ফিরে যেতে চান

জমিদার শব্দটি ফার্সী শব্দ জমিনদার থেকে এসেছে। জমিন আরবি শব্দের অর্থ ভূমি এবং ফার্সি দার শব্দের অর্থ রক্ষক। শব্দগত অর্থেই বোঝা যায়, জমিনদার অর্থ ভূমিরক্ষক। তাহলে এরা জমির রক্ষক ছিল, জমির মালিক ছিল না। জমিনদার শব্দটি পরিবর্তন হয়ে জমিদার হয়েছিল এবং জমির রক্ষক থেকে জমির অধিকারীও হয়েছিল। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে জমিদার বলতে তাদেরকে বোঝাত, যারা জমির রক্ষক হয়ে প্রজাদের নিকট থেকে রাজস্ব আদায় করতো এবং এর রাজাংশ শাসককে দিয়ে সামান্য পরিমাণে স্বাধীনভাবে ভোগ করতো। মুসলিম শাসনামলে এরাই পরবর্তীতে জমিদার নামে খ্যাতি অর্জন করে ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছিল। কুতুবের প্রধান সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের পর গিয়াস উদ্দিনের সময় হতে সেন রাজাদের অধীনে যে সকল ভূম্যধিকারী ছিল তারাই পরে জমিদার নাম ধারণ করেছিল। পাঠান শাসনামলে বাংলার জমিদারেরা সুবাদারের অধীনে থেকে তাকে রাজস্ব প্রদান করতো। সে সময় জমিদারদের ক্ষমতা বেশি ছিল না। সুবাদারেরাই হর্তাকর্তা ছিল। পাঠানদের পর মোঘলরা দুইশ বছর ভারতবর্ষ শাসন করে। মোঘল শাসনামলে জমিদারদের ক্ষমতা প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এ সময় সুবাদারকে কর প্রদান করলেও অনেকটা স্বাধীন রাজার মতোই জমিদারি করতো। এদের মধ্যে বার ভুঁইয়ারা বেশ ক্ষমতাশালী ছিল। তাদের সৈন্য গড়, বিচারালয় ছিল। আকবরের মত প্রভাবশালী সম্রাট ও জমিদারদের পদমর্যাদা রেখেছিল। নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর আমলে জমিদারেরা নিজ রাজ্যে দেওয়ানী ও ফৌজদারী বিচারকার্য সম্পাদন করতো এবং নিজ বাড়িতে কারারুদ্ধ করতো। তাঁরা কিস্তি মোতাবেক নবাবকে রাজস্ব প্রদান করতো এবং অনেকটা স্বাধীনভাবে জমিদারি পরিচালনা করতো। তবে কিস্তি মোতাবেক রাজস্ব পরিশোধ না করলে শাস্তি ভোগ করতে হতো। কাউকে কারাগারে প্রেরণ করা হতো, কারো জমিদারি কেড়ে নেয়া হতো, কারো বৈকুণ্ঠবাসের ব্যবস্থা হতো। 
নবাব আলীবর্দী খাঁর আমলে জমিদারদের ক্ষমতা প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সে যে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার পূর্বে জমিদারদের পরামর্শ নিতো। এর অন্যতম কারণ ছিল সে জমিদারদের সহযোগিতায় নবাব হয়েছিলো। নবাব সিরাজউদ্দৌলা জমিদারদের এ ক্ষমতাকে ভাল চোখে দেখেনি। তাই তাদের ক্ষমতাকে ক্রমশ খর্ব করতে আরম্ভ করে। এর ফলে জমিদারেরা সিরাজকে উৎখাত করার জন্য ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র আরম্ভ করে। প্রায় সব বড় বড় জমিদারই এ ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে পলাশীর যুদ্ধের পর জমিদারদের ক্ষমতা আরো হ্রাস পেতে আরম্ভ করেছিল। ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট বার্ষিক ২৬ লাখ টাকার রাজকরের বিনিময়ে দিল্লীর সম্রাট শাহ্ আলম ইংরেজদের হাতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানী সনদ প্রদান করে।১১৪ এ সনদের ক্ষমতা বলে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ ১৭৬৬ সালে জমিদারদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে শুভপূণ্যাহ করেছিল। এর ফলে একদিকে যেমন দিল্লী সাম্রাজ্যের অধঃপতন ও বাংলার নবাবের রাজ্য ধ্বংস হয়েছিল। অন্যদিকে ইংরেজ রাজত্বের সূচনা হয়েছিল।    
১৭৮২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর হয়ে কলকাতা আসে। সে দিল্লীর সনদ বলে জমিদারগণের নিকট হতে খাজনা আদায়ের ভার নিজ হাতে গ্রহণ করে। এ জন্য সে প্রত্যেক জেলায় কালেক্টর নিয়োগ করে। সে পাঁচ বছরের জন্য জমিদারদের সঙ্গে একটি বন্দোবস্ত করে। এর ফলে জমিদারদের রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছিল। বন্দোবস্ত মোতাবেক প্রত্যেক জেলায় একটি করে ফৌজদারী ও দেওয়ানী আদালত স্থাপিত হয়েছিল। দেওয়ানী বিচারের ভার ছিল মুসলমান কাজীর হাতে। তবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পূর্ব পযন্ত নাটোর জমিদার দেওয়ানী ও ফৌজদারী বিচারের কাজ সম্পন্ন করতো।১১৪
১৭৮৬ সালে লর্ড কর্নওয়লিস গভর্নর জেনারেল হয়ে ভারতবর্ষে আসে ও ১৭৯৩ সালে জমিদারদের সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে। জমিদারদের সঙ্গে প্রথম দশ বছরের জন্য যে দশশালা বন্দোবস্ত করে, তাই ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। বন্দোবস্ত মোতাবেক ইংরেজ সরকার আর বৃদ্ধি হারে রাজস্ব নিতে পারতো না এবং জমিদারেরাও প্রজাদের নিকট নির্দিষ্ট হারে খাজনা ছাড়া অন্য কোন প্রকার আবওয়াব আদায় করতে পারতো না। কিস্তিমত নির্দিষ্ট দিনে ইংরেজ সারকারকে রাজস্ব দিতে না পারলে জমিদারি নিলামের কথা বলা হয়েছিল। জেলায় কালেক্টদের হাতে খাজনা আদায়ের ভার অর্পণ করা হয়েছিল। এতে জমিদারদের বিচার করার ক্ষমতা রহিত করা হয়েছিল। প্রতি জেলায় দেওয়ানী ও ফৌজদারী বিচারের জন্য জজ নিযুক্ত করা হয়েছিল। জজদের অধীনে বাঙালি মুন্সেফ এবং বিভিন্ন স্থানে থানা স্থাপন করে পুলিশ দারোগা  নিয়োগ করা হয়েছিল। এরপর গভর্নও জেনারেল লর্ড বেন্টিংয়ের আমলে কালেক্টরদের হাতে ফৌজদারী বিচারের ভার অর্পণ করা হয় এবং বাঙালিদের ডেপুটি কালেক্টরের পদে নিযুক্ত করা হয়। লর্ড এলেনবরের আমলে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রে পদ সৃষ্টি করে নিম্ন ফৌজদারী বিচারের কাজ অর্পণ করা হয়।
এ সময় হতে প্রকৃতপক্ষে প্রজাদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করে ইংরেজ সরকারকে রাজস্ব প্রদান ছাড়া জমিদারের কোন ক্ষমতা ছিল না। তবে পুরনো অভ্যাস, বিনা শ্রম, বিনা খরচ ও অশিক্ষার কারণে প্রজারা বিচারের জন্য জমিদারদের শরণাপন্ন হতো। এর ফলে জমিদারেরা বিচারের সামান্য দণ্ডও আদায় করতো।১১৪ জমিদারদের ক্ষমতা হ্রাস পেলেও উত্তরাধিকারী সূত্রে জমিদারি পাওয়ার প্রচলন ইংরেজ আমলেও ছিল।
রাজশাহীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে অনেক ছোট বড় জমিদারের অস্তিত্ব দেখা যায়। বাংলাদেশের আর কোন জেলায় এত সংখ্যক জমিদার ছিল কিনা জানা যায় না। ১৯২৩ সালের পরিসংখ্যান থেকে প্রতীয়মান হয় এ জেলায় বড় জমিদারির সংখ্যা ৩০টিরও বেশি ছিল।৫ প্রজা বাৎসল্য ও উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের ফলে এসব জমিদার রাজা মহারাজার খেতাবে ভূষিত হয়েছে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে জমিদারেরা প্রচুর ক্ষমতাশালী ছিল। আধুনিক রাজশাহীর উন্মেষের পিছনে এসব জমিদারদের প্রত্যক্ষ অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৯৫১ সালের ২৮ আইন অনুসারে উক্ত সালের ১৫ মে জমিদারি উচ্ছেদ আইন কার্যকর হয়।১ জমিদারি প্রথার বিলুপ্ত হলেও রাজশাহীর ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।