ফিরে যেতে চান

ফজর আলি খাঁন (১৮৯৫-১৯৮০) লিখেছেন, বৈশাখ মাসে ধর্ম সভায় ভাগবৎ, গীতা, বেদ, বেদান্ত, ভক্তিযোগ, কর্মযোগ রঘুযোগ রঘুবংশ প্রভৃতি শাস্ত্র দ্বারা হিন্দু দর্শন শাস্ত্রের আলোচনা হইত। বৈশাখ সংক্রান্তির দিবস প্রায় ৩০/৪০ টি সংকীর্ত্তন বাহির হইত। অনুমান ৫০০ মন বাতাসা হরিলুট দেওয়া হইত। পুঠিয়া গোপালেন্দ্র রায় যিনি এক আনির রাজা এই শহরে থাকিতেন তিনি এক সংকীর্ত্তনে চাঁদির টাকা হরিলুট দিয়াছিলেন।৬৮২ ২০০১ সালের পর থেকে ধর্মসভায় আর বৈশাখ সংক্রান্তির সংকীর্ত্তন হতে দেখা যায়না। নদীর ধারে কুমারপাড়ায় সনাতন সংঘে এখনও হয়ে থাকে।৭১৭ 

১ বৈশাখ বর্ষ বরণের শোভাযাত্রা

তবে মুসলমানদের কাছে এক সময় বৈশাখের উৎসব বলতে হালখাতাকে বোঝাত। হাট-বাজারের ছোট ব্যবসায়ীর কাছে ছিল এটা বড় উৎসব। পাওনা আদান-প্রদানের উদ্দেশ্যে হালখাতার আয়োজন হলেও উৎসবটি ছিল ক্রেতা-বিক্রেতার সৌহার্দ্যরে সেতু বন্ধন। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কেনা-কাটার সম্পর্কটা সব পরিবারের থাকার কারণে প্রায় সব পরিবারের মানুষই হালখাতা উৎসবের অংশীদারিত্ব পেয়ে যেত। একবিংশ শতাব্দিতে এসে বৈশাখের উৎসবটা পাল্টে গেছে। এখন আর বৈশাখের উৎসব শুধু হালখাতার মধ্যেই নেই; মুখ্য ভূমিকায় চলে এসেছে সাংস্কৃতিক কর্মীরা। ১ বৈশাখ মানেই এখন ভোর থেকেই পদ্মাপাড়সহ নগর জুড়ে মানুষের ঢল। বিচিত্র সাজে কিষাণ-কিষাণীর মহড়া। মেলা ও বিভিন্ন মঞ্চে লোক সঙ্গীতের মূর্ছনা ইত্যাদি।  
প্রাচীন সূত্রে অবশ্য ১ বৈশাখের হালখাতা দোকানদার, ব্যবসায়ীরা এখনও পালন করেন।  তবে ঐতিহ্যের জৌলুস নেই। সাহেব বাজারের প্রসিদ্ধ মুদির দোকান ১নং গদি ও ২নং গদির বংশধর বড়কুঠি নিবাসী ব্যবসায়ী আলাউদ্দিনের মতে, পাকিস্তান আমলে সাহেব বাজারের ১নং গদি, জব্বার, আব্দুল বারি, আব্দুল হাসিব, জমির উদ্দিনসহ সব দোকানদারই ১ বৈশাখে হালখাতা করতেন। আমরা একদিনই হালখাতা করতাম। তবে দূর-দূরান্তের পাইকার, খরিদ্দারদের জন্য সপ্তাহব্যাপী হালখাতার ব্যবস্থা থাকত। হালখাতায় আগে এক সেরের কম মিষ্টি দেয়া হতো না। হালখাতা উপলক্ষে এখন আমন্ত্রণ পত্র ছাপা হলেও আগের মত পালন হয়না। 
১ বৈশাখে বর্ষবরণকে কেন্দ্র  করে বর্তমানে রাজশাহীতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সরকারি প্রতিষ্ঠান মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পান্তা ভাত খাওয়ার আয়োজন করে থাকে। কবে, কার দ্বারা প্রথম আরম্ভ হয়ে অনুষ্ঠানগুলোর আকৃতি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা আবিস্কার সহজ নয়। রাজশাহী সম্পর্কিত বিভিন্ন গ্রন্থে স্থানীয় সংস্কৃতি চর্চার তথ্য আছে। এসব তথ্যে ১ বৈশাখ বা বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতার উল্লেখ নাই। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ রাজশাহীতে আরো প্রসিদ্ধ সাহিত্যিকের আগমনের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পূর্বে ১ বৈশাখ বা বর্ষবরণের কোন অনুষ্ঠানের  তথ্য জানা যায় না । জেলা ও পরবর্তীতে বিভাগের প্রশাসনিক সদর ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পণ্ডিত, সংস্কৃতি চর্চামনা ব্যক্তির সমাগম হয়েছে; তবে স্বাধীনের পূর্বে এ শহরে বর্ষবরণের রেওয়াজ শুরু হয়নি। প্রবীণ ব্যক্তিদের নিকট থেকে জানা যায়, পাকিস্তান আমলে সবাই হালখাতা এবং কিছু ধর্মীয় রীতিনীতি ও সামাজিক লোকচারের মাধ্যমে নববর্ষকে উদ্যাপন করত। কয়েকজন সাংস্কৃতিক কর্মী স্বাধীনতা উত্তরকাল থেকে বর্তমান ধারায় বর্ষবরণের কথা বলেছেন। তবে শুরুর নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেননি। হিন্দোল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির পরিচালক মরহুম ওস্তাদ রবিউল হোসেন একবার মত প্রকাশ করেছিলেন, স্বাধীনতার উত্তরকাল থেকেই রাজশাহীতে বর্ষবরণের প্রভাব পড়তে থাকে। অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রামাণিক, সাংবাদিক মাহাতাব উদ্দিনসহ আরো কয়েকজন মিলে রাজশাহী কলেজের কড়াইতলায় প্রথম আনুষ্ঠিকভাবে বর্ষবরণের আয়োজন করেছিলেন। ঐ অনুষ্ঠানের তিনি দর্শক ছিলেন। তাঁর মতে, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মিসেসদের সংগঠন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মহিলা পরিষদ প্রথম ১ বৈশাখে পান্তাভাত খাওয়ার আয়োজন করে।
রামচন্দ্রপুর নিবাসী হিন্দোল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর প্রশিক্ষক মো. শামসুল আলম (জন্ম ১৯৫৮) এর মতে, গত সত্তর দশক থেকে রাজশাহী কলেজ চত্বরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ১ বৈশাখ উপলক্ষে। ১৪০০ সন বরণ অনুষ্ঠান ঢাকায় ব্যাপকভাবে আয়োজন করা হয়। জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার মো. আব্দুর রশিদের মতে, জেলা প্রশাসক আব্দুস সালামের সময়  (মেয়াদ ১৭.০২.১৯৮৩-১৩.০৭.১৯৮৫) থেকে রাজশাহীতে ১ বৈশাখ উপলক্ষে মেলা শুরু হয়েছে। সে সময় শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও জেলখানা মাঠে মেলা বসতো। টি বাঁধের নিচেও চিড়া, মুড়ি, খৈ, পাখা, মাটির পুতুল, সোলার কুমির, কাগজের ঘুরনি বিক্রি হতো। তিনি গত আশি সালের দিকে অর্থাৎ ১৩৮৭ সনের ১ বৈশাখ উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে রাজাশাহীতে প্রথম পান্তাভাত খাওয়ার আয়োজনের কথা বলেন। 
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ১৪০৬ সনে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় (তৎকালীন নাম রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা) বর্ষবরণের আয়োজন করে। পুকুরের পশ্চিমপাড়ে বর্তমান মসজিদের উত্তরে ফাঁকা জায়গায় তৎকালীন কর্পোরেশনের জনসংযোগ শাখার কর্মচারী সৌমিত্র ব্যানার্জি ঘাসে বসে বর্ষবরণের গান পরিবেশন করেছিলেন। এরপরও কর্পোরেশনের আয়োজনে কয়েক বছর বর্ষবরণ হয়েছিল। এ উদ্যানের দক্ষিণ পাশে মেয়র এএইচ.এম. খায়রুজ্জামান লিটনের উদ্যোগে সিটি কর্পোরেশন মঞ্চ তৈরি করে ব্যাপকভাবে ১৪১৬ সনের ১বৈশাখ সকালে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সব দর্শনার্থীকেই মোটা লালচালের পান্তা ও ইলিশ ভাজা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়েছিল। জেলা শিল্পকলা একাডেমীর অবসরপ্রাপ্ত কালচারাল অফিসার মো. আব্দুর রশিদের উপস্থাপনায় মঞ্চে গান ও অভিনয়ের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতিকে পরিবেশন করা হয়। শিল্পকলা একাডেমি সংশ্লি¬ষ্ট শিল্পীদের বাঙালি বিয়ের অনুষ্ঠান পরিবেশন ছিল বেশ উপভোগ্য। বিয়ে অনুষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন হাড়ুপুর নবগঙ্গা নিবাসী সঙ্গীত শিল্পী আব্দুর রশিদ। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ১৪১৭ সনের ১ বৈশাখের উৎসব পদ্মাপাড়ের মুক্তমঞ্চে আয়োজন করেছিল। ১৪১৭ সনকে বিদায় ও ১৪১৮ সনকে বরণ উপলক্ষে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ও টাইম ফ্যাশনের যৌথ উদ্যোগে ৭ দিনব্যাপী বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি ও সঙ্গীতসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল মুক্তমঞ্চেই। এ উৎসব উদ্যাপন কমিটির আহবায়ক ছিলেন ২২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল হামিদ সরকার টেকন। অনুষ্ঠান হয়েছিল ৩০ চৈত্র ১৪১৭ বুধবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৬ বৈশাখ ১৪১৮ মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত (১৩-১৯ এপ্রিল ২০১১)। ৩০ চৈত্রের সন্ধ্যায় উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, বিশেষ অতিথি ছিলেন প্যানেল মেয়র-১ ও ১২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সরিফুল ইসলাম বাবু, সভাপতি ছিলেন কমিটির আহবায়ক। সমাপনী অনুষ্ঠানেও তাই ছিল। বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন মেয়র পত্নী শাহীন আক্তার রেনী।
বর্তমান নগরবাসীর কাছে ১ বৈশাখ খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ভোর হতেই পদ্মার পাড় ও রাস্তাগুলো মুখরিত হয়ে ওঠে। জেলা শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে বিভিন্ন গোষ্ঠী ভুবন মোহন পার্কে নিজস্ব কর্মসূচি পালন করে। এছাড়া কোর্ট স্টেশন চত্বর, উপশহর মাঠ, ফুদকিপাড়ার পদ্মাপাড়ের মুক্ত মুঞ্চ, পদ্মা গার্ডেন, টি বাঁধসহ পদ্মাপাড় ও বিভিন্ন স্থানে সকাল-সন্ধ্যা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা, মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রভৃতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। ১ বৈশাখ ১৪১৮ সকালে রাজশাহী কলেজ মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে। ১ বৈশাখ পালনের উদ্দেশ্যে মো. আরিফুল আমিনের উদ্যোগে  আমরা পাঠানপাড়াবাসী নামে একটি সংগঠন তৈরি হয়। সংগঠনটি ১৪১৮ বঙ্গাব্দ থেকে বর্ষবরণ উপলক্ষে পদ্মার চরে লোক সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।৭২২ তরুণ-তরুণীরা একতারা, তবলার আলপনা আঁকা পোশাক পরছে কয়েক বছর থেকে। দুই ঈদ, শারদীয় দুর্গোৎসবের মতোই রাজশাহীর রেডিমেড গার্মেন্টেস, শাড়ি-কাপড়ের ব্যবসায়ীরা ১ বৈশাখ উপলক্ষ্যে ভাল ব্যবসাও করছে।