ফিরে যেতে চান

রাজশাহী মহানগরীর রাজনৈতিক সভার স্থান

পাঁচ আনির মাঠ : ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় রাজশাহী মহানগরীর পাঁচানীর মাঠ ছিল রাজনৈতিক জনসভার ঐতিহাসিক স্থান। ১৯০৩ সালে বাংলা লিটারির কনফারেন্স হয়েছিল পাঁচ আনির মাঠে। কনফারেন্সে অনেক জমিদার ২০০০-৪০০০ টাকা মূল্যের কাশ্মিরী শাল পরে উপস্থিত হয়েছিলেন। উপস্থিত জমিদারদের মধ্যে কয়েকজনের নাম পাওয়া যায়। যেমন-কাসিম বাজারের মহারাজা মনিন্দ্রনাথ নন্দী, নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়, দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায়, বৈজ্ঞানিক প্রফুল্লচন্দ্র রায়, বিপিন পাল, পঞ্চানন নিওগী, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সুদর্শন চক্রবর্তীসহ তৎকালীন বাংলার অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্র কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন। কান্তকবি রজনীকান্ত সেন কনফারেন্সে তাঁর রচিত স্বস্তিস্বাগত সুধী জ্ঞানপরব্রত পূন্য বিলাকন গানটি গেয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে কবি ফজর আলি খাঁনও (১৮৯৫-১৯৮০) গেয়েছিলেন।৬৮২  
১৯২৪ সালের শেষের দিকে পাঁচানীর মাঠের এক জনসভায় সি আর দাস (চিত্ত রঞ্জন দাস), মিসেস সরোজিনী নাইডু, কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজী ও মওলানা আকরাম খাঁন ভাষণ দেন। এ জনসভায় কোরআন তেলাওয়াত করেন শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের চাচা মুহম্মদ আব্দুস সামাদ। ১৯২৫ সালের ১২ জুলাই এ মাঠেই এক জনসভায় ভাষণ দেন মহাত্মা গান্ধী     (মোহন দাস করম চান্দ গান্ধী)১৩৬। 
ন্যাশনাল স্কুল প্রাঙ্গণ: মাহবুব সিদ্দিকীর শহর রাজশাহীর আদিপর্ব গ্রন্থে রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস প্রবন্ধে ফজর আলি খাঁন (১৮৯৫-১৯৮০) এর তথ্যানুসারে সেমিনারী স্কুল উঠে গেলে সেখানে স্থাপন হয় ন্যাশনাল স্কুল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ১৯০৫ সালেই এ স্কুল প্রাঙ্গণে সুরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বজ্রকণ্ঠে বক্তব্য দিয়েছিলেন। বিদেশি বস্ত্রে আগুন দিয়ে বিদেশি পণ্য বর্জন আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়েছিল। এ সভায় আগত নেতৃবৃন্দকে বিপুল উষ্ণ অভ্যর্থনা প্রদান করা হয়েছিল। কংগ্রেস কর্মীরা ঘোড়া খুলে দিয়ে নিজেরাই জুড়িগাড়ি টেনে শহরে এনেছিলেন। তারপর কংগ্রেসের প্রচেষ্টায় গোপালপুরে চিনির কল স্থাপন, ঘরে ঘরে চরকাই সুতাকাটা, কাপড় বুনানো, খাদি কাপড় তৈরি ও পরিধান করার সামাজিক আন্দোলনেরও প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল।৬৮২
সবজিপাড়ার মাঠ: বর্তমানে যেখানে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের রাণী হেমন্ত কুমারী ওয়াটার ওয়াকার্স অবস্থিত সেটাই ছিল সবজি পাড়ার মাঠ। তখন জায়গাটি ছিল শহরের কেন্দ্রে মুক্ত অঙ্গন। এখানেও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সভা অনুষ্ঠিত হতো। এ অঙ্গনে ১৯২৪ সালের শেষের দিকে এক জনসভায় উপমহাদেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব ড. সাইফুদ্দীন কিচলু ভাষণ দেন। এর কিছুকাল পর ওয়াহাবী আন্দোলনের নেতা সৈয়দ আহমেদ বেরেলভী এখানে ভাষণ দেন।১৩৬ 
দরগা মসজিদ প্রাঙ্গণ: খেলাফত আন্দোলনের সময় মৌলানা মহম্মদ আলী ও মৌলানা শওকত আলী এখানে খেলাফত বিষয়ে একটি সভা করেন। এরপর আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম সমিতি গঠন করা হয়েছিল। দেশ বিভাগের প্রাক্কালে মুসলমানরা এখানে মুসলিম লীগ গঠন করে।৬৮২ 
ভুবন মোহন পার্ক : ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত ভুবন মোহন পার্ক হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক সভার কেন্দ্র ভূমি। স্বাধীনের পর সত্তর দশকেও এখানে রাজনৈতিক সভার মঞ্চ দেখা যায়। গত শতাব্দীর ৯০ দশকে তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্র কলকাতা থেকে রাজশাহী এলে ভুবন মোহন পার্কে জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বামপন্থী দলসমূহ এ সমাবেশের আয়োজন করে। 
মাদ্রাসা মাঠ : রাজশাহী সরকারী মাদ্রাসা মাঠ একটি ঐতিহাসিক সভার স্থান। জানা যায়, পাকিস্তান আমলে এখানে মঞ্চ তৈরি করে আয়ুব খান বিডি সমাবেশ করে। মাহবুব সিদ্দিকীর শহর রাজশাহীর আদিপর্ব গ্রন্থে রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস প্রবন্ধে ফজর আলি খাঁন (১৮৯৫-১৯৮০) লিখেছেন, ‘১৯৪৮ সালে ইদগাহ ও জিন্নাহ হল মজিদ সাহেব উ.গ. এর চেষ্টায় স্থাপিত হয়। ১৯৮১-৮২ সালে প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের আমলে মঞ্চটি সংস্কার করা হয়। গত শতাব্দীর ৯০ দশকের শেষের দিকে মঞ্চটি আবারো সংস্কার করা হয়। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চের সমাবেশ এখানে অনুষ্ঠিত হয়।১৪৭ তাছাড়া স্বাধীনের পর দেশের শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, রাষ্ট্র ও সরকারের প্রধানগণ এখানে সমাবেশ ও সভায় ভাষণ দেন।  

রাজশাহী সরকারি মাদ্রাসা মাঠের পশ্চিম অংশে নির্মিত সভামঞ্চ (ছবি- জানুয়ারি২০১৭)

কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ: রাজশাহী সরকারী মাদ্রাসার দক্ষিণে অবস্থিত কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে এক সময় রাজনৈতিক সভা অনুষ্ঠিত হতো। রাজশাহী মহানগরীর প্রবীণ লেখক ও সাংবাদিক সাইদ উদ্দিন আহমেদের মতে, গত শতাব্দীর চল্লিশ দশকের শেষ প্রান্তে লিয়াকত আলী খান প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দ্বিতীয় বার রাজশাহী আগমন উপলক্ষে এখানে একটি মঞ্চ তৈরি হয়েছিল এবং তিনি এ মঞ্চে ভাষণ দিয়েছিলেন। ষাটের দশকে কনভেশন মুসলিম লীগ নেতা খান আব্দুল কাইয়ুম খান, পরে সবুর খানও এখানে সভা করেন। পাঠানপাড়া নিবাসী মোফাজ্জল হোসেন মাকুর  মতে, গত শতাব্দীর সত্তর দশকের দিকে মঞ্চটি ভেঙ্গে ফেলা হয়।  
সাহেব বাজার বড় রাস্তা: ১৯৯০ সালে সাহেব বাজার বড় রাস্তা (নাটোর-চাঁপাইনবাবগঞ্চ সংযোগ সড়ক) নির্মাণের পর থেকে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের জন্য এ সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। বিএনপি সাধারণত মনি চত্বরে, আওয়ামী লীগ ও বাম সংগঠনসমূহ পিএন স্কুলের সামনে এবং জামায়াতে ইসলাম জিরো পয়েন্টে সভা-সমাবেশ করে থাকে।
রাজশাহী কলেজ মাঠ: বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী কলেজ মাঠেও জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান রাজশাহীতে প্রথম আগমনের সভা হয়েছিল এখানে। ভাষা আন্দোলনের সভাও এখানে অনুষ্ঠিত হয়।