তক পুত্র ছিলেন ভৈরবেন্দ্র নারায়ণ রায়। ভৈরবেন্দ্র নারায়ণ রায় যখন জমিদারি গ্রহণ করেন তখন ঋণে জর্জরিত ছিল। তিনি কিছু সম্পত্তি পত্তন দিয়ে, কিছু অংশ বিক্রি করে ঋণ শোধ করেন এবং কলকাতায় ব্যবসা শুরু করেন। হঠাৎ তার মৃত্যু ঘটে এবং ব্যবসার সব সম্পত্তি ম্যানেজার আত্মসাৎ করে। এর ফলে তার পরিবার বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। দিঘাপতিয়ার জমিদার প্রসন্ননাথ ভৈরবেন্দ্র নারায়ণের বন্ধু হওয়ায় এ বিপন্ন পরিবারের জন্য মাসে ১০০ টাকা ধার্য করেছিলেন। মহারাণী শরৎ সুন্দরীও এ পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতেন। বড় তরফের মহারাণী হেমন্তকুমারী কন্যা সুরেন্দ্রবালার সঙ্গে ভৈরবেন্দ্র নারায়ণের দৌহিত্র বিশ্বেশ্বর স্যানালের বিয়ে হয়েছিল
মোদনারায়ণ শাখা: রাজা অনুপনারায়ণের দ্বিতীয় পুত্র মোদনারায়ণের লক্ষ্মীনারায়ণ (বড় তরফ), মহেন্দ্র নারায়ণ (মধ্যম তরফ) এবং রবীন্দ্র নারায়ণ (ছোট তরফ) নামে তিন পুত্র ছিল। মোদনারায়ণের মৃত্যুর পর তার সাড়ে তিন আনা সম্পত্তি এ তিন পুত্রের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। রাজা রবীন্দ্রনারায়ণের কোন সন্তান না থাকায় তার সম্পত্তি চার আনার রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণকে দান করেন। এদিকে মহেন্দ্র নারায়ণের কোন পুত্র না থাকার ফলে কন্যা সত্যভামাদেবী সম্পত্তি লাভ করেন। পুঠিয়ার রামচরণ স্যান্যালের সঙ্গে তার বিয়ে হওয়ার ফলে এ সম্পত্তি পরবর্তীতে স্যানাল পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। 
জ্যেষ্ঠ লক্ষ্মী নারায়ণের শাখা এক আনি নাম পরিচিতি পায়। রাণী ভবানী ও রাণী মহামায়া নামে তার দুই স্ত্রী ছিল। তার মৃত্যুর পর বিধবাদ্বয়ের সম্পত্তির দেখাশোনা করতে থাকেন চারি আনা রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ। রাজেন্দ্র নারায়ণ মারা গেলে স্ত্রী সূর্যমণি এ সম্পত্তি বেদখল দেন। এ নিয়ে মামলাও হয়। লক্ষ্মীনারায়ণের পুত্র গোলকেন্দ্র নারায়ণের সময় কিছু সম্পত্তি ঋণের দায়ে বেহাত হয়। তার কোন সন্তান না থাকায় ব্রজেন্দ্র নারায়ণকে দত্তক গ্রহণ করেছিলেন। ব্রজেন্দ্র নারায়ণ মারা গেলে তার পুত্র  গোপালেন্দ্রনারায়ণ উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির মালিক হন। তিনি ভোগ বিলাসে অনেক ঋণ গ্রহণ করেন। মৃত্যুকালে বিশাল ঋণের বোঝা এবং নৃপেন্দ্রনারায়ণ ও খগেন্দ্র নারায়ন নামে দুই পুত্র রেখে যান। এ ঋণের দায়ে দুই পুত্রের নিকট থেকে সকল সম্পত্তি বেহাত হয়ে যায় এবং তারা কাশিম বাজারের জমিদার মহারাজা মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দী বাহাদুরের অনুগ্রহে মুর্শিদাবাদের খাগড়ায় বসবাস শুরু করেন। এভাবে মোদনারায়ণের শাখার অবসান ঘটে।
রূপেন্দ্রনারায়ণ শাখা : রূপেন্দ্রনারায়ণের কোন সন্তান ছিল না। তিনি রাজেন্দ্র নারায়ণকে দত্তক গ্রহণ করেন এবং উত্তরাধিকার প্রদান করেন। রূপেন্দ্রনারায়ণের সাড়ে তিন আনার সঙ্গে রবীন্দ্রনারায়ণের অংশের দান সম্পত্তি এক হয়ে রাজেন্দ্রনারায়ণের সম্পত্তির পরিমাণ দাঁড়ায় চারআনা তের গণ্ডা। ফলে এ শাখা চারিআনা হিসেবে পরিচিতি পায়। রাজেন্দ্র নারায়ণ রাজা উপাধি পান। তিনি মারা গেলে বিধবা পত্নী সূর্যমণি জমিদারির ভার গ্রহণ করেন। সূর্যমণি কুটিল বুদ্ধি ও অসৎ বুদ্ধির মহিলা ছিলেন বলে লক্ষ্মীনারায়ণের দুই স্ত্রীর সম্পত্তি আত্মসাৎ করতে চেয়েছিলেন। এমনকি তিনি একমাত্র নিজ পুত্র ভুপেন্দ্রনারায়ণকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে মামলা হলে ভুপেন্দ্রনারায়ণ জয়লাভ করেন। ভুপেন্দ্রনারায়ণের তিন পুত্র যথাক্রমে প্রসন্ননারায়ণ,পরেশনারায়ণ ও শীলনারায়ণ। এর মধ্যে প্রসন্ননারায়ণ ও শীলনারায়ণের অকাল মৃত্যু হলে পরেশ নারায়ণ সমস্ত সম্পত্তির মালিক হন। তিনি বিভিন্ন জনকল্যাণ কাজ সম্পাদন করেন। নিজ জমিদারি এলাকাভুক্ত কাপাসিয়া, জামিরা, বানেশ্বর প্রভৃতি স্থানে এবং রামপুর-বোয়ালিয়া, পুঠিয়ায় অনেক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৮৬৪ সালে পুঠিয়ায় তিনি যে মধ্যশ্রেণীর বঙ্গ বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন ১৮৭১ সালে তা ইংরেজি স্কুলে পরিণত হয়। ১৮৬৬ সালে এখানে তিনি একটি  দাতব্য চিকিৎসালয়ও স্থাপন করেন।
তিনি মৃত্যুবরণ করার পর বিধবা স্ত্রী রাণী মনোমোহিনী দেবী সম্পত্তির অধিকারী হন। তাদের কোন সন্তান ছিল না বলে মনোমোহিনী দেবী সুরেশনারায়নকে দত্তক গ্রহণ করেন। কিন্তু সুরেশনারায়ণ অকালে মারা গেলে নরেশনারায়ণকে দত্তক নেন। তিনি যোগ্যতার সহিত জমিদারি পরিচালনা করেন এবং অনেক জনকল্যাণ কাজ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর নরেশনারায়ণ সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করেন। 
প্রাণনারায়ণ শাখা: এ শাখার পরিচিতি ছিল সাড়ে তিন আনির রাজবংশ হিসেবে। প্রাণনারায়ণের মৃত্যু হলে পুত্র আনন্দনারায়ণ উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির মালিক হন। মহেশ নারায়ন, গিরীশনারায়ণ, ঈশ্বরনারায়ণ, ঈশাননারায়ণ নামে  আনন্দনারায়ণের চার পুত্র ছিল। তিনি পরলোকগমন করলে এ পুত্রসমূহের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ হয়ে যায। ফলে প্রত্যেকে সাড়ে সতের গণ্ডার মালিক হন। এরা চৌদ্দপাই জমিদার নামেও খ্যাত হয়ে উঠেন। পরবর্তীতে বংশধর বৃদ্ধি পেলে সম্পত্তি বিভক্ত হয়ে ক্রমশ অনেক মালিকানার সৃষ্টি হয়।