ফিরে যেতে চান

মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, রাজশাহী

মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পশ্চিমমুখী গেট

ভারতবর্ষে বর্তমান আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ইউরোপ থেকে আগত বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারী। বলা যায় তাঁরাই আধুনিক একাডেমিক শিক্ষার বীজ বুনেছিল। এ সব মিশনারীর আগমন শুরু হয় ১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামার জলপথে ইউরোপ থেকে ভারতের পথ আবিস্কারের পর। ভাস্কো দা গামা ১৪৯৮ সালে দক্ষিণ ভারতের কালিকট বন্দরে অবতীর্ণ হয়ে সেখানে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন। ভারতের প্রথম পুর্তগিজ গভর্নরআল বু ক্যার্ক ১৫১০ সালে বিজাপুর সুলতানের নিকট গোয়া দখল করে সেনানিবাস গড়ে তুলেছিলেন।৬৭১
সে সময় মিশনারিরা আসত ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক কোম্পানির সঙ্গে। কোম্পানির কর্মচারীদের আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ও স্ব স্ব ধর্ম প্রচারই ছিল তাঁদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। শিক্ষার প্রসার ব্যতীত এ কার্যক্রম সম্ভব ছিল না। তাই তাঁদের প্রচেষ্টায় ভারতে শুরু হয়েছিল নতুন শিক্ষার পরিবেশ। প্রাথমিক অবস্থায় তাঁরা দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে অবহেলা করেনি। ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের পর প্রয়োজনের তাগিদে মিশনারিরা ক্রমশ পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারে উদ্যোগী হয়ে ওঠে।৬৭১ পরবর্তীতে কোম্পানী সরকার ও ব্রিটিশ সরকার বিভিন্ন শিক্ষা নীতি ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ইংরেজি বা আধুনিক শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটায়। মিশনারিরা ধারণা করেছিল, ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের কাজ সহজ হবে ও যথাযথভাবে এগিয়ে যাবে। ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনির কোনো কোনো নীতি নির্ধারকও এ ধারণা পোষণ করতো। যদিও তাঁদের প্রত্যাশা অনুসারে সুফল আসেনি। যেমন কাউন্সিলের আইন সদস্য ও জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন (এঈচও) এর সভাপতি লর্ড ম্যাকলে (ভারতে আগমন ১৮৩৪ সালের ১০ জুন) তাঁর আব্বাকে এক পত্রে লিখেন, ‘আমার দৃঢ় বিশ^াস, বাঙালিরা ইংরেজি শিক্ষা পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই খ্রিষ্ট ধর্মভাবাপন্ন হয়ে উঠবে, ধর্ম প্রচারের আবশ্যকই হবে না। পরবর্তী ৩০ বছরের মধ্যে এ দেশে একজনও মূর্তিপূজক থাকবে না’ (It is my firm belief that if our plans of Education are followed up, there will not be a single idolator among the respected classes in Bengal thirty years since. And this will be effected without any efforts to proselytes)| ৬৭১ বাংলাদেশে অন্যান্য মিশনের মতো প্রেসবিটারীয়ান মিশনও প্রথম হতে শিক্ষা বিস্তার ও শিক্ষার মাধ্যমে ধর্ম প্রচারে মনোযোগী হয়েছিল।১১১ মূল উদ্দেশ্য ধর্ম প্রচার হলেও রাজশাহী মহানগরীর মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রেসবিটারীয়ান মিশনের একটি সর্বজনীন জনকল্যাণমূলক কৃতিত্ব।
মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় রাজশাহী কোর্টের জেলা প্রশাসন ভবনের পূর্বপাশে রাজশাহী-চাঁপাই নবাবগঞ্জ সড়কের উত্তর-পূর্ব পাশে অবস্থিত। জায়গাটি বুলনপুর মহল্লার অন্তর্গত। প্রায় দেড়শ বছরের প্রচীন এ বিদ্যালয়টি স্থাপনকাল সম্পর্কে অনেক বিভ্রান্তকর তথ্য বিভিন্ন জায়গায় লিখা হয়েছে। সেগুলো থেকে প্রকৃত সত্যটাকে খুঁজে নেয়া কঠিন। এ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জোতির্ময় সরকার স্বাক্ষরিত রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সচিবের নিকট প্রেরিত এ বিদ্যালয় সম্পর্কিত ২০১২ সালের ৯ জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে অনেক অস্পষ্ট তথ্য দেখা যায়। প্রতিবেদনটিতে তথ্য উপস্থাপন করা হয়- রাজশাহী শহরের সাধারণ মানুষের শিক্ষা প্রদানের জন্য তৎকালীন প্রেসবিটারীয়ান চার্চ অব ইংল্যান্ড কর্তৃক ১৮৮৮ সালে ১.৮০৯ একর জমির উপর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। আবার লিখা হয়েছে ১৯৬৮ সালে রাজশাহী শহরে বালিকাদের জন্য প্রথম উন্নতমানের বিদ্যালয় স্থাপন করে মিশন কর্তৃপক্ষ। ১৯৬৮ সালে স্কুলটি মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হয়। বিদ্যালয়টি প্রায় শতবর্ষ কাল শহরের প্রাণকেন্দ্রে থেকে শহরবাসী বালিকাদের শিক্ষাদান করে আসছে। ১৯৭০ সালে সর্ব প্রথম এ বিদ্যালয় হতে ১৪ জন ছাত্রী এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ১৩ জন প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। বর্তমানে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের অফিসের বিপরীতে কোর্ট এলাকায় অবস্থিত মিশন হাউজের মধ্যে নিজস্ব ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিবেদনে ছাত্র-ছাত্রীর পরিসংখ্যানে দেয়া হয়েছে ১৩৫৫ জন। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো সম্পর্কে বলা হয়েছে- ১টি বিজ্ঞান ভবন, ১টি পাঠাগার, ১টি দ্বিতল ভবন, ১টি মিলনায়তন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রবিধান অনুসারে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি দ্বারা বিদ্যালয় পরিচালিত হয়। ২০১৬ সালের ১৭ মার্চ সকাল ৯ টায় প্রধান শিক্ষিকা মারিয়া অলকা মণ্ডল ও একজন অফিস সহকারীর (মহিলা) সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাঁরাও এ বিদ্যালয় স্থাপনের সঠিক তথ্য সম্পর্কে অবগত নন। বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ডে লিখে রাখা হয়েছে ১৮৮৮ ইং।
প্রকৃতপক্ষে বিদ্যালয়টির স্থাপত্যকাল আরো প্রাচীন। যতদূর জানা যায়, শিক্ষানগরীর সর্ব প্রথম মুসলিম নারীদের আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। তবে এ বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন। কাজ করতে গিয়েও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিমণ্ডলীর আন্তরিকতার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠে। এমন পরিস্থিতিতে দেখা যাক এ বিদ্যালয় সম্পর্কে পণ্ডিত-গবেষকগণ কি বলেছেন।
এ বিদ্যালয় স্থাপন আসলে রামপুর বোয়ালিয়ায় ইংলিশ প্রেসবিটারীয়ান মিশনের কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট। বর্তমান সিটি চার্চ, রাজশাহীর এক সময়ের পুরোহিত রেভারেন্ড প্রিয় কুমার বারুই ‘বঙ্গীয় খৃষ্ট মণ্ডলীর ইতিহাস’ গ্রন্থের পঞ্চদশ অধ্যায়ের ‘ইংলিশ প্রেসবিটারীয়ান মিশনের কার্য’ শিরোনামে  রামপুর বোয়ালিয়ায় (বর্তমান রাজশাহী মহানগরী) মিশনের কৃতিত্বের কিছু তথ্য উপস্থাপন করেছেন। অনেক দিন যাবৎ প্রচেষ্টার ফলে দুস্প্রাপ্য এ গ্রন্থের পঞ্চদশ অধ্যায়ের ফটোকপি রেভারেন্ড প্রিয় কুমার বারুই এর কন্যা টিটি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহযোগী অধ্যাপক মনিকা মান্নানের নিকট থেকে ১৭ মার্চ ২০১৬ তারিখ সকাল সাড়ে নটার দিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এ গ্রন্থের তথ্য মোতাবেক রামপুর বোয়ালিয়ায় মিশন স্থাপনের মাধ্যমেই ইংলিশ প্রেসবিটারীয়ান মিশন ব্রিটিশ বাংলায় কার্যক্রম শুরু করেছিল। অবশ্য এর পূর্বে বাংলায় খ্রিষ্টান ধর্মের সুসমাচার প্রচারে এ মিশনের পরোক্ষ অংশ গ্রহণ ছিল। ডা. আলেকজান্ডার ডাফ্ যখন কোলকাতায় ফ্রি চার্চের সঙ্গে যোগ দিয়ে পৃথকভাবে কাজ শুরু করেন তখন ইংলিশ প্রেসবিটারীয়ান মিশন তাঁর নিকট আর্থিক সাহায্য প্রেরণ করতো। ডা. আলেকজান্ডার ডাফ যে শিক্ষায়তন নির্মাণ করেছিলেন তার জন্য আনুমানিক ৫০ হাজার টাকা (৪০০ পাউন্ড) দান করা হয়েছিল। 
রামপুর বোয়ালিয়ায় ইংলিশ প্রেসবিটারীয়ান মিশনের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন রেভারেন্ড বিহারীলাল সিং। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন ১৮৩১ সালে কলকাতার এক রাজপুত পরিবারে। ১৮৪৩ সালের ১৩ আগস্ট রেভারেন্ড ম্যাকডোনাল্ড কর্তৃক তিনি ব্যাপটিস্ট হয়েছিলেন। রামপুর বোয়ালিয়ায় কাজ শুরুর পূর্বে তিনি ইংল্যান্ডে ছিলেন। এ সময় ইংলিশ প্রেসবিটারীয়ান মিশনের পক্ষ থেকে তাঁকে বাংলায় একটি মিশন খোলার আমন্ত্রণ জানানো হলে এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং ইংল্যান্ড থেকে বাংলায় ফিরে এসে রামপুর বোয়ালিয়ায় বর্তমান মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরেই মিশন খোলেন। সে সময়টা ছিল ১৮৬২ সাল। এখানে এসে তিনি সর্ব প্রথম পাঠশালা খুলতে আরম্ভ করেন। মাত্র দু’বছরের মধ্যে তিনি অনেকগুলো পাঠশালা, একটি উন্নতমানের বিদ্যালয় গৃহ, একটি প্রার্থনা গৃহ ও মিশনারীদের জন্য একটি বাসগৃহ নির্মাণ করেন। 
মাত্র দুবছর বলতে ১৮৬৪ সালের মধ্যেই তিনি এ সব কাজ করতে সমর্থ হন। পাঠশালা বলতে ছোট স্কুল বা সে সময়ের জুনিয়র প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাঠশালার পূর্বে বহু বচন ‘অনেক’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে। তার মানে দুই বা তার চেয়েও বেশি জুনিয়র প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি উন্নতমানের বিদ্যালয় নির্মাণ করেন ১৮৬৪ সালের মধ্যেই। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছেলেদের, না মেয়েদের, না উভয়ের- রেভারেন্ড বারুই স্পষ্ট করেননি। প্রশ্ন হলো এ উন্নতমানের বিদ্যালয় কোনটি? তিনি গ্রন্থের ১৬৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশে অন্যান্য মিশনের মত  প্রেসবিটারীয়ান মিশনও প্রথম হতে শিক্ষা বিস্তার ও শিক্ষার মাধ্যমে ধর্ম প্রচারে মনোযোগী হয়েছিল। রাজশাহী শহরে বালিকাদের জন্য প্রথম উন্নতমানের বিদ্যালয় স্থাপন করে মিশন কর্ত্তৃপক্ষ। এই বিদ্যালয় প্রায় শত বর্ষ কাল শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত থেকে সহরবাসী বালিকাদের শিক্ষাদান করেছিল। কিন্তু সহরে ৫/৬টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এই বিদ্যালয়টি বন্ধ করে কেবল মাত্র মিশন কম্পাউণ্ডে স্থিত উচ্চ প্রাইমারী স্কুলটি চালু রাখা হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদে ১৯৬৭ সালে এই উচ্চ প্রাইমারী বিদ্যালয়ের মান উন্নত করে ইহাকে উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে পরিণত করা হয়েছে। বর্তমান বৎসরে সর্ব প্রথম এই বিদ্যালয় হতে ১৪ জন ছাত্রী ঝ.ঝ.ঈ (এসএসসি) পরীক্ষা দিয়েছিল ইহাদের মধ্যে ১৩ জন ছাত্রী প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে। ডা. মিসেস মালাকার এই বিদ্যালয়টিকে উন্নত করার জন্য অগ্রসর হন। পরে মিশনের সমর্থন ও সাহায্যে ইহাকে উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে উন্নিত করা সম্ভব হয়েছে।’১১১
বর্তমান মিশন কম্পাউন্ডে অবস্থানরত ৬৮ বছর বয়স্ক ডেনিস মনোজ বিশ্বাসের নিকট থেকে ২০১৬ সালের ১২ আগস্ট সন্ধ্যার পূর্বে জানা যায়, মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পূর্ব নাম ছিল বুলনপুর মিশন স্কুল। এ স্কুল ও হেতখাঁর মিশন স্কুল উভয়ই প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। হেতমখাঁর শিক্ষকরা এ কম্পাউন্ডেই থাকতেন। সেখানে এখন কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা থাকে। শিক্ষকরা এখান থেকে পাল্কিতে যাতায়াত করতেন। পাল্কির বেয়ারা ছিলেন কাজীহাটার মরহুম মোসলেম। পাকিস্তান আমলে হেতমখাঁর স্কুল ডাক্তার কাউসারের নিকট বিক্রি করা হয় । ঐ টাকায় এ স্কুলের নতুন ভবন নির্মাণ করে হাই স্কুল করা হয়। এ স্কুলের টিনশেড কক্ষেই হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছিল। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের পাকা জায়গাটা এখনও আছে।
‘বঙ্গীয় খৃষ্ট মণ্ডলীর ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে আরো জানা যায়, ডা. ডোনাল্ড মরিশন ১৮৭৭ সালে রাজশাহী এসে মিশনারীর দায়িত্ব গ্রহণ করে একটি স্কুলগৃহে রোগীদের চিকিৎসা শুরু করেন। এ চিকিৎসা কেন্দ্রটিই পরে খ্রীষ্টিয়ান মিশন হাসপাতালে পরিণত হয়। কোনো স্কুল গৃহে এ হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়েছিল রেভারেন্ড বারুই উল্লেখ করেননি। তবে তাঁর মিশন সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে হাসপাতালের প্রথম কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বর্তমান মিশন কমপ্লেক্সে বা বর্তমান মিশন স্কুলে। ১৯৪৮ সালে বা তার কিছুকাল পর ডা. ইয়ান প্যাট্রিক বিলেত থেকে এসে হাসপাতালের দায়িত্ব গ্রহণের পর হাসপাতালটি ওয়েস্ট মিনিস্টার হোস্টেলে বা বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্রের পশ্চিম পাশে বর্তমান ভবনে স্থানান্তর করেন।১১১ প্রফেসর এসএএ বারী রাজশাহী মহানগরীর চিকিৎসা ব্যবস্থা:অতীত ও বর্তমান প্রবন্ধে এ হাসপাতাল সম্পর্কে লিখেছেন,‘খ্রিষ্টান মিশনারীগণ একটা চিকিৎসালয় চালু করেন ১৯০৫-৬ সালে জজ কোর্টের পূর্ব দিকে, তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাসে। পরে এটাকে উঠিয়ে আনা হয় বর্তমান বেতার কেন্দ্রের পশ্চিমে এবং হাসপাতাল হিসেবে চালু করা হয়।৬৪২ 
শহরের প্রাণকেন্দ্রের উন্নত বালিকা বিদ্যালয়টি ছিল হেতমাখাঁ বড় মসজিদের পিছনে। এখানে বিদ্যালয়ের যাত্রা আরম্ভ হয়েছিল ১৮৬৮ সালে খোন্দকার ওয়সিমুদ্দিন আহম্মদের বাড়িতে। প্রতিষ্ঠার পরবর্তী পর্যায়ে স্কুলের দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়। নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৮৮৮ সালে।৬৩৬ এখনও ভবনটি বিদ্যমান। যার দোতলার অংশে বড় ইংরেজি অক্ষরে লিখা আছে- AD 1888. খোন্দকার ওয়াসিমুদ্দিন আহম্মদের নাতির পুত্র খোন্দকার এনামুল হক তাঁর উৎস সন্ধানে (২০১৩) গ্রন্থের ১০৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, ‘১৮৬৮ সালে খোন্দকার ওয়াসিমুদ্দিন নিজ বাসগৃহে ইংরেজি মিশন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।’ 
এ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, খোন্দকার ওয়াসিমুদ্দিন আহম্মদ ১৮৮৮ সালেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে এ স্কুল প্রাঙ্গণেই কবর দেয়া হয়। পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রী মাজেদা খাতুনের মৃত্যু হলে স্বামীর কবরের পাশেই দাফন করা হয়। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসনের পর পাকিস্তান আমলে সরকারি অনুদানের অভাবে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায় এবং সরকারি সম্পত্তিতে পরিণত হয়। এক সময় এখানে ইউএসআইএস লাইব্রেরি খোলা হয়েছিল। লাইব্রেরিটি অন্য ভবনে স্থানান্তর হলে স্কুল ভবন আবারো পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে সরকারি ইজারা/লিজ গ্রহণের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। ভবনটিতে এখন বাস করছেন প্রয়াত ডাক্তার কাউসারের পরিবার। ৫ মার্চ ২০১৬ তারিখ দুপুরে রাজশাহী সিটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি গবেষক মোহাম্মদ জুলফিকারসহ এ বাড়ির চত্বরে দেখা করি ডা.  মো. কাউসার রহমানের ৫ম সন্তান মো. ফজলে আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর বাবা মো. কাউসার রহমানের সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল টিবি হাসপাতাল। তিনি ছিলেন এক্স-রে বিশেষজ্ঞ। তিনি হেতমখাঁতে ১৯৬২ সালে একটি এক্স-রে মেশিন বসিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে তার পূর্বে রাজশাহী শহরে হয়তো ডা. সুলতান আহম্মদ এক্স-রে মেশিন স্থাপন করেন। মো. কাউসার রহমান ১৯৭০ সালের আগে বা পরে এ বাড়িটি ক্রয় করেন মিশনারীর কাছ থেকে। এ জায়গাটির পরিমাণ প্রায় ২ বিঘা। মো. কাউসার রহমান ১৯৮০ সালের ২৫ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।৬৩৭ ২৭ মার্চ ২০১৬ তারিখে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (তৎকালীন রাজশাহী মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশরেশন) প্রথম মেয়র অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদী জানান, হেতমখাঁ বড় মসজিদের পাশের বাড়িটি ছিল এক সময় আমাদের। সেটা আমার খালার সম্পত্তি ছিল। আমার আব্বা আব্দুল গফুর খালার নিকট থেকে কিনে নিয়েছিলেন। আমার আব্বা মারা যাবার পর স্বাধীনতার আগেই আমরা বাড়িটি ডাক্তার কাউসারের নিকট বিক্রি করে দিয়েছিলাম। ডাক্তার কাউসার সেখানে প্যাথলজি বানিয়েছিলেন। সম্ভবত আমাদের বাড়িটি কেনার আগেই মিশন বালিকা বিদ্যালয়ের ভবনটি কিনেছিলেন। তবে মিশনারী না সরকারের কাছ থেকে জানা নেই। 
W.W Hunter, BA, LLD, A Statistical Account of Bengal, Vol. VIII, Districts of Rajshahi and Bogra গ্রন্থের ৯১ পৃষ্ঠায় মিশন সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন, The Indian Mission of Presbyterian Church has a station at Rampur Beauleah, and another at Nawabgaj. Besides its work of promoting Christianity by direct religious teaching, the Mission maintains four vernacular schools, with an attendance in 1871 of 242 pupils; also an orphanage attended in 1871 by 14 children; and a depository for babies and tracts, which are sold at reduced rates, or distributed gratuitously in cases of poverty. The Rev. Behari Lal Sinh, a native clergyman, presids over the mission, assisted by two educated native ladies, and several outdoor agents. The number of baptisms of converts, since the commencement of the mission in 1862 up to 1871, is reported at about 35. 92পৃষ্ঠায় লিখেছেন , …a female normal school, and a girls’ school at Rampur Beauleah.১১৫ পৃষ্ঠায় গার্লস স্কুল সম্পর্কে লিখেছেন, There are only two girls’ school in Rajshahi District:- one aided by Government, and the other supported from mission funds.১১৫ 
হান্টার ৯১ পৃষ্ঠায় মিশনের রামপুর বুয়ালিয়ায় একটি ও নবাবগঞ্জে আর একটি শাখার কথা বলেছেন এবং ৪ টি ভার্নাকুলার স্কুল পরিচালনার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এ ৪ টি ভার্নাকুলার স্কুলের অবস্থানের ঠিকানা স্পষ্ট করেননি। রাজশাহী মহানগরীতে এ মিশনের ৪ টি স্কুলের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ পর্যন্ত আবিস্কৃত দুটি স্কুলের মধ্যে একটি বর্তমান বুলনপুরে মিশন ক্যাম্পাসে ও অপরটি হেতখাঁয়। হেতমখাঁরটি ১৮৬৮ সালে খোন্দকার ওয়াসিমুদ্দিন নিজ বাসগৃহে স্থাপন করে দিয়েছিলেন বলে উৎস সন্ধানে (২০১৩) গ্রন্থের ১০৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে। তাই অনুমান করা যায় ৪ টি ভার্নাকুলার স্কুলের মধ্যে একটি বর্তমান মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়; যা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল।
 ৯২ পৃষ্ঠায় রামপুর বোয়ালিয়ায় দুটি মেয়েদের স্কুলের এবং ১১৫ পৃষ্ঠায় রাজশাহী জেলায় দুটি মেয়েদের স্কুলের কথা উল্লেখ করেছেন। তৎকালীন রাজশাহী জেলার এলাকা বৃহত্তর রাজশাহী বা তারও বেশি এলাকা নিয়ে ছিল। তাই প্রশ্ন আসে সরকারি সহযোগিতায় পরিচালিত মেয়েদের স্কুলটি কোথায় ছিল? ৯২ পৃষ্ঠায় রামপুর বোয়ালিয়া উল্লেখ থাকায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ২টি বালিকা বিদ্যালয়ই ছিল আজকের রাজশাহী মহানগরী বা সেকালের রামপুর বোয়ালিয়া শহরে। একটি ছিল বর্তমান পিএন সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও অন্যটি হেতমখাঁয় মিশন পরিচালিত বালিকা বিদ্যালয়। সে সময় বর্তমান মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় বালিকা বিদ্যালয় নামে পরিচিতি পায়নি বা বালিকাদের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষা কার্যক্রম ছিলনা। সেখানে কয়েকটি ক্লাশ নিয়ে হয়তো কো এডুকেশন সিস্টেম ছিল। যাকে পাঠশালা বা জুনিয়র প্রাথমিক বিদ্যালয় বলা হয়। দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত এখনও  কো এডুকেশন সিস্টেম বিদ্যমান। পরবর্তীতে শ্রেণি সংখ্যা বৃদ্ধি করে বালিকা বিদ্যালয়ের বিশেষত্ব দেয়া হয় এবং পর্যাক্রমে ১৯৬৭ সালে মাধ্যমিক শ্রেণিতে উন্নীত হয়।
কাজী মোহাম্মদ মিছের রাজশাহীর ইতিহাস গ্রন্থে Calcutta Review No. CXI. January 1873 সূত্রে ১৮৬৮ সালে রামপুর বোয়লিয়াতে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের কথা বলেছেন। Calcutta Review No. CXI. January 1873; The Modern History of the India Chiefs Rajas and Zaminders, Part II. P. 375 সূত্রে বালিকা বিদ্যালয়টিকে বর্তমান পিএন সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অধ্যাপক ফজলুল হক রাজশাহীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (১৮২৫-১৯৫২) প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ..এক সময় দু’টি মিশন বালিকা বিদ্যালয় ছিল। একটিকে বলা হ’তো ‘বড় মিশন’ , আরেকটিকে বলা হ’তো ‘ছোট মিশন’। বর্তমানে যে মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় চালু আছে তা সেকালের ‘ছোট মিশন’।৬৩৮ সেকালের বলতে কোন কাল তিনি উল্লেখ করেননি।  
এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা থাকাকালীন মিনা হেমব্রমের নিকট জানা গিয়েছিল, ১৯৬৭ সালে স্কুলটি নিম্ন মাধ্যমিক ও ১৯৬৯ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। বর্তমানে স্কুলটিতে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কো-এডুকেশন চালু আছে। 
মাহবুব সিদ্দিকীর শহর রাজশাহীর আদিপর্ব গ্রন্থে রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস প্রবন্ধে ফজর আলি খাঁন (১৮৯৫-১৯৮০) লিখেছেন, ‘সদর দপ্তর রাজশাহীতে স্থানান্তরিত হইতে পুলিশ লাইনের নিকট অনুমান ১৫০ বৎসর হইল খৃষ্টানদের Protestant গীর্জা স্থাপিত হয় এবং তৎসহ মিসনারি স্কুল, হাসপাল ও মালোপাড়ায় মিশন হল স্থাপিত হয়। হেতমখাঁয় একটি দোতলা বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হয়।’ 
উপরোক্ত তথ্যাদি বলে দিচ্ছে, বর্তমান মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও হেতমখাঁর বিলুপ্ত মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় দুটো পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । উভয়ের জন্ম হয়েছে আঠারো শ সালের ষাটের দশকে। বর্তমানটি স্থাপন হয়েছিল ১৮৬২ থেকে ১৮৬৪ সালের মধ্যে পাঠশালা বা অন্য নামে। সেখানে ছেলে-মেয়ে উভয়ের পড়ার সুযোগ ছিল। পর্যায়ক্রমে তার উন্নতি ঘটে ও বালিকা বিদ্যালয়ের বিশেষত্ব পায়। আর হেতমখাঁর বিলুপ্ত প্রতিষ্ঠানটি বালিকা বিদ্যালয় হিসেবে স্থাপন হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দা খোন্দকার পরিবারের দান সম্পত্তি ও অবকাঠামোতে মিশনারী বিদ্যালয় স্থাপন করেছিল। এ খোন্দকার পরিবারটিও পারস্য থেকে বাংলায় এসেছিল ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। খোন্দকার পারসি শব্দ। যার অর্থ হলো আলেম-ওলামা, ইসলামী বিদ্যায় পারদর্শী ব্যক্তি ও ধর্ম প্রচারক। মিশনারীর উদ্দেশ্যেও ছিল খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষা দান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও ইউরোপীয় বা ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে ভারতীয়দের খ্রিস্টান ধর্মে আকৃষ্টকরণ ছিল সে সময়ের মিশনগুলোর একটা পলিসি। কিন্তু ভারতে এ পলিসি খুব বেশি কার্যকর হয়নি। ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করলেও তেমনভাবে খ্রিস্ট ধর্মে দিক্ষীত হয়নি।৬৩৯
মিশনারীর বর্তমান মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় বা তৎকালীন পাঠশালা ও অন্যান্য সেবামূলক কার্যক্রম সন্তোষজনক বিবেচিত হওয়ার ফলে হয়তো ইসলাম ধর্ম প্রচারক পরিবারের  লোক হয়েও খোন্দকার ওয়াসিমুদ্দিন আহম্মদ মিশনারীকে স্কুল প্রতিষ্ঠায় সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে পিছিয়ে থাকা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আধুনিক শিক্ষায় অগ্রগামী করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তৎকালীন সামাজে বর্ণবাদী চেতনা, হিন্দু জমিদার কর্তৃক পিএন স্কুল স্থাপনও খোন্দকার পরিবারটিকে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রভাবিত করতে পারে।