ফিরে যেতে চান

প্রাচীন প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান ও রাজশাহী ডায়মন্ড জুবিলী ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল

জ্ঞানাঙ্কুর পত্রিকার শ্রাবণ ১২৮০ (১৮৭৩ খ্রি.) সংখ্যায় প্রকাশিত বোয়ালিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্টস স্কুল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রসপেক্টাস (BOALIA INDUSTRIAL ARTS SCHOOL. PROSPECTUS) ছাপানো হয় বিজ্ঞাপন আকারে। এ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারির ভূমিকায় দেখা যায় তৎকালীন বোয়ালিয়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হরগোবিন্দ সেনকে। নতুন এ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারি কয়েকটি পদে নিয়োগের জন্য আবেদনও জানান ওয়ানটেড (WANTED) শিরোনামে। বোয়ালিয়া হাই স্কুলে বেসরকারি উদ্যোগে হয়তো ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেক্রেটারির ভূমিকা বলে দেয়, নিশ্চয় হরগোবিন্দ সেন ছিলেন এর প্রধান অথবা শীর্ষ স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অন্যতম। এ প্রতিষ্ঠানটিকে ১৯০৯ সালের শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ক্যালেন্ডারে রাজশাহী ডায়মন্ড জুবিলী ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। এ ক্যালেন্ডারে বলা হয়, ১৯০৫ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে এর বি ক্লাস চালু হয়েছিল। সেখানে ছাত্ররা ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রইং অ্যান্ড সার্ভেইং ও কার্পেন্টার বিষয়ে পড়াশোনা করতো। অর্থাৎ ১৯০৫ সালে হয়তো স্থানীয় কীর্তি ব্যক্তিগণের মাধ্যমে স্থাপিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলটি রাজশাহী ডায়মন্ড জুবিলী ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলের সঙ্গে একত্রিত হয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে যায়। 
এ তথ্য আবিস্কারের পর বলা যায় রাজশাহী মহানগরীতে একাডেমিক প্রকৌশলবিদ্যা শুরু হয়েছিল ১৮৭৩ সালে। অর্থাৎ আধুনিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর ৪৫ বছর পর রাজশাহী মহানগরীতে প্রকৌশলবিদ্যা প্রদান শুরু হয়েছিল। তখন মহানগরীর নাম ছিল রামপুর বোয়ালিয়া। আর দ্বিতীয় আদি প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল রাজশাহী ডায়মন্ড জুবিলী ইন্ডাস্ট্রিয়ার স্কুল। ইংরেজি অক্ষরে Rajshahi Diamond Jublilee Industiral School. প্রতিষ্ঠানটি আজও তার প্রাচীন ভূমিতেই অবস্থিত। তবে প্রাথমিক নাম নেই। বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউট, রাজশাহী নামে পরিচিত। মধ্যনগরীর সোনাদিঘির পশ্চিম পাড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউট। এর উত্তরে  রাস্তা ও তার ওপাশে রাজশাহী সিটি কলেজ। দক্ষিণে পুরাতন নগর ভবনের জায়গায় নির্মাণাধীন সিটি সেন্টার। নির্মাণাধীন সিটি সেন্টার ও ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউটের মাঝখানে মুক ও বধির স্কুলের পরিত্যক্ত ভবনটি এখনও বিদ্যমান। পশ্চিমে রাস্তা ও তার ওপাশে লোকনাথ হাই স্কুল। 

ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউটের প্রধান গেট, সোনাদিঘি (উত্তরমুখী, ছবি ২০১১)

সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের শেষ দিকে বোয়ালিয়া একটি জনপদের পরিচিত পেলেও শহর প্রকৃতির আকার ধারণ করতে আরম্ভ করেছিল রেশমকে কেন্দ্র করে। তখন সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ পর্যায় বা অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়া। সুতরাং রামপুর বোয়ালিয়া প্রধানত রেশম ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন রেশম শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়ে তখনই ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল স্থাপিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই ধারণা চলে আসে এ গুরুত্বপুর্ণ প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের মাধ্যমে তৎকালীন রামপুর বোয়ালিয়ার কর্তারা রেশম শিল্পের পুনর্জাগরণ ঘটাতে চেয়েছিলেন। করতে চেয়েছিলেন অর্থে ও শিক্ষায় সমৃদ্ধ। শ্রীকালীনাথ চৌধুরী তাঁর রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস গ্রন্থের ৬৯ পৃষ্ঠার (প্রকাশ ১৯০১) ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলের প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৯৮ সালের জানুয়ারি উল্লেখ করেন। তবে (২) নং ফুটনোটে উল্লেখ করেন, ম্যাজিস্ট্রেটের এডমিনিস্ট্রেশন রিপোর্র্ট ‘জানুয়ারি ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দ’ লিখিত আছে। কিন্তু অক্ষয় বাবু ‘ডাইরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন’ নিকট ১৯০০ খ্রীস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে যে পত্র লিখেন, তাহাতে ১৮৯৭ খ্রীষ্টাব্দে কার্যারাম্ভ লিখিত আছে। ১৯০৯ সালের ক্যালেন্ডারে এর প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৯৮ সালের জানুয়ারি। এলএমএস ও‘ ম্যালী এর বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটীয়ারস রাজশাহীর (১৯১৬) ১৫২ পৃষ্ঠায় ১৮৯৮ উল্লেখ আছে। তবে অত্র প্রতিষ্ঠানের বুকলিস্টের তথ্যানুযায়ী ১৮৯৭ সালে এ প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয় এবং ১৮৯৮ সালে শারীরিক আকার ধারণ করে। ১৯০৯ সালের ক্যালেন্ডারে উল্লেখ আছে, This was founded in January 1898 in commemoration of the Jubilee of the reign of Her majesty the Queen-Empress Victoria.৬১৩ প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন হয়েছিল রাজশাহী জেলা বোর্ডের ব্যবস্থাপনায় এবং বর্তমানেও জেলা পরিষদের অধিকারেই আছে। তৎকালীন কালেক্টর মি. নন্দকৃষ্ণ বসু এমএসিএস এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। দিঘাপতিয়ার জমিদার রাজা প্রমদানাথ রায় বাহাদুর জায়গাটি দান করেন। প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন ও উন্নয়নের জন্য নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় ৫০০০ টাকা, রায় কেদার প্রসন্ন সাহিত্য বাহাদুর ১৫০০০টাকা, রানী হেমন্ত সুন্দরী দেবী ৬০০০ টাকা, দুবলহাট্টীর রানীদ্বয় ২০০০ টাকা, রানী মনোমোহিনী দেবী ৫০০০ টাকা, চৌগ্রামের রাজা রমনীকান্ত রায় ৫০০ টাকা, ভুবনমোহন মৈত্র জজের উকিল ৩০০০ টাকা দান করেছিলেন।১১৪ ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল জেলা বোর্ডের অধীনে থাকলেও একটি কার্যনির্বাহী কমিটির দ্বারা পরিচালিত হতো। বোর্ডের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, বোয়ালিয়া  মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান, রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ ও আরো কিছু গুণীজন কমিটির সদস্য ছিলেন। আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সে যুগের উজ্জ্বল নক্ষত্র উকিল অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়। তিনিই ছিলেন প্রচেষ্টার অগ্রসৈনিক। শুরুতে এর শিক্ষক ছিলেন কৃষি বিভাগের (প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত) বাবু সীতানাথ গুহ। 
মাত্র দু’বছরের মধ্যেই ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল। সরকারের কৃষি বিভাগ সাহায্যের হাত সম্প্রসারণ করেছিল। গুটিপোকার বীজ তৈরি, সুতা রং, সুতা তৈরি করে মটকা কাপড় প্রস্তুতের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। এখানকার গুটি পোকার বীজ জাপান, ইটালী, ইংল্যান্ড ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হতো। ফলে এর সুনাম বৃদ্ধির পাশাপাশি রামপুর বোয়ালিয়া আন্তর্জাতিক খ্যাতি বৃদ্ধি পায়।
১৯০৯ সালের ক্যালেন্ডারের তথ্যানুযায়ী সর্ব প্রথম এখানে সেরিকালচারাল অ্যান্ড ইউভিং ডিপার্টমেন্ট খোলা হয়েছিল। ১৯০৮ সালের জানুয়ারি মাসে সেরিকালচারাল ডিপার্টমেন্টটি সরকারের কৃষি বিভাগের অধীনে আসে। বিভিন্ন সময়ে এখানে ডিপার্টমেন্ট খোলা হয়। যেমনÑ আমিন খোলা হয় ১৯০৫ সালের জানুয়ারিতে, ইউভিং ১৮৯৮ সালে, সাব ওভারসিয়ার ১৯০৬ সালের আগস্টে। ১৯০৭ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (শিবপুর কোলকাতার হাওড়া) শিক্ষানবীশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯০৫ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে এর বি ক্লাস চালু হয়েছিল। সেখানে ছাত্ররা ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রইং অ্যান্ড সার্ভেইং ও কার্পেন্টারি বিষয়ে পড়াশোনা করতো। ১৯০৯ সালের ক্যালেন্ডারে এর ৬ জন স্টাফ উল্লেখ আছে। তাঁরা সুপারিনটেনডেন্ট, সায়েন্স অ্যান্ড ম্যাথামেটিক্যাল টিচার, সেকেন্ড টিচার, থার্ড টিচার, কার্পেন্টার মিস্ত্রী ইন্সট্রাক্টর ও স্মিথ মিস্ত্রী ইন্সট্রাক্টর। এলএসএস ও‘ম্যালী এ প্রতিষ্ঠানের নাম দি ডায়মন্ড জুবিলী ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনস্টিটিউশন বলেছেন। সেখান থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও টেকনিক্যাল দু’ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ছিল। এজন্য একই জায়গায় প্রতিষ্ঠানটি দুটা অংশে বিভক্ত ছিল। মূল প্রতিষ্ঠান ছিল দি ডায়মন্ড জুবিলী ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনস্টিটিউশন। ১৯০৯ সালের ক্যালেন্ডারে এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে রাজশাহী ডায়মন্ড জুবিলী ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল। এর সংযোজিত প্রতিষ্ঠান দি সেরিকালচারাল স্কুল (The Sericultural School)৬১৩ ১৯০৯ সালের ক্যালেন্ডারে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে, The sericultural department was taken over by Government Agricultural Department in January 1908. এলএমএস ও’ ম্যালী এর বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটীয়ারস রাজশাহীতে উল্লেখ আছে, দি ডায়মন্ড জুবিলী ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনস্টিটিউশনে ৪০ জন শিক্ষার্থীকে ২ বছর মেয়াদে সাবওভারসিয়ার, সার্ভে ও আর্টিজেন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আবার তিনি সেরিকালচার স্কুলকে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে এর ছাত্রসংখ্যা ১২ জনের কথা বলেন। যাদের পলুপোকা থেকে সুতা প্রস্তুতের (Rearing silk worms) এবং পলুপোকার রোগ নির্ণয়ে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের ব্যবহার (The microscopic examination of silk worm pests) শেখানো হয়। তিনি আরো উল্লেখ করেন, রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে বি ক্লাসের পরীক্ষার্থীরা শিবপুরের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সাব ওভারসিয়ার ক্লাসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তাঁর প্রদত্ত তথ্য আমাদের স্পষ্ট করে, সে সময় ডায়মন্ড জুবিলী ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলে রেশম সম্পর্কিত ও প্রকৌশল বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে প্রকৌশল বিষয়ের উচ্চ শ্রেণি চালু করা হয়েছিল। ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলের পড়া শেষ করে তাঁরা কলেজিয়েট স্কুলে যেত এবং পরীক্ষা দিতে হতো কলকাতার শিবপুরে অবস্থিত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধীনে।
রেশম শিল্পের ক্রম অবনতির কারণে ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলেরও অবনতি হতে থাকে। এ প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত বুকলিস্ট থেকে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর প্রতিষ্ঠানের করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়। সুযোগ্য শিক্ষকগণ ভারতে চলে যাওয়ার কারণে শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি হয়। ছাত্র সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকে। ১৯৫০ সালে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুদ্দিন আকন্দ উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৫১-১৯৫২ সালে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। ১৯৫১ সালে সাবওভারসিয়ার প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পরের বছর চলে আসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব চলে যায় কারিগরী শিক্ষা বোর্ড, ঢাকায়। যা এখনও বিদ্যমান। ১৯৫৫ সালে এর শিক্ষায় ও নামে পরিবর্তন আসে। আমিনশিপের ১বছর মেয়াদী উচ্চতর কোর্স সার্ভে ফাইনাল কোর্স (কানুনগো) সংযোজন হয়। ডায়মন্ড জুবিলী ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলের পরিবর্তে নতুন নামকরণ হয় ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে স্কুল। প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদবি সুপারিনটেনডেন্ট এর বদলে অধ্যক্ষ হয়। তখন অধ্যক্ষ ছিলেন এসএম সোলায়মান। এ সময় প্রতিষ্ঠানটি ক্রমশ উন্নতির পথে ছিল। ১৯৬০ সালে আবারো পরিবর্তন আসে। নামকরণ হয় ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউট। শিক্ষার্থীদের আসন সংখ্যা ১২০ থেকে বৃদ্ধি করা হয় ২১০ টিতে। সে সময় সাবওভারসিয়ার পাস করে শিক্ষার্থীরা উচ্চতর ডিপ্লোমা-ইন-সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পেত না। ফলে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধে। অবশেষে ছাত্র ও অভিভাবকদের দাবির প্রেক্ষিতে ১৯৬০ সালে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এ কোর্স পড়ার সুযোগ করে দেয়। ১৯৬৩-১৯৬৪ শিক্ষাবর্ষে অধ্যক্ষ ক্যাম্প নং-১ পত্রের মাধ্যমে সিভিল ডিপ্লোমা কোর্স পরিচালনার জন্য কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নিকট আবেদন জানান। তবে এ আবেদনের প্রতিক্রিয়া হয়নি। ইনস্ট্রাক্টর মো. বাদশা আলম তাঁর লিখিত প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পূর্বকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজশাহী সিটি কলেজে আগমন করলে তাঁকে বিষয়টি জানানো হয়। বঙ্গবন্ধু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন হলে অত্র প্রতিষ্ঠানে ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স খোলার ব্যবস্থা করব এবং সরকারিকরণ করে দেব।’ ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজশাহী আসলে ছাত্ররা তাঁকেও জোরালো দাবি জানান এবং তিনিও প্রতিশ্রুতি দেন। এদিকে ছাত্র আন্দোলন ক্রমশ বেগবান হতে থাকে। তাঁরা ৭২ ঘন্টাও অনশন  ধর্মঘট পালন করে। অবশেষে তৎকালীন রাজশাহী বিভাগের কমিশনার শফিউল আলমের প্রচেষ্টায় ১৯৭৯ সালের ২৮ মার্চ এ কোর্সের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিপ্লোমা ইন সার্ভে কোর্স পরিচালনার অ্যাফিলিয়েশন পায়। ডিপ্লোমা-ইন-সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং (৩য় বর্ষ) কোর্স পরিচালনার জন্য এ্যাফিলিয়েশনের সময় উল্লেখ আছে ১৯৮৮ সালের জুন।৬১৪
ইনস্টিটিউটের বুকলিস্ট অনুযায়ী ৪ সেমিস্টারে বিভক্ত ২ বছর মেয়াদের সাব ওভারসিয়ার, ২ সেমিস্টারে বিভক্ত ১ বছর মেয়াদের ডিপ্লোমা-ইন-সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং (৩য় বর্ষ), ১ সেমিস্টারের ১ বছর মেয়াদের আমিনশিপ (সার্ভে কোর্স), ২ সেমিস্টিারে বিভক্ত ১ বছর মেয়াদের সার্ভে ফাইনাল ও ২ সেমিস্টারে বিভক্ত ১ বছর মেয়াদের ডিপ্লোমা-ইন-সার্ভে শিক্ষাক্রম চালু ছিল। তথ্য প্রাপ্ত বুকলিস্টটিতে প্রকাশের সময় না থাকলেও ইনস্ট্রাকটর মোহা. বাদশা আলমের মতে, বুকলিস্টটি ১৯৮৯ বা ১৯৯০ সালে প্রকাশ হয়েছিল। ৯.৬.২০১১ তারিখে জনাব বাদশার নিকট থেকে জানা যায়, বর্তমানে এ ইনস্টিটিউটে শুধু ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং (সার্ভেয়িং টেকনোলজি) পড়ানো হয়। ২০০০-২০০১ শিক্ষাবর্ষ থেকে ৪ বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং (সার্ভেয়িং) কোর্স চালু করা হয়। এর ৮টি সেমিস্টার আছে। প্রতি ইয়ারের ছাত্রসংখ্যা ৯৬ জন হিসেবে ইনস্টিটিউটের মোট ছাত্রসংখ্যা ৩৮৪ জন। একজন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ শিক্ষক সংখ্যা প্রায় ১০ জন।
ঐতিহ্য ও কারিগরি উভয় দিক থেকে এ প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বকে কম করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু নানান সমস্যা প্রতিষ্ঠানটিকে এমনভাবে কামড়ে ধরে আছে, তাতে কতদিন এর শরীরে নিঃশ্বাস থাকবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ১৯৮৯/৯০ সালেই মোটা দাগে ১২টি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। শিক্ষক স্বল্পতা, ছাত্রদের আবাসন, প্রয়োজনীয় শ্রেণি সংখ্যা, যন্ত্রপাতি, গ্রন্থাগারের বই, বিনোদন, শিক্ষকদের নিম্নমানের পদবি, যুগোপযোগী প্রশিক্ষণসহ সর্বক্ষেত্রেই সংকট প্রবল হয়ে উঠেছে। রাজশাহী জেলা পরিষদ প্রায় ২২ বছর পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠানটিকে অধিগ্রহণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়ে আসছে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের টনক না নড়ার কারণে জেলা পরিষদ অগত্যা ধরে রেখেছে। এ রকমই একটি প্রতিষ্ঠান কুমিল্লার সার্ভে ইনস্টিটিউট শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিচালনা করছে। 
প্রতিষ্ঠানটি সোনাদিঘি থেকে পবা উপজেলার নওদাপাড়া বড় বনগ্রামে স্থানান্তরের কার্যক্রম চলছে। জায়গাটি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের এলাকার উত্তর উপকণ্ঠে। এ উদ্দেশ্যে ২০১১ সালের ২৫ জুলাই ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড সার্ভে ইনস্টিটিউট, রাজশাহীর ভৌত সুবিধাদি বর্ধিতকরণ প্রকল্প সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের ব্যয় (প্রত্যাশিত) ২৪ কোটি টাকা। অর্থের  উৎস গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। বাস্তবায়নকারী সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ২০১৫ সালের ৩০ জুন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ শেষ হবার কথা। ৩ একর ক্যাম্পাসে এ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণ হচ্ছে ২৬১৬ বর্গ মিটারের চারতলা বিশিষ্ট একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবন, ১৬১৬ বর্গ মিটারের চারতলা বিশিষ্ট ১০০ শয্যার বয়েজ হোস্টেল, ১২১৬ বর্গ মিটারের তিনতলা বিশিষ্ট ৫০ শয্যার গার্লস হোস্টেল, ৩৭২ বর্গ মিটারের অধ্যক্ষ ও হোস্টেল সুপারের কোয়ার্টার, ৩৩৬ বর্গ মিটারের ডরমেটরী ভবন। এর বাউন্ডারী ওয়ালের দৈর্ঘ্য ৪৪২ মিটার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এর ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপন করেন।৩১৪ ২০১৭ সালের জুনেও দেখা যায় প্রতিষ্ঠানটি স্থানান্তর হয়নি।