ফিরে যেতে চান

রাজশাহী ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমী

রাজশাহী ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমীর প্রধান গেট (উত্তর-পশ্চিমমুখী)

রাজশাহী ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমী বিবি হিন্দু একাডেমী নামে সুপরিচিত। রাজশাহী মহানগরীর তৎকালীন প্রথিতযশা আইনজীবী অনুকূল চন্দ্র চক্রবর্ত্তী ও সুদর্শন চক্রবর্ত্তীর প্রচেষ্টায় এবং চন্দ্র কিশোরের সহযোগিতায় ১৮৯৮ সালের ১২ জুলাই মিয়াপাড়ার রাজশাহী গণগ্রন্থাগার প্রাঙ্গণের ভিতর একটি ঘরে রাজশাহী একাডেমী আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। তবে এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম কয়েক বছর পূর্বেই শুরু হয়েছিল। পণ্ডিত যাদব চন্দ্র চক্রবর্ত্তী সাগরপাড়ার আইনজীবী মহেষচন্দ্র ভট্টাচার্য্যরে বাহির বাড়িতে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে একটি পাঠশালা চালু করেছিলেন। এটি যাদব পণ্ডিতের পাঠশালা নামে পরিচিতি পেয়েছিল। এ পাঠশালাটিই নতুনভাবে বিকশিত হয়ে রাজশাহী একাডেমী নামে বিকশিত হতে আরম্ভ করে।৩০৫ ১৯০০ সালে একাডেমী জামিদার রায় বাহাদুর কুঞ্জ মোহন মৈত্রের ঘোড়মারার বাড়ির একটি অংশে স্থানান্তর হয়। পূর্বে বাড়িটি মাড়োয়ারী দেবীদাস বাবুর ঠাকুরবাড়ি ছিল। কুঞ্জ মোহন মৈত্র বাড়িটি ক্রয় করেছিলেন। একই বছরে একাডেমী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন এবং ছাত্ররা প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছিল। যারা এ একাডেমী থেকে প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন চাঁপাই নবাবগঞ্জের অ্যাডভোকেট রমেশ চন্দ্র বাগচী। নাটোর জেলার খাজুরার সে সময়ের জমিদার জীবন্তীনাথ খাঁ এবং জ্ঞানেন্দ্রনাথ খাঁ একাডেমীকে সুপ্রতিষ্ঠিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ফলে বিদ্যালয়ের পূর্ব নাম পরিবর্তন করে তাঁদের পিতা ভোলানাথ খাঁর নামানুসারে ভোলানাথ একাডেমী রাখা হয়। ১৯০২ সালে চক্রবর্ত্তী ভ্রাতৃদ্বয় মেদিনীপুর জমিদারী কোম্পানীর নিকট থেকে বড়কুঠি অঞ্চলের বেশ কিছু জমি ক্রয় করে ছাত্রাবাসসহ একাডেমীটির বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করেন। ১৯২৯ সালের শেষের দিকে জীবন্তীনাথ খাঁ ও জ্ঞানেন্দ্রনাথ খাঁ একাডেমী পরিচালনার যাবতীয় দায়িত্ব অনুকূল চক্রবর্ত্তী ও তাঁর জীবনাবসানে তাঁর উত্তরাধিকারীদের নিকট অর্পণ করেন। ১৯৩৫ সালে চক্রবর্ত্তী ভাতৃদ্বয় তাঁদের স্বর্গীয় পিতা বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তীর নাম একাডেমীর সঙ্গে যুক্ত করেন। ফলে একাডেমীর নাম হয় ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর একাডেমী। ১৯৩৯ সালে একাডেমী পরিচালক মণ্ডলীর প্রস্তাবানুসারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আজিজুল হকের অনুমোদন লাভ করে একাডেমীর সঙ্গে হিন্দু কথাটি যুক্ত হয়। ফলে এর নাম হয় ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমী। 
১৯২৯ সালে অনুকূল চক্রবর্ত্তী বিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে পরিচালক পরিষদের নিকট অর্পণ করেন। তখন একাডেমীর সম্পাদক ছিলেন মহেন্দ্র কুমার সাহা। ১৯৫১ সালে তিনি পূর্ব দলিল রদ করে কতকগুলো বিধিবদ্ধ শর্তারোপ করে একাডেমী পরিচালনার কর্তৃত্ব পরিচালক মন্ডলীর প্রতিনিধি সম্পাদক অ্যাভোকেট যামিনী কান্ত চক্রবর্তী বরাবর দলিল সম্পাদন করেন। দলিলে উল্লিখিত শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলো:
১.     “রাজশাহী ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমী” নাম ভবিষ্যতে কদাপি কোনো কারণে পরিবর্ত্তিত হইতে পারিবেনা।
২.     “হিন্দু” ধর্ম্ম ব্যতীত অপর কোনোধর্ম্ম সম্বন্ধীয় সভা, সমিতি, উৎসব বা উপাসনা বিদ্যালয় ভবনে হইতে পরিবেনা।
৩.     প্রধানত: হিন্দু ছাত্রদিগের শিক্ষার জন্যই বিদ্যালয় স্থাপিত হইয়াছে এবং হইতে থাকিবে। ছাত্র ভর্ত্তির সময় হিন্দু ছাত্রের জন্য ছাত্র সমষ্টির শতকরা ৯০টি (নব্বইটি) আসন যাহাতে রক্ষিত থাকে তৎ প্রতি বিশেষ দৃষ্টি ও লক্ষ্য রাখিয়া ছাত্র ভর্ত্তির কার্য্য চলিবে। কোনো ক্রমেই তাহার ব্যতিক্রম করিয়া ছাত্র ভর্ত্তি চলিবে না।
১৯৪৯-১৯৫০ সালে ভারত থেকে আগত শরণার্থীদের আশ্রয়ের জন্য সরকার একাডেমী ভবনটিকে গ্রহণ করে। তখন লোকনাথ হাই স্কুলে মর্নিং শিফটে একাডেমী চালু করা হয়। কিছুদিন পর সরকার ভবন ছেড়ে দিলে একাডেমী আবার স্বভবনে ফিরে আসে। কিন্তু ১৯৫২ সালে সরকার হুকুম দখল করে নেয়। ফলে একাডেমীকে আবারো লোকনাথ হাই স্কুলেই প্রাণ বাঁচাতে হয়। এ দুরাবস্থায় একাডেমীর তৎকালীন সম্পাদক যামিনীকান্ত চক্রবর্ত্তী, অ্যাডভোকেট বীরেন্দ্রনাথ সরকার, ভুবন মোহন মৈত্রের পুত্র সত্যেন মোহন মৈত্র, প্রভাষ চন্দ্র লাহিড়ীর প্রচেষ্টা (সাবেক প্রাদেশিক অর্থমন্ত্রী) ও জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায় কালিনাথ মুখার্জ্জি (বেচু বাবু) এর সাগরপাড়ার দ্বিতল ভবনটিকে ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসে ভাড়া নেয়া হয়। বাড়িটির প্রয়োজনীয় সংস্কারের পর ১৯৫৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি লোকনাথ হাই স্কুল থেকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়। একাডেমীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রস্তাবের ভিত্তিতে একাডেমীর তৎকালীন সভাপতি ও জেলা প্রশাসক খন্দকার আসাদ-উদ-জামান ১৯৭১ সালে ভবনটির অধিগ্রহণের সার্বিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পর তাঁর কয়েকটি বিভাগ একাডেমীর নিজস্ব ভবনে (বড় কুঠি এলাকা) চালু করা হয়েছিল। তার ভাড়া বাবদ বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমীকে মাসিক ৩৫০০/- টাকা দিত।৩০৬ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম লাইব্রেরিও এখানে চালু করা হয়েছিল। ভাড়া বন্দোবস্তে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রাবাস হিসাবেও ভবনটি ব্যবহার হয়েছে।৩০৫
২০১৩ সালের আগস্টে দেখা যায় জরাজীর্ণ এ ভবনে ছিন্নমূল মানুষরাই বসবাস করছেন। ২৫ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে একাডেমীর সহকারী প্রধান শিক্ষক অনল কুমার মণ্ডলের তথ্যানুসারে ভবনটি নিয়ে একাডেমীর সঙ্গে সরকারের মামলা চলছে। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্রনাথ সরকারের নিকট থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বর্তমান সাগরপাড়া একাডেমী ভবনের জমির পরিমাণ ০.৯৭ একর। শিশু হতে মাধ্যমিক পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা প্রদান করা হয়। এর প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন চন্দ্রকান্ত সেন। বর্তমানে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ১৩০০ জন ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়ন করে। যার মধ্যে প্রায় ৪০% মুসলমান। পুরনো বড়কুঠির পুরনো ভবনটি সরকার ১৯৮২/১৯৮৩ সালে শক্র সম্পত্তিতে পরিণত করে। সেখানে এখন বাস করছেন ভারত থেকে আসা ও স্থানীয় উদ্বাস্তু মানুষ। ভবনটিকে নিয়ে সরকারের সঙ্গে একাডেমীর মামলা চলছে।৩৪০