ফিরে যেতে চান

বড়কুঠি (ছবি-২০১১)

নির্মাণকালের বিবেচনায় হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) হুজরাখানা রাজশাহী মহানগরীর সর্বপ্রথম পাকা ভবন। ১৬৩৪ সালে নির্মিত হজরত শাহ্ মখদুম (রহ.) মাজার শরীফ ২য় প্রাচীন। বড়কুঠি তৃতীয় প্রাচীনত্বের ইতিহাস বহন করছে। তবে হুজরাখানা ও মাজার শরীফ আবাসন ভবন নয়। শুরুতে বড়কুঠি ছিল ডাচদের আবাসন, বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও অফিস। তাই বড়কুঠি রাজশাহী মহানগরীর সর্বপ্রাচীন আবাসন ভবন।  
এ কুঠিকে কেন্দ্র করে ঐ এলাকার নামকরণ হয়েছে বড়কুঠি। ব্রিটিশ শাসনামলের পূর্ব থেকেই ব্যবসা বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ইউরোপিয়রা এ ধরনের কুঠি তৈরি করেছিল। কাজী মোহাম্মদ মিছেরের রাজশাহীর ইতিহাস (১ম খণ্ড) গ্রন্থের ৭৬ পৃষ্ঠায় বাংলাদেশে রবার্ট ওয়াটশন কোম্পানিরই ১৫২টি কুঠি ও কারখানা ছিল বলে উল্লেখ আছে। উত্তর বঙ্গের বড় বড় নদীর তীরে এ কোম্পানির বেশিরভাগ কুঠি ও কারখানা ছিল। অধিকাংশ কুঠি ও কারখানাতে বেশম ও নীলের কারবার হতো বলে কুঠিগুলো নীল কুঠি নামেও পরিচিত। রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া, মতিহার, বিনোদপুর, শিরোইল এবং জেলার বিভিন্ন জায়গা যেমন- পানানগর, পুঠিয়া, সরদা, বিড়ালদহ, নন্দনপুর, বিলমারিয়া, মুলাডুলী, খরচাকা, দুর্গাপুর, বাগমারা, অচিন ঘাট, সুরস্যা প্রভৃতি স্থানে কুঠি ছিল। রাজশাহী মহানগরীর বড় কুঠি তৈরি করেছিল ওলন্দাজরা বা ডাচরা।৪
ইউরোপিয়ানদের মধ্যে ডাচ বা ওলন্দাজ বা নেদারল্যান্ডবাসীই সর্বপ্রথম তৎকালীন বোয়ালিয়া বা বর্তমান রাজশাহী মহানগরীতে আসে এবং বড়কুঠি নির্মাণের পর বেশম বাণিজ্য আরম্ভ করে। তাঁদের বড়কুঠি স্থাপন ও রেশম কারবারের নির্দিষ্ট সূচনাকাল নির্ণয় কঠিন। তবে ১৬০২ সালে ডাচদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠিত হয়। ১৬০৯ সালে মাদ্রাজের উত্তরাঞ্চল কালিকটে, ১৬৬০ সালে নাগাপট্রমে তাঁরা কুঠি স্থাপন করে। ১৬৪৫-৫০ সালের মধ্যে বাংলার চূঁচুড়াতে বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করেছিল।১ এরপর বাণিজ্যকে সম্প্রাসারণের জন্য উপযোগী স্থানের সন্ধান শুরু করে। একই উদ্দেশ্যে ডাচ গভর্নর ফন ডেন ব্রুক ১৬৬০ সালে বাংলার একটি মানচিত্র প্রণয়ন করে। হজরত আলী কুলি বেগ (রহ.) কর্তৃক হজরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর মাজার কমপ্লেক্স নির্মাণ ও মহরম উৎসবকে কেন্দ্র করে রামপুর বোয়ালিয়া তখন একটি প্রসিদ্ধ জনপদ। ফলে ব্রুকের নকশায় বোয়ালিয়া স্থান পায়। এ নকশায় দেখা যায়, বোয়ালিয়া থেকে একটি সড়ক লস্করপুর বর্তমান (পুঠিয়া), পাবনার হান্ডিয়াল, বগুড়ার শেরপুর হয়ে আসামের দিকে ধাপিত। তবে বোয়ালিয়া নকশাই ইঙ্গিত থাকলেও অক্ষরে নেই। একটি নৌযানের ছবি দিয়ে বোয়ালিয়া ঘাটের ইঙ্গিত করা হয়েছে।
মানচিত্র প্রণয়নের পর বোয়ালিয়াকে বাণিজ্যের উপযোগী স্থান হিসাবে বেছে নেয় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তাঁরা বড়কুঠি স্থাপনের মাধ্যমে রেশম ও পণ্যের বাণিজ্য শুরু করে। ধারণা করা যেতে পারে, ডাচ আগমনের পূর্বেই এখানে রেশম উৎপাদন হতো। হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর মাজার শরিফ ও রেশমের চাষ ছিল বলেই ১৬৬০ সালে প্রণীত মানচিত্রে নৌযানের ছবি দিয়ে ঘাটের ইঙ্গিত দিয়ে বোয়ালিয়াকে চিহ্নিত করা হয়। গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীও এ অনুমানকে সমর্থন করেন। এ রেশমের আকর্ষণেই ডাচরা এখানে আসে এবং সমৃদ্ধ করে। ১৭৪১-৪২ সালে মারাঠা বর্গীরা বাংলায় ব্যাপক অত্যাচার-লুণ্ঠন চালায়।১ তাঁদের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য মুর্শিদাবাদ থেকে নবাব পরিবার ও কিছু সম্ভ্রান্ত পরিবার গোদাগাড়ীর বারোইপাড়া ও বোয়ালিয়া এসেছিল। তাঁদের আগমন রেশম শিল্পকে ক্রমবিকশিত করতে সহায়তা করে। তাঁরা জীবিকার তাগিদে ডাচদের ব্যবসায় শ্রমিক-কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত হন।১ ডব্লু ডব্লু হান্টার (WWW. Hunter. B.A, LL.D.) এ স্টাটিসটিক্যাল অ্যাকাইন্ট অব বেঙ্গল ভলিউম-৮, ডিস্ট্রিক্ট রাজশাহী এ্যান্ড বগুড়া-১৮৭৬ (A Statistical Account of Bengal volume viii, Districts of Rajshahi and Bogra-1876) গ্রন্থে উল্লেখ করেন, শহরটি বাণিজ্যের একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং কালেকটর সম্পত্তি। যা গত শতাব্দীর প্রথম অংশে ডাচরা একটি কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে প্রথম নির্ধারণ করেছিল (The town is a large and important centre of commerce; and the Collector states that it was first selected by the Duth in the early part of the last century as the of a factory.P-53)

 এল.এস.এস ও’ম্যালী (L.S.S O’Malley) বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটীয়ারস. রাজশাহী (Bengal Districl Gageteers Rajshahi.) গ্রন্থে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাধ্যভাগে মুর্শিদাবাদ থেকে কিছু মানুষের আগমন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, In the map of Bengal made by Van den Broucke, a dutch Governor in 1660, a road is shown as starting from Rampur Boalia which passed through the districts of  Rajshahi, Pabna (via Harial), Bogra and Rangpur to the assam border- a great military road. The earliest historical mention of Rampur Boalia that I have been able to trace occurs in the Sair-ul-Mutakharin, which states that in the middle of the eighteenth century many of the inhabitants of Murshidabad fled across the Ganges to escape the Maratha raids and sought refuge at Rampur Boalia and other places where `they built themselves houses and passed lives.’ The town had by this time become an enterpot of the Dutch trade in silk and other goods, which centered in their factory, which is still called the Bara Kothi.P-179. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পঞ্চম রিপোর্টের ১নং ভলিউমের তথ্য অনুসারে বাংলার নবাব ১৭২৫ সালে বোয়ালিয়ার বড়কুঠি রেশম কারখানাসহ রাজশাহী জমিদারি রামজীবনের নিকট অর্পণ করে। এ ভলিউমে উল্লেখ আছে, Rajeshahy, the Most unwieldy extensive zemindarry of Bengal, or perhaps in India; intersected in its whole length by the great Ganges or lesser branches, with many other navigable rivers and fertilizing waters, producing within the limits of its Jurisdiction, at least four-fifths of all the silk, raw or manufactured, used in, or exported from the effeminated luxurious empire of hindostan, with a superabundance of all the other richest productions of nature and art, to be found in the warmer climates of Asia, fit for commercial purposes; enclosing in its circuit, and benefited by the industry and population of the overgrown capital of Moorshedabad, the principal factories of Cossim-bazar, Bauleah, commercolly, &e. and bordering on almost all the other great provincial cities, manufacturing towns, or public markets of the soubah; was conferred in 1725, being little more than 30 years antecedent to the British conquest, on Ramjeon, a Bramin, actually the first of the present family vested in the office of farming-collector of the district; and who having adopted for heir his supposed grandson Ramkaut, husband of the yet reported to be living, Ranny Bowany, procured a nomination of the same zemindarry succession for the former, on whose death it devolved eventually, or more properly by priestcraft to the latter, under forms of pretended right; but in fact, to afford a striking melancholy instance of the corrupt inefficient and generally oppressive grasping administration of inferior ecclesiastics, equally unknown and irresponsible to the ruling  civil power.611 

সুতরাং ডাচ গভর্নর ভান ডেন ব্রুক ১৬৬০ সালে বাংলার মানচিত্র প্রণয়নের পর ও ১৭২৫ সালের পূর্বে কোন এক সময় বড় কুঠি স্থাপিত হয়েছিল। শুরুতে কোন নাম নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়নি। রেশম কারখানা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল বিধায় কারখানা শব্দটি এসেছে। 

পরবর্তীতে বোয়ালিয়া ও তার পার্শ¦বর্তীতে অনেকগুলি কুঠি স্থাপন হয়েছিল। মহানগরীর কাজলায় একটা কুঠি ছিল। এর মূল ভবনেই প্রথমে রাজশাহী বেতার কেন্দ্র স্থাপিত    হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কুঠি ছিল। এটা এখন ইউ.ও.টি.সির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভাগীয় কমিশনারের কুঠিটি ছিল ওয়াটশন কোম্পানির। এ সব কুঠির সাহেবদের দুটি গোরস্থানও ছিল। গোরস্থান  দুটির একটি ছিল বড়কুঠি প্রাঙ্গণে ও অপরটি দুই বিঘা জমির উপর রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের পশ্চিমে গণপূর্ত অফিস সংলগ্ন।৪ এ দুটির পূর্বেও বড়কুঠির দক্ষিণ পাশে ডাচদের একটি গোরস্থান ছিল। যা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। 
এসব কুঠির মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে বড়। তাই বড়কুঠি নাম ধারণ করে। হান্টার উল্লেখ করেন, Silk spinning and weaving has been carried on in Rajshahi District for several centuries past. The East India Company established a factory in Rajshahi in the eighteenth century. In 1832 The company had two head factories in the District, once at the town of Rampur Beauleah, and  the other at sardah.P-82. হান্টারের আলোচনায় স্পষ্ট হয় রাজশাহী জেলায় কোম্পানির  অনেকগুলো কুঠি ছিল। সেগুলোর মধ্যে বোয়ালিয়া ও সরদারটি ছিল প্রধান। সুতরাং বড়কুঠিকে কোম্পানির জেলার বাণিজ্যিক সদর দপ্তর হিসাবেও ধরা যায়। বাণিজ্যিক প্রশাসনের গুরুত্ব থেকেও বড়কুঠি শব্দটি আসতে পারে।
বহুতল ভবন হিসেবে বড়কুঠি রাজশাহী মহানগরীর সর্ব প্রাচীন দালান বা ইমারত হলেও পাকা ইমারত হিসেবে নয়। কারণ পারস্য (ইরান) রাজার সেনাধ্যক্ষ আলী কুলি বেগ (র.) ১৬৩৪/১৬৩৫ সালে হজরত শাহমখদুম (রহ.) এবং মাজার সংস্কার করে গম্বুজ ঘর নির্মাণ করেছিলেন। তার পূর্বে ছিল হুজরাখানা। তবে গত ২৬ জানুয়ারি ২০১১ তারিখ রাত আটটায় গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর উপস্থিতিতে অধ্যাপক এবনে গোলাম সামাদ ফায়ার সার্ভিসের পূর্ব পাশের একটি গলির মধ্যে তাঁর ভাড়া বাসায় ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁর মতে, পদ্মা আরো দূরে ছিল। মখদুম সাহেবের মাজার ছিল পদ্মার পাড়ে। পদ্মা ভেঙে  এখানে এসেছে। হয়ত মখদুম সাহেবের মাজারও বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। স্থানান্তরের পর তাঁর মাজারের দরজার উপরে ফারসি ভাষার শিলা লিপিটিও পুনরায় স্থাপন করা হতে পারে। মাজার স্থাপনের পূর্বেই বড়কুঠি নির্মাণ হয়েছে। অশীতিপর এ গবেষক অধ্যাপকের মতামত যথার্থ হলে বর্তমান পাকা ইমারতগুলোর মধ্যে বড়কুঠিই সর্ব প্রাচীন। তবে অনুমানভিত্তিক এ মতকে সমর্থন করা যায় না। এর জন্য আরো গবেষণার প্রয়োজন।
১৭৫৭ সালে ইংরেজদের বাংলা দখলের পরও ডাচরা মিরজাফরের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে ইংরেজদের ক্ষমতা খর্বের প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। তাঁরা ইংরেজদের কাছে পরাজিত হবার পরও রাজশাহী অঞ্চলে কিছুদিন ব্যবসা করেছিল। এরপর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বড়কুঠি ডাচদের নিকট থেকে ক্রয় করে নেয়। কোন এক সময় ডাচরা বড়কুঠি ত্যাগ করে। ইংরেজদের বাণিজ্যিক প্রতিনিধির আবাসন হয় বড়কুঠি।৪ চীন ও জাপান বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উন্নত রেশম বিশ্ব বাজারে অল্প দামে ছাড়লে এখানকার ইউরোপীয় রেশম ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে ১৮৩৩ সালে ইংল্যান্ডের রাজা ৪র্থ উইলিয়ামের ঘোষণা অনুযায়ী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রেশম ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। এ কোম্পানির বড় বড় কর্মচারীরা প্রাইভেট কোম্পানি গঠন করে। যেমন মেসার্স রবার্ট ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানি। 
১৮৩৩ সালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বড়কুঠি থেকে তাঁদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয় এবং ১৮৩৫ সালে মেসার্স রবার্ট ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানির নিকট বিক্রি করে দেয়। এ কোম্পানি বড়কুঠিকে কেন্দ্র করে রেশম ও নীল শিল্পের ব্যাপকভাবে সম্প্রুসারণ করে। সিপাহী বিদ্রোহের সময় ইউরোপীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার হয়েছিল বড়কুঠি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ বা বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই ইংরেজদের মোদিনীপুর জমিদারী কোম্পানি মেসার্স ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানির নিকট থেকে বড়কুঠি কিনে নেয়। ওয়াটসন কোম্পানির কারবার বন্ধের কারণ ছিল রেশম শিল্পের অবনতি ও অনেক চাষীর তুঁত চাষের পরিবর্তে অন্য ব্যবসা অবলম্বন।
ইউরোপীয় বাজারে বাংলার রেশম বিদেশি রেশমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পরাজিত হয় এবং ১৮৫৯-৬০ সালে নীল বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার কারণে বাণিজ্যক শহর হিসেবে রাজশাহীর অবনতি ঘটে। ১৮৯০ সালে জার্মানীতে হিউম্যান (Heumann) খুব সস্তায় কয়লা থেকে নীল তৈরির কৌশল আবিস্কার করে। ফলে নীল গাছের পাতা থেকে নীল রঙ তৈরি আর লাভজনক ছিল না। এ কারণে ক্রমশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল নীল কারখানাগুলো। এদিকে রেশম ব্যবসাতেও মন্দাভাব দেখা দিয়েছিল। এর অন্যতম কারণ হলো পেব্রিন নামক এক প্রকার রোগ। এতে রেশম পোকা মরে যেত। তাছাড়া ইউরোপে রেশম চাষের বিস্তার ঘটেছিল। এখানকার চেয়ে তুলনামূলকভাবে সস্তায় ইউরোপের চাহিদা মত ফ্রান্সে রেশম সুতা উৎপন্ন হতো। 
মেদিনীপুর জমিদারি কোম্পানিও ছিল ইংরেজদের। এ কোম্পানি রাজশাহী মহানগরীর যে স্থানে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীর বাজার বসাতো তা এখন সাহেব বাজার নামে খ্যাত।৪ কাজী মোহাম্মদ মিছেরের রাজশাহী ইতিহাস (১ম খণ্ড) গ্রন্থে প্রদত্ত ঠিকুজি মোতাবেক মেদিনীপুর জমিদার কোম্পানির কাছ থেকে বড় কুঠি যায় বেঙ্গল সিল্ক কোম্পানির নিকট। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ উপনিবেশের থাবা মুক্ত হয়ে পাকিস্তানের জন্ম হওয়ার পর ১৯৫১ সালে তৎকালীন সরকার বড়কুঠি একোয়ার করে নেয় এবং খাদ্য সরবরাহ অফিসে পরিণত করে। ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৫৫ সালে বড়কুঠি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় আসে এবং ভাইস চ্যান্সেলরের অফিস ও বাসভবনে পরিণত হয়। নিচতলা অফিস ও ওপরতলা বাস ভবন। বর্তমান বড়কুঠির নিচতলা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়ক কর্মচারী ইউনিয়নের অফিস ও উপরতলা টিচার্স ও কর্মকর্তাদের ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০১৬ সালের ২৫ মে রাজশাহী মহানগরীর বড়কুঠি এলাকায় অবস্থিত বোয়ালিয়া ভূমি অফিস থেকে জানা যায়, বড়কুঠি এক সময় রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের পক্ষে রেকর্ড হয়। তবে বড়কুঠির বর্তমান মালিক ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে জেলা প্রশাসক, রাজশাহী। অঃজেঃপ্রঃ (রাজস্ব) রাজশাহীর ৩৫৯/xiii/৮১-৮২ নং বিবিধ কেসে ১২/৭/৮২ তারিখে প্রদত্ত আদেশ ও ৩১/৫/৮৮ তারিখের ১০৪১/১(২) নং এসএ স্মারকের আদেশ ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত করা হয়েছে। বোয়ালিয়া মৌজায় অবস্থিত বড়কুঠির আরএস খতিয়ান-২১। আরএস দাগ নং ৬২২৬।
অনেক বার সংস্কার হওয়ার কারণেই টিকে আছে বড়কুঠি। কাজী মোহাম্মদ মিছেরের গ্রন্থে মেদিনীপুর জমিদার কর্তৃক বড়কুঠি ও কারখানা পুনরায় সংস্কারের কথা উল্লেখ আছে। ডাচ নির্মিত বড়কুঠির মূলভবনের সঙ্গে পরবর্তীতে অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের বড়কুঠির ক্ষতি সাধন হয়। সম্প্রসারিত অংশ ধ্বসে পড়ে। ভূমিকম্পে  ক্ষতিগ্রস্ত বড়কুঠির প্রত্যক্ষদর্শী রাজশাহী জজ কোর্টের তৎকালীন ক্লার্ক লেখক দীনেন্দ্রকুমার তাঁর সেকালের স্মৃতি গ্রন্থে উল্লেখ করেন,“বড় কুঠির প্রাচীন অট্টালিকার দোতলার কিয়দংশ ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছিল।” সুতরাং এ ভূমিকম্পে মূল ভবনের হয়ত কিছু ক্ষতি হয়েছিল। পরে মেরামত করা হয়। মূলকুঠির দৈর্ঘ্য ৮২ ফুট ও প্রস্থ ৬৭ ফুট। উপরে ও নিচে ছয় ছয় মোট বারটি কামরা আছে। বিভিন্ন সময় নিচের কামরাগুলো রেশম, নীল ও অন্যান্য মালপত্রের গুদাম হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। উপরের কামরাগুলো ছিল আবাসন ও সভার জন্য। পূর্ব-পশ্চিম উভয় পাশে আছে ছাদে যাবার ঘোরানো সরু সিঁড়ি। প্রত্যেক সিঁড়ির দেয়ালে আছে আটটি করে পরিমাণ মাপের ছিদ্র। ও’ ম্যালী ডিস্ট্রিক্ট গেজেটীয়ারে উল্লেখ করেন, যে কোন আক্রমণ মোকাবেলায় রাইফেল ফায়ারের জন্য ছিদ্রগুলো উভয় পাশে আছে। ভবনের ভিতরে দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে দোতলায় যাবার কাঠের পাটাতনের বেশ চওড়া একটি সিঁড়ি আছে। ছাদের মাঝখান অনেকটা স্টেজের মত। ছাদের গঠন দেখে মনে হয় চুন সুড়কির তৈরি। ও’ ম্যালী উল্লেখ করেছেন, ছাদের উপর কিছু কামান স্থাপন করা ছিল। কামানগুলোর গায়ে V.O.C.A ইংরেজি অক্ষর লিখাছিল। V.O.C = Vereenigde Ostindiche Companie (The United East India Company).611 শেষের অ অক্ষরটি হয়ত ডাচদের কোন আর্টিলারির পরিচয় বহন করে। একটি ছাড়া এ কামানগুলি মেদিনীপুর জমিদার কোম্পানির প্রতিষ্ঠান নদীয়ার শিকারপুরে  (Shikarpur) নিয়ে যাওয়া হয়। সাত ফুট লম্বা আর একটি ঘূর্ণায়মান কামান  (Swivel gun) মুর্শিদাবাদের মরিচায় (Maricha) মেদিনিপুর জমিদার কোম্পানির ম্যানেজারের বাংলোই স্থানান্তর করা হয়েছিল। ও’ ম্যালী উল্লেখ করেন, বড়কুঠির অবশিষ্ট কামানটি রামপুর বোয়ালিয়ার পুলিশ লাইনে দেখা যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, এটি দিয়ে কয়েক বছর থেকে দুপুরের তোপধ্বনি  (Midday gun) দেয়া হচ্ছে। ২৬ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে অধ্যাপক এবনে গোলাম সামাদ জানান, পুলিশ লাইনের কামানটি কোন এক সময় পুলিশ সুপারের নদীর তীরের বাসভবনে স্থাপন করা হয়েছিল। 
আমার জ্ঞান হবার পর যখনই বাঁধের উপর দিয়ে পুলিশ সুপারের বাসভবনের সামনে গেছি তখনই কামানটিতে আমার দৃষ্টি ছুঁতো। ঐ কামানটি যে রাজশাহী মহানগরী সূচনার নিরেট স্বাক্ষী তা তখন বুঝতামনা। শুধু আমি নই; রাজশাহী মহানগরী বা তার আশে পাশের ত্রিশোর্ধ্ব বয়সী প্রায় সবাই হয়তো কামানটি দেখে থাকবেন। ২৫ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে সিরাজগঞ্জ নিবাসী বর্তমানে রাজশাহীর গণপূর্ত-১ দপ্তরের অফিস সহকারী মো. গোলাম নবী বলেন, ১৯৮৩ সালে রাজশাহী আসার পর পুলিশ সুপারের বাসভবনে কামানটি দেখেছি।
৭ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের উপস্থিতিতে তাঁর দপ্তরের এক সভায় কামানটির খোঁজ নেয়ার জন্য আমাকে মৌখিক নির্দেশ দেয়া হয়। পরের দিন সকাল দশটার কয়েক মিনিট পর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যাই। প্রায় এগারটার সময় পুলিশ সুপার এসএম রোকন উদ্দিনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। তাঁর দপ্তরের তখন সহকারী পুলিশ সুপার আবু বক্কর সিদ্দিক উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা আমার উদ্দেশ্য শুনেন। কিন্তু কামানটির খোঁজ দিতে পারেননি। তবে খুঁজে জানাবেন বলে আশস্ত করেন। পরে আমি এএসপির কাছে কয়েক বার খোঁজ নিয়েছি। কামানের খোঁজ না পেলেও তিনি বার বার আশ^স্ত করেছেন। ২৫ জানুয়রি ২০১১ তারিখে এসপির বাংলোর প্রধান ফটকে গিয়ে দেখি জরাজীর্ণ পুরনো বাসভবনটির চিহ্ন মাত্র নেই। নদীর দিকে তাক করা সমতল থেকে একটু উচুঁ বেদিতে কামানটি স্থাপন করা ছিল। তার স্মৃতি চিহ্নও নেই। পুরনো ভবনের জায়গার পাশেই শোভা পাচ্ছে নতুন আবাসিক ভবন। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য জানালেন, আমি নতুন এসেছি কামান সম্পর্কে কিছুই জানিনা। এসপি অফিসের আরো কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছি। কেউ ইতিহাসের এ মৌলিক উপাদানটির খোঁজ দিতে পারেননি। আমি ব্যক্তিগতভাবে সরদা পুলিশ একাডেমি, রংপুর, ঢাকা জাতীয় জাদুঘর, লালবাগকেল্লা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান করেছি। কেউ কামানটির তথ্য দিতে পারেনি। এমনও হতে পারে পুরনো ভবন অপসারণের সময় এর গুরুত্ব না বুঝে কোন আবর্জনা বা মালখানায় ফেলে রাখা হয়েছে। ভগ্ন কোন স্তুপের নিচে অনাদারে পড়ে আছে কিনা, তারই অসম্ভব কি?
ওয়াটসন কোম্পানির আমলে নিচের ঘরগুলোকে বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বহু মানুষকে ধরে এনে এখানে খুন ও বহু নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। নীল চাষে অবাধ্য কৃষকদের পিটানো হতো চামড়া মোড়ানো বেতের লাঠি শ্যামা চাঁদ দিয়ে।৪ ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবের সময় বড়কুঠি ইংরেজদের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর বিশেষ হেড কোয়ার্টার রূপে ব্যবহৃত হয়েছিল।৩
বড়কুঠির তলদেশ থেকে পদ্মা পর্যন্ত একটা সুড়ঙ্গ পথ আছে বলে রাজশাহী মহানগরবাসীর মুখে একটা গল্প আছে। ভবনটির নিচতলা-দোতলা খুঁজে এ ধরনের কোন গোপন পথের সন্ধান আবিস্কার হয়নি। তবে ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট বিকেল সোয়া তিনটায় নগর ভবনের ২১১ নং রাজশাহী সিটি মিউজিয়াম কক্ষে প্রসঙ্গক্রমে বর্তমান ১৭১, মেহেরচণ্ডি পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মো. মনোয়ার হোসেন বিদ্যুৎ অনেকটা চমকে দেয়ার মতোই তথ্য প্রদান করেন। তাঁর দাবি বড়কুঠির  পূর্ব পাশের ছাদে যাবার ঘোরানো সরু সিঁড়ির সঙ্গে যুক্ত ভূগর্ভ দিয়ে নদী পর্যন্ত একটা সুড়ঙ্গ পথ আছে। ঘটনাক্রমে তিনি নিজে ঐ সুড়ঙ্গে হেঁটেছেন। বিদ্যুতের পিতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মুজাহিদ হোসেন (মৃত্যু সেপ্টেম্বর ২০১৩) ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত সপরিবারে বড়কুঠির দোতলাই থাকতেন। একই তলাই ভূগোল বিভাগের প্রফেসর মকবুল হোসেনও সপরিবারে ছিলেন। একাডেমিক সার্টিফিকেট অনুসারে বিদ্যুতের জন্ম ১৯৭৭ সাল হলেও প্রকৃত বয়স আরো এক বছর বেশি। ১৯৮৩ সালে তাঁর বয়স ৭ বছর। তাঁদের বড়কুঠিতে বাসকালীন সেখানকার জঙ্গলে সাপ বাস করতো। এমনকি তাঁদের বিছানাতেও একদিন গোখরা সাপ উঠে বসেছিল। পশ্চিমের ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে ছাদ পর্যন্ত যাওয়া যেত। পূর্ব পাশের সিঁড়িটা বন্ধ ছিল। এখনও বন্ধ আছে। ছাদের উপরে তার বন্ধ দরজা। তাঁর পিতা সিঁড়িটাকে চালু করার জন্য ১৯৮৩ সালে দরজাটি ভেঙেছিলেন। তখন বিদ্যুৎ  কৌতুহলবশত কাউকে না জানিয়ে টর্চ রুমাল নিয়ে ঐ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যান। নামতে নামতে একবারে গভীরে চলে গিয়েছিলেন। ঐ সিঁড়ি থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত সুড়ঙ্গ ধরে ১০/১২ ফুট এগুতেই একটা মানুষের কঙ্কাল দেখতে পান। বিদ্যুত তখন ভয় পেয়ে পালিয়ে আসেন। কঙ্কাল দেখার আগে তিনি কয়েকটি সাপের ডিম কুড়িয়েছিলেন রুমালে। সেগুলো সঙ্গে আনতে পেরেছিলেন। পরে তাঁর বাবা ঘটনাটি জেনে দরজাটি আবারো বন্ধ করে দেন। ঐ বছরই তাঁরা বড়কুঠি ত্যাগ করেন। তবে প্রফেসর মকবুল হোসেন আরো কিছুদিন ছিলেন। বিদ্যুৎ স্মৃতি থেকে তথ্য দেন, ঐ সুড়ঙ্গের উচ্চতা প্রায় ৭ ফুট। পাশাপাশি দুজন মানুষ হেঁটে যাওয়ার মতো তার প্রস্থ। বিদ্যুতের এ তথ্য দেয়ার দেয়ার সময় হেতমখাঁর মঞ্জুর মুর্শেদ খান চৌধুরী (শিশির) উপস্থিত ছিলেন। শিশিরও জানান, তিনিও দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর নিকট থেকে ঐ সুড়ঙ্গ পথের কথা শুনেছেন।   
বড়কুঠির ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ: মহানগরীর ইতিহাস সংরক্ষণ ও পর্যটকদের নিকট আকর্ষণীয় করার জন্য বড়কুঠির মূল আদল ঠিক রেখে সংস্কারের পরিকল্পনা গ্রহণ করে মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন মেয়াদের রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন পরিষদ। তাতে সহযোগিতা করেছিলেন গবেষক মুহাম্মদ লুৎফুল হক। সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন নেদারল্যান্ডের নাগরিক ফ্লোরাস গেরাস ও সিগফ্রিড জ্যানজিং, প্রফেসর ড. মো. মাহবুবর রহমান, রাজশাহী সিটি কর্পেরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল হক। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে ১৬ থেকে ২৬ জানুয়ারি ২০১২ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডের প্রসিদ্ধ Built Heritage Expert Dick A.J.ter Steege (M.Sc) বড় কুঠি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণের পর একটি রিনোভেশন প্ল্যান (Renovation Plan)  দাখিল করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অসম্মতির কারণে প্ল্যানটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। Built Heritage Expert Dick A.J.ter Steege (M.Sc)  রাজশাহীতে থাকাকালীন তাঁর গাইডের দায়িত্ব পালন করেন এ গ্রন্থের রচয়িতা আনারুল হক আনা। ফ্লোরাস গেরাস ও সিগফ্রিড জ্যানজিং প্রায় প্রতি বছরই রাজশাহী আসেন এবং বড়কুঠিকে সংস্কার, হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণ ও সেখানে রাজশাহী সিটি মিউজিয়াম স্থাপনের জন্য সিটি কর্পোরেশনসহ স্থানীয় মানুষকে উৎসাহিত করেন। তাঁদের সর্বশেষ আগমন ঘটে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন কিশোরগঞ্জের ইলিয়াস কাঞ্চন ও চট্টগ্রামের রাশেদুল আলম চৌধুরী।