ফিরে যেতে চান

বাংলাদেশ টেলিভিশনের রাজশাহী সম্প্রচার কেন্দ্র ও টিভি স্টুডিও আন্দোলন

বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বপাশে বাংলাদেশ টেলিভিশনের রাজশাহী সম্প্রচার কেন্দ্র অবস্থিত। ১৯৯৪ সালে তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। নির্মাণ আরম্ভ হয় ১৯৯৬ সালে। ২০০১ সালের ১৩ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রচারের উদ্বোধন করেন। কেন্দ্রটি বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকা কেন্দ্রের প্রচারিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। 

বাংলাদেশ টেলিভিশন (সম্প্রচার কেন্দ্র), কাজীহাটা, রাজশাহী

২৩ ডিসেম্বর ২০০২ তারিখে রাজশাহী সম্প্রচার কেন্দ্র হতে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে কেন্দ্রটি ৩.৮৮ একর জমির উপর অবস্থিত। ৪৮০ ফুট উঁচু এন্টেনা টাওয়ার, সম্প্রচার ভবন, পাওয়ার সাব স্টেশন ও পুলিশ ব্যারাক নির্মাণ হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ১৩.৪৫ কোটি টাকা। কেন্দ্রের জায়গাটি পূর্বে বাংলাদেশ রাইফেলস এবং পরবর্তীতে আনসার বাহিনী ব্যবহার করতো।
প্রাথমিক পর্যায়ে কেন্দ্রটি রাজস্ব খাতে ছিল না। বর্তমানে রাজস্বভুক্ত। এর মঞ্জুরীকৃত জনবল ১৯। প্রধান হলেন রক্ষণ প্রকৌশলী। সম্প্রচার ক্ষমতা ১০ কিলোওয়াট। কেন্দ্রটি উদ্বোধন হয় রাজশাহী সম্প্রচার কেন্দ্র হিসেবে। তবে কাগজে কলমে ব্যবহার হচ্ছে রাজশাহী উপকেন্দ্র নামে।৪২৫


টিভি স্টুডিও আন্দোলন

রাজশাহীতে টিভি স্টুডিও আন্দোলন স্থানীয় মানুষের গণজাগরণ ও ঐক্যের দৃষ্টান্ত। দল মত নির্বিশেষে কিশোর থেকে প্রবীণ সবাই এ আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে। এ আন্দোলন বাংলাদেশের নাগরিক আন্দোলনে এক অভিনব কর্মসূচির সংযোগ ঘটায়। তা হলো ১৫ মিনিট, ২০ মিনিটের হরতাল পালন। পূর্ব ঘোষিত সময় অনুযায়ী এ অভিনব হরতালের জন্য বাঁশি দিলেই সবাই নিজ নিজ কাজ বন্ধ করে দিত। রাস্তার যানবাহন ও পথচারীরা দাঁড়িয়ে যেত। কোন মোড়ে ঐ সময়ে তরুণরা রাস্তায় দড়ি ধরে বেরিকেড তৈরি করতো। এ কর্মসূচির উদ্ভাবক ছিলেন সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী মুক্তিযোদ্ধা মাহাতাব উদ্দিন। আন্দোলন কর্মসূচিতে আরো ছিল পূর্ণ দিবস হরতাল, অর্ধ দিবস হরতাল, স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী, গণস্বাক্ষর, গণসংযোগ, কর্মীসভা, পথ অবরোধ,  মিছিল, সমাবেশ, পথসভা, ব্যঙ্গনাটক, সঙ্গীত, স্মারক লিপি প্রদান, সাংবাদিক সম্মেলন প্রভৃতি। বিভিন্ন সভা, সমিতি, সংগঠন থেকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় দলীয় নেত্রী, আইন মন্ত্রী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী, মেয়র, জেলা প্রশাসকের নিকট ২৫০ টি স্মারক লিপি প্রদান করা হয়। বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন যেমন রাজশাহী থিয়েটার, নাট্যদল ঐক্য পরিষদ, রাজশাহী সচেতন নাগরিক কেন্দ্র, অবকাশ নাট্যদল, বসুন্ধরা থিয়েটার, মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী গবেষণা কেন্দ্র, রাজশাহী সাংস্কৃতিক সমন্বয় পরিষদ, ছাত্রদল ঐক্য পরিষদ, সঙ্গীত সংগ্রাম পরিষদ, সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ, ক্রীড়া সংগ্রাম পরিষদ। বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনও আন্দোলনে মুখর হয়ে ওঠে। যেমনÑ বেনেতি ব্যবসায়ী সমিতি, বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতি, বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি রাজশাহী শাখা, রাজশাহী স্টেশনারী ও মনোহারী ব্যবসায়ী সমিতি, রাজশাহী ক্রোকারিজ সমিতি, পাদুকা সমিতি, কাজলা বাজার ব্যবসায়ী সমিতি, সপুরা ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংঘ, নিউ মার্কেট বণিক সমিতি, শালবাগান বাজার ব্যবসায়ী সমিতি, মুচি জনগোষ্ঠিসহ বিভিন্ন সংগঠন সোচ্চার হয়ে ওঠে। মহল্লা ও পাড়াভিত্তিক বিভিন্ন ক্লাব, সংঘ পাড়ায় পাড়ায় আন্দোলনকে উৎসবমুখর তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মহানগরীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মিছিল, মানব বন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান শুরু করে। ১৯৯২ সালের ১৯ জুলাই মুসলিম হাই স্কুলের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন ভিন্ন দিনে কর্মসূচি পালন করে। 
রাজশাহীর সাথে সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে এ আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। রাজশাহীতে পূর্ণাঙ্গ টিভি স্টুডিওর প্রস্তাবনা বগুড়ায় স্থানান্তরের পরিকল্পনা প্রচারের প্রথমে কয়েকজন সংস্কৃতি কর্মী আন্দোলনের সূচনা করেছিল। এরপর সংস্কৃতি কর্মী থেকে আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে দুপুরে ঘোড়ামারা পোস্ট অফিসের গেটে চিত্রকর এমএ কাইউমের উপস্থিতিতে প্রখ্যাত গীতিকার আনোয়ারুল আবেদিনের জমজ ভাই চিত্রকর আশফাকুল আশেকিনের নিকট এ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি মত প্রকাশ করেন, টিভি স্টুডিও আন্দোলনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সাংবাদিক মাহাতাব উদ্দিন। 
আন্দোলনের সূচনা হিসেবে সচেতন নাগরিক কেন্দ্রের ৬ দফা দাবি সম্বলিত পোস্টারে রাজশাহীতে টিভি স্থাপন জায়গা পায়। এ পোস্টার ছাপানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল রাজশাহী কলেজের কলাভবনের সামনের মাঠে আয়োজিত সচেতন নাগরিক কেন্দ্রের সভায়। যাতে সভাপতিত্ব করেন ঐ কেন্দ্রের আহবায়ক সাহেব বাজারের লাল। এরপর ১৯৯২ সালের ১৪ জুন নাট্যদল ঐক্য পরিষদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাজশাহী থিয়েটার কার্যালয়ে ১৯৯২ সালের ২৩ জুন মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় টিভি স্টুডিওর বিষয়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, পেশাজীবী নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে একটি সভা আহ্বান করা হয়। ঐ সভায় ৬৪ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। রাজশাহী থিয়েটারে জায়গা সংকুলানের কারণে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিবি হিন্দু একাডেমীতে। আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করলে পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ জেলার সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাংবাদিকরাও রাজশাহীর আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েন। রাজশাহীতে টিভি স্টুডিও স্থাপনের পক্ষে রামেন্দু মজুমদারও সাপ্তাহিক দুনিয়ায় মত ব্যক্ত করেন। তৎকালীন মেয়র মো. মিজানুর রহমান মিনু, জননেতা ফজলে হোসেন বাদশা (এমপি ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে), তৎকালীন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন (মেয়র ২০০৮ সালের নির্বাচনে)সহ রাজশাহীতে টিভি স্টুডিও স্থাপনের জন্য বক্তব্য প্রদান করেন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে তৎকালীন তথ্য মন্ত্রী রাজশাহীতে পূর্ণাঙ্গ টিভি স্টুডিও স্থাপনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। তবে পূর্ণাঙ্গ টিভি স্টুডিওর পরিবর্তে রাজশাহীতে স্থাপন হয় সম্প্রচার কেন্দ্র।৫৬৪
২৯ ও ৩০ মে ২০১১ তারিখে দৈনিক সোনার দেশে প্রকাশিত ফিরে দেখা টিভি স্টুডিও আন্দোলন প্রবন্ধে টিভি স্টুডিও আন্দোলনের প্রথম সারির কর্মী ও সংস্কৃতি কর্মী কামার উল্লাহ সরকার উপরোক্ত তথ্য দিয়েছেন। 
টিভি স্টুডিও আন্দোলনের একজন বলিষ্ঠ কর্মী ছিলেন হড়গ্রামের তৎকালীন বসুন্ধরা থিয়েটারের পরিচালক মো. মোস্তাগীর রহমান ছক্কা। ২০১৫ সালের ৩০ অক্টোবর রাতে সাক্ষাৎকারে তিনি মত প্রকাশ করেন, নাট্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজশাহী সাংস্কৃতিক ঐক্যজোট গঠন হয়েছিল। দরগাপাড়ার ফিরোজ ছিলেন এ জোটের সভাপতি ও মো. মোস্তাগীর রহমান ছক্কা ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। সংগঠনটি রাজশাহীতে পূর্ণাঙ্গ টিভি স্টুডিও নির্মাণের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দরাগাপাড়ার দৈনিক সোনালী সংবাদের সাংবাদিক মাহাতাব চৌধূরী টিভি স্টুডিও আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।৫৮০ 
এ টিভিও স্টুডিও আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হয় সফল পাইপ লাইনে গ্যাস সরবরাহের আন্দোলন। উভয় আন্দোলনের ব্যবধান ছিল একটি দশক।

 

পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ

বাংলাদেশ টেলিভিশনের রাজশাহীর সম্প্রচার কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রে উন্নীতকরণের জন্য ১৮ মে ২০১২ তারিখে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিন পরিদর্শন শেষে আপাতত ভাড়া বাড়িতে পুর্ণাঙ্গ কেন্দ্র চালুর ঘোষণা দেন। নগরভবনের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণায় নির্মাণাধীন স্বপ্নচূড়া প্লাজায় পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র চালুর প্রস্তুতি নেয়া হলেও আইনী জটিলতার কারণে হয়নি।