ফিরে যেতে চান

২০১৫ সালে কিষাণ গম্ভীরা দলের পরিবেশনায় গম্ভীরার দৃশ্য। নানা চরিত্রে খুরশীদ ও নাতি চরিত্রে

মাহমুদুল হাসান নয়ন

গম্ভীরার প্রাচীন ধারায় সঙ্গীতের প্রাধান্য থাকলেও বর্তমানে সংলাপের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান বৈশিষ্ট্য থেকে গম্ভীরার ক্ষেত্রে লোকনাট্য শব্দটিও প্রযোজ্য। নারী অস্তিত্ববিহীন এ লোকনাট্যের চরিত্র প্রধানত দুটি- নানা ও নাতী। নানা-নাতী উভয়ই  রসালো চরিত্র। তবে নানা সুভ্র দাড়িতে মুনশিয়ানা জ্ঞানে অভিজ্ঞ। নাতী অপরিপক্ক হলেও চৌকস বুদ্ধিমান। নাতি হাস্যোচ্ছলে বাঁধবিহীন নিরেট সত্য কথায় সমাজ-রাষ্ট্রের ভুল-ত্রুটি ও নাগরিক সমস্যাগুলোকে উপস্থাপন করে। নানা যুক্তির সাথে সেগুলো গঠনমূলক সংলাপে নিয়ে আসেন। উভয়ের যুক্তি-তর্ক শেষে এক সময় মানুষকে সচেতনতার পর্যায়ের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা থাকে। ঘুঙুরের তালে নৃত্য, অঙ্গ-ভঙ্গি, খাঁটি আঞ্চলিক ভাষার গান, উপস্থিত বুদ্ধির বাক্ চাতুরতা দর্শকের চিত্তকে চৌম্বক আকর্ষণ করে। শাসক ও শোষক গোষ্ঠীকে কটাক্ষ, ব্যঙ্গ ও হাসির ছলে গম্ভীরা সরাসরি যে প্রক্রিয়ায় বাণাঘাত করতে পারে, অন্য কোন মাধ্যমের সে সুযোগ নেই। তাই গম্ভীরা আঞ্চলিকতার সীমা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকনাট্যের রূপ নিয়েছে। 
গম্ভীরা লোকসঙ্গীতের উৎস ভূমি বাংলাদেশের চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী ভারতের পশ্চিম বাংলা রাজ্যের বর্তমান মালদা জেলা। তখন অবশ্য মালদা জেলা নামে প্রশাসনিক ইউনিটের অস্তিত্ব ছিল না। ১৮৭৩ সালের মার্চে রহনপুর ও চাঁপাই নবাবগঞ্জকে রাজশাহী জেলা থেকে পৃথক করে এবং দিনাজপুর ও পূর্ণিয়া থেকে আরো কয়েকটি থানা নিয়ে মালদা জেলা গঠিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময়  চাঁপাই নবাবগঞ্জকে আবারো রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মালদা ও চাঁপাই নবাবগঞ্জের মানুষের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষা ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙে মিল আছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, গম্ভীরার উৎস্যমুখ  মালদার পরই ভোলাহাটে আসে। ভোলাহাট বর্তমান  চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার অন্তর্গত একটি থানা। তাই অনেকে গম্ভীরাকে চাঁপাই নবাবগঞ্জের আদি লোকসঙ্গীত বা লোকনাট্য মনে করেন। অবশ্য ভৌগলিক সীমা পরিবর্তিত গম্ভীরা চাঁপাই নবাবগঞ্জকে সমৃদ্ধ করেছে। পরবর্তীতে রাজশাহী মহানগরীতে বিস্তার ঘটে। বর্তমানে গম্ভীরাকে রাজশাহীরও লোক সংস্কৃতি বলা যায়। ক্রমবিকশিত গম্ভীরা বর্তমানে  চাঁপাই নবাবগঞ্জ ও রাজশাহী নয়; র‌্যাংকিংয়ের দিক থেকে সমগ্র বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় লোক সংস্কৃতি।৭৩৬
গবেষকদের যুক্তিগত আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে বর্তমান ধারার এ লোকনাট্যের উৎপত্তি মালদায়। তবে এর পিছনেরও ইতিহাস আছে। ইন্দো-মঙ্গলীয় জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন শাখায় গম্ভীরা উৎসব বা বাৎসরিক উপজাতীয় অধিবেশন উপলক্ষে বর্ষবিবরণী বা বর্ষ পর্যালোচনা হিসেবে এ ধরনের আয়োজনের সন্ধান পাওয়া যায়। ড. আশুতোষ মনে করেন, এ রকমের অনুষ্ঠান হতেই গম্ভীরার উদ্ভব ঘটে। তিনি এও মন্তব্য করেন, মধ্য যুগের বাংলা কাব্যে ব্যবহৃত গম্ভীরার সাথে সঙ্গীত অর্থে গম্ভীরার মৌলিক সম্পর্ক নাই। তিনি জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার অঞ্চলের লোকসঙ্গীত গম্ভীরা শব্দটিকে তিব্বতীয়-চৈনিক প্রভাবজাত সংস্কৃত রূপান্তর হিসেবে বর্ণনা করেছেন।৭৩৬ তাই গম্ভীরার আদি ভূমি ও উৎপত্তিভিত্তিক জনগোষ্ঠী নির্ণয়ের জন্য ব্যাপক অনুসন্ধান প্রয়োজন। 
কোন কোন গবেষক গম্ভীরার অনুমানভিত্তিক বয়স নির্ণয় করেছেন দেড় হাজার বছর।৭৩৬-পৃ.৪৬ গম্ভীরাকে যদি বাংলা ভাষা বা বাঙালি জাতির মধ্যে অনুপ্রবেশ হিসেবে বিচার করা যায়, তাহলে হয়তো এ অনুমানকে গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে বাঙালি জাতি বা বাংলা ভাষার মধ্যে গম্ভীরার উৎপত্তি বা আবির্ভাবকে দেড় হাজার বছর বয়সে নিয়ে যাওয়া নিছক কল্পনা। কারণ বাঙালি জাতির প্রধান উপাদান বাংলা ভাষা। মোটা দাগে বাঙালি জাতির উদ্ভবকে হাজার বছরের পিছনে নিয়ে যাওয়া হলেও বাংলা ভাষার বয়স আদৌ তা নয়। প্রকৃতপক্ষে স্ববৈশিষ্ট্যে বাংলা ভাষা সৃষ্টি হয়েছে ত্রয়োদশ/চতুর্দশ শতাব্দীতে। প্রায় সাত শ বছর আগে। অনেকে চর্যাপদকে বাংলা ভাষার আদি রূপ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে চর্যাপদে যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলোকে স্বতন্ত্র বাংলা বলা যায় না। চর্যাপদগুলো ছিল বাংলা, অহমিয়া ও ওড়িয়া ভাষার পূর্ব পুরুষ। তবে বাংলা ভাষার সঙ্গে তার যোগ বেশি। বিভিন্ন পণ্ডিতের মতানুসারে বলা যায়, প্রাপ্ত চর্যাগুলো রচিত হয়েছিল অস্টম/নবম থেকে শুরু করে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত ।৭৩৭ তাই বাংলা গম্ভীরার বয়স নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সাত শ বছর অতীতে যাওয়ার পূর্বেই থেমে যেতে হয়।
বাংলা ভাষার গম্ভীরাকে গৌড়কেন্দ্রীক ধরে আলোচনা করা যেতে পারে। গৌড় ছিল সেকালে বাংলার রাজধানী বা তার পূর্বে গৌড় ছিল একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। চৌদ্দ শতকের দ্বিতীয় ভাগে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহর আমলে গৌড়কে সমগ্র বাংলার রাজধানীতে পরিণত করা হয়েছিল।৭৩৭ তৎকালীন গৌড়ের পরিধি ছিল ভারতের বর্তমান মালদা ও বংলাদেশের চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার অংশ নিয়ে। আঞ্চলিক ভাষা উচ্চারণ ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও উভয় জেলার মানুষের সঙ্গে মিল দেখা যায়। সুতরাং ভৌগলিক বিচারে আধুনিক ধারার গম্ভীরাকে চাঁপাই নবাবগঞ্জের স্থানান্তরিক লোকসঙ্গীত বা লোকনাট্য না বলে উৎপত্তি সূত্রের লোক সংস্কৃতি ধরা যায়। তবে সূত্রপাত ঘটে বর্তমান মালদা অংশেই। সেখান থেকে সম্প্রসারিত হয় বর্তমান চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলায়। এক সময় গম্ভীরা মালদার মানুষের জাতিগত সংস্কৃতির রূপ লাভ করে।৭৩৬ র‌্যাডক্লিফের মানচিত্র অনুসারে ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় বর্তমান মালদা, ভোলাহাট ও চাঁপাই নবাবগঞ্জে অনেক গম্ভীরা শিল্পী ছিলেন। মালদায় ছিলেন বেশ কয়েক জন মুসলমান শিল্পী। দেশ ভাগ হলে তাঁরা চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার সীমানায় চলে আসেন। এ সব শিল্পীরাই গম্ভীরাকে সৃজনশীল মেধায় সংস্কার ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে ব্যাপক অঞ্চলের মানুষের কাছে নিয়ে যান।
আজ গম্ভীরাকে যেভাবে দেখা যায়, তার প্রাচীন রূপ ছিল ভিন্ন। আদিকালের স্বরূপ উন্মোচনের পূর্বে শব্দগত গম্ভীরাকে চিনে নেয়া যায়। বাংলা একাডেমির অভিধানে গম্ভীরা শব্দের তিনটা অর্থ পাওয়া যায়। সেগুলো-১.হিন্দুদের গাজনের উৎসব বিশেষ; ২. শিবের গাজনের গান; ৩. হিন্দু মন্দিরের অভ্যন্তর। মধ্য যুগের কাব্যে শব্দটি অন্ধকার বা ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ অর্থে ব্যবহার হয়েছে। যেমন- গম্ভীরাতে স্বরূপ গোসাঞি প্রভুকে শোয়াইল।৭৩৬ শিবের মন্দির, গাজন ঘর, গাজন উৎসবেও ব্যবহার হয়েছে। প্রথম দিকে গবেষকরা শিব মন্দির হিসেবে গম্ভীরা শব্দকে গ্রহণ করেন। শিবের আর এক নাম গম্ভীর। অনুমান করা হয় গম্ভীর থেকে গম্ভীরা হয়েছে। সাধারণ অর্থে বলা যায়, শিব বা মহাদেবের বন্দনা সঙ্গীতই গম্ভীরা।
তবে লোক সংস্কৃতি গবেষক ড. প্রদ্যোত ঘোষ শুধু শিব বা মন্দিরের সঙ্গে গম্ভীরার সম্পর্ক স্থাপনে সম্মত হননি। তাঁর মতে, শিব পূজা বা শিবের গাজন শুধু মন্দিরেই হয় না; উন্মুক্ত আকাশের নিচে চাঁদোয়া টাঙ্গিয়েও হতে পারে।
বর্তমান বাংলাদেশের গম্ভীরায় শিব পূজা, শিবের গাজন বা শিব সংশ্লিষ্ট কোন লোকাচার বোঝায় না। হাস্যোরসের মাধ্যমে কোন সামাজিক সমস্যা, রাষ্ট্রের কোন অসঙ্গতি উপস্থাপন ও সমাধানের যৌক্তিক পথ দেখানো হয় গম্ভীরায়। তবে প্রত্যক্ষভাবে শিবের অস্তিত্ব না থাকলেও হারমোনিয়ামে বিণের সুর তুলে গম্ভীরার সমাপ্তি টানা হয়। রাজশাহী মহানগরীর কিষাণ গম্ভীরা দলের পরিচালক ও গম্ভীরার নানা চরিত্র মো. খুরশীদ আল মাহমুদের মতে, হারমোনিয়ামের এ সুর প্রকৃতপক্ষে আদি গম্ভীরা বা শিবের গাজনের প্রতীকী বিশেষ। ঐতিহ্য রক্ষার্থে এ প্রথা প্রচলন আছে। 
গবেষকরা গম্ভীরাকে দুই শ্রেণিতে ভাগ করে যেভাবে আলোচনা করেছেন, তাতে বর্তমান গম্ভীরাকে শিবের গাজনের ধারাবাহিক পর্যায় বলা যায় না। এটা পালা গম্ভীরার অধুনা সংস্করণ। প্রাচীন কালে গম্ভীরা দুটো শ্রেণিতে ভাগ হয়ে পড়ে। একটি শিবের গাজন বা আদ্যের গম্ভীরা। অপরটি পালা গম্ভীরা বা গম্ভীরা সঙ্গীত। 
শিবের গাজন আলোচনায় বলা হয়েছে, মধ্য যুগে কৃষ্টির প্রধান অবলম্বন ছিল বিভিন্ন লৌকিক দেবতার গুণকীর্তন। কাল ও স্থান ভেদে বিভিন্ন দেবতাকে কল্পনায় এনে পূজা উৎসব পালন হতো। নিজেদের আনন্দ-বেদনা, অভাব-অভিযোগ পদপাদ্মে নিবেদন করে মানুষ প্রতিকারের আশায় বসে থাকতো। চণ্ডী, মনসা, শীতলা প্রভৃতি লৌকিক দেব-দেবী সম্পর্কে মানুষের মধ্যে এভাবেই গভীর বিশ্বাস গড়ে ওঠে। এ প্রেক্ষাপটেই  ধর্ম ঠাকুরের পূজা শুরু হয়। এ পূজা সূর্য পূজারই নামান্তর। এক সময় বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এ পূজা পালন করতো। পরবর্তীতে তা গাজন বা শিবের গাজন নামে পরিচিতি পায়। শিব লৌকিক সূর্য দেবতা বা ধর্ম ঠাকুরের সঙ্গে অভিন্নভাবে কল্পিত হওয়ায় কোন কোন অঞ্চলে আদ্য নামে পরিচিত। এ জন্য গম্ভীরা গবেষক পালিত হরিদাস শিবের গাজনকে আদ্যের গম্ভীরা বলে উল্লেখ করেন। বর্তমানে চাঁপাই নবাবগঞ্জের কোথাও আদ্যের গম্ভীরা অনুষ্ঠিত হয় না। গম্ভীরা সঙ্গীতে এক সময় শিবমূর্তি স্থাপন হলেও তার স্বরূপ ছিল ভিন্ন।৭৩৬
গম্ভীরা সঙ্গীতকে অনেকে গম্ভীরা পূজার ক্রমবিবর্তনের ফল বলে মনে করেন। তারই প্রভাবে গানের আসরে শিব মূর্তি স্থাপন ও শিব সম্বোধন হয়েছে দীর্ঘ দিন। তবুও একে শৈব-ধর্ম বিষয়ক কোন সঙ্গীতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। একে নিছক লোক সঙ্গীত হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্রম বিবর্তনে এ লোক সঙ্গীতের ভাব আঙ্গিকেরও পরিবর্তন হয়েছে।৭৩৬
প্রাথমিক কালে গম্ভীরা সঙ্গীতের উৎস ছিল বর্ষব্যাপী কর্ম থেকে। অর্থাৎ সারা বছরের বিশেষ বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও অভাব-অভিযোগের ভিত্তিতে গান রচনা করা হতো। মধ্যযুগীয় সনাতন বিশ্বাসে এ সকল সমস্যা নিরসনের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হতো। তাঁদের বিশ্বাস ছিল সামাজিক, ব্যক্তিগত সকল সংকট সৃষ্টি হয় শিবের ইচ্ছায় এবং প্রতিকারের ক্ষমতাও তাঁর। তাই গম্ভীরার গান হতো-


শিব তোমার লীলা খেলা কর অবসান,
বুঝি বাঁচে না আর প্রাণ।
............................।

 

আবার গোষ্ঠীগত দুর্নাম রটনা করা হয়েছে এ গানে। যেমন-


মুসলমানদের কোন কীর্তি নাইকো গৌড়বঙ্গে,
নারী হরণ প্রজা পীড়ন ছিল এ নব বঙ্গে হে।
...................................................।


বিশ শতকের শুরু থেকে গম্ভীরা গানে শিবের তিরোধান লক্ষ্য করা যায়। তবে শিবের প্রভাব তখনও ছিল। শিবের প্রতীক রূপে একজন মানুষকে দাঁড় করিয়ে তাঁর কাছেই আবেদন নিবেদন করা হতো। যেমন- 


(তুমি) কোন উদাসী, কাশীবাসী, ও হে কাশীশ্বর।
দুনিয়াটা যায় রসাতল, রক্ষাকর হর।
কামার কুমার ছুতার চাষা
ছাড়ল তারা জাত-ব্যবসা
চাকরি লয়ে বাবু হয়ে ভাবছে কত বড়।
............................
রং তামাসা টুকির গানে
 দেবতা পালায় উলুবনে
শিখাও মোদের ভক্তি মন্ত্র
পূজা, গঙ্গাধর।

গম্ভীরার উৎপত্তি হিন্দু সমাজে হলেও গম্ভীরার সম্প্রসারণ, সংস্কার ও সমৃদ্ধিতে মুসলমান সমাজ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মধ্য যুগে পারস্য থেকে গৌড়ে আগত স্থপতি, রাজমিস্ত্রী, সৈনিক, শ্রমিকদের সমন্বয়ে একটি সুসংহত মুসলমান সমাজ গড়ে উঠেছিল। স্থায়ী বসবাসের ফলে কালক্রমে তাঁদের সংস্কৃতির সাথে স্থানীয় সংস্কৃতির মিশ্রণ হতে দেখা যায়। এ সংমিশ্রণের প্রভাব পড়ে গম্ভীরায়। মুসলমানদের অংশ গ্রহণের ফলে শিব বা ভোলানাথ হয়ে ওঠে ভোলা নানা। যেমন-


কাম কাজ না করিলে
মান রহে না হে ভোলা নানা
দেখ দুই দিন যদি বসে থাকি 
কেউ তো খেতে কহে না হে ভোলা নানা
নানা হে-

 

আধুনিক গম্ভীরার উৎকর্ষ সাধক শেখ শফিউর রহমান বা সুফি মাস্টার ডান থেকে দ্বিতীয়, তাঁর ডানে ড. তসিকুল ইসলাম রাজা, বামে অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন (বই হাতে) ও অন্য একজন

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর গম্ভীরা গানেও আমূল পরিবর্তনের সূচনা হয়। দেশ ভাগ হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে। মালদা জেলার ভিতর দিয়ে বয়ে যায় র‌্যাডক্লিফ সীমান্ত রেখা। চাঁপাই নবাবগঞ্জ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। মালদার গম্ভীরা গানের পৃষ্ঠপোষক ও গায়েনরা চাঁপাই নবাবগঞ্জে এসে বসতি স্থাপন করেন। ফলে গম্ভীরা গান যেমন মালদা থেকে বিলীন হতে আরম্ভ করে, তেমনি তৎকালীন চাঁপাই নবাবগঞ্জ তথা রাজশাহী জেলায় সমৃদ্ধ হতে শুরু করে। এ উৎকর্ষ সাধনে অগ্রগামী ছিলেন শেখ শফিউর রহমান বা সুফি মাস্টার, মোহাম্মদ সোলাইমান মোক্তার, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ ফজলুর রহমান, তৈয়ব আলী, লূৎফুল হক, মুনিমুল মাস্টার প্রমুখ।৭৩৬
সংস্কারের ফলে গম্ভীরাই বৈচিত্র্য আসে। এ বৈচিত্র্যে সুফি মাস্টারের অবদান স্মরণযোগ্য। তখন থেকে গম্ভীরায় শিবের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে আসে নানা-নাতী। কখনও দাদা-পৌত্র। তাঁর পূর্বে চরিত্র দুটি মামা-ভাগ্নের সম্পর্ক ছিল। গম্ভীরার বৈশিষ্ট্য অনুসারে যে রসিকতা থাকে, তা নানা-নাতী চরিত্রে যেভাবে পরিস্ফুটিত হতে পারে অন্য সম্পর্কিত চরিত্রে তা মানানসই নয়।
পাকিস্তান আমলের শুরু থেকে গম্ভীরায় বৈচিত্র্য এলেও শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে খুব বেশি দূর সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে গম্ভীরা নব উদ্যোমে ক্রমসম্প্রসারিত হতে থাকে। সরকারি ইলেকট্রোনিক মিডিয়া রেডিও এবং পরবর্তীতে টেলিভিশনেও জায়গা পেয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে চাঁপাই নবাবগঞ্জের কুতুবুল আলম ও রকিব উদ্দিন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ অবদানের পরবর্তী পর্যায়ে আসে চাঁপাই নবাবগঞ্জের ধীরেন ঘোষের দল ও ভোলাহাটের আব্দুল লতিফ সর্দারের দল। 
গম্ভীরা চরিত্র দুটিতে ফুঠে উঠে পল্লী বাংলার খাঁটি বৈশিষ্ট্য। পোশাকে প্রতীয়মান হয় দরিদ্র কৃষকের খোলস। নানা-নাতির সংলাপ, গান, ঘুঙুর নাচ, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও অঙ্গিভঙ্গি দর্শক শ্রোতাকে আনন্দিত ও সচেতন করে তোলে। নানার কৃত্রিম দাড়ি ছাড়া সাধারণত কোন মেকাপ থাকে না। লুঙ্গি, ভালো বা ছেঁড়া হাফ হাতা গেঞ্জি, গামছা, মাথাল, বলদ পেটানো পাণ্ঠি (লাঠি), পায়ে ঘুঙুর হলো নানার অংগসজ্জা। নাতির জোড়াতালির হাফ প্যান্ট, স্যান্ডো গেঞ্জি, ঘুঙুর। কোন সময় গামছা, মাথালও দেখা যায়। কখনও নানা-নাতিকে হুকো টানতেও দেখা গেছে। তবে বর্তমানে হুকোর প্রচলন নেই।
প্রাথমিক যুগে গম্ভীরার আয়োজন হতো খোলা আকাশের নিচে। কয়েক ফুট জায়গা ছেড়ে দর্শক গোলাকৃতিকে বসতো। দর্শক ও আসরের ফাঁকা জায়গায় বসতো সহশিল্পী, ঢোলক, জুড়িদার। কিছু দূরে গ্রীন রুম বা সাজঘরও থাকতো। ঢোল ও জুড়ি ছিল বাদ্যযন্ত্র। সুফি মাস্টার এর সঙ্গে তবলা ও হারমোনিয়ামের সংযোগ ঘটান। বর্তমানে বাঁশি ও অন্য যন্ত্রও দেখা যায়। কণ্ঠ জোরালোর জন্য মাইক বা সাউন্ড বক্সের ব্যবহার হচ্ছে। চারপাশে দর্শক বেস্টিত আসর পদ্ধতি নেই। তার পরিবর্তে এখন খোলা জায়গায় মঞ্চ-প্যান্ডেল নির্মাণ বা মিলনায়তনের প্রচলন শুরু হয়েছে। দর্শকরা সাধারণত একমুখী হয়ে বসেন। কোন কোন মঞ্চের তিন দিকেই দর্শক বসার ব্যবস্থা থাকে। দর্শকের আসন চেয়ার। রাতের অনুষ্ঠানে থাকে বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জা।
পূর্বে গম্ভীরার কয়েকটা ভাগ ছিল। যেমন- মুখপাদ, বন্দনা, ডুয়েট বা দ্বৈত, চার ইয়ারী, পালাবন্দী গান, সংবাদ বা রিপোর্ট। শিব বা মহাদেবের উদ্দেশ্যে বন্দনা হতো। শিব বিশেষ পোশাকে আবির্ভূত হতেন। তিনি দু:খী ও নিপীড়িত মানুষের কথা শুনে ও সমাধানের আশ্বাস দিয়ে বিদায় নিতেন। ফরিয়াদি মানুষের পোশাক থাকতো শতছিন্ন। এ রূপকের দ্বারা সরকারের কাছে দু:স্থ নাগরিকের আবেদন বোঝানো হতো। বর্তমান বন্দনা বা গান শিব প্রতীকী নয়; বিষয় ভিত্তিক ও সময়োপযোগী। এখন গম্ভীরা গানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শককে বড় নানা সম্বোধন করা হয়। এ বড় নানাকে কটাক্ষ, বিদ্রুপ ও প্রশংসাও শুনতে হয়। ১৯৭৫ সালে নাটোরের উত্তরা গণভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বড় নানা সম্বোধন করে গানের মাধ্যমে বাণ ছোঁড়া হয়েছিল। গানটা ছিল-


হে নানা, কেনে করিস তুই ভাবনা
ঐ দেখ আসছে হাঁরঘে বড় নানা।
বল্যা যাব নানা লাতি 
 কোনো কথা বাকি রাখবো না।
বিদ্যাশ হতে আসছে নানা
দামি দামি সব কাপড়
কিনতে যায়্যা ধর‌্যা খাইছে
হাঁরঘে হাফর ফাপর।
তার পরেও পিন্ধলে কাপড় 
দেখা যায় বড় নানা।


নানা-নাতির এ গানে নির্ভীকতার পরিচয় পাওয়া যায়। তাতে বোঝানো হয়েছিল, দেশ স্বাধীনের পর ভারত থেকে যে কাপড় আমদানি করা হয়েছিল, তা ছিল খুব পাতলা। পরলে শরীর দেখা যেত। এভাবে বঙ্গবন্ধুকে প্রত্যক্ষ কটাক্ষ করা হয়। 
গম্ভীরার দ্বৈত চরিত্রে নারীর উপস্থিতি নেই। তবে নাতির সংলাপে তার আবহ দেখা যায়। আবার যৌতুক, বাল্য বিয়ে, পাচার, নির্যাতন ইত্যাদি অসামাজিক কার্যক্রম বন্ধে জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে নারীর কথা চলে আসে।
গম্ভীরা শুরু ও শেষ হয় একই আসরে। নানা-নাতি সংলাপ, গান, নৃত্যের দ্বারা বিভিন্ন দৃশ্যের অবতারণা ঘটান। সবশেষে যুক্তি তর্কের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের যৌক্তিক পথ দেখিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানা হয়। তারপরে থাকে হারমোনিয়ামে বিণের শব্দ।
বর্তমানে চাঁপাই নবাবগঞ্জ ও রাজশাহী মিলে এক ডজনের মতো গম্ভীরা দল আছে। রাজশাহী মহানগরীর সর্ব প্রথম দলের নাম সান্ধ্য প্রদীপ। এরপর মনোয়ারুল ইসলাম গঠন করেন মাথাল। তৃতীয়টা অ্যাডভোকেট মহসিনের দল। চতুর্থ মোস্তফার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে বাঁচার আশা দল। পঞ্চম দল কিষাণ গঠন করেন মো. খুরশীদ আল মাহমুদ। রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায় শ্যামল ও মাহমুদুল হাসান নয়ন গঠন করেছেন পাণ্ঠি।