ফিরে যেতে চান

রাজশাহী সরকারি মাদ্রাসা১

রাজশাহী সরকারি মাদ্রাসার বর্তমান প্রাচীন ভবন (উত্তরমুখী, কেন্দ্রীয় কারাগারের পূর্বে)

রাজশাহীর রাজা-জমিদার ও সমাজ সচেতন ব্যক্তিগণ ইংরেজি উচ্চ শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠা করে যেমন মহতের পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি এখানকার আরবি, ফারসি,উর্দু ভাষা এবং সাহিত্যের উচ্চ শিক্ষার জন্য রাজশাহীর আলেম সম্প্রদায় ও উৎসাহী ব্যক্তিগণ ১৮৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে দর্সে নিজামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা নির্মাণ করে বিদ্যানুরাগীর পরিচয় দেন। কিন্তু  সরকারি অফিস-আদালতে চাকুরি লাভের আশায় মুসলমান ছাত্রগণ ইংরেজি স্কুল-কলেজে পড়াশোনায় বেশি উৎসাহী হয়ে ওঠে। যার কারণে ১৮৮৩ সালে সিনিয়র মাদ্রাসা জুনিয়র মাদ্রাসায় পরিণত হয়। কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসা ও হুগলী মাদ্রাসা ব্যতীত বাংলার অন্যান্য আরবি শিক্ষা প্রতিষ্ঠিানগুলোর একই অবস্থা ঘটেছিল। ফলে মাদ্রাসাগুলোই আরবি শিক্ষার কিছু কারিকুলাম পরিবর্তন করে ইংরেজিকে শিক্ষার মাধ্যম করে একটি নতুন কারিকুলাম ঘোষণা করা হয়েছিল। ১৯৩০ সালে বাংলা সরকারের নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী রাজশাহী মাদ্রাসা হাই মাদ্রাসায় পরিবর্তিত হয়। 
বর্তমান রাজশাহী কলেজ চত্বরে এ মাদ্রাসার দুটি ভবন বিদ্যমান। একটি ছিল মাদ্রাসার একাডেমিক ভবন। যা ১৮৮৪ সালে নির্মিত হয়েছিল। বর্তমান ভবনটি হাজী মোহাম্মদ মহসীন ভবন নাম দেয়া হয়েছে। অপরটি ফুলার হোস্টেল। মাদ্রাসার একাডেমিক ভবন ১৮৮৪ সালে নির্মাণের তথ্য পাওয়া গেলেও ১৮৭৪ সালে মাদ্রাসাটি কোথায় শুরু হয়েছিল, তার অবকাঠামো কেমন ছিল- সে সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এর জন্য আরো অনুসন্ধানের প্রয়োজন।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে এ মাদ্রাসা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ১৮৭৪ থেকে ১৮৮৩ পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল দরসে নিজামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, ১৮৮৩ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত দরসে নিজামিরা জুনিয়র মাদ্রাসা, ১৯১৪ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত রাজশাহী সরকারী মাদ্রাসা, ১৯৩০ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত রাজশাহী হাই মাদ্রাসা এবং ১৯৬০ সালে নামকরণ হয় রাজশাহী সরকারী মাদ্রাসা। মাদ্রাসা নাম হলেও এ প্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষকরা বলছেন, এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাদ্রাসা শব্দটি সংযুক্ত থাকার কারণে ছাত্র ভর্তি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিভিন্ন ধরনের বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়। তাই ‘হাজী মুহম্মদ মহসীন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নামকরণের প্রচেষ্টা চলছে। এ উদ্দেশ্যে মহানগরীরর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ৭ অক্টোবর ২০১২ তারিখ রোববার বিকেলে এ প্রতিষ্ঠানের উত্তর পাশের নতুন ভবনের একটি কক্ষে সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি জেলা প্রশাসক আব্দুল হান্নানের সভাপেিত্ব এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, সাবেক মেয়র মো. মিজানুর রহমান মিনু। অন্যান্যদের মধ্যে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর তানবিরুল আলম, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার উপ পরিচালক অরুন কুমার সরকার, এ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আফজাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।৩১৮
দানশীল হাজী মুহাম্মদ মুহসিনের দানে এ মাদ্রাসার ছাত্রদের মাসিক বেতন ছিল মাত্র এক টাকা পাঁচ আনা। রাজশাহী কলেজ হতে মাদ্রাসা ভবনটি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের পূর্ব পাশে স্থানান্তর করা হয়। এ ভবনটি রাজশাহী ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ারের আবাসিক কুঠি ছিল। মাদ্রাসার প্রথম সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন বিখ্যাত ইসলাম শিক্ষাবিদ ও পণ্ডিত মওলানা আব্দুল কাদির। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন হয়েছিল। তিনি শামসুল ওলামায়ে বাঙ্গালা উপাধি লাভ করেছিলেন। 
রাজশাহী কলেজ চত্বরে রাজশাহী মাদ্রাসার আদি ছাত্রাবাসটি অবস্থিত। এটা ফুলার হোস্টেল নামে পরিচিত। বর্তমানে এটা কলেজ কর্তৃপক্ষের অন্তর্ভুক্ত। ১৯০৯ সালে স্থাপন হয়েছিল ফুলার হোস্টেল। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক খান বাহাদুর আহসান উল্লার প্রচেষ্টায় পূর্ববঙ্গ ও আসামের গভর্নর স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার (Sir Bamfylde Fuller)  এর মঞ্জুরকৃত অর্থে হোস্টেলটি নির্মাণ হয়েছিল এবং তাঁর নামানুসারে নাম রাখা হয়েছিল ফুলার হেস্টেল। হেস্টেলটি নির্মাণের জন্য ৭৫ হাজার টাকা মঞ্জুর করা হয়েছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চালু হবার পর এ হোস্টেলই তার প্রথম ছাত্রাবাস হিসেবে ব্যবহার হয়। জেলখানার পূর্ব পাশে মাদ্রাসা স্থানান্তরিত হলে  মাদ্রাসা ভবন ও ফুলার হোস্টেল রাজশাহী কলেজ কর্তৃপক্ষের নিকট চলে আসে।৬৬০ মো. নূরুন্নবী এ হোস্টেলের নাম ফুলার মোহমেডান ছাত্রাবাস উল্লেখ করেন।৬৬১ ফুলার হোস্টেলের সূচনায় রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী মাদ্রাসা ও রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের মুসলমান ছাত্ররা থাকতো।৬৬০  বর্তমানে ফুলার হোস্টেল রাজশাহী কলেজের একাডেমিক ভবন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।৬৬০ 
মাদ্রাসার বিদ্যমান প্রাচীন প্রশাসনিক ভবনটি সংস্কার করা হয়েছে। সংস্কারকৃত ভবনটি ২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা উদ্বোধন করেন (তথ্য: উদ্বোধন লিপি)। মাদ্রাসায় এখন প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়।