ফিরে যেতে চান

জাতীয় নেতা শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান

জাতীয় নেতা শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান১৫৫

বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। রাজনৈতিক ভূমিকা ও আত্মত্যাগ তাঁকে দেশের অন্যতম জাতীয় নেতাতে পরিণত করেছে। তাঁর পৈতৃক বাড়ি রাজশাহী মহানগরীর কাদিরগঞ্জ মহল্লায়। তিনি ১৯২৩ সালের ২৬জুন নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া থানার মালঞ্চি রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন নূরপুর গ্রামে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম এএইচএম কামারুজ্জামান। পূর্ণাঙ্গ শব্দতে হয় আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। দাদি হাস্নাহেনা ফুলের সঙ্গে তুলনা করে ডাক নাম রাখেন হেনা। তাঁর পিতা আব্দুল হামিদ মিয়া ও মাতা জেবুন নেসা। এ দম্পতির ১২টি পুত্র-কন্যার মধ্যে কামারুজ্জামান সবার বড়। কামারুজ্জামান জমিদার ও রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তার দাদা হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার (১৮৪৮-১৯৩৬) গুলাইয়ের জমিদার ছিলেন। তিনি ১৯২৪ থেকে ১৯২৬ ও ১৯৩০ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য (এমএলসি) ছিলেন। সমাজসেবায়ও তার খ্যাতি ছিল। কামারুজ্জামানের পিতা আব্দুল হামিদ মিয়া (১৮৮৭-১৯৭৬) বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও পাকিস্তান শাসনামলে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ) ছিলেন।
শিক্ষা ক্ষেত্রে কামারুজ্জামানের প্রেরণার উৎস ছিলেন রাজশাহী মহানগরীর আর একজন খ্যাতনামা ব্যক্তি সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আব্দুস সামাদ (১৯১৩-২০০৫)। বিবি হিন্দু একাডেমীর প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র কুমার সরকার ৮ মার্চ ২০১৬ তারিখে মত প্রকাশ করেন, শহীদ কামারুজ্জামান প্রথমে ভর্তি হন বিবি হিন্দু একাডেমিতে এবং এখান থেকে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে যান। শহীদ কামারুজ্জামানের পুত্র রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ১১ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখ রাত ১০.১৭ টায় মোবাইল ফোনেও জানান, তাঁর বাবা বিবি হিন্দু একাডেমিতে পড়েছেন। এ সময়  তাঁর ফুফা কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামে বদলি হয়ে গেলে কামারুজ্জামানকেও সঙ্গে নিয়ে যান এবং চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করে দেন। ১৯৪২ সালে সেখান থেকেই ম্যাট্রিক পাস করার পর রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে আইএ পাস করেন। উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য তিনি কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৪৬ সালে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। এর দশ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগ খোলা হলে তিনি প্রথম ব্যাচেই ল পাস করেন।
তিনি ১৯৫১ সালে বগুড়া জেলার দুপচাচিয়া থানার চামরুল গ্রামের জোতদার আশরাফ উদ্দিন তালুকদারের কন্যা জাহানারাকে বিয়ে করেন। তাঁরা মোট ৬ সন্তানের জনক-জননী। বড় সন্তান ফেরদৌস মমতাজ পলি ১৯৫৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। এরপর দিলারা জুম্মা রিয়া (১৯৫৫), রওশন আখতার রুমি (১৯৫৭), এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন (১৯৫৯), এএইচএম এহসানুজ্জামান স্বপন (১৯৬১) ও কবিতা সুলতানা চুমকি (১৯৬৪)। 
কামারুজ্জামান স্কুল জীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতি আরম্ভ করেন। স্কুলের ছাত্র অবস্থাতেই তিনি নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের রাজশাহী জেলা শাখার সম্পাদক হন ও ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নিখিল বঙ্গের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এ বছরই তিনি রাজশাহী মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালে রাজশাহী জেলার সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ছিলেন। আর সে কারণেই ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর এক নির্মম ঘটনার মধ্যে দিয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। ১৯৬২ সালের আয়ুব বিরোধী, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভূত্থান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকারের স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে দেশের স্বাধীনতায় বিশেষ অবদান রাখেন।
প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রী প্রথার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তিনি ১৯৬২ সালের এপ্রিলে ও ১৯৬৫ সালের মার্চে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের (পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বলী) এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল এসেম্বলী) নির্বাচিত হন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সম্মিলিত বিরোধী দলের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রদের ১১ দফা দাবির প্রতি সম্মান ব্যক্ত করে তিনি ১৯৬৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এমএনএ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনের নেতা হিসেবে তিনি আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকে পরিণত হন। এ সময় তিনি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী জেনারেল নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে জয় লাভ করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই কলকাতা যান। প্রবাসী সরকারের স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হিসেবে তিনি ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের অন্তর্গত মুজিবনগর (বৈদ্যনাথতলা) আমবাগানে শপথ গ্রহণ করেন। তার প্রচেষ্টার ফলে মুক্তিযুদ্ধ অনেকটা ত্বরান্বিত হয়। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ঢাকায় ফিরে ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর নতুন মন্ত্রীসভা গঠন করলে তিনি স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়েরই দায়িত্ব পান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর পুনরায় মন্ত্রীসভা গঠিত হলে তিনি ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন। ১৯৭৩ সালের পুনরায় মন্ত্রী সভা গঠিত হলে তিনি বাণিজ্যমন্ত্রী হন। ১৯৭৩ সালে সাধারণ নির্বাচনে তিনি রাজশাহীর দুটি আসনের (তানোর-গোদাগাড়ি ও পবা-বোয়ালিয়া) প্রার্থী হয়ে ২টিতেই নির্বাচিত হন। একটিতে (তানোর-গোদাগাড়ি) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জয় লাভ করেন। এ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগে পার্লামেন্টারি বোর্ডের সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করার ২দিন পর ২০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হন। এ পদে তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৭৫ সালে পুনর্গঠিত মন্ত্রীসভায় তিনি শিল্পমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গঠিত বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগের (বাকশাল) কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মনোনীত হন। ১৯৭৫ সালে খোন্দকার মোশতাকের সরকারে যোগদানের জন্য চাপ আসে। তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করায় তাঁর জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে কারাবন্দী করা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেই ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসের আর একটি লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। ঐদিন কারাগারের মধ্যেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজ উদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলীসহ কামারুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁকে যে মামলায় আটক করা হয়েছিল মৃত্যুর পর তার রায় প্রকাশ হলে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। ৬ নভেম্বর ১৯৭৬ তারিখে তাঁর মরদেহ রাজশাহী আনা হয় এবং কফিনসহ আর্মি পাহারায় দাফন করা হয় কাদিরগঞ্জ পারিবারিক গোরস্থানে। দাফনের পর ৭দিন ধরে কবরে পাহারা ছিল।
শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের সহধর্মিণী জাহানারা জামান ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখ রোববার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ঢাকার গুলশানের নিজ বাড়িতে ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখ সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় গুলশান আজাদ মসজিদে তাঁর প্রথম জানাযা অনুষ্ঠিত হয় ও জানাযা শেষে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে লাশ রাখা হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় তাঁর লাশ রাজশাহীতে আসে। ঐ দিন দুপুর সোয়া ২টায় হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) কেন্দ্রীয় ঈদগাহ্ মাঠে দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠানের পর কাদিরগঞ্জ পারিবারিক গোরস্থানে স্বামীর কবরের পশ্চিম পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।৭৮০