ফিরে যেতে চান

দেশের প্রথম শহীদ মিনার শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ

দেশের প্রথম শহীদ মিনার শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবগত রাতে রাজশাহী কলেজ নিউ হোস্টেল প্রাঙ্গণের স্মৃতি স্তম্ভ(বিলুপ্ত)

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবগত রাতে রাজশাহী কলেজ নিউ হোস্টেল প্রাঙ্গণের
বিলুপ্ত স্মৃতি স্তম্ভের স্থানে নির্মিত শ্রদ্ধাস্মারক

শহীদ ভাষা সৈনিকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির দিবাগত রাতেই রাজশাহী কলেজ চত্বরে অবস্থিত নিউ হোস্টেলের উত্তর পাশে শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ নামে দেশের প্রথম শাহীদ মিনার নির্মিত হয়েছিল বলে রাজশাহীর ভাষা সৈনিকেরা দাবি করে আসছেন। ভাষাসৈনিক ও সাংবাদিক সাইদ উদ্দিন আহমদ তাঁর বাটার মোড়ের পাশের বাড়িতে আমাকে বলেছিলেন যে, শহীদ ভাষা সৈনিকদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে রাজশাহীতেই সর্ব প্রথম শহীদ মিনার তৈরি হয়েছিল। তবে শহীদ মিনার বা এর কোন মডেল স¤পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিলনা বলে জালিয়ানাবাগের স্মৃতি স্তম্ভের অনুসরণে এর নাম দেয়া হয়েছিল ‘শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ’। শহীদ স্মৃতি স্তম্ভের প্রেক্ষাপট স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী আমরাও রাজশাহীতে যথারীতি আন্দোলন করছিলাম। সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ছিলনা বলে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের নির্বিচারের গুলিতে ছাত্র হত্যার খবর আসতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। খবর পৌঁছানো মাত্র রাজশাহী শহরের সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী মেডিকেল স্কুল (বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) এর আন্দোলনরত ছাত্রদের রক্তে জ্বলে উঠল আগুন। সন্ধ্যার পর তারা রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেলে এক সভায় মিলিত হলো। আন্দোলনকে আরো বেগবান করার লক্ষ্যে সভায় গঠন করা হল ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। রাজশাহী মেডিকেল স্কুলের ছাত্র এস.এম.এ গাফ্ফারকে সভাপতি এবং রাজশাহী কলেজের ছাত্র গোলাম আরিফ টিপু ও হাবিবুর রহমানকে যুগ্ম স¤পাদক করা হয়। সাইদ উদ্দিন আহমদও ছিলেন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য। অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে যাদের নাম তিনি উল্লেখ করেন তারা হলেন- আব্দুর রহমান, আবুল কালাম চৌধুরী, মো. আনসার আলী, ওয়াহিদুল হক দুলু, মহসীন প্রামাণিক, এল.আর মল্লিক ডলার, আবুল হোসেন, জামাল উদ্দিন, আব্দুর রাজ্জাক খান চৌধুরী, শফিউল আলম, মোহসেনা বেগম, আনোয়ারুল আজীম, মমতাজ উদ্দীন আহমদ, আবু সাঈদ, মহিউদ্দিন আহম্মদ, মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি। (এই ভাষা সৈনিকেরা অনেকেই পরলোক গমন করেছেন, অনেকে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন)।১১২
উক্ত সভায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পর পরই ঢাকায় ভাষা শহীদ ভাইদের উদ্দেশ্যে স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং নিউ হোস্টেলের উত্তরে অবস্থিত প্রধান ফটকের ১০/১৫ গজ অভ্যন্তরে ভাষা সৈনিকেরা ইট আর কাদা দিয়ে নির্মাণ কাজ শুরু করে দিল। নির্মাণ শেষ হতে সকাল হয়ে গিয়েছিল। ঢাকায় পুলিশের গুলি কতজন ভাষা সৈনিকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল তার সঠিক সংখ্যা তখনও না পৌঁছানোর কারণে আনুমানিক সাত জন ধরে চতুস্কোণ আকৃতির এ মিনারের সাতটি ধাপ তৈরি করা হয়েছিল। নিচের ধাপটি ছিল সবচেয়ে বড়। তারপর ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে শীর্ষে উঠেছিল। শহীদদের উদ্দেশ্যে নির্মিত স্থাপনার নাম কি হবে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় পূর্বে উল্লিখিত ভাবনা থেকে এর নাম দেয়া হয়েছিল ‘শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ’ এবং গায়ে তা লিখে দেয়া হয়েছিল। গায়ের আর এক পাশে লেখা হয়েছিল কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতার চারটি লাইন, “উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।” শহীদ স্মৃতি স্তম্ভের পাশে উড়ানো হয়েছিল কালো পতাকা। সেদিনই অর্থাৎ বায়ান্নোর ২২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর ভাষা সৈনিকেরা মাতৃভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে ও ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে যখন অগ্নি মশালের মত উদ্গিরণ হচ্ছিল তখন বেলা প্রায় ১০টা থেকে ১১টার দিকে রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেল প্রাঙ্গণে সদ্য নির্মিত শহীদ স্মৃতি স্তম্ভটি একদল পুলিশ গুড়িয়ে দিয়েছিল। 

ভাষা শহীদদের স্মৃতিকে অক্ষয় করে রাখবার বাসনায় রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ নামে প্রথম শহীদ মিনার গড়ে তোলা হয়েছিল তার যথেষ্ট প্রমাণ মিলে। কারণ ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার তৈরির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল বায়ান্নো সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে এবং ২৩ ফেব্রুয়ারির বিকেল থেকে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এ প্রসঙ্গে বশীর আল হেলালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থের ৪২৯ পৃষ্ঠায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অন্যতম পরিকল্পক ডা. সাইদ হায়দারের উদ্ধৃতি দেয়া যায়। তিনি লিখেছেন  “... ২২ ফেব্রুয়ারি রাত থেকেই শহীদ মিনার তৈরির পরিকল্পনা নেয়া হয়। ... ২৩ তারিখ বিকেল থেকে শুরু করে সারা রাত সেখানে কাজ হয়। শহীদ শফিকুর (শফিউর হবে) রহমানের পিতাকে এনে ২৪ ফেব্রুয়ারি মিনারটি উদ্বোধন করা হয়েছিল। আমি সেখানে ছিলাম”। ড. রফিকুল ইসলামের মত হচ্ছে- ‘সাইদ হায়দারের নকশায় ও বদরুল আলমের মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারটি ২৪শে ফেব্রুয়ারি সকালে শহীদ শফিউর রহমানের পিতা আর ২৬শে ফেব্রুয়ারি সকালে আবুল কালাম শামসুদ্দীন উদ্বোধন করেছিলেন ...।১০০ ভাষা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এমআর আখতার মুকুল তার একুশের দলিল গ্রন্থে বলেছেন, ‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের এ প্রথম শহীদ মিনার মোট দুইবার উদ্বোধন করা হয়েছিল। প্রথম বার ২৪ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেছিলেন শহীদ শফিউর রহমানের পিতা ঢাকার লক্ষ্মী বাজার নিবাসী মৌলভী মাহবুবুর রহমান। দ্বিতীয় বার ২৬ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেছিলেন দৈনিক আজাদের স¤পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন।১০০ 
বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ বিষয়ে প্রয়াত বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সমাজ সেবক ও ভাষা সৈনিক এ্যাডভোকেট মহসীন প্রামাণিকের উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে। তিনি বলেছেন, ... ২১শে ফেব্রুয়ারি দিন গত সারারাত ধরে আমরা ইট ও কাদা দিয়ে নিউ মুসলিম হোস্টেলের মেইন গেটের সামনে হোস্টেলের অভ্যন্তরে একটা শহীদ মিনার নির্মাণ করি এবং সকাল ৭টার দিকে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। .. ২২শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে যখন ছাত্ররা পিকেটিং করার জন্য বেরিয়ে গেছে সেই সময় পুলিশ বাহিনী এসে মিনারটি গুঁড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনারের ফটোটা আমি অনেক কষ্টে বাঁচিয়ে রেখেছি।১০০ বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এ্যাডভোকেট সৈয়দ আমীর হোসেন স্পেন স্মৃতিচারণে বলেন, আমি রাত্রি ৮/৯টার পরে নিউ হোস্টেলের গেটের কাছে আসতেই থমথমে ভাব দেখলাম। ... কতগুলি ইট দিয়ে নিউ হোস্টেলের গেটের কাছে শহীদ মিনার তৈরি হচেছ।১০০ 
গবেষকদের আলোচনায় ও ভাষা সৈনিকদের মতের ভিত্তিতে আমাদের কাছে পরিষ্কার দেশের সর্বপ্রথম শহীদ মিনারটি তৈরি হয়েছিল রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেল প্রাঙ্গণে এবং কয়েক ঘন্টা স্থায়ী থেকে অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বেলা ১০/১১টার দিকে পুলিশ বাহিনী সেটা ভেঙ্গে ফেলার পর সেখানে আর স্থাপিত হয়নি। 
ঐ স্থানে প্রথম শহীদ মিনারের একটি মডেল স্থাপন করা হয়েছে। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ভিত্তিপ্রস্তরে উল্লেখ আছে- মহান ভাষা আন্দোলনে নির্মিত প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ (তৎকালীন সরকারি প্রশাসন কর্তৃক ভেঙ্গে ফেলা হয়) স্মরণে শ্রদ্ধাস্মারক। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন: মেয়র এএইচএম থায়রুজ্জামান (লিটন), মাননীয় মেয়র, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন। তারিখ ৭ ফাল্গুন ১৪১৫বঙ্গাব্দ/১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ।