ফিরে যেতে চান

ময়েন উদ্দীন আহামেদ মানিক২০৭

গণতান্ত্রিক চেতনার ধারক মুক্তিযোদ্ধা ময়েন উদ্দীন আহামেদ মানিক। তেজস্বী, সাহসী ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের কারণে মাত্র ২৬ বছর বয়সে ১৯৭৩ সালে রাজশাহী-২ (পবা-বোয়ালিয়া) আসনের উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আওয়ামী লীগের এক বর্ষিয়ান নেতাকে পরাজিত করে বাংলাদেশের প্রথম সংসদের সর্বকনিষ্ঠ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। রাজশাহীবাসীর এ কৃতী সন্তান ১৯৪৮ সালের ১ জুলাই নগরীর হেতমখাঁয় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এখানেই বসবাস করেন। পরে নগরীর রামচন্দ্রপুর কেদুর মোড়ের বৌবাজারে নিজ বাড়িতে বাস করতেন। তার বাবা মোসলেম উদ্দিন আহমেদ ও মা শামসুন্নাহার।
তিনি বি.কম পাস করার পর এলএলবি পাস করেন। এছাড়া বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, ব্রিটিশ কাউন্সিল ও অস্ট্রেলিয়ার বার কাউন্সিলে আইনে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তার সহধর্মিনী মানিকের জীবনীমূলক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, তিনি রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও রাজশাহী বিভাগের পক্ষ হতে অসংখ্য জাতীয়ভিত্তিক সাঁতার, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেট বল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সফল হন। এ তথ্য থেকে ধারণা করা হয়, মানিক রাজশাহী কলেজ থেকে বি.কম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করেন।
১৯৭১ সালে মানিক মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি দেশের অভ্যন্তরে ও ভারতীয় সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ৭নং সেক্টরে সাব-সেক্টর কমান্ডার তৎকালীন ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর অধীনে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। পানিপিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে তিনি প্লাটুন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। দেশ স্বাধীনের পর গণতন্ত্রপন্থী বামধারার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৭২-৭৩ সালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এর রাজশাহী শাখার সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছরে তিনি মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী এএইচএম কামারুজ্জামানের ছেড়ে দেয়া রাজশাহী-২ (পবা বোয়ালিয়া) আসনের উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। তিনি জাসদের প্রার্থী ছিলেন এবং তার প্রতীক ছিল মশাল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসন ব্যাবস্থার তীব্র বিরোধিতা করেন। বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রবর্তন করার প্রতিবাদ স্বরূপ সংসদ সদস্য থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করা হয়। এ সময় তিনি আত্মগোপন করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে মানিক আপোসহীন ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮২ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের শুরুতেই তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৯২ সালে ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠের এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে বিএনপিতে যোগদান করেন। দলীয় কর্মকাণ্ডে দক্ষতার জন্যই তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও বাংলাদেশ কর আইনজীবী দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ লাভ করেন। 
মানিক রাজনীতি ছাড়া সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, খেলাধুলা ও মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণের বিষয়ে আন্তরিক ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কাজ করার জন্য তিনি মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের মহাসচিব (কল্যাণ ও পুনর্বাসন) এর দায়িত্ব পান এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে এফবিসিসিআই (ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ) এর সদস্য, রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির সদস্য, বাংলাদেশ টেক্সটাইল অ্যান্ড পাওয়ার লুম ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সদস্য, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতির সদস্য, বাংলাদেশ রেশম বোর্ডের পরিচালক, সুরভী টেক্সটাইল মিলস লি: এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এম.ডি) ছিলেন। তিনি সানরাইজ ক্লাব, বোয়ালিয়া ক্লাব, টেবিল টেনিস ক্লাব, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, পাবলিক লাইব্রেরীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্য ছিলেন।
মানিকের লেখালেখিতেও হাত ছিল। তিনি দৈনিক ইত্তেফাক ও সাপ্তাহিক রোববারের প্রবন্ধ লেখক এবং একজন সাংবাদিক (সম্মানসূচক) ছিলেন। এ বহু প্রতিভাধর মানুষটি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে ২০০৪ সালের ৪ জানুয়ারি নিজ বাসভবনে ৫৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও দুই কন্যা সন্তান রেখে যান। ৮ নভেম্বর ২০০৫ তারিখের জানা যায়,  স্ত্রী শামসুন্নাহার ঝর্ণা রূপালী ব্যাংক লি. এর প্রিন্সিপ্যাল অফিসার। বড় মেয়ে নূসরাত আহমেদ সুরভী আহসান উল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজির শিক্ষক। ছোট মেয়ে অনন্যা।
২০০৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর এ মুক্তিযোদ্ধাকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে রাজশাহী সিটি বাইপাসের নাম রাখা হয়েছে ময়েন উদ্দীন আহামেদ মানিক রোড।
(আহমাদ উল্লাহ সম্পাদিত ৫ম জাতীয় সংসদ সদস্য প্রামাণ্য গ্রন্থ-১৯৯২ এ মানিক এর নামের বানান মঈনুদ্দীন আহমেদ মানিক উল্লেখ আছে এবং মিসেস মানিক ৮/১১/২০০৫ তারিখে এক প্রতিবেদনে ময়েন উদ্দীন আহামেদ মানিক উল্লেখ করেছেন। এখানে মিসেস মানিক এর বানানটি লিখা হল।)