ফিরে যেতে চান

এমরান আলী সরকার২০২

এমরান আলী সরকার রাজশাহী মহানগরীর রামচন্দ্রপুরে বাংলা ১৩১৯ সালের ৪ ফাল্গুন/১৯১৩ সালের ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ইয়াকুব আলী সরকার ছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী। সাহেব বাজারে তার দোকান ছিল। দোকানটি বর্তমানে তার ছেলে- ভাতিজারা চালান। এমরান আলীর জন্মের পর ১৯১৩ সালেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মা ময়মুননেসা ছিলেন গৃহিনী। রামচন্দ্রপুরের পূর্বে তাঁদের বাড়ি ছিল নগরীর পদ্মার পাড় খরবোনায়। বাড়িটি পদ্মায় ভাঙ্গার কারণে রামচন্দ্রপুরে চলে আসেন। এমরান আলী সরকারের লেখাপড়া শুরু হয় সোনাদীঘি মোড়ের পাঠাশালায়। পাঠশালাটি বর্তমানে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মসজিদ। এরপর লোকনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫ম বা ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেখান থেকেই ১৯৩১ সালে ম্যাট্রিক পাস করে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন। রাজশাহী কলেজে ১৯৩৪ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর বিএ পড়াশুনা করলেও পরীক্ষা দেননি। তার পেশা জীবন শুরু হয় মালদা জজ আদালতের অস্থায়ী ক্লার্ক হিসেবে। ১৯৩৭ বা ১৯৩৮(?) সালে তিনি এ চাকরিতে যোগ দেন (তখন রাজশাহী ও মালদার জজ একজনই ছিলেন)। চাকুরিটি অস্থায়ী হওয়ায় কিছুদিন পরই তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৯৪০(?) সালের দিকে রাজশাহীতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগে সহকারী পরিচালকের দপ্তরে ২য় ক্লার্কের চাকুরি পান। যোগদানের প্রায় ৬ মাস পরই পদোন্নতি পেয়ে হেড ক্লার্ক হন। তখন সহকারী পরিচালক ছিলেন ড. ফহিম উদ্দিন। ড. ফহিমের মেজাজী ও রুঢ় আচরণের জন্য অভিমানী এমরান আলী একবার চাকুরিতে ইস্তফা দেন। কিন্তু তার অব্যাহতি পত্র অফিস গ্রহণ না করায় তিনি আবারো যোগদান করেন। জনস্বাস্থ্য বিভাগে যোগদানের কিছুদিন পরই ১৯৪০ (?) সালের দিকে তিনি বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম আমেনা বেগম। আমেনা গৃহিণী।
এমরান আলী সরকারের রাজনীতি জীবনটা শুরু হয় অনেকটা অশনি সংকেতের মতই। বিয়ে করার কিছুদিন পরই তিনি তৎকালীন ভয়াবহ রোগ টিবিতে (যক্ষা) আক্রান্ত হন এবং শ্বশুরের সহযোগিতায় পশ্চিম বাংলার যাদবপুর টিবি হাসপাতালে ভর্তি হন। ঐ হাসপাতালে রোগীদের রিক্রিয়েশনের জন্য একটি ক্লাব ছিল। রোগীরাই নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে কমিটি গঠন করে ঐ ক্লাব পরিচালনা করতেন। তিনি যে সময় ঐ হাসপাতালে ভর্তি হন তখন পর্যন্ত রিক্রিয়েশন ক্লাবের সবাই হিন্দু নেতা নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। এমরান আলীর কৌশলে প্রথমবারের মত সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত হন দিনাজপুরের মকবুল হক নামক এক মুসলমান। বিষয়টি তৎকালীন অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগের সেক্রেটারী আনোয়ার হোসেনের চোখে পড়ে। আনোয়ারও তখন যাদবপুর টিবি হাসপাতালের রোগী ছিলেন। এ ঘটনার পর আনোয়ারের সঙ্গে এমরান আলীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠে। এমরান আলী সুস্থ হয়ে যাদবপুর থেকে বাড়ি আসার কিছুদিন পরই একটি টেলিগ্রাম আসে। টেলিগ্রামে আনোয়ার কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউটে পার্টির মিটিং-এ যোগদানের জন্য আহ্বান জানান। তিনি যথা সময়ে কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউটে উপস্থিত হন। এভাবেই তিনি রাজনীতিতে পদার্পণ করেন এবং মুসলিম লীগ ন্যাশনাল গার্ডের ট্রেনিং নেন। তিনি অল বেঙ্গল মুসলিম লীগের কাউন্সিলর ছাড়াও রাজশাহী জেলার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ-ভাসানী) যোগদেন। স্বাধীনের সময় ন্যাপের রাজশাহী জেলার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিএনপি-তে যোগদানের পূর্বে এ পার্টিতেই ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও রাজশাহী জেলার প্রথম সাধারণ সম্পাদক। ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৮২ তারিখ পর্যন্ত রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে পাঁচ বছর ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ই ১৯৭৯ সালে সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে পবা-বোয়ালিয়া আসনের ২য় জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হন। তাঁর ভাষায় জিয়ার মৃত্যুর পর জেনারেল এরশাদের চাপে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার তাঁকে মন্ত্রী পরিষদ থেকে বাদ দেন। যোগ্যতার বলে তিনি বিএনপি’র স্ট্যান্ডিং কমিটির মেম্বার হয়েছিলেন। ১৬ অক্টোবর ২০০৫ তারিখে তার সাক্ষাৎকালীন সময়ও তিনি বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। রাজনীতি শুরুর পর তিনি হয়ত চাকুরি ছেড়ে দেন অথবা টিবিতে আক্রান্ত হওয়ার ফলে বেশ কিছুদিন অনুপস্থিতির কারণে তার চাকরি চলে যায়। কারণ তিনি রাজশাহী জজ আদালতে মোক্তার হিসেবে আইন পেশায় যোগদান করেন।
এমরান আলী সরকার ৬ ছেলে ও ৫ মেয়ের জনক। সন্তানসমূহ যথাক্রমে সুলতানা বেগম বেনু, দিলরুবা আলম, দিল আফরোজা বেগম, আমিনুর রহমান বাবু, আশরাফ জামাল আব্বু, শওকত কামাল সরকার, দিল আরা বেগম, শামসুদ্দিন হায়দার, লায়লা আরজুমান বানু, আনোয়ার জাহিদ ও মো. ফজলে রাব্বি। এমরান আলী সরকার ২০০৭ সালের ১২ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।৬৭৩
[১৬ অক্টোবর ২০০৫ তারিখে রামচন্দ্রপুরের বাড়িতে এমরান আলী সরকারের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। তখন জীবনের অনেক ঘটনাই স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। কোনটার সঠিক তথ্য দিতে সক্ষম হয়েছেন। কোনটার বিষয়ে তিনি নিজেই বিভ্রান্তের মধ্যে পড়েছেন। এজন্য অনেক জায়গা (?) চিহ্ন রাখা হয়েছে তাঁর মতামত অনুসারে।]