ফিরে যেতে চান

রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার

রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার (পূর্বমুখী)

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থাগার রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার। রাজশাহী মহানগরীর মিয়াপাড়ায় অবস্থিত। মোহনদাস করম চান্দ গান্ধী (মহাত্মা গান্ধী) ১৯২৫ সালের ১২ জুলাই এ গ্রন্থগার পরিদর্শন শেষে মন্তব্য করেন, ''It is good to read clean-books, but it is better to weave in to our lives that which we read in ennobling literature''. ১৯২৮ সালের ১২ এপ্রিল নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু মন্তব্য করেন, `I visited the Rajshahi Public Library this morning and was much impressed with what I saw. The stuff very kindly showed me round. The cllection of books is splendid – the books are well arranged and the entire premises are neat and clean. I have no hesitation in saying there are few public libraries of this type outside Calcutta. Great credit is due to the pioneers and organisers of this Institution. May the Institution grow care day to day and may it fulfil the intellectual needs of the Rajshahi public.’  ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯২৯ সালের ৪ অক্টোবর মন্তব্য করেন, Visited the Rajshahi Public Library and was pleased to see everything. I would treat there were many such libraries in Bengali. I am greatful to the authorities for showing me round.” এ গ্রন্থাগারের আদি নাম ছিল রাজশাহী সাধারণ পুস্তকালয়। ১৯৭৫ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনীর মাধ্যমে নামকরণ হয় রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার বা Rajshahi Public Library. দিঘাপাতিয়ার জমিদার রাজা প্রমদানাথ রায়ের দানকৃত জমিতে কাশিমপুরের জমিদার রায় বাহাদুর কেদার নাথ প্রসন্ন লাহিড়ী কর্তৃক স্থাপিত বর্তমান ভবনে গ্রন্থাগারটি ১৮৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলেও প্রকৃত সূচনাকাল আরো আগের। বিখ্যাত ঐতিহাসিক উইলিয়াম হান্টার ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট গ্রন্থে প্রতিষ্ঠার তারিখ উল্লেখ না করে সাধারণ গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নাটোরের রাজা আনন্দনাথ রায় সিএসআইয়ের নাম উল্লেখ করেন।২৬৬  হান্টার আরো তথ্য প্রদান করেন, ১৮৭১-৭২ সালে এ গ্রন্থাগারের গ্রন্থ সংখ্যা ছিল ৩,২৪৭টি এবং ৬টি সাময়িকী নেয়া হতো। সুতরাং এ গ্রন্থাগার যাত্রা শুরু করে ১৮৬৬ সালের পূর্বে। কারণ রাজা আনন্দনাথ রায় ১৮৬৬ সালে মারা যান। মো. আব্দুর রশীদ খান রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘‘এ পাঠাৃগার তাহার মৃত্যুর বহু পূর্বেই প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, যদিও আজকের মত ইহার কোন নিজস্ব জমি ও ভবন ছিল না।’’ বর্তমান গ্রন্থাগারিক শুকুর মোহাম্মদের মতে, উনবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকে এ গ্রন্থাগারের সূচনা হয়। রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার সর্ব প্রথম মহানগরীর কুমার পাড়ায় (পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের কাছে) কাশিমপুর হাউসের একাংশে জন্মলাভ করে। পরে প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক কালি প্রসন্ন আচার্য্যরে বাড়িতে স্থানান্তর হয়। নিজস্ব ভবন নির্মাণ হলে ১৮৮৪ সালে সেখানে স্থানান্তর হয়। কাসিমপুরের জমিদার রায় গিরিশ চন্দ্র লাহিড়ি বাহাদুরের স্মৃতির স্মরণে গ্রন্থগারের হল রুমের নাম রাখা হয়েছে গিরিশ চন্দ্র হল। হল রুমটির পশ্চিম দেয়ালের উপরের অংশে প্রস্তর ফলকে লিখা আছে- GIRISH CHANDRA HALL
Memory of Late Roy Girish Chandra Lahiri Bahadur of Kasimpur. মোট ০.৪৪ একর আয়তন বিশিষ্ট চত্বরে অবস্থিত গ্রন্থাগারটির ভবন দোতলা। ভবনে একবার উপর নিচ করলেই এর প্রাচীন গুরুত্ব ও ঐহিত্য সম্পর্কে ধারণা চলে আসে। উভয় তলায়ই পাঁচ পাঁচ করে মোট ১০টি কক্ষ আছে। ১ থেকে ৫ নং কক্ষ নিচতলায় ও ৬ থেকে ১০ নং কক্ষ উপর তলায় অবস্থিত। ১নং পেপার রিডিং রুম, ২নং কপি রাইট সেকশন, ৩নং গিরিশ চন্দ্র হল (মিলনায়তন), ৪নং সংবাদপত্র সংরক্ষণ রুম, ৫নং গ্রন্থাগারিকের অফিস, ৬নং রেফারেন্স সেকশন, ৭নং বই লেনদেন বিভাগ, ৮নং শিশু পাঠাগার, ৯নং লাইব্রেরি মিলনায়তন, ১০ নং সেক্রেটারির অফিস। এ ১০টি কক্ষের মধ্যে পাঠকরা পড়াশোনার সুযোগ পান ১নং পেপার রিডিং রুম, ৬নং রেফারেন্স সেকশন ও ৮নং শিশু পাঠাগারে। এ তিন কক্ষের পাঠকদের জন্য আসন সংখ্যা ১২০টি।  পেপার রুমের আসন ৫০টি, রেফারেন্স সেকশনে ৫০টি ও শিশু পাঠাগারে ২০টি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০জন পাঠক বই-পত্রিকা পড়েন। এর মধ্যে পত্রিকা পাঠকের সংখ্যা বেশি। 
এখানকার শতকরা পঞ্চাশ ভাগ বই দু®প্রাপ্য। গ্রন্থাগারের বয়স প্রায় দেড়শ বছর হলেও এখানে দুশ’বছরের পুরানো বইও আছে। স্কটল্যান্ড থেকে প্রকাশিত শেকসপিয়ার গ্রন্থাবলি ১ম সংস্করণ, অ্যানুয়াল রেজিস্টার, মাইকেল  মধুসুদন দত্তের একেই বলে সভ্যতা ১ম সংস্করণ, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো ১ম সংস্করণ, বৃটিশ আমলের পত্রিকা ভারতবর্ষ, শনিবারের চিঠি, বসুমতি, রিভিউ প্রভৃতি দু®প্রাপ্য গ্রন্থ ও পত্রিকা থাকার কারণে গবেষকদের আগমন ঘটে এখানে। ১ ডিসেম্বর ২০০৩ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকের তথ্যানুসারে বইয়ের সংখ্যা  ৩৮ হাজার ও দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকা পাওয়া যায় ১০টি। সরকার প্রতি বছর ১৫ হাজার টাকার বই প্রদান করে। সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় বার্ষিক অনুদান দেয় ১৫ হাজার টাকা ও রাজশাহী এসোসিয়েশন দেয় বার্ষিক ২৫ হাজার টাকা। পূর্বে জেলা পরিষদ অনুদান দিলেও বর্তমানে বন্ধ আছে। ১৯৯৩ সালে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিল। হল বা মিলনায়তন ভাড়া থেকেও কিছু আয় হয়। উপযুক্ত সংস্কার, তত্ত্বাবধান ও অর্থাভাবে গ্রন্থাগারটির অবস্থা শোচনীয়।১৩১ ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বরে দৈনিক সানশাইন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৬টি স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকা রাখা হয় এখানে। এ পত্রিকাগুলোই পাঠককে আকর্ষণ করে। পূর্বের চেয়ে পাঠকের সংখ্যা অনেক কম। প্রায় ৫০/৬০ জন। এর মধ্যে পত্রিকা পাঠকই বেশি। বর্তমানে নিয়মিত বার্ষিক অনুদান আসে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে ৬০ হাজার টাকা। এ অনুদানের মধ্যে নগদ পাওয়া যায় ৩০ হাজার টাকা ও ৩০ হাজার টাকার বই। জেলা পরিষদ ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে কিছু সংস্কার কাজ করেছে।৫১৭ মিলনায়তনে টাইলস ফিটিং ও এসি সংযুক্ত করা হয়েছে। পূর্বে একদিনের মিলনায়তন ভাড়া ছিল ৩শ টাকা। বর্তমানে মিলনায়তনের একদিনের নন এসি ভাড়া ৭০০ টাকা ও এসিসহ ২০০০ টাকা। মুক্ত মঞ্চের ভাড়া ১০০০ টাকা। সাধারণ সদস্যদের বার্ষিক চাঁদা ১২০ টাকা। তবে নতুনদের ক্ষেত্রে ২২০ টাকা। আজীবন সদস্যের জন্য ৫০০০ টাকা। বর্তমানে আজীবন সদস্য সংখ্যা ১১৫ জন ও সাধারণ সদস্য ৮৮ জন। এর উন্নতির জন্য নাটোরের রাজা চন্দ্রনাথ রায় বাহাদুরের বার্ষিক ২০ পাউন্ড স্থায়ী সহায়তার বন্দোবস্ত ছিল।১ বাংলা সরকার বৎসর বৎসর বিনামূল্যে গ্রন্থাগারের জন্য পুস্তকাদি দান করত। ১৮ জন নিয়মিত চাঁদা দিত। ঐ সময় প্রতিদিন গ্রন্থাগারটি ৬ ঘন্টা খোলা থাকত। ভারত-পাকিস্তান বিভাগের পূর্বে বরাদাতে আচার্য পিসি রায়ের সভাপতিত্বে ভারত বর্ষ বেসরকারি গ্রন্থাগার সম্মেলনে রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার সমগ্র বাংলার গ্রন্থাগারগুলোর মধ্যে চতুর্থ স্থান লাভ করেছিল।১ 
১৯৭৫ সালের কপিরাইট আইনের অধীনে দেশের সকল প্রকার প্রকাশিত গ্রন্থ, সাময়িকী, পত্র-পত্রিকা এ গ্রন্থাগারে দেয়ার নিয়ম করা হয়।৩
এ গ্রন্থাগার পরিচালনা করে একটি কার্যনির্বাহী পরিষদ। জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে কমিটির সভাপতি। বর্তমানে সহ-সভাপতি প্রশান্ত কুমার সাহা ও প্রফেসর রুহুল আমিন প্রামানিক। সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম। কোষাধ্যক্ষ ড. তসিকুল ইসলাম রাজা।৫১৭ 
গ্রন্থাগারে কর্মরত ৬ জন কর্মচারীর মধ্যে ১ জন গ্রন্থাগারিক, ১ জন গ্রন্থাগার সহকারী, ১ জন কালেকটর, ১ জন পিয়ন, ১ জন নৈশ প্রহরী ও ১ জন ঝাড়ুদার। 
গ্রন্থগারটি সপ্তাহের বুধবার বন্ধ থাকে। বাকি ৬ দিনই খোলা। গ্রীষ্মকালে বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা, শীতকালে বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা ও রমজানে দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। 
১৫ জুলাই ২০১৭ তারিখে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল হকের তথ্যানুসারে ভারত সরকারের অর্থায়নে সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট অফ রাজশাহী সিটি থ্রু দ্যা ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড কনজারভেশন অফ সোস্যল, কালচারাল, এনভারমেন্টাল অ্যান্ড হেরিটেজ ইনফারটাকচার্স প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী মহানগরীর ৬টি মঠ সংস্কার, তালাইমারীতে অবস্থিত পদ্মা সাধারণ গ্রন্থাগার সংস্কার, মিয়াপাড়ার রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের অডিটোরিয়ামও নির্মাণ হবে।