ফিরে যেতে চান

খ্রীষ্টিয়ান মিশন হাসপাতাল (উত্তরমুখী) 

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পূর্বে সদর হাসপাতাল ও রাজশাহী খ্রীষ্টিয়ান মিশন হাসপাতাল ছিল রাজশাহীর সর্ব বৃহৎ হাসপাতাল। বেসরকারি পর্যায়ে রাজশাহী খ্রীষ্টিয়ান মিশন হাসপাতাল ছিল সর্ব বৃহৎ। চিকিৎসা সেবায় এর ভূমিকা ছিল অন্যতম।
বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর রাজশাহী, ১৯৯১ এর তথ্যানুসারে ১৮৭৭ সালে খ্রীষ্টিয়ান মিশনারী কর্তৃক হাসপাতালটি স্থাপিত হয় এবং ১৮৯০ সালে নিয়মিতভাবে চালু হয়।২ স্কটল্যান্ডের ফ্রি চার্চ মণ্ডলীর সভ্য ডোনাল্ড মরিসন একটি স্কুল গৃহে (বর্তমানে মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়) প্রথমে হাসপাতালে চিকিৎসা আরম্ভ করেন।১১১ ১৯৫০ সালে বেতার কেন্দ্রের পশ্চিম পাশে বর্তমান হাসপাতাল ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হয়। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ছিল ৬৬টি। তার মধ্যে পুরুষ সাধারণ ওয়ার্ডে ২৫টি, মহিলা সাধারণ ওয়ার্ডে ১৫টি, প্রসূতি ওয়ার্ডে ৭টি, প্রসব কক্ষে ২টি, শিশু ওয়ার্ডে ৫টি, কেবিন কক্ষে ২টি এবং নার্সারী শয্যা ছিল ১০টি। ১৯৬৪ সালে শিশু বিভাগটি সংযোজিত হয়। পরে নির্মিত হয় একটি প্রসূতি সদন। ১৯৭৮ সালে শয্যা সংখ্যা হয় ১১৫টি। ১৯৭৯ সালে শয্যা সংখ্যা হয় ১২০টি।২ তবে রাজশাহী খ্রীষ্টিয়ান মিশন হাসপাতালের সাবেক সুপারিনটেনডেন্ট ডা. প্যাট্রিক বিপুল বিশ্বাস জানান, রাজশাহী শহরে শিশুদের সুচিকিৎসার বিশেষ কোন হাসপাতাল না থাকায় ডা. ইউএন মালাকারের অনুরোধে রাজশাহীতে ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহী ফ্রেন্ডশিপ কমিটির আর্থিক সহযোগিতায় রাজশাহী খ্রিস্টিয়ান মিশন হাসপাতালে ১৯৭২ সালে একটি শিশু বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর পূর্বে ম্যাটারনিটি ব্যবস্থা ছিল।৬৫২
রেভ. প্রিয় কুমার বারুই বঙ্গীয় খ্রীষ্টিয় মণ্ডলীর ইতিহাস (১৯৭৩) গ্রন্থে হাসপাতালটি স্থাপনের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। গ্রন্থটির তথ্যানুসারে, স্কটল্যান্ডের ফ্রি চার্চ মণ্ডলীর সদস্য ডা. ডোনাল্ড মরিসন রাজশাহীর ইংলিশ প্রেসবিটারীয়ান মিশনের মিশনারী হয়ে ১৮৭৭ সালের শেষের দিকে আসার পর  রাজশাহী জেলা প্রশাসন ভবনের পূর্ব পাশে বর্তমান মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে চিকিৎসা সেবা  শুরু করেছিলেন। বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রমের করে এ ক্ষুদ্র চিকিৎসা কেন্দ্রটি এক সময় খ্রীস্টিয়ান মিশন হাসপাতালে উন্নীত হয়। ডা. ডোনাল্ড মরিসন চিকিৎসার পাশাপাশি সুসমাচার প্রচার ও শিক্ষিত যুবকদের বাইবেল ক্লাশ নিতেন। এ সময় সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী কলেজে দু’এক ঘণ্টা অধ্যাপনা করার অনুরোধ আসলে কাজের চাপে আহবানে সাড়া দেয়া সম্ভব হয়নি। এখানে তিনি ২২ বছর কাজ করেছিলেন। কঠোর পরিশ্রমের কারণে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ায় ১৮৯৯ সালে নিজের দেশে ফিরে যান ও সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর রাজশাহী ত্যাগের সঙ্গে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে। ১৯০০ সালে হোম বোর্ড কর্তৃক নিয়োজিত হয়ে রাজশাহী আসেন মিস কে মিলার, আচার্য ডবলিউ জে হ্যামিলটন ও ডা. জেএ ম্যাকডোনাল্ড স্মিথ। দু’বছর পর মিস কে মিলার আপন দেশে ফিরে যান। ১৯০৩ সালে ডা. জেএ ম্যাকডোনাল্ড স্মিথ পুনরায় চিকিৎসা কেন্দ্রটি চালু করেছিলেন। ১৯০৪ সালে তাঁর সহকারী হিসেবে রাজশাহী আসেন ডা. ডোনাল্ড মরিসনের পুত্র  ডা. রবার্ট মরিসন। ফলে আচার্য ডবলিউ জে হ্যামিলটন প্রচার কাজ এবং ডা. জেএ ম্যাকডোনাল্ড স্মিথ ও ডা. রবার্ট মরিসন চিকিৎসায় বেশ মনোযোগী হয়ে উঠেন। এ সময় রাজশাহী শহরে সদর হাসপাতাল থাকায় ডা. জেএ ম্যাকডোনাল্ড স্মিথ তৎকালীন নওগাঁ মহকুমার কোন এক জায়গায় একটি হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাঁর যুক্তিগত প্রস্তাবের ভিত্তিতে হোম কমিটি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য অর্থ প্রেরণ করে। সান্তাহার ও নওগাঁর মাঝখানে তুলসী নদীর তীরে আনুমানিক ৪০ বিঘা ক্রয়কৃত জমির উপর নির্মিত হয় একটি হাসপাতাল। ১৯১১ সালে হাসপাতালটি চিকিৎসা সেবা আরম্ভ করেছিল ও ভালভাবে চলছিল। কিন্তু অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে কয়েক বছর পর ডা. জেএ ম্যাকডোনাল্ড স্মিথ অসুস্থ হয়ে পড়েন ও নিজের দেশ গমন করেন। তখন ডা. রবার্ট মরিসনকে রাজশাহী চিকিৎসা কেন্দ্রটি বন্ধ রেখে নওগাঁ হাসপাতালের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে ঔষধ ও অন্যান্য জিনিসের দুস্প্রাপ্যতা এ হাসপাতালের চিকিৎসা সেবায় বিঘ্ন ঘটে। এদিকে ডা. রবার্ট মরিসন এক বছরের জন্য স্বদেশ গমন করেন। ফলে হাসপাতালটি এ সময় বন্ধ থাকে। তিনি স্বদেশ থেকে ফিরে আবারো হাসপাতালটি চালু করেন। কিন্তু ১৯২২ সালে আচার্য ডবলিউ জে হ্যামিলটনের মৃত্যুতে রাজশাহীর মিশনারী শূন্য হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে ডা. রবার্ট মরিসনকে রাজশাহীতে আসতে হয় এবং ১৯২৩ সালে নওগাঁর হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যায়। ডা. রবার্ট মরিসন রাজশাহীতে সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন। তাঁর সহকর্মী রূপে ডা. ভূপেন্দ্রনাথ ভায়াকে নিয়োগ করেন। ডা. রবার্ট মরিসন ১৯২৯ সালে রাজশাহী ছেড়ে যান। তখন আউটডোরে ডা. ভূপেন্দ্রনাথ ভায়া চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রাখেন। তিনি ১৯৪০ সাল পর্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় মিসেস ইউয়াটের চেষ্টায় একটি দোতলা ভবন নির্মাণ করে মাতৃসদন খোলা হয়। মিস নাইনান, ডা. মিস দাম, ডা. মিস সেনের তত্ত্বাবধানে কয়েক বছর মাতৃসদনটি চালু ছিল। উপযুক্ত লেডি ডাক্তারের অভাবে এ মাতৃসদনটি অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়নি। 
১৯৪০ সালেই ডা. হিমাংশু কুমারকে ডা. ভূপেন্দ্রনাথ ভায়ার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছিল। ১৯৪৩ সালে ডা. হিমাংশু কুমার যুদ্ধে অংশগ্রহণের কারণে অস্থায়ীভাবে একজন হিন্দু ডাক্তারকে নিয়োগ করা হয়। ১৯৪৮ সালে ডা. উপেন্দ্রনাথ মালাকারকে চিকিৎসা সদনের চিকিৎসক নিয়োগ করা হয়। এর কিছুকাল পরেই ডা. ইয়ান প্যাট্রিককে হাসপাতালের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য বিলেত থেকে পাঠানো হয়। তিনি দায়িত্ব নিয়ে হাসপাতালটি বর্তমান মিশন চত্বর হতে ওয়েস্ট মিনিস্টার হোস্টেলে স্থানান্তর করেন। বর্তমান হাসপাতাল ভবনটিই ছিল ওয়েস্ট মিনিস্টার হোস্টেল। এখানে পুরুষ বিভাগ, মহিলা বিভাগ খুলে রোগীদের ইনডোর-আউটডোর চিকিৎসা অব্যাহত রাখা হয়। ডা. ইয়ান প্যাট্রিকের সহযোগিতার জন্য  বিলেত হতে ডা. ফারমার ও ডা. সেভ এসেছিলেন রাজশাহীতে। কিন্তু দু’বছরের বেশি থাকতে পারেননি। ১৯৫৩ সালে বিলেত থেকে আসেন লেডি ডাক্তার এলিজাবেৎ কনান। এরপর ডা. ইয়ান প্যাট্রিকের স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় তিনি ডা.উপেন্দ্র নাথ মালাকার ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. মিসেস মৃণালিনী মালাকারকে এ হাসপাতালের চিকিৎসক নিয়োগ করেন। তাঁদের সঙ্গে কিছুকাল কাজ করার পর তিনি ১৯৫৭ সালে আপন দেশে ফিরে যান। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ডা.উপেন্দ্র নাথ মালাকার হাসপাতালের কর্মধ্যক্ষ হন। রেভ. প্রিয় কুমার বারুই বঙ্গীয় খ্রীষ্টিয় মণ্ডলীর ইতিহাস (১৯৭৩) গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘বর্তমানে হাসপাতালের বহু পরিবর্তন ও পরিবর্দ্ধন হয়েছে এবং প্রসূতি, শিশু ও সাধারণ পুরুষ ও মহিলা রোগীদের সুবন্দোবস্ত করা হয়েছে।’১১১ 
৪ ডিসেম্বর ২০০২ তারিখের তথ্যানুসারে ওয়ার্ড সংখ্যা ৪টি এবং শয্যা ১২০টি। এখানে আউটডোর ও ইনডোর চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। গড়ে প্রতিদিন আউটডোরে রোগীর সংখ্যা হতো প্রায় ৯০ জন ও ইনডোরে রোগী থাকতো ৩৫ জন। ৩১ ডিসেম্বর ২০০৪ তারিখের যুগান্তরের রিপোর্ট অনুসারে ৩০ নভেম্বর ২০০৪ তারিখে হাসপাতালটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। সেপ্টেম্বর ২০০৬ এ দেখা যায় হাসপাতালটি চালু আছে। তবে ২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এ হাসপাতালের পরিচালক (ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) মার্টার চৌধুরীর মতে, হাসপাতাল বন্ধ হয়নি। ইনডোর সার্ভিস কিছুদিন বন্ধ ছিল। হাসপাতালটি চার্চ অব বাংলাদেশের (প্রটেস্ট্যান্ট) আওতাধীন। এর প্রধান হলেন পরিচালক।