ফিরে যেতে চান

পূর্বের শিল্প-বাণিজ্যিক অবস্থান ম্লান হয়ে গেলেও রাজশাহী আজও শিক্ষানগরী হিসেবে খ্যাত। বর্তমান বাংলাদেশের সীমানায় আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার গোড়ার পত্তন হয় ১৮২৮ সালে ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এ ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান নাম রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল। ইংরেজ আমল থেকে কালক্রমে শিক্ষানগরী রাজশাহীতে গড়ে উঠেছে বেশ কটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দেশের সমগ্র অঞ্চল ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা বিদ্যা অন্বেষণের মহৎ ইচ্ছায় এ নগরীতে পদার্পণ করে। ফলে অনানুষ্ঠানিকভাবে রাজশাহী শিক্ষানগরী বিশেষণে পরিচিত হয়ে ওঠে। নগরীর এ গৌরবের পশ্চাতে আছে অনেক মনীষী ও বিদ্যোতসাহী সমাজ সেবকের অবদান।
বাংলায় ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন সূচনার প্রায় সত্তর বছর পর রাজশাহীতে আধুনিক শিক্ষার গোড়াপত্তন হয়। তার পূর্বে মোগল বা স্থানীয় মুসলিম শাসনের প্রভাবে বিভিন্ন মক্তব-মসজিদে আরবি, ফারসি ভাষা এবং কোরআন-হাদিস শিক্ষার প্রচলন ছিল। তাও ছিল সীমিত পর্যায়ে। দরগাপাড়ায় শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর মসজিদে ও হাতেমখাঁর ওয়াহাবী মসজিদের (হেতেমাঁ বড় মসজিদ) মক্তবে মুসলমান ছেলে-মেয়েদের আরবি, ফারসি ও কোরআন-হাদিস শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। মেহেদীপুর (লক্ষ্মীপুর), কাদিরগঞ্জ ও সাহেব বাজার মসজিদও অনুদর্স শিক্ষা দেয়া হতো।১ তখন এখানে হিন্দুদের শিক্ষা-দীক্ষার তেমন ব্যবস্থা ছিল না।১ ১৮২৮ সালে ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলেও মুসলমানরা তার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেনি। রাজশাহী জেলার সদর নাটোরকে কেন্দ্র করেই চারপাশে গড়ে উঠেছিল টোল ও বঙ্গভাষা শিক্ষার জন্য কিছু প্রাইভেট বিদ্যালয়। রাজা ও জমিদারদের অর্থায়নে ঐ সব বিদ্যালয়ে ব্যয় করা হতো। তখন রাজশাহী মহানগরীতে (বোয়ালিয়া) অধিকাংশই বিভিন্ন স্থানের হিন্দু ব্যবসায়ীদের বসবাস ছিল। স্থানীয় হিন্দুদের অধিকাংশই গরিব ছিল। সপুরার মাদ্রাসা হিসাব, ব্যকরণ প্রভৃতি শিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। বহু দূর থেকে ছাত্ররা এখানে পড়াশুনা করতে আসত।
নূরুল ইসলাম খানের সম্পাদনায় ১৯৯১ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর রাজশাহী গ্রন্থের ২৮৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, প্রাচীনকালে স্থানীয় ব্যবস্থাধীনে পাঠশালা, চণ্ডীমন্ডপ এবং গুরুগৃহে শিক্ষা দেয়া হতো। সুলতানী আমলে বহু শিক্ষিত মুসলমান ও অমুসলমান পণ্ডিত সমাজে শিক্ষার ও সংস্কৃতি প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি বহিরাগত ও স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলমানদের নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠে। মুসলিমদের এ শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল মোটামুটি মসজিদ কেন্দ্রিক। অতীতে রাজশাহী জেলাতেও খুব সম্ভব এ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সাধারণভাবে আরবি-ফারসি শিক্ষার ব্যবস্থাও ছিল। সেই সঙ্গে মক্তব বা পাঠশালা জাতীয় প্রতিষ্ঠানে বাংলা, সংস্কৃত, গণিত ইত্যাদি বিষয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল। তাতে হিন্দু মুসলমান সবাই শিক্ষা গ্রহণ করতো। গুরুগৃহে শিক্ষাদানের ব্যবস্থাও ছিল। 
ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নাটোর, দিঘাপাতিয়া, পুঠিয়া, তাহিরপুর, দুবলহাটি, কাশিমপুরের জমিদারেরা রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে আবাসিক কুঠি স্থাপন করে। ফলে তাঁরা তাদের ছেলে-মেয়েকে ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজন অনুভব করে তৎকালীন বোয়ালিয়ায় ইংলিশ স্কুল স্থাপনের মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষার প্রচলন ঘটায়।