ফিরে যেতে চান

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রাজশাহীতে সাহিত্য চর্চায় যে সব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘকাল ধরে অবদান রেখেছে তাদের মধ্যে রাজশাহী এসোসিয়েশন (১৮৭২), রাজশাহী সাহিত্য মজলিশ, উত্তরা সাহিত্য মজলিশ, কতিপয় সাহিত্য গোষ্ঠী, কবিতা সারথি, নব প্রবাহ সাহিত্য গোষ্ঠী, স্পন্দন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংসদ, বাংলা সাহিত্যিকী, প্রত্যয় সংস্কৃতি পরিষদ, অনির্বাণ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ, খামখেয়ালী সাহিত্য গোষ্ঠী, রবিবাসরীয় সাহিত্য সংসদ, হিমাচল সাহিত্য-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, উদ্বেল সাহিত্য গোষ্ঠী, উদ্ভাস সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, আব্দুল হাই সাহিত্য-সংস্কৃত সংসদ, বরেন্দ্র একাডেমী, ড. হিলালী স্মৃতি সংসদ, ধ্রুব সাহিত্য গোষ্ঠী, আদিবাসী কাব্য শিল্প নিকেতন (আকাশিনী) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।২২৭ এ সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোন কোনটি বর্তমানে নিস্ক্রিয়।
উত্তরা সাহিত্য মজলিশ: ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর রাজশাহীতে ১৯৭৪ সালে সর্ব প্রথম উত্তরা সাহিত্য মজলিশ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন সাহিত্য সাধক ও দক্ষ সংগঠক আব্দুল গণি (জন্ম : ১ জুলাই ১৯২৭-মৃত্যু : ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬)। তিনি ছিলেন এর সাধারণ সম্পাদক। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি সংগঠনটিকে রাজশাহী মহানগরী এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিত, লেখক, গবেষক ও কবিদের মিলন কেন্দ্রে পরিণত করেন।
তার সঙ্গে সোনালী আসর নামে শিশু ও কিশোরদের জন্য একটি শাখা খোলেন। নিয়মিত প্রতি সপ্তাহে সাহিত্যিক আড্ডা এবং গান বাজনায় সাহিত্য মজলিশের আসর জমে উঠতো। এ সংগঠন থেকে কবি বন্দে আলী মিয়া সম্পাদিত ‘প্রতীতি’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হতো। রাজশাহী জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে উত্তরা সাহিত্য মজলিসের সভাপতি ছিলেন। প্রতিষ্ঠালগ্নে এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রখ্যাত কবি বন্দে আলী মিয়া, বাংলাদেশ পরিষদ, রাজশাহী কেন্দ্রের পরিচালক প্রখ্যাত লোককলাবিদ অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমদ, প্রফেসর মুহম্মদ এলতাস উদ্দিন (অধ্যক্ষ, রাজশাহী টি. টি. কলেজ), প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক ‘রাজশাহী বার্তা’ সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক মুহাম্মদ আব্দুস সামাদ, ভাষাসৈনিক অধ্যাপক মুহাম্মদ একরামুল হক, কবি ও গীতিকার মুস্তাফিজুর রহমান গামা, কবি ও রম্য লেখক আনোয়ারুল আবেদীন, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক এস.এম. আবদুল লতিফ, বিশিষ্ট কবি ও শিশু সাহিত্যিক অধ্যক্ষ শামসুল হক কোরায়শী, নাট্য ব্যক্তিত্ব আব্দুর রশীদ খান, কবি খন্দকার জাহানারা বেগম, অ্যাডভোকেট আব্দুল গণি, কবি ও ব্যাংকার সৈয়দ আবুল হাশেম, অধ্যাপক ফজলুল হক, ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী, বেগম লুৎফা আলম, মানসুর আল ফারুকী, হাসান মীর, ওবায়দুর রাহমান, কবি লোকমান হাকিম, তসিকুল ইসলাম রাজা প্রমুখ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক প্রফেসর ড. কাজী আবদুল মান্নান, কবি আতাউর রহমান, প্রফেসর ড. গোলাম সাকলায়েন, অধ্যাপক মুহাম্মদ আবূ তালিব, কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, কবি আবুবকর সিদ্দিক, কবি জুলফিকার মতিন, প্রফেসর ড. মুহম্মদ মজির উদ্দীন, প্রফেসর ড. রশীদুল আলম প্রমুখ।  
উত্তরা সাহিত্য মজলিশ : উত্তরা সাহিত্য মজলিশ ১৯৭৬ সাল থেকে গম্ভীরা গানের উস্তাদ সুফী মাস্টার, কবি বন্দে আলী মিয়া, উস্তাদ হরিপদ দাস, ওস্তাদ মোজাম্মেল হোসেন (মরণোত্তর), সাহিত্যসাধক আব্দুল গণি (মরণোত্তর), প্রবীণ সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মুহাম্মাদ আব্দুস সামাদ, গবেষক মুহাম্মদ আবু তালিব, গবেষক অধ্যাপক এস.এম আবদুল লতিফ, লেখক রহমতুল্লাহ বাঙ্গালী, উস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চু, লেখক ও শিক্ষাবিদ শফিউদ্দীন সরদার, উস্তাদ বজলার রহমান বাদল, পণ্ডিত ও গবেষক ড. রশীদুল আলম, ড. আবুল কাশেম চৌধুরী প্রমুখ ব্যক্তিত্বকে গুণীজন হিসেবে সংবর্ধিত ও পদক প্রদান করা হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে অনেক নতুন লেখক সৃষ্টি হয়েছে। আবদুল গণি খুব অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তসিকুল ইসলাম রাজা। ১৯৯০ সালে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন কবি খন্দকার জাহানারা বেগম। স্বেচ্ছাসেবী ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর অভাবে এক সময় এই প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব একেবারে বিলুপ্তির পথে চলে যায়। 
রাজশাহী লেখক পরিষদ: ১৯৮৫ সালে প্রফেসর রুহুল আমিন প্রামাণিককে সভাপতি ও ড.তসিকুল ইসলাম রাজাকে সাধারণ সম্পাদক করে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রাজশাহী লেখক পরিষদ’। এদের নেতৃত্বে রাজশাহীতে ১১টি বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়।
মুক্ত সাহিত্য সমাবেশ:মূলত আশফাকুল আশেকীন, সৈয়দ সোহেল (প্রয়াত), শামীম হোসেন, খোকন তালুকদার, আনোয়ারুল আবেদীন, খোন্দকার আমিনুল হক, সরকার আলী মঞ্জুর, কবি হাবিবুল্লাহ, তুহিন, এন্ড্রু অলক দেওয়ারী, প্রফেসর ড. ফরিদা সুলতানা, এ. বি সিদ্দিক প্রমুখের উদ্যোগে ২০০০ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি মুক্ত সাহিত্য সমাবেশের যাত্রা শুরু হয়। প্রথম সভায় সাভাপতিত্ব করেন কবি ও শিল্পী আশফাকুল আশেকীন।
কবিকুঞ্জ: রাজশাহী মহানগরীতে কবি সাহিত্যিকদের বিভিন্ন নামে কয়েকটি সংগঠন আছে। এগুলোর মধ্যে বর্তমানে কবিকুঞ্জ অন্যতম সংগঠন। নিয়মিত আসরের পাশাপাশি ২০১২ সাল থেকে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দু’দিনব্যাপী জীবনানন্দ মেলার আয়োজন করে থাকে শাহ মখদুম কলেজ প্রাঙ্গণে। তবে চতুর্থ বার অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের ২৭ ও ২৮ নভেম্বর। এ মেলায় বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বাংলার স্বনাম ধন্য বাংলা ভাষার কবিদের আগমন ঘটে। প্রথম বার আমন্ত্রিত কবির সংখ্যা ১২০ জন, দ্বিতীয় বার ১৬১ জন, তৃতীয় বার ছিল ১৩৫ জন ও চতুর্থ বার ছিল ৯০ জন। মহানগরী ও বিভিন্ন স্থানের সাহিত্য প্রেমীরা মেলায় আসেন। মেলায় বই মেলার আয়োজন, কবিতা পাঠ, আলোচনা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এছাড়া একজন কবি ও একজন সাহিত্য গবেষককে পুরস্কার দেয়া হয়। পুরস্কারে থাকে ২৫ হাজার টাকা, পদক, স্মারক পত্র, উত্তরীয়। প্রথমবার পুরস্কৃত হন কবিতায় কবি আসাদ মান্নান ও জীবনানন্দ গবেষক মো. সাদিক। দ্বিতীয় বার কবিতায় কবি ওয়ালী কিরণ ও গবেষণায় ড. তসিকুল ইসলাম রাজা। তৃতীয় বার কবিতায় কবি সিরাজুদ্দৌলাহ বাহার ও গবেষণায় ড. অনুপম হাসান। চতুর্থ বার কবিতায় কবি আতাউল হক সিদ্দিকী ও গবেষণায় অনীক মাহমুদ।
কবিকুঞ্জ ১৪১৯ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ/২০১২ সালের ১৪ এপ্রিল মহানগরীর বড়কুঠি অডভার মুনক্সগার্ড পার্কে কবিতা পাঠ আসরের মাধ্যমে আত্ম প্রকাশ করে। প্রথমে আহবায়ক কমিটি গঠিত হয়। আহবায়ক হয়েছিলেন প্রফেসর রুহুল আমিন প্রামাণিক ও সদস্য সচিব ছিলেন কবি আরিফুল হক কুমার (সাউথ ইস্ট ব্যাংকের ম্যানেজার)। বর্তমানে ২১ সদস্যের একটি কার্যনির্বাহী কমিটি দ্বারা সংগঠনটি পরিচালিত হয়। এর সভাপতি প্রফেসর রুহুল আমিন প্রামাণিক ও সাধারণ সম্পাদক কবি আরিফুল হক কুমার। এছাড়াও আছেন সহ সভাপতি ড. তসিকুল ইসলাম রাজা, সহ সভাপতি আশফাকুল আশেকিন, যুগ্ম সম্পাদক কবি কামরুল বাহার আরিফ, যুগ্ম সম্পাদক কবি শামিম হোসেন, কোষাধ্যক্ষ কবি আলমগীর মালেক, নির্বাহী সদস্য সর্ব জনাব মজিদা আকতার বিথী, মনিরা রহমান মিঠি, মরহুম ওয়ালী কিরণ, সিরাজুদ্দৌলাহ বাহার, শফিকুল আলম। কবিকুঞ্জের প্রথম অফিস ছিল কুমারপাড়ায়। বর্তমানে মিয়াপাড়ায় সাধারণ গ্রন্থাগারে প্রতি সপ্তাহর শনিবার বিকেলে কবিতা পাঠের আসর বসে। এ সব আসরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরূল ইসলামের জন্ম বার্ষিকী পালন হয়। ২০১৫ সালের ৯ জুলাই প্রাপ্ত তথ্যানুসারে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ৬৯ টি আসর হয়েছে।৫৬৭
ধ্রুব সাহিত্য গোষ্ঠী: সাহিত্য চর্চার উল্লেখযোগ্য সংগঠন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্রুব সাহিত্য গোষ্ঠী। প্রতি সোমবার তরুণ-তরুণী সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে আলোচনার জন্য ধ্রুব সাহিত্য গোষ্ঠীর নিয়মিত আড্ডা বসে। তাদের মাঝে প্রবদ্ধ লেখক-সাহিত্যিকও আড্ডায় মিলিত হন। এ গোষ্ঠীর মুখপত্র লিটল ম্যাগাজিন ধ্রুব। এর প্রধান সম্পাদক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. অমৃতলাল বালা। তিনি ধ্রুব সাহিত্য গোষ্ঠীর অভিভাবকের ভূমিকাও পালন করেন। ধ্রুব নামটির প্রস্তাবক ছিলেন বাংলা বিভাগের ছাত্রী ও লেখিকা লিপি বিশ্বাস।২৩২
আদিবাসী কাব্য শিল্প নিকেতন (আকাশিনী):কবি পূরবী যাফরের সম্পাদনায় ১৪১২ বঙ্গাব্দে (শরৎ-হেমন্ত সংখ্যা) আদিবাসী কাব্য ও শিল্প বিষয়ক পত্রিকা সেরমা সেতঙ্গ প্রথম প্রকাশ পায়। পবা থানার বর্ষা পাড়ায় অবস্থিত আদিবাসী কাব্য শিল্প নিকেতন (আকাশিনী) পত্রিকাটি প্রকাশ করে। সেরমা সেতঙ সাঁওতালী শব্দ। যার অর্থ আকাশ রোদ। এ পত্রিকাটিতে বেশ কিছু কবি ও ছড়াকারের কবিতা ও ছড়া বাংলার পাশাপাশি সাঁওতালী ভাষায় বাংলা অক্ষরেই প্রকাশ হয়েছে। সাঁওতালী ভাষায় কবিতায় অনূদিত করেছেন কবি জন কিসকু।