ফিরে যেতে চান

যতীন্দ্র নাথ বন্দোপাধ্যায় এর মূর্তি

যতীন্দ্র নাথ বন্দোপাধ্যায় এর মূর্তি

যতীন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এর আবক্ষ মূর্তি রাজশাহীর একটি উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য ও মানুষের জন্য মানুষের ত্যাগের দৃষ্টান্ত। মূর্তিটির উচ্চতা ২৪ ইঞ্চি, প্রস্থ ২১ ইঞ্চি, পরিধি ৪৬ ইঞ্চি। নির্মাতা শিল্পীর নাম জানা যায় না। নির্মাণ হয়েছিল কলকাতায়। মূর্তিটির বেদির শিলালিপি অনুসারে বাংলা ১৩২৩ সালের ১২ পৌষ প্রায় ডুবন্ত দুজন মহিলাকে উদ্ধার করতে গিয়ে পদ্মাগর্ভে আত্মবিসর্জন দিতে হয় মহৎপ্রাণ যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তৎকালীন সময়ে লিখিত তাঁর বিস্তারিত বিবরণও পাওয়া যায় না। আবক্ষ মূর্তির সঙ্গে শিলালিপি ও রাজশাহী শহরের প্রবীণ ব্যক্তিদের মুখে তাঁর মহানুভবতার ঘটনা ও জীবন ইতিহাসের অংশ বিশেষ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিলালিপিতে উল্লেখ আছে-

যতীন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এম-এ-বি-এল

পদ্মাগর্ভে নিমজ্জমানা নারীদ্বয়ের বিপন্ন অবস্থা দর্শনে তাঁহাদের প্রাণরক্ষার নিমিত্ত তদ্দণ্ডে আত্মপ্রাণ তুচ্ছ করিয়া পদ্মাবক্ষে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিলেন এবং তাঁহাদের উদ্ধার সাধন করিয়া স্বয়ং পদ্মাগর্ভে নিমজ্জিত ও অন্তর্হিত হইয়া অনন্তের ক্রোড়ে আশ্রয় লাভ করিয়াছেন।

জন্ম- ১৬ই বৈশাখ, ১২৯৫
মৃত্যু-১২ই পৌষ, ১৩২৩

যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও শিলালিপি

জানা যায়, যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতৃনিবাস ছিল রাজশাহী মহানগরীর মাস্টারপাড়া। তিনি উচ্চ ডিগ্রি লাভের উদ্দেশ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে এমএ বিএল করেন। পড়াশোনা শেষ করেই তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। শোনা যায়, বাড়ি ফেরার পরের দিনই তিনি পদ্মার তীরে অবস্থিত বড়কুঠির পার্শ্ববর্তী ঘাটে স্নান করতে যান। তখন পদ্মা গর্ভে নিমজ্জমানা দুজন নারী উদ্ধারে নৈতিক দায়িত্ববোধে শিউরে ওঠেন তরুণ যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। অসহায় ডুবন্ত দুজন নারীর প্রাণ রক্ষার জন্য পদ্মাবক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নারীদ্বয় উদ্ধারে সমর্থ হন। আর তিনি নিজে পদ্মার গহীনে অন্তর্হিত হয়ে অনন্তের কোলে আশ্রয় লাভ করেন। পদ্মায় অনেক খোঁজাখুঁজির পর যে যতীন্দ্রনাথকে পাওয়া গিয়েছিল তা প্রাণহীন লাশ। মানবতাবাদের এমন দৃষ্টান্ত অটুট রাখার উদ্দেশ্য উদ্বারপ্রাপ্তা নারীদ্বয়ের চিরকৃতজ্ঞ পরিবার যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি আবক্ষ মূর্তি তৈরি করে নিয়ে আসেন কলকাতা থেকে। মূর্তিটি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত সোনাদিঘির পূর্বপাড়ে স্থাপন করা হয়েছিল। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ সোনাদিঘির পূর্বপাড় ঘেঁষে মার্কেট নির্মাণ করার ফলে মূর্তিটিকে সেখান থেকে স্থানান্তর করা হয়েছিল পুরনো সিটি ভবনের প্রধান গেট সংলগ্ন পূর্বপাশে। পুনঃস্থাপনের তারিখ ছিল ১৩৯৭ সালের ২৯ চৈত্র/ ১৯৯১ সালের ১৩ এপ্রিল। রাজশাহী সিটি সেন্টার নির্মাণের জন্য পুরনো সিটি ভবন ভাঙার কাজ শুরু হলে মূর্তিটিকে সেখান থেকে সরিয়ে এনে বর্তমান গ্রেটার রোডের নতুন সিটি ভবনের প্রস্তাবিত রাজশাহী সিটি মিউজিয়ামের ২১১ নং কক্ষে রাখা হয়। ১৪ অক্টোবর ২০০৯ তারিখে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ও এনা প্রপার্টিজ লি. এর সঙ্গে সিটি সেন্টার নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর ও ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে পুরনো সিটি ভবন ভেঙ্গে রাজশাহী সিটি সেন্টার নামে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কাজ অব্যাহত আছে।  
মানবতাবাদে আত্মত্যাগী যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বংশীয়দের খোঁজ মেলে না। প্রবীণদের মতে, ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বিভাজনের পরপরই তারা সপরিবারে ভারত গমন করেন। ২০০০ সালের মে মাসে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে মাস্টারপাড়ার জরাজীর্ণ বাড়িতে বাস করতেন মরহুম এডভোকেট খাদেম সাহেবের পরিবার।৭৪৫