ফিরে যেতে চান

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রকাশনা

সংরক্ষণ পদ্ধতির অভাবে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের পৌর আমলের প্রকাশনা সম্পর্কিত কোন তথ্য আবিস্কার করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন কি প্রাচীন অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি-পত্রও সিটি কর্পোরেশনের হেফাজতে নেই। ফলে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আদি প্রতিষ্ঠান রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটির স্থাপন কাল নিয়েও আছে তথ্যগত বিভ্রাট। ডব্লু ডব্লু হান্টারের স্ট্যাটিসটিকস অ্যাকাউন্ট-১৮৭৬, ভলিউম-৮ (রাজশাহী-বগুড়া) গ্রন্থে এ মিউনিসিপ্যালিটির ১৮৬৯ ও ১৮৭১ সালের  আয়-ব্যায়ের উল্লেখ আছে। এলএসএস ও’ম্যালি বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার-১৯১৬, রাজশাহীতে রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটির নির্মাণ সাল লিখেন ১৮৭৬। বিভ্রান্তির সূত্রপাত হয়তো এখান থেকেই। পরবর্তী প্রকাশনাগুলোই  রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটির জন্ম সাল ১৮৭৬ উল্লেখ করা হয়। The Municipal Bye-Laws for the Town of Rampore Bauleah under the Provisions of act V (B.C) of ১৮৭৬ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৭৭ সালে কোলকাতা বেঙ্গল সচিবালয়ের  প্রেস থেকে। গ্রন্থ আকারের মাত্র ১৪ পৃষ্ঠার এ প্রকাশনা ইংরেজি ও তার অনুবাদের জন্য বাংলা ভাষা ব্যবহার হয়েছে। এর মলাটে ব্রিটিশ সরকারের মনোগ্রামে একটি ক্রাউনের বামপাশে সিংহ ও ডান পাশের ঘোড়ার ছবি আছে। সিংহ ও ঘোড়া উভয়ই সামনের দু’পা তুলে ক্রাউনটিকে ধরে আছে। ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভার্সনের শেষে ইংরেজি অক্ষরে বাংলা সরকারের পক্ষে বাংলা সরকারের সচিব  S.C. Bayley ও চেয়ারম্যাানের নাম W.H. D’OYLY লিখা আছে। অনুচ্ছেদের সংখ্যা ৩৪টি। প্রকাশনায় ৩৪টি অনুচ্ছেদ ব্যতীত একটি নোটিফিকেশন বা বিজ্ঞাপন আছে। যেখানে বাই লজটি গ্রহণ ও কার্যকরণের তারিখ, অনুসরণীয় আইনের উল্লেখ আছে। ৩৪টি অনুচ্ছেদে মিউনিসিপ্যালিটির কর্মচারীদের নিয়োগ-ছাটাই ও সার্বিক কার্যক্রমের বর্ণনা আছে। যা সর্ব সাধারণের জ্ঞাতার্থেই প্রকাশিত হয়। মিউনিসিপ্যালিটির প্রাথমিক অবস্থা থেকে বর্তমান পর্যন্ত নামের হেরফেরে আইন, বিধি, উপবিধি প্রাদেশিক বা কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে প্রকাশ হয়ে আসছে। কর্পোরেশনের কাজ ও জনগণের সেবাপ্রাপ্তির সুবিধার্থে এগুলো প্রকাশিত হলেও সর্ব সাধারণের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ কম থাকে। জনগণেরও প্রাপ্তির ইচ্ছা থাকে না। সরকার ছাড়াও কর্পোরেশন বাজেট বই, সাংবাদিক সম্মেলন ইত্যাদির জন্য  পুস্তিকা প্রণয়ন করে। এগুলোও সর্ব সাধারণের হাতে কম যায়। জনগণের কাছে যায় বিনা মূল্যের সচেতনমূলক বিজ্ঞাপন, লিফলেট, বুকলিট ইত্যাদি। এগুলো সাহিত্যধর্মী প্রকাশনা হিসেবে বিবেচ্য নয়।
রাজশাহী পৌরসভা আমলে সাহিত্য, গবেষণা বা ইতিহাসধর্মী প্রকাশনার সন্ধান পাওয়া যায় না। তবে কাজী মোহাম্মদ মিছের রাজশাহীর ইতিহাস গ্রন্থে লেখকের নিবেদনে রাজশাহী মিউনিসিপ্যালিটি কমিটির আর্থিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছেন। দু’খণ্ডের এ গ্রন্থটি প্রণয়ন ও প্রকাশে আরো সহযোগিতা ছিল বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি (বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর), জিন্নাহ্ ইসলামিক ইনস্টিটিউট (শাহ্ মখদুম ইনস্টিটিউট), রাজশাহী জেলা পরিষদ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের। তবে টাকার অংক জেলা পরিষদেরই সবচেয়ে বেশি ছিল। কাজী মোহাম্মদ মিছের এ গ্রন্থ রচনার কাজ শুরু করেছিলেন ১৯৫৮ সালের ১২ জানুয়ারি। যার পরিসমাপ্তি হয় ১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসে। অধ্যাপক এবনে গোলাম সামাদ রচিত রাজশাহীর ইতিবৃত্ত (১৯৯৯) ও আনারুল হক আনার রাজশাহী মহানগরীর কথা (১ম সংস্করণ, ২০০৪) গ্রন্থ দুটি প্রকাশে সহযোগিতা স্বরূপ প্রকাশের পর বেশ কিছু কপি কিনে নেয় কর্পোরেশন । এ ছাড়াও সৌজন্য বিজ্ঞাপন প্রদান ও আরো কিছু উপায়ে গ্রন্থ, পত্রিকা ইত্যাদি প্রকাশে সহযোগিতা প্রদান করে। তবে এসব কৃতিত্ব রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের নামে ঘোষিত হয় না।
কর্পোরেশনের নিজস্ব প্রকাশনা মহানগর বুলেটিন প্রকাশ করে গত শতাব্দীর নব্বই দশকে। মহানগর বুলেটিনের কোন কপি সংরক্ষিত না থাকায় প্রকাশনার তারিখ, সম্পাদকের নাম ইত্যাদি জানা যাচ্ছে না। এ গ্রন্থেরর লেখক ২০০৬ সালে কর্পোরেশনের পুরনো কাগজ-পত্র পোড়ানোর সময় একটা কপির অংশ বিশেষ ধ্বংস স্তুপের গাদা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। অনেক মূল্যবান তথ্যসহ মহানগর বুলেটিনের নথিটি হারিয়ে যাওয়ার কারণে যাথযথ তথ্য প্রদান সম্ভব হচ্ছে না। এ বুলেটিন প্রকাশের কয়েক বছর পর কর্পোরেশনের মুখপত্র ‘মহানগর’ নামে সংবাদ বুলেটিনের ৩টি সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছিল। সাদাকালো ক্রাউন সাইজের প্রথম স্যংখাটি প্রকাশ হয় ১২ অক্টোবর ১৯৯৮ তারিখে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যার প্রকাশের তারিখ ৫ মে ১৯৯৯ ও ৩১ অক্টোবর ১৯৯৯। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যার রঙ ছিল রঙ্গীন ও আকার ছিল ডিমাই। সিটি কর্পোরেশনের জনসংযোগ শাখা থেকে প্রকাশিত এ তিনটি সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন জনসংযোগ কর্মকর্তা কাজী আমিরুল করিম। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যার পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলেন এ- গ্রন্থের লেখক আনারুল হক আনা। 
২০০৯ সালে এসে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রকাশনার মান বৃদ্ধি পায়। মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের বিদেশ সফর উপলক্ষে ২০০৯ সালেই `RAJSHAHI CITY’ (রাজশাহী সিটি) শিরোনামে নগর ভবনের ছবিসহ সোনালী রঙের ২৮ পৃষ্ঠার ইংরেজি ভাষায় ছোট একটি পুস্তিকা এবং বেগুনি রঙের ডিমাই সাইজের ১২ পৃষ্ঠার  ইংরেজি ভাষায় আর একটি পুস্তিকা বের করা হয়। দ্বিতীয় সংখ্যাটি প্রকাশ হয়েছিল ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে। দু’সংখ্যারই বাংলায় পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলেন আনারুল হক আনা। প্রথম সংখ্যা অনুবাদ করেছিলেন মেয়রের একান্ত সচিব মো. শফিকুল ইসলাম। দ্বিতীয় সংখ্যার অনুবাদ করা হয়েছিল এক রাতেই তৃতীয় তলার ২১৪ নম্বরের প্রধান প্রকৌশলী (তৎকালীন) সিরাজুম মুনীরের কক্ষে। অনুবাদ করেছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার প্রফেসর আব্দুস সালাম, প্রফেসর ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান সজল প্রমুখ। কর্পোরেশন মহানগরীর বিভিন্ন বিষয়ের উপর গবেষণামূলক প্রবন্ধ নিয়ে বরেন্দ্রের বাতিঘর অগ্রযাত্রার ৩ বছর শিরোনামে গ্রন্থ প্রকাশ করে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে। মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের নেতৃত্বাধীন পরিষদের ৩ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশ করা হয় বরেন্দ্রের বাতিঘর অগ্রযাত্রার ৩ বছর শিরোনামের গ্লোসি পেপারের ডিমাই আকারের ২৬০ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি। এ পরিষদের ৫ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে একই আকারের ৪৪৮ পৃষ্ঠার বরেন্দ্রের বাতিঘর অগ্রযাত্রার ৫ বছর প্রকাশ করা হয় ২০১৩ সালের ৯ মে। এ সংখ্যাই গ্লোসি পেপার ব্যবহার হয়নি। উভয় গ্রন্থের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। প্রকাশনা কমিটির সভাপতি ছিলেন ৩০ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. শহিদুল ইসলাম পিন্টু। প্রকাশক ছিলেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আজাহার আলী এবং ১০ ও ১১ সদস্য বিশিষ্ট সম্পাদনা পরিষদে ছিলেন প্রফেসর রুহুল আমিন প্রামানিক (প্রধান সম্পাদক), ড. তসিকুল ইসলাম রাজা (সম্পাদক), আকবারুল হাসান মিল্লাত (সম্পাদক), প্রফেসর ড. মুশফিক আহমদ, প্রফেসর ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান সজল, ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী, কবি আরিফুল হক কুমার, প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা মো. নওশের আলী, কেএম আব্দুস সালাম, আনারুল হক আনা। অগ্রযাত্রার ৩ বছর সংখ্যায় ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী ব্যতীত সবাই ছিলেন। অগ্রযাত্রার ৩ বছর সংখ্যার ৬ টি অধ্যায়ে ৪৬ টি প্রবন্ধ ও অগ্রযাত্রার ৫ বছর সংখ্যার ৭টি অধ্যায়ে ৫৮ টি প্রবন্ধ লেখা হয়। রাজশাহী মহানগরী সম্পর্কিত এ যাবৎকালের সর্ব বৃহৎ গ্রন্থের নাম ‘রাজশাহী মহানগরী : অতীত ও বর্তমান’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ (আইবিএস) ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন যৌথ উদ্যোগে গ্রন্থটি প্রকাশ করে। আইবিএসের পরিচালক প্রফেসর ড. মো. মাহবুবর রহমান গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন। দুই খণ্ডের এ গ্রন্থটির সর্বমোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৪২৪। গ্রন্থটি প্রকাশের পূর্বে ২০১০ সালের ১৫ ও ১৬ জানুয়ারি আইবিএস গ্রন্থটির শিরোনামে আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে বাংলাদেশ, ভারত ও দ্বিতীয় দিন নেদারল্যাণ্ডের একজন প্রতিনিধি অংশ গ্রহণ করেন। গ্রন্থটির প্রকাশনা উৎসব হয় ২০১২ সালের ৩১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে। গ্রন্থটি প্রকাশে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন প্রায় তিন লাখ টাকা প্রদান করে। সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও প্রকাশনা উৎসবে সভাপতিত্ব করেছিলেন উপাচার্য ড. এম আব্দুস সোবহান। সেমিনারের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান নগর পরিকল্পনাবিদ প্রফেসর ড. নজরুল ইসলাম অংশ গ্রহণ করেন। উভয় অনুষ্ঠানে মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন উপস্থিত ছিলেন। এ গ্রন্থের ১ম খণ্ডে ৫১ টি এবং ২য় খণ্ডে ৪৪ টি প্রবন্ধ, রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটির বাই লজ-১৮৭৬ ও ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দেলনের ১০ ফেব্রুয়ারি জনসভার একটি লিফলেটের ছবি ছাপা হয়। 
লিটন পরিষদের আমলে ‘তথ্য মেলা ২০১১ (১০-১২ ডিসেম্বর)’ নামে একটি ব্রুসিয়ার, পরবর্তী  আর একটি ব্রুসিয়ার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১২-২০১৩ শিক্ষা বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা উপলক্ষে ‘আমাদের নগরীতে স্বাগতম’ নামে একটি ব্রুসিয়ার প্রকাশ করা হয়। এসব ব্রুসিয়ারে রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল মেয়র  নির্বাচিত হওয়ার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩-২০১৪ শিক্ষা বর্ষে ভর্তি উপলক্ষে একই আঙ্গিকে ‘রাজশাহী মহানগরীতে স্বাগতম’ নামে আর একটি ব্রুসিয়ার প্রকাশ করা হয়। এ সময় বরেন্দ্রের বাতিঘর গ্রন্থের ধারাবাহিকতায় ‘রাজশাহী মহানগরী: ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ নামে একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। এর প্রকাশনা কমিটির সভাপতি ও সদস্য সচিব হয়েছিলেন যথাক্রমে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আজাহার আলী ও সচিব কেএম মাসুদুজ্জামান। আর সম্পাদনা পরিষদের প্রধান সম্পাদক ছিলেন অ্যাডভোকেট আবুল কাসেম ও সাচিবিক দায়িত্বে ছিলেন আনারুল হক আনা। এ প্রকাশনার কার্যক্রম অব্যাহত আছে। কর্পোরেশনের মুখপত্র হিসেবে ডিমাই সাইজের ‘রাসিক বার্তা’ নামে একটি বুলেটিন প্রকাশ করা হয় ১ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে। এর সম্পাদক ও সহযোগী সম্পাদক কাজী আমিরুল করিম ও আনারুল হক আনা। এ বুলেটিনের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেন আনারুল হক আনা। এছাড়াও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময় বিষয় ভিত্তিক লিফলেট প্রকাশ করে থাকে।