ফিরে যেতে চান

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ প্রশাসন ভবন (দক্ষিণমুখী)

১৯৪৭ সালের পূর্ব থেকেই এখানে চিকিৎসার সমস্যা ছিল। উচ্চ শিক্ষিত ডাক্তারের সংখ্যা ছিল খুব নগণ্য। শহরাঞ্চলে দু একজন এমবি ও ইংরেজি শিক্ষিত ডাক্তার ছিল বটে কিন্তু অসুবিধার কারণে মফস্বলে যেতে পারতেন না। উচ্চ শিক্ষিত ডাক্তারের জন্য কলকাতার উপর নির্ভর করতে হতো। তবে সবার পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য অসুবিধার কারণে ঢাকা যাওয়াও ছিল মুশকিল। তাই সুচিকিৎসার বিষয়ে উত্তরাঞ্চলবাসীকে নিরাশ থাকতে হতো। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হলে উত্তরবঙ্গ কলকাতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় এ সংকট আরো প্রবল আকার ধারণ করে। এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হয়ে ওঠে তৎকালীন জনহিতৈষী সচেতন মহল। ফলে জনসাধারণের তিন লক্ষাধিক টাকার চাঁদায় বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের দক্ষিণে মুসলিম ক্লাবে বর্তমান টিবি সেন্টারে ১৯৪৯ সালে স্থাপিত হয় একটি প্রাইভেট মেডিক্যাল স্কুল। রাজশাহীর চির স্মরণীয় মহৎ ব্যক্তিত্ব এমএলএ মাদার বখশ এর প্রস্তাব করেন। রাজশাহীর তদানীন্তন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর অব পাবলিক হেলথ আব্দুল জাব্বার, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল মজিদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও জনগণের সহযোগিতায় মাদার বখশের প্রস্তাব বাস্তবের রূপ ধারণ করে। তৎকালীন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরউদ্দিন আকন্দের অবদানও রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণে স্মরণযোগ্য। প্রতিষ্ঠার পর মেডিক্যাল স্কুলটিকে বর্তমান শিশু ও মাতৃমঙ্গল প্রতিষ্ঠানের পশ্চিম ধারে একটি দ্বিতল গৃহে সম্প্রসারিত করা হয়।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রশাসন ভবন (দক্ষিণমুখী)

এনাটমি বিভাগের শব ব্যবচ্ছেদের জন্য বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম ভবন প্রাঙ্গণের পশ্চিম উত্তর কোণে একটি ভবন তৈরি করা হয়েছিল। সাহেব বাজারস্থ কো-অপারেটিভ বিল্ডিং মেডিক্যাল স্কুলের শ্রেণি কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। হেতমখাঁ মোড়ের সদর হাসপাতালের উত্তরের দালানটি (বর্তমানে ইপিআই কেন্দ্র) শব ব্যবচ্ছেদের জন্য ব্যবহার করা হতো। বর্তমান সিভিল সার্জন অফিসের বিপরীতে কছিরন ভিলা ছাত্রীদের প্রথম অস্থায়ী হেস্টেল হয়েছিল। রাজশাহী কলেজ হোস্টেলের বিপরীতে আলমগীর ছাত্রাবাসটি ছিল প্রথম ছাত্রাবাস। যা বর্তমান সিভিল সার্জন অফিস। পাঠানপাড়ার ইবনে সিনা হোস্টেলটি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রাবাস ছিল। সদর হাসপাতাল সে সময় মেডিক্যাল স্কুলের হাসপাতাল  হিসেবে ব্যবহৃত হতো ১৯৫৪ সালে মেডিক্যাল স্কুলটি সরকারি হয় এবং ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে রূপান্তরিত হয়। এনাটমি ও ফিজিওলজি দুটি বিভাগ ও ৫ জন অফিস স্টাফ নিয়ে কলেজের যাত্রা আরম্ভ হয়। কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন এনাটমি বিভাগের প্রধান লে. কর্নেল গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদ। ফিজিওলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক ডা. নায়েব আলী। প্রথম ব্যাচে ৪১ জন ছাত্র ও ২ জন ছাত্রী মোট ৪৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এমবিবিএস শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। এ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ১৯৬৩ সালে এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম গ্রাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করে। কলেজের মনোগ্রামটির রূপকার মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন আর্টিস্ট নুরুল আলম।৬৭
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালটি ৯০ একর জমির ওপর অবস্থিত। মেডিক্যাল কলেজের জন্য নির্মিত স্কুলটি কলেজের বিল্ডিংয়ে পরিণত হয়। ৬০.৮৪ একর জমির ওপর অবস্থিত হাসপাতালটির জায়গায় পূর্বে কৃষি ফার্ম ছিল।৬৭ ৭ তলার পরিকল্পনা বিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনের ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩ তলা পর্যন্ত নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৬৫ সালে। পরবর্তীতে এ ভবনের কিছু অংশ সম্প্রসারিত হয়। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৩ তারিখের প্রতিবেদন অনুসারে হাসপাতালের ওয়ার্ড সংখ্যা ২৫টি, শয্যা ৫৩০টি, চিকিৎসক ১৬৪ জন। প্রতি বছর গড়ে ৪ লাখ ৫ হাজার ৮৬৩ জন রোগীকে আউটডোর ও ৩ লাখ ২৪ হাজার ২১১ জন রোগীকে ইনডোর চিকিৎসা প্রদান করা হয়। হাসপাতালের প্রধান হলেন পরিচালক। তিনি সেনাবাহিনীর ব্রিপেডিয়ার জেনারেল।
মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সম্পসারণের উদ্দেশ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৬২ সালে প্রথম কলেজ ক্যান্টিন চালু হয় হাসপাতালের কিচেনের পাশে। ১৯৬৩ সালে প্যাথলজি বিভাগের উত্তরে ক্যান্টিনের টিনশেড নির্মাণ হয় এবং ১৯৮২ সালে তা একতলা ভবনে পরিণত হয়। ১৯৬৯ সালে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্র নির্মাণ হয় (রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধীনস্থ নয়)। ১৯৭৪ সালে প্রশাসনিক ভবনের সামনে শহীদ মিনার নির্মাণ হয়। ১৯৮৪ সালে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় করোনারি কেয়ার ইউনিট খোলা হয়। ১৯৯০ সালে এটা কার্ডিওলজি বিভাগ হিসেবে পূর্ণতা লাভ করে। ১৯৮৯ সালে ডেন্টাল সার্জারি কোর্স চালু হয়। এ কোর্সে প্রথম ব্যাচে মাত্র ৯ জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়। ১৯৮২ সালে কলেজের জিমনেসিয়াম তৈরি হয়। ১৯৯০ সালে ফার্মাকোলজি ভবন তৈরি হয়। ১৯৯১ সালে খোলা হয় নিউরো সার্জারি বিভাগ ও কিডনি রোগ বিভাগ। ১৯৯৩ সালে শিশু সার্জারি বিভাগ খোলা হয়। ১৯৯৪ সালে নিউরো মেডিসিন বিভাগ চালু হলেও এর ওয়ার্ড খোলা হয় ১৯৯৯ সালে। ফার্মাকোলজি ভবনের পূর্বে ১ হাজার বিশিষ্ট আসনের সুরম্য আধুনিক অডিটোরিয়াম তৈরি হয় ১৯৯৫ সালে। আন্ডার গ্রাজুয়েটের পাশাপাশি ডিপ্লোমা ইন চাইল্ড, ডিপ্লোমা ইন ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি বিষয় দুটিতে পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্স চালু হয় ১৯৯৮ সালে।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের মিলিনিয়াম পুনর্মিলনী ২০০০ এর তথ্যানুসারে কলেজ বিল্ডিংয়ে ৩টি গ্যালারি, ২টি মিউজিয়াম, ২টি ব্যবচ্ছেদ কক্ষ, ১টি লাশ কাটা ঘর, ১টি ছাত্র কমন রুম, ১টি ছাত্রী কমন রুম, ৮টি ল্যাবরেটরি, ১টি লাইব্রেরি আছে। লাইব্রেরিতে ১৮ হাজার বই ও বাঁধাইকৃত ১৮শ মেডিক্যাল জার্নাল আছে। নিয়মিতভাবে ৩৪ প্রকারের দেশি ও ২৬ প্রকারের বিদেশি জার্নাল নেয়া হয়। ১৯৮৪ সাল থেকে এ কলেজ থেকে TAJ মেডিক্যাল জার্নাল প্রকাশ হয়।
কলেজ চত্বরেই অবস্থিত স্টাফ কোয়ার্টার, ছাত্রদের জন্য শহীদ কাজী নুরুন্নবী ও শহীদ শাহ মঈনুল আহসান চৌধুরী পিংকু ছাত্রাবাস, ছাত্রীদের জন্য পলিন ও ফাল্গুনী ছাত্রী নিবাস আছে। পুরুষ ইন্টার্নী চিকিৎসকের জন্য শহীদ জামিল আখতার রতন ও মহিলা ইন্টার্নী চিকিৎসকের জন্য আলাদা হোস্টেল আছে।
২০০১ সালে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের অফিস সহকারী প্রদত্ত তথ্যানুসারে কলেজে মোট বিভাগের সংখ্যা ৩১টি। মিলিনিয়াম পুনর্মিলনী ২০০০ এর তথ্যানুসারে কলেজে অধ্যাপকের সংখ্যা ৮ জন, সহযোগী অধ্যাপক ১৯ জন, সহকারী অধ্যাপক ৪১ ও প্রভাষক ৪৭ জন। কর্মচারী ১৮৫ জন। ছাত্র-ছাত্রী ১১৪৩ জন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও মালয়েশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, জর্দান, ইরান, ইরাক, লেবানন, নেপাল, শ্রীলংকা, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, সোমালিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী এখানে পড়তে আসে। 
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে শিক্ষকের সংখ্যা ১৭৯ জন। অধ্যাপকের সংখ্যা ১৫ জন, সহযোগী অধ্যাপক ৩৩ জন, সহকারী অধ্যাপক ৭৮ ও প্রভাষক ৫৩ জন। বিভাগের সংখ্যা ৪৩টি।৩৬২ ৫টি বর্ষে ছাত্র-ছাত্রী ১১৭০ জন। এর মধ্যে এমবিবিএস ৯৬৭ জন ও বিডিএস ২১০ জন।৩৬৪ ভারতের কাশ্মির ও নেপালের ছাত্র-ছাত্রী পড়ছেন।৩৬২ সাধরণ কর্মচারীর সংখ্যা ২২৪ জন। ২য় শ্রেণি ৪ জন, ৩য় শ্রেণি ৪৭ জন ও ৪র্থ শ্রেণি ১৭৩।৩৬৩ 
কলেজের চিকিৎসক ও বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রী সংগঠিতভাবে মানবসেবামূলক কাজও করে থাকে। সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম এবং মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সেবার জন্য ব্রিটিশ মেডিক্যাল কাউন্সিল ১৯৯২ সালের ১ জুলাই এ কলেজকে স্বীকৃতি প্রদান করে।
২২ ডিসেম্বর ২০০৩ তারিখ থেকে এ হাসপাতালে এনজিওগ্রাম মেশিন চালু হয়। কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার সিকান্দার আলীকে অস্ত্রোপাচার করে এ এনজিওগ্রাম দ্বারা পেস মেকার বসানো হয়। জার্মানের তৈরি মেশিনটির মূল্য ৪ কোটি টাকা। ১১নং ওয়ার্ডের বিশেষ কক্ষে মেশিনটি স্থাপনে ব্যয় হয় ১৫ লাখ টাকা।১২৩
এ হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ১০০০ টিতে উন্নীতকরণের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৬ তারিখে (তথ্য ভিত্তি প্রস্তর)। ১০ তলা ভিত্তির উপর এ ভবনের ৪ তলা পর্যন্ত নির্মাণ কাজ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ তারিখে শুরু হয় ও ২৬ মার্চ ২০১৩ তারিখে রোগী সেবা কার্যক্রম শুরু হয়। রোগী সেবা কার্যক্রম অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। ৪ তলা পর্যন্ত নির্মাণ ব্যয় হয় ২৯ কোটি ২ লাখ টাকা।
ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি): ২৬ জুন ২০০২ তারিখে এ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে ওসিসি স্থাপন করা হয়।৬৮ ১৪ আগস্ট ২০০৫ তারিখের সমকাল পত্রিকার তথ্যানুসারের এখানে ২ জন সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, ৬ জন নার্স, পুলিশের ১জন সাব-ইন্সপেক্টর, ২জন কনস্টেবল, ১জন কম্পিউটার অপারেটর ও ৩ জন ক্লিনার আছেন। এখানে নির্যাতিতা নারীর চিকিৎসা, নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং মানসিক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য কাউন্সেলিং দেয়া হয়। প্রয়োজনে সমাজকল্যাণ বিভাগের সাহায্য ও নিরাশ্রয়ীদের শেল্টার হোমে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এতগুলো সেবা এক জায়গা থেকে দেয়া হয় বলে এটার নাম রাখা হয়েছে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার।১৮০