ফিরে যেতে চান

রাজশাহী শহরে কবি কাজী নজরুল ইসলাম

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে রাজশাহী শহরে আনা হয়েছিল। কবির রাজশাহীতে আগমনের সময় নিয়ে আছে তথ্যগত বিভ্রাট। অনেকে তাঁর আগমনের ঘটনাকে ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকের কথা বলেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী মুহম্মদ আবদুস সামাদ তাঁর সুবর্ণ দিনের বিবর্ণ স্মৃতি গ্রন্থে লিখেছেন ২১ ডিসেম্বর ১৯২৯। ড. তসিকুল ইসলাম রাজা তাঁর বাংলাদেশে ফোকলোর চর্চার ইতিবৃত্ত ও অন্যান্য প্রবন্ধ নামক গ্রন্থে রাজশাহীতে কবি নজরুল প্রবন্ধে নজরুলের রাজশাহী আগমন কালকে ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি নির্ধারণ করেছেন।৭১৪ এ প্রবন্ধের শেষে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক সওগাত’ পত্রিকার ১৩ পৌষ ১৩৩৫/২৮ ডিসেম্বর ১৯২৮ সংখ্যায় রাজশাহীতে কবির আগমন প্রতিবেদনের অংশ বিশেষ সংযোজন করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ আছে ‘... গত ১৬ ডিসেম্বর রাজশাহী মুসলিম ক্লাবের  বার্ষিক অধিবেশন উৎসব সম্পন্ন হইয়া গিয়াছে। পরদিন রাজশাহীর মুসলমান ছাত্রবৃন্দের উদ্যোগে নজরুল সম্বর্ধনার এক বিরাট আয়োজনকে সাফল্যমণ্ডিত করিবার জন্য শেতাঙ্গ প্রিন্সিপাল মি. টিটি উইলিয়ামস নানা বিষয়ে ছাত্রদিগকে সাহায্য করিয়াছিলেন। তিনি স্বয়ং সভাপতির পদ গ্রহণ করিয়া ছাত্রবৃন্দের মনে এক বিপুল উৎসাহ সঞ্চার করেন। সভায় শুধু ছাত্র সমাজ ছাড়া আরো প্রায় ৬/৭ হাজার যুবক উপস্থিত ছিলেন। এই সময় কবিকে মুসলমান ছাত্রবৃন্দ একখানি মানপত্র প্রদান করেন। উত্তরে কবি একটি হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা প্রদান করেন। পরে তাঁহার প্রাণ মাতানো সঙ্গীত গীত হইবার পর সভা ভঙ্গ হয়। ইহার পরদিন  ১৮ই ডিসেম্বর প্রাতে কবির সিরাজ-উদ-দৌলার লেখক শ্রীযুক্ত অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র সহিত ‘বাণী কল্যাণী’র কবি রজনী সেনের বাড়িতে অনেকক্ষণ ধরিয়া আলাপ এবং সঙ্গীতালাপ হয়। ঐদিন বৈকালে টাউন হলে সাধারণ এক বিরাট অধিবেশন হয়। কবিকে দেখিবার জন্য দলে দলে লোক সভায় যোগদান করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে ভদ্রমহিলার সংখ্যাই বোধ হয় অন্যূন দুই হাজার হইবে। কংগ্রেস সভাপতি শ্রীযুক্ত বাবু মহেন্দ্রকুমার শাহ চৌধুরী এই সভায় সভাপতিত্ব করিয়াছিলেন। এ সভায়ও কবি বক্তৃতা দিয়া ও গান গাহিয়া জনসাধারণকে মুগ্ধ ও চমৎকৃত করেন।’৩২৪

সাহেব বাজার বড় রাস্তার দক্ষিণ পাশে হিলালী স্মৃতি-কুটীর থেকে সংগৃহীত ১৯২৮ সালে রাজশাহী শহরে আগত কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে অন্যান্যদের ছবি। তবে ছবির উপরে হাতে লেখা শিরোনামে নজরুলের আগমনকাল উল্লেখ আছে ১৯২৯ সাল

সাপ্তাহিক সওগাতের ২৮ ডিসেম্বর ১৯২৮ সংখ্যায় যদি নজরুলের রাজশাহী আগমন প্রতিবেদন ছাপা হয় তাহলে কবি রাজশাহীতে আগমন করেছিলেন ১৯২৮ সালে; ১৯২৯ সালে নয়। সাপ্তাহিক সাওগাতের প্রতিবেদন  অনুযায়ী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আগমন করেন ১৯২৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বিভিন্ন প্রবন্ধে বিভিন্ন লেখক কবির রাজশাহী আগমনকালকে ১৯২৯ উল্লেখ করেছেন। তা আদৌ ঠিক নয়। ডক্টর গোলাম সাকলায়েন তাঁর রাজশাহীতে নজরুল ইসলাম প্রবন্ধের ২য় অনুচ্ছেদে কবির আগমন ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর লিখলেও ২য় অনুচ্ছেদে সাপ্তাহিক সাওগাতের ১৩ পৌষ ১৩৩৫/২৮ ডিসেম্বর ১৯২৮ উল্লেখ করেছেন।৭১৫ নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকার নির্বাহী পরিচালক রশীদ হায়দার কবির রাজশাহী আগমনকে ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর উল্লেখ করেছেন।৭১৬ সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টের পূর্ব পাশে বড় রাস্তার দক্ষিণে হিলালী কুটিরে নজরুলের রাজশাহীতে আগমনকালের কয়েকটি ছবি দেয়ালে লাগানো আছে। ছবিগুলোই লিখা আছে ১৯২৯ সাল। এ তারিখ পরে লিখে ছবিগুলো লাগানো হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। 
কবি কেন এসেছিলেন? কিভাবে এসেছিলেন? ছিলেন কোথায়? কতদিন ছিলেন? কি কি করেছিলেন? কারা এনেছিলেন? এ পর্যন্ত যারা নজরুলের রাজশাহীর আগমন সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখেছেন, তাঁরা এসব প্রশ্নের কাছাকাছি থাকলেও কবির থাকার বিষয়ে দু‘রকম মতে ভাগ হয়ে গেছেন। তবে কেউ যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। এ বিষয়ে ভালোভাবে গবেষণা না হওয়ায় তথ্য বিভ্রাট। ১৯৪৭ ও ১৯৭১ এর রাষ্ট্রের পট পরিবর্তনের কারণে অনেক মূল্যবান দলিল দস্তাবেজ ধ্বংস হলেও সে সময় রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক হিন্দু রঞ্জিকা’ ও ‘সাপ্তাহিক পল্লী বান্ধব’ এর কপি কোথাও না কোথাও আছে। তাঁর আগমনে যে উল্লাস সৃষ্টি হয়েছিল তাতে কবির আসা, থাকা, খাওয়া, ঘোরা, গাওয়া সব কিছুই পত্রিকা দুটির বিবরণ হওয়ার কথা। 
সাপ্তাহিক সওগাতের সূত্র ধরে বলা যায়, নজরুল রাজশাহী শহরে এসেছিলেন ১৯২৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ১৯২৯ সালে আসলে তিনি রাজশাহী স্টেশনে নামতেন। কারণ ১৯২৯ সালের ১৪ মার্চ থেকে রাজশাহী শহরে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছিল। ফিরতি পথ রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন হয়েছিল বলেও কোন তথ্য নেই। সাপ্তাহিক সাওগাতের তথ্যানুযায়ী কবি রাজশাহী এসেছিলেন দি রাজশাহী মুসলিম ক্লাবের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে; উদ্বোধনে নয়। সাওগাতে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর ক্রমবাচক সংখ্যা ব্যবহার হয়নি। আমরা ধরে নিতে পারি সেটা প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ছিল। তাহলে দি রাজশাহী মুসলিম ক্লাবের জন্মের সাল ১৯২৭। রাজশাহী মহানগরীর কথা গ্রন্থের পূর্ববর্তী সংস্কারে এ ক্লাবের প্রতিষ্ঠার সাল ১৯২৯ বলা আছে; তা ঠিক নয়।
রাজশাহীতে কবিকে নিয়ে আনার বিষয়ে সমন্বয়কের ভুমিকা পালন করেছিলেন মাদার বখ্শ। তিনি তখন কলকাতায় পড়াশোনা করতেন।৭১২ তাঁর সমন্বয়ের সূত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে কবিকে কোলকাতায় আমন্ত্রণ করতে যান আব্দুল হাকিম খান চৌধুরী, আজিজুল আলম ও নাবালক মিয়া। আবার চক্ষু চিকিৎসক ডা. মুনসুর রহমান, মহসিন মিয়া ও কোলকাতায় অধ্যয়নরত কছিরুদ্দীন মৃধা কবিকে রাজশাহী আসার আমন্ত্রণ জানান বলেও তথ্য পাওয়া যায়।৭৮৫   
নির্ধারিত দিনে কবি দার্জিলিং মেইলে কলকাতা থেকে নাটোরে পৌঁছেছিলেন সকালে। মুহম্মদ আবদুস সামাদ সুবর্ণ দিনের বিবর্ণ স্মৃতির তথ্য মতে, কবির সঙ্গে মহসিন মিয়া ও সিভিল সার্জন ডা. মনসুর রহমান ট্রেন থেকে নেমেছিলেন। কবি শাহাদত হোসেন ও কবি বন্দে আলী মিয়াও ট্রেনে নজরুলের সঙ্গী ছিলেন। তবে তাঁরা  পাবনার উদ্দেশ্যে ঈশ্বরদীতেই নেমে পড়েছিলেন। নাটোর থেকে কবিকে রাজশাহীতে আনা হয়েছিল জমিদার হাজী লাল মোহাম্মদ সরদারের ১৯২৭ সালে কেনা ১৯২৭ নম্বরের সেভোরলেট গাড়িতে। গাড়ির চালক ছিলেন হাজী লাল মোহাম্মদের মেজো ছেলে আব্দুল মজিদ। সঙ্গে ছিলেন আব্দুল মজিদের ভাই মুহম্মদ আবদুস সামাদ, মহসিন মিয়া প্রমুখ। সেভোরলেট রাজশাহী শহরে পৌঁছেছিল বেলা এগারটায়। কবি রাজশাহী শহরে তিন দিন থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। প্রশ্ন হলো এ তিন দিন কবি বিশ্রাম ও ঘুমিয়েছিলেন কোথায়? মুহম্মদ আবদুস সামাদের দাবি আমাদের কাদিরগঞ্জের বেলতলা ভবনে। ড. তসিকুল ইসলামের কথাও তাই। ড. মো. মাহবুবর রহমান তাঁদের মতকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু ডক্টর গোলাম সাকলায়েন বলেছেন হেতম খাঁ মহল্লার আশরাফ আলী ব্যারিস্টারের বাড়ি চৌধুরী দালানে। দ্বিমতের কোন পক্ষই যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ খাড়া করেননি। অধ্যাপক ফজলুল হক রাজশাহী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে (১৮২৫-১৯৫২) উভয় মতের রেফারেন্স দিয়েছেন। সুতরাং এ বিষয়ে আরো গবেষণার মাধ্যমে বিভেদের অবসান হওয়া প্রয়োজন।
কবির রাজশাহী শহরের তিন দিনের কর্মসূচিকে বিভিন্ন লেখক বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। যে মুসলিম ক্লাবের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে কবির আগমন, সে অনুষ্ঠানটি প্রথম দিন, না তৃতীয় দিনে হয়েছিল তা নিয়েও আছে মতভেদ। সাপ্তাহিক সওগাতের বিবরণ অনুযায়ী ১৬ ডিসেম্বর মুসলিম ক্লাবের বার্ষিক অধিবেশন সম্পন্ন হয়। পরদিন মুসলমান ছাত্রবৃন্দের উদ্যোগে কবিকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। শ্বেতাঙ্গ প্রিন্সিপাল মি. টিটি ইউলিয়ামস সংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করেন। পরদিন ১৮ ডিসেম্বর সকালে কবি অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁর সঙ্গেই কবি রজনীকান্ত সেনের বাড়িতে অনেকক্ষণ অবস্থান করেন। ঐ দিনেই বিকেলে টাউন হলে (অলকা, পরে স্মৃতি সিনেমা হল এবং বর্তমানে এসোসিয়েশন ভবন) বিশাল অধিবেশনে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এখানে কংগ্রেস সভাপতি বাবু মহেন্দ্রকুমার শাহ চৌধুরী সভাপতিত্ব করেছিলেন।
আরো তথসূত্রে জানা যায়, ১৬ ডিসেম্বর ১৯২৮ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম রাজশাহীতে আগমন করেন এবং সেই দিন বিকেলে মুসলিম ক্লাবের অনুষ্ঠানে কবি যোগদান করেন। ক্লাবের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী জেলা ও দায়রা জজ নূরুন্নবী চৌধুরী। সভা পরিচালনা করেন আব্দুল হাকিম খান চৌধুরী।৭৯৫ আব্দুল হাকিম খান চৌধুরী এ ক্লাবের প্রথম সম্পাদকের দায়িত্বও তিনি পালন করেন।৭১৩ 
হোসেনীগঞ্জের শেখপাড়ায় অবস্থিত যে বাগধানী জমিদারির কাচারি প্রাঙ্গণে দি মুসলিম ক্লাবের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর আয়োজন করা হয়েছিল, সেটাই ছিল রাজশাহী শহরে কবিকে নিয়ে আসার প্রধান উদ্দেশ্য। এর পশ্চাতে ছিল তৎকালে পিছিয়ে থাকা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা, সংস্কৃতিতে উৎসাহ দান। শহরের সচেতন মুসলমানদের উদ্যোগে কবিকে আনা হলেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন মুসলমান-হিন্দু সবার প্রিয় কবি। টাউন হলে মুসলমান-হিন্দুর ব্যাপক সমাবেশ আমাদের কাছে সে বার্তায় পৌঁছে দিচ্ছে। নজরুল প্রীতির হৃদয়াঙ্গম সমাবেশ রাজশাহীবাসীকে হয়ত বোঝাতে চেয়েছিল বিভেদ নয়; বরং সাম্প্রাদায়িক সম্প্রীতিই এনে দিতে পারে সুন্দর ও শান্তিময় মনুষ্য সমাজ। রাজশাহী শহরে কবি নজরুল ইসলাম আগমনের ফোকাল পয়েন্ট দি রাজশাহী মুসলিম ক্লাবের প্রাথমিক যাত্রা বাগধানী জমিদারির কাচারি দালান আজও দণ্ডায়মান। তাঁর প্রাঙ্গণে নির্মিত হয়েছে দোতলা হোসেনীগঞ্জ শেখপাড়া মসজিদ, তিনতলা খন্দকার হাউস। মূল ভবনে বাস করছেন বাগধানী জমিদারের উত্তরসূরী খন্দকার পরিবার। তাঁদের পূর্বতন বাসভবন ছিল পশ্চিমবঙ্গের সালার। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর চাকরির সুবাদে এ পরিবারটি চলে আসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরির পর ষাটের দশকের শুরু বা তাঁর দু/এক বছর আগ থেকে বসবাস আরম্ভ করেন কাচারি ভবনে। যাকে দিয়ে শুরু তিনি রাজশাহীর জেলা সাব-রেজিস্ট্রার খন্দকার জিয়াউল আহসান (মৃত্যু ১৯৭৪)। ১৭ মে ২০১১ দুপুর প্রায় আড়াইটায় খন্দকার জিয়াউল আহসানের পুত্র নাজমুল আহসান বাবর জানান, পশ্চিমের ঘরে বসে নজরুল চা খেয়েছিলেন। প্রাচীনত্ব, জামিদারির অফিস, জাতীয় কবি ও ঐতিহাসিক একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কারণেই বাড়িটার গুরুত্ব আছে। দি রাজশাহী মুসলিম ক্লাব ও নজরুলকে কেন্দ্র করে গবেষক লেখকদের কলমে উঠে আসছে। তবে অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এর বাসভবনের মত কখন এরও অস্তিত্ব মুছে যাবে ঠিক নেই!