ফিরে যেতে চান

তমোঘ্ন যন্ত্রালয়ের দেয়ালযুক্ত সাইনবোর্ড

রাজশাহী মহানগরীতে পত্রিকা প্রকাশনা শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। সে সময় রাজশাহীতে কোন ছাপাখানা ছিল না। এ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই গোড়া হিন্দুদের প্রতিষ্ঠান রাজশাহী ধর্ম সভার মুখপত্র হিসেবে ১৮৬৫ সালে হিন্দু রঞ্জিকা নামে সর্ব প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথমে পত্রিকাটি মাসিক ও ১৮৬৮ সালে সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হয়।২২৪ ঢাকায় অবস্থিত সুলভ নামের ছাপাখানায় পত্রিকাটি ছাপিয়ে আনা হতো। এ পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই রাজশাহীতে প্রথম ছাপাখানা আসে। ছাপাখানাটির নাম ছিল তমোঘ্ন যন্ত্রালয়। মিয়াপাড়ায় ধর্মসভার অবকাঠামো পুননির্মাণ কাজ শুরুর পূর্ব পর্যন্ত ছাপাখানাটি সেখানেই ছিল। দুবলহাটির জমিদার রাজা হরনাথ রায় চৌধুরী পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশের জন্য ১ হাজার টাকা দান করেছিলেন। ঐ টাকাতেই ছাপাখানাটিও কেনা হয়েছিল। 
রাজশাহী সংবাদ নামে ১৮৭০ সালে রাজশাহীতে দ্বিতীয় পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি ছিল সাপ্তাহিক ও ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র। পত্রিকাটি প্রায় ৫ বছর প্রকাশের পর বন্ধ হয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ হিসাব উল্লেখ করা যেতে পারে ব্রাহ্ম সমাজের রাজশাহী উপকেন্দ্রের কর্মতৎপরতায় শিথিলতা।
রাজশাহী মহানগরীর পত্রিকার ইতিহাস বিশ্লে¬ষণ করলে দেখা যায় প্রথম দিকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো ছিল কোন না কোন ধর্মীয় সংগঠনের মুখপত্র। সূচনা থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর অবশিষ্ট সময়কাল হিন্দু ধনাঢ্য ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশ হয়েছে। ১৯০০ সালে নূর-উল-ঈমান নামে মুসলমান সম্প্রদায়ের দ্বারা প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকাটি ছিল মাসিক। এর মাত্র ৪ টি সংখ্যা ছাপা হয়েছিল। পত্রিকাটি ছিল নুর-উল-ঈমান ও হেমায়েত ইসলাম নামক  সংগঠনের মুখপত্র। ১৯১৯ সালে মুসলমানরা মুষ্টি নামের আর একটি পত্রিকা প্রকাশ করে। বাড়ি বাড়ি মুষ্টির চাউল তুলে পত্রিকাটি প্রকাশনার পুঁজি গঠন করা হতো বলে এর নাম রাখা হয়েছিল মুষ্টি।
পত্রিকা প্রকাশের এ অবস্থা থেকে স্পষ্ট হয়, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে নিজেদের সামাজিক উন্নয়ন প্রতিযোগিতা ছিল। আরো ধারণা আসে, হিন্দুরা শুধু সম্পদশালীই নয়; শিক্ষা ক্ষেত্রেও বেশ অগ্রগামী ছিল। পশ্চাৎপদ মুসলমানরা শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রগামী হবার প্রবল প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। মুষ্টির চাউল তুলে পত্রিকা প্রকাশই তার দৃষ্টান্ত।
পল্লী বান্ধব২ নামের একটি পত্রিকা এখানকার প্রকাশনার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটায়। এর পূর্ব প্রকাশিত পত্রিকাগুলো মূলত ছিল ধর্মকেন্দ্রিক। সেগুলোর লেখালেখির বিষয় ছিল ধর্মীয় আদর্শভিত্তিক। পল্লী বান্ধব এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটিয়ে নতুন মাত্রা যোগ করে। আধুনিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে পত্রিকাটি সর্ব জনগোষ্ঠীর হাতে পৌঁছায়।২২৪ পল্লীবাসীর কাছেও পত্রিকাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ১৯৫১ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটি প্রকাশ হয়েছিল। ১৯৪২ সালের ৯ মার্চ প্রকাশিত পল্লী বান্ধব পত্রিকার নাম শিরোনামের নিচে লেখা আছে, ‘সৌভাগ্য-স্পর্শমণির গ্রন্থকার, সমাজ-প্রাণ মরহুম মির্জা ইউসুফ আলী সাহেবের পুণ্য স্মৃতি’। তার নিচে সম্পাদকের নাম এম্ , এম্ ইয়াকুব ও সহঃ সম্পাদক- এম, ইউসুফ। বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর রাজশাহী-১৯৯১ এ পত্রিকাটির প্রকাশ কাল ১৯২৫ ও বন্ধের বছর ১৯৫১ লিখা আছে। ১৯৪২ সালের ৯ মার্চ প্রকাশিত সংখ্যায় লিখা আছে ১৩শ বর্ষ ৪৩শ সংখ্যা। ১৯৪২ সালের ৯ মার্চ পত্রিকাটির চলতি বয়স ১৩ বছর হলে পত্রিকাটির প্রকাশ সাল ১৯২৯। গেজেটে এর প্রথম সম্পাদকের কথা উল্লেখ আছে আইনজীবী আলী আযম। পরবর্তী সম্পাদক মির্জা ইয়াকুব আলি। তবে সাইদ উদ্দিন আহমেদ তথ্য প্রদান করেছেন, এর সম্পাদক ছিলেন মির্জা মহাম্মদ ইয়াকুব আলি। ইয়াকুব আলি শুধু পত্রিকা প্রকাশনায় আমূল পরিবর্তন ঘটাননি, পত্রিকা ছাপার ক্ষেত্রকেও আর এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। রাজশাহীতে দ্বিতীয় ছাপাখানাটি তিনিই স্থাপন করেন। এর নাম ছিল হেমা ক্লিয়ারিং প্রিন্টিং প্রেস। যা পরে হেমায়েত ইসলাম মেসিন প্রেস নাম ধারণ করে।২২৪
১৯৪৭ সালের আগষ্টে ভারত পাকিস্তান বিভক্তির পর ১৯৪৮ সাল থেকেই এখানে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে আরম্ভ করে। রাষ্ট্র ভাষাকে কেন্দ্র ছাত্র সমাজ নতুন চেতনায় উজ্জীবিত হয় এবং সাহিত্য চর্চার প্রগতিশীল চিন্তা ভাবনার উন্মেষ ঘটে। ফলে গঠিত হয়েছিল দিশারী সাহিত্য মজলিশ। এর প্রথম স¤পাদক মসিহউর রহমান (চলচ্চিত্রের আজিজ মেহের)। পরে সম্পাদক হন বিশিষ্ট সাংবাদিক সাইদউদ্দিন আহমদ।২২৪ মজলিশের পক্ষ থেকে দিশারী নামে দুটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ হয়েছিল। প্রথম সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন হাবিবুর রহমান  শেলী (সাবেক প্রধান  বিচারপতি  ও ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা)। ২য় সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন একরামুল হক। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে প্রবাহ, অংকুর, কিশোর, চঞ্চল, দেওয়ান নামে কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সেগুলো ৬/৭ বা ২/৩ সংখ্যার বেশি টিকে থাকতে পারেনি। একই সময়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সংশ্লি¬ষ্ট উৎসাহী ব্যক্তিরা হাতে লিখেও পত্রিকা প্রকাশ করেছে। সেতু নামের একটি পত্রিকা হাতে লিখে ২/৩ সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছিল। দেশ স্বাধীনের পূর্বে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত আরো কিছু পত্রিকার সন্ধান পাওয়া যায়। মযহারুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় উত্তর অন্বেষা, মহসিন রেজার সম্পাদনায় সুনিকেত মল্ল¬ার, ফজলুল হক ও সেলিনা হোসেনের সম্পাদনায় সমষ্টি। জুলফিকার মতিন ও আব্দুর রব খান ফরহাদের সম্পাদনায় ১৯৬৮/৬৯ সালে পাকিস্তানের প্রথম মিনি পত্রিকা এখান থেকে প্রকাশ হয়েছিল।২২৪  ১৯৭০ সালে প্রবল গণ আন্দোলনের মধ্যে নির্বাচনের পূর্বে কুইক প্রিন্টার্স থেকে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সোনারদেশ। এর প্রকাশিকা ছিলেন জাহানারা জামান। প্রথম সম্পাদক আমজাদ হোসেন। মুক্তিযুদ্ধকালে পাক বাহিনী এ পত্রিকা অফিস তছনছ করে দেয়। ফলে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য দেশ স্বাধীনের কয়েক বছর পর আব্দুল মালেক পত্রিকাটি প্রথমে সাপ্তাহিক ও পরে দৈনিক হিসেবে চালু করেন। বর্তমানে হাসান মিল্লাতের সম্পাদনায় প্রকাশ হচ্ছে।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত রাজশাহী থেকে বেশ কিছু পত্রিকা প্রকাশ হলেও সেগুলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন  বা স্থায়ী হতে পারেনি। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল সাহিত্যিকী। ১৯৭৫ সালে প্রকাশ হয়েছিল আন্তরিক। এরপর রক্ত শপথ, দাবানল, সঙ্গী, দুঃসময়, রৌদ্র তিমিরে, শতাব্দীর আলো, উল্কা, কৃষ্ণচূড়া, চেতনা, উল্লাস, বুমেরাং, নবপ্রবাহ, সাহিত্য, সংবর্ত প্রভৃতি নামে বেশ কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশ হয়। কিন্তু কোনটাই দীর্ঘ স্থায়ী হয়নি।
১৯৭৬ সালের ১৫ অক্টোবর দৈনিক বার্তা প্রকাশের মাধ্যমে রাজশাহীতে পত্রিকা প্রকাশনার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ঢাকার বাইরে প্রথম জাতীয় পত্রিকা দৈনিক বার্তা। এ পত্রিকাটিকে কেন্দ্র করে নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী, আব্দুর রাজ্জাক চৌধুরী, সৈয়দ রেদাওয়ান রহমান, কামাল লোহানী, আজিজ মিসির, মীর নুরুল ইসলাম, মোসলেম আলী বিশ্বাস, ওয়াজেদ মাহমুদসহ অনেক নামী দামী সাংবাদিকের আগমন ঘটে রাজশাহীতে। এসব দক্ষ ও প্রথিত যশা সাংবাদিকদের সহচার্য লাভ করে স্থানীয় সাংবাদিকদের কলমের যথেষ্ট উন্নতি হয়। তারা আজ বিভিন্ন পত্রিকায় দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন এবং সাংবাদিক-লেখক তৈরি করছেন। ৬ মার্চ ১৯৮৯ তারিখের সাপ্তাহিক বঙ্গব্যাপি পড়ে জানা যায়, রাজশাহীতে একটি পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে পাকিস্তান আমলে প্রেসিডেন্ট আয়ুব আমলের একটি উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক লং মার্চের জন্য মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী রাজশাহী আসলে স্থানীয় সাংবাদিক ও কিছু সচেতন ব্যক্তি এখানে পত্রিকা প্রকাশের চেষ্টা চালানোর অনুরোধ করেন। ভাসানী তাঁদের দাবির প্রেক্ষিতে সংবাদ পত্রে বিবৃতি দেন। তার বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান দ্রুত এর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ও পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। যার ফলশ্রুতি দৈনিক বার্তা। ১৯৭৬ সালের ১৫ অক্টোবর দৈনিক বার্তা প্রকাশ হয়। তবে তার কিছু দিন পূর্বেই প্রকাশের কথা ছিল। কিন্তু ১৫ সেপ্টেম্বর ব্যবস্থাপনা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল গণি হাজারীর মৃত্যুর কারণে পত্রিকা প্রকাশের তারিখ পিছিয়ে গিয়েছিল।২২৬ পত্রিকা প্রকাশনার উদ্বোধন করেন তৎকালীন সরকারের উপদেষ্টা আকবর কবীর। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন তথ্য সচিব এবি এম গোলাম মোস্তফা। বার্তা প্রকাশের জন্য হেলাল প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিসিং কোম্পানীর সদর ঘাটস্থ এসোসিয়েটেড প্রিন্টার্সে ব্যবহৃত রোটারী মেশিন, ব্লক নির্মাণের ক্যামেরা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি রাজশাহীতে আনা হয়েছিল।২২৬
বর্তমানে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে অনেক পত্রিকা প্রকাশ হচ্ছে। নিয়মিতভাবে পত্রিকাগুলো রাজশাহী জেলা  প্রশাসনের নিবন্ধনভুক্ত থাকলেও অনিয়মিত পত্রিকাগুলোর কোন হিসেব নেই। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, বক্তিগত উদ্যোগে অনেক তরুণ-তরুণীর এসব ম্যাগাজিন, স্মরণিকা প্রতিনিয়তই প্রকাশ করছে। 
রাজশাহীর ক্রীড়া সাংবাদিক সুমন হাসানের সম্পাদনায় ক্রীড়া ভিত্তিক ক্রীড়া জমিন নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ হয়। ২০০৫ এর আগষ্টে এর ১ম সংখ্যা, অক্টোবরে ২য় সংখ্যা ও ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে ৩য় সংখ্যা প্রকাশ হয়েছে। পত্রিকাটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রাজশাহীর মেয়র ও সংসদ সদস্য মো. মিজানুর রহমান মিনু। এছাড়া সরদার আব্দুর রহমান, ডা. নাজিব ওয়াদুদ ও কাজী বুলু পত্রিকাটির সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
বর্তমান প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে দৈনিক সোনালী সংবাদ, দৈনিক সোনার দেশ, দৈনিক সানশাইন, দৈনিক নতুন প্রভাত পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।