ফিরে যেতে চান

 

তালাইমারী শহীদ মিনারের উত্তর পাশ সংলগ্ন শহীদদের নামফলক

১৪ এপ্রিল থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধকালীন পুরো সময়টা রাজশাহী মহানগরী ছিল হানাদার বাহিনীর দখলে। স্বাধীনতাকামী নিরীহ মহানগরবাসীর কাছে ছিল বিভীষিকাময় রাজ্য। পাক বাহিনী ১৪ এপ্রিল রাজশাহী মহানগরীর দখল নেয়ার পরই বিহারীরাও মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় বাড়িতে লুটপাট আরম্ভ করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। এর ফলে মহানগরীর মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল। পাক সেনাদের আগমনের সময় গোলাগুলি ও বোমার শব্দে এবং লুটপাট ও বাড়ি ঘরে আগুন দেয়ার পূর্বেই প্রায় শতকরা আশি ভাগ মানুষ শহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল বিভিন্ন গ্রামে ও সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। অবশিষ্ট যাদের কোথাও যাবার জায়গা ছিল না তাঁরা পাকসেনা ও তাঁদের দোসরদের দ্বারা দারুণভাবে নির্যাতিত হয়। পরবর্তীতে যুদ্ধকালীন সময়ে কিছু কিছু মানুষ শহরে ফিরে এসেছিল। তবে সংখ্যায় অর্ধেকেরও কম। যুদ্ধকালীন পুরো সময় বিহারীরা নিজেদের রাজত্ব কায়েম করেছিল। লুটের মালামাল দিয়ে তারা সাহেব বাজারে বাজার বসাত এবং অনেকে নিজেদের বাড়ির মাল নিজেরাই কিনে নিয়ে যেত।
তথাকথিত শান্তি কমিটির সদস্য, রাজাকার, আলবদরের সহযোগিতায় হানাদার বাহিনী নারকীয় হত্যাকান্ড, ধর্ষণসহ অমানবিক নির্যাতন চালায়। কখনও দিনের আলোয় কখনও নিকোশ আঁধারের নিরব রাতে মাতৃভূমিকে ভালোবাসার দায়ে ঘর থেকে ধরে এনে নির্যাতন চালিয়ে রক্তচোষা দানবের মত গুলি করে রক্তের ফিনকি ছুটা দেখত এরা। আবারো কখনও জীবন্ত গণকবর দিয়ে মধ্যযুগীয় বর্বরের পরিচয় দিত। এসব স্থানগুলো বধ্যভূমি নামে পরিচিত। ১৪ ডিসেম্বর ২০০০ তারিখে দৈনিক সোনালী সংবাদ ও ১ জানুয়ারি ২০০১ তারিখের দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত রিপোর্টে রাজশাহী মহানগরীতে এরকম ২০টির মত গণকবরের কথা বলা হয়েছে। পদ্মার চর ও পদ্মাপাড়ের বাবলা বন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হল, মন্নুজান হলের উত্তর এলাকা, কাজলা, বিনোদপুর, তালাইমারী, জেবর মিয়ার ইটভাট, অলকার পাশের বাবলাতলা, বোয়ালিয়া ক্লাব প্রভৃতি ছিল হত্যা কাণ্ডের স্থান। পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণের পর বিজয়ের আবেগপূর্ণ অশ্রুসজল জনতা এসব স্থানে শহীদের লাশের ছড়াছড়ি দেখতে পেয়েছিল। ১৮ ডিসেম্বর পদ্মার বালিচরে বাবলা বনের সামনে থেকে একই দড়িতে সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল অধ্যাপক কাইয়ুম, অ্যাডভোকেট তসলিম উদ্দিন, অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন, চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন, ঠিকাদার আলতাফ হোসেন, তৈয়ব আলী, নওরোজদ্দৌলা খান, মির্জা সুলতান, আমিনুল হক চৌধুরী, মকবুল চৌধুরীসহ অনেকের লাশ। সম্ভবত জীবন্ত পুঁতে হত্যা করা হয়েছিল এদের। লাশের গায়ে গুলি বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।১২২ 
বাবলা বনের বধ্যভূমির টি বাঁধের পূর্ব পাশ ঘেঁষে ১৯৯৫ সালের ২৫ নভেম্বর স্মৃতি ফলকের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর করা হয়। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সৌজন্যে এ ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মীর কাইয়ুমের পত্নী অধ্যাপক মাসতুরা খানম।১২২ তালাইমারী পদ্মা নদীর বাধলাগা যে স্থানে অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে হত্যা করে নদী গর্ভে নিক্ষেপ করা হতো রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ১৯৯৯ সালে সেখানে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে। এছাড়াও বোয়ালিয়া থানা লাগা মোসলেম শাহর বাসভনের উঠান, উপশহর ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংঘ লাগা অনুসন্ধানী ক্লাবের স্থান, রাজশাহী সেনানিবাসের ১নং গেট, উপশহর কলেজ লাগা পূর্ব ড্রেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারিত জুবেরী ভবন, হাদীরমোড় লাগা বাধের পাশ, পদ্মা নদীর ধারে পুলিশ লাইন লাগা চাঁদের বাড়ির আঙ্গিনা, কেন্দ্রীয় উদ্যানের পাশে হে পথিক থমকে দাড়াও লিখা জিওমেট্রিক্যাল সাইন এর পাশে, পুলিশ কমিশনার ও আনসার ভিডিপি অফিসের মাঝখানের পুকুরে গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। নগরীর ঘোড়ামারায় জমিদার কুঞ্জ মৈত্রর বাড়ির উঠান, সাহেব বাজার স্টার স্টুডিওর দক্ষিণে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে হর্টিকালচার লাগা স্থানে, নির্মিতব্য বিসমিল্লাহ্ মার্কেটের সম্মুখে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষকে পাক সেনা ও তাদের দোসরেরা হত্যা করে।১০৪ কোর্টের পশ্চিম পাশে সিঅ্যান্ডবি ইটভাটায় (বর্তমান ৩নং গ্রোয়েনের পূর্বপাশে) ৭ জনকে গুলি করে মাটি চাপা দেয়া হয়। এর পাশেই আজাহারের ইটভাটায় মালিক আজাহারকেই গুলি করে হত্যা করে খান সেনারা।     

শহিদ

মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী মহানগরীর কতজন, কখন, কিভাবে শহিদ হয়েছিলেন তা সঠিক পরিসংখ্যানে নিয়ে আনার কার্যক্রম হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকজন শহীদের নাম উল্লেখ করা হলো: 
১.    অ্যাডভোকেট বীরেন্দ্রনাথ সরকার- ২ এপ্রিল রাত পৌঁনে ১১টায় পাক সেনারা বাসায় ঢুকে গুলি করে হত্যা করে। 
২.    অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন- ১৩ নভেম্বর সকালে রাজাকার-আলবদর বাহিনীর লোকেরা তাঁকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। তিনি আর ফিরে আসেননি। পরে জানা যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলে দৈহিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।
৩.    আয়কর আইনজীবী তসলিম উদ্দীন আহম্মদ- ১৯ নভেম্বর গ্রেফতার করে তাঁকে হত্যা করা হয়। 
৪.    অ্যাডভোকেট নজমুল হক সরকার - ২৬ মার্চের সকালে পাক সেনারা গ্রেফতার করে হত্যা করে। 
৫.    স্বাধীনতা ও বিদ্রোহের কবি ফেরদৌসদৌলা বাবলু - ইস্ট পাকিস্তানের সিভিল আর্মস ফোর্স ইপিকাপের কমান্ডার তাকে ধরে নিয়ে যায়। ধারণা করা হয়, পদ্মার ধারে বধ্যভূমিতে তাঁকে হত্যা করা হয়।
৬.    সমাজকর্মী মো. মোক্তার হোসেনসহ ৪ শহীদ- ২৭ মার্চ পাক সেনারা পুলিশ লাইন আক্রমণ করলে পুলিশ লাইনের প্রধান গেটের সামনে তাঁর বাড়ির উঠানে তিনি, তাঁর ছেলে ও দুই প্রতিবেশী ট্রেঞ্চ কাটেন। শত্রু সেনাদের নিক্ষিপ্ত মর্টার সেলেই এ ট্রেঞ্চের ভিতরে ৪ জনেই শহীদ হন। 
৭.    আওয়ামী লীগ কর্মী মো. আ. হালিম - ২৮ মার্চ পাক সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে যায় এবং তাঁদের আস্তনায় (বর্তমান বিভাগীয় শ্রম দপ্তর) সাতদিন যাবৎ অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে সন্ধ্যার পর অভুক্ত অবস্থায় রাস্তার ওপর পিছন থেকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। 
৮.    ব্যবসায়ী সহোদর ইলিয়াস উদ্দিন, মিলিয়াশ উদ্দিন রবুসহ অন্য এক শহীদ- ১৪এপ্রিল সকাল ১০টায় পাক সেনারা বাড়িতে ঢুকে উক্ত দুই সহোদর , তাঁদের দোকানের কর্মচারী ও এক প্রতিবেশীকে দাঁড় করিয়ে ব্রাস ফায়ার করলে তিন জন শহীদ হন এবং ইয়াছিন নামক একজন আহত অবস্থায় পালিয়ে বাঁচেন। তিন দিন পর শহীদ সহোদরের মা নিজ হাতে কোনোরকম মাটি খুঁড়ে তিন জনকেই কবর দেন। 
৯.     সেলিমুজ্জামান ও ওয়াসিমুজ্জামান- শহরের প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী আ. সালামের এ দুই সন্তান ছিলেন ঢাকার বুয়েটের ৪র্থ বর্ষ ও রাজশাহী কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র । ২৫ মার্চ রাত তিনটার সময় পাক সেনারা বাড়ি থেকে এ দুই সহোদরকে ধরে নিয়ে যায় ও হত্যা করে। (মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী গ্রন্থে এ সহোদরদ্বয়ের নাম শহীদুজ্জামান ও ওয়াসিমুজ্জামান নামে ও একই গ্রন্থে ওয়াহিদা আহমেদ সেলিমউজ্জামান ও ওয়াসিমউজ্জামান নামে উল্লেখ করেছেন। ৭ মার্চ ২০১৬ তারিখ দিবাগত রাতে ফোনালাপে শহীদদ্বয়ের ভগ্নিপতি কবি আরিফুল হক কুমারের নিকট থেকে জানা যায়, তাঁদের প্রকৃত নাম সেলিমুজ্জামান ও ওয়াসিমুজ্জামান)
১০.    রিসার্চ অফিসার সাইদুর রহমান মীনা ও সাংস্কৃতিক কর্মী শহীদ হাসানুজ্জামান খোকা - এরা শালা-ভগ্নিপতি। ২৫ মার্চ রাতে লক্ষ্মীপুরের বাড়ি থেকে পাক সেনারা এদের ধরে নিয়ে যায় এবং নৃশংসভাবে হত্যা করে।
১১.    রেভিনিউ অফিসার  দেওয়ান সিদ্দিক ও শ্যালক খন্দকার আলী আফজাল- নগরীর রাণীনগরের বাড়ি থেকে ২৫ মার্চ রাতে পাকসেনা ও তার দোসরেরা ধরে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে।
১২.    সিঅ্যান্ডবি’র সাব ওভারসিয়ার আব্দুল হক (অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদীর ভাই)- ২৫ মার্চ রাত তিনটার দিকে পাক সেনারা বাড়ির ভিতর ধরে নির্যাতনের পর হত্যা করে।
১৩.    রাজনীতিক সুরেশ পাণ্ডে - ২ এপ্রিল রাত সোয়া ১১টায় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকসেনারা তার ফুদকিপাড়ার বাড়ি হানা দেয় এবং গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে।  
১৪.    গবেষক নওরোজ-উদ-দৌলা, ভাগ্নে রমজান আলী ও ভাতিজা ফেরদৌস-উদ-দৌলা-মুক্তিযোদ্ধাদের ওয়ারলেস তৈরি করে দিতেন নওরোজ। আলবদর-রাজাকারদের সহযোগিতায় পাক সেনারা ২৫ নভেম্বর তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং পদ্মা পাড়ের বধ্যভূমিতে অনেকের সাথে হত্যা করে। তাঁর ভাগ্নে রমজান আলী ও ভাতিজা ফেরদৌস-উদ-দৌলাকে ২৬ নভেম্বর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়।
১৫.    ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা মো.সাইফুল ইসলাম ঠান্ডু - মেজর শফিকের নির্দেশে মহানগরীর পাঁচানী মহল্লার এ একাদশ শ্রেণির ছাত্র মুক্তিযোদ্ধাসহ ৫ জন চারঘাটের একটি অপারেশনে ১জুলাই রাতে নৌকার ওপর পাক সেনাদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হন এবং শহীদ হন ২ জুলাই।
১৬.    ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা মো. খুরশিদ আলম শিবলী - শিবলীর বাড়ি রাজশাহীর চারঘাটে। তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ১ জুন রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। ৩ জুন আরো দুজন বন্ধুসহ তাঁকে চারঘাট ডাকবাংলার কাছে নদীর ধারে বেয়নেট চার্জ করে পাক সেনারা হত্যা করে নদীতে নিক্ষেপ করে। মৃত্যুর পূর্বেও শিবলী পাক মেজরকে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, আমরা পাকিস্তানকে ঘৃণা করি। শিবলীর মা নদী থেকে লাশ কুড়িয়ে বাড়ির পাশে দাফন করেন।
১৭.    অ্যাডভোকেট আমিন উদ্দিন - ইনি ছিলেন নাটোরের অধিবাসী। পাক সেনারা ২৬ মার্চ তাঁকে ধরে নিয়ে যায় এবং ২৯ মার্চ হত্যা করে। 
১৮.    সামজকর্মী আলমগীর হোসেন- রাজাকাররা তাঁকে ধরে পাক সেনাদের হাতে তুলে দেয় ও নিমতলা এলাকায় হত্যা করে। 
১৯.    সিআইবি সহকারী পরিচালক আবু আখতার ও ডিসিআই মো. আজিজুর রহমান- উভয়ই পাক সেনাদের গুলিতে ১৩ এপ্রিল সিআইবি রাজশাহী অফিসে গুলিবিদ্ধ হন। 
২০.    সিআইবি সহকারী পরিচালক খলিলুর রহমান-২৫ এপ্রিল পাক মেজর সালমান মাহমুদ বাস ভবন থেকে তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। জানা যায় চারদিন ধরে নির্যাতনের পর ২৯ এপ্রিল সপুরা ক্যান্টনমেন্টে নায়েক সুবেদার হায়াত মাহমুদ সালমানের (পাঞ্জাবী) নির্দেশে স্টেনগানের গুলিতে হত্যা করা হয়।
২১.     মোসলেমউদ্দিন- মোসলেম উদ্দিনের বাড়ি রাজশাহী কোর্টের পশ্চিমে বশড়ি গ্রামে। ১৯৭১ সালে নওগাঁ জেলা রাণীনগরে তৎকালীন ইপিএডিসিতে (বিএডিসি) স্টোর কিপার পদে কর্মরত ছিলেন। ১৭ জুন ১৯৭১ তারিখে সকাল ৮টায় সপরিবারে নাস্তা খাওয়া অবস্থাতেই তাঁর বড় শ্যালক নাজমুল হকসহ তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে এসে বাড়ির পাশেই বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। নাজমুলকে অর্ধমৃত অবস্থায় কাঁটার উপর গড়ানো হয় এবং তিনি বেঁচে যান।
২২.    আজাহার আলী -  কোর্ট এলাকার বুলনপুর নিবাসী আজাহার আলী খান সেনাদের দেখে বাড়ির পশ্চিমে তাঁর নিজস্ব ইটভাটায় স্ত্রীসহ লুকানোর সময় খান সেনাদের গুলিতে নিহত হন। স্ত্রী বেঁচে যান।
২৩.    হাবু চৌকিদার ও আলীসহ ৭জন - নগরীর পশ্চিমে অবস্থিত হাড়ুপুর গ্রামের হাবু চৌকিদার, জেলে আলীসহ ৭ জনকে রমজান  মাসে ধরে নিয়ে এসে ইফতারের পূর্বে কোর্টের পশ্চিমে সিঅ্যান্ডবি ইটভাটায় গুলি করে হত্যা করে গণকবর দেয়া হয়।
২৪.    মাইফুল- মাইফুলের বাড়ি কুষ্টিয়া। তিনি নগরীর কাঠালবাড়িয়ায় শ্বশুর সমজানের বাড়িতে এসে রাজাকারের হাতে শহীদ হন। তাঁকে রাজাকারেরা পদ্মার ওপারে নবীনগর চরে হত্যা করে। দিনটি ছিল সম্ভবত ১৪ এপ্রিল।
২৫.    সাইরগাছার বিদেশী- নগরীর পশ্চিমে সাইরগাছা মহল্লার বিদেশী নামে পরিচিত  জনৈক ব্যক্তিকে খান সেনারা হত্যা করে।
২৬.    যদু শেখ - সম্ভবত ১৪ এপ্রিল  খান সেনারা কাঠালবাড়িয়ার যদু শেখের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং তাকে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ যদু শেখ জ্বলন্ত আগুনে হুমড়ি খেয়ে পড়েন এবং আগুনে দগ্ধ লাশটি ক্ষুদ্রাকার ধারণ করে।
২৭.    আব্দুল হাফিজ, সোলাইমান ও দিলজান- ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল নগরীর কোর্ট অঞ্চলের রায়পাড়ায় সোলাইমানের বাড়ির ঘরের ভিতর আব্দুল হাফিজ, তাঁর চাচাতো ভাই সোলাইমান ও ভারত থেকে বেড়াতে এসে সোলাইমানের ভাই দিলজান খান সেনাদের গুলিতে শহীদ হন। আব্দুল হাফিজ ও দিলজান সঙ্গে সঙ্গে নিহত হন এবং সেখানেই লাশ দাফন করা হয়। সুলাইমানকে আধার কোঠার হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময় মুরারীপুর নামক স্থানে মারা যান এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। একই ঘরে সোলাইমানের স্ত্রী ও রায়পাড়ার মোনতাজও গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। তাঁরা বেঁচে যান। 
২৮.    মহিরুদ্দিন ভা¹ু- বিজয়ের কয়েক দিন পূর্বে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে নগরীর কোর্ট অঞ্চলের রায়পাড়ার নিজ বাড়ি থেকে মহিরুদ্দিন ভা¹ুকে ধরে নিয়ে যায় খান সেনারা। আর ফিরে আসেননি।
২৯.    আব্দুর রকিব- রাজশাহী কোর্টের রায়পাড়া মহল্লার আব্দুর রকিব ছিলেন পুলিশ কনস্টেবল। মুক্তিযুদ্ধকালীন গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি থানায় কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। ১৭ আগস্ট ১৯৭৪ তারিখ হানাদার বাহিনীর গুলিতে সেখানে শহীদ হন।
৩০.    জেকের আলী - সম্ভবত ১৪ এপ্রিল আনুমানিক সকাল ৭টায় টিকাপাড়া নিবাসী মো. জেকের আলীকে পাক বাহিনী গুলি করে হত্যা করে এবং তাঁর বাড়ি-ঘরে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
৩১.    মো. শামসুল আলম, সুরুজ্জামান, হেলেন, আবু তালেব, সাইদুর রহমান, ইয়ার মোহাম্মদ, গিয়াসসহ ৮ শহীদ- হড়গ্রাম মুন্সিপাড়া নিবাসী আলহাজ রুহুল আমিন সরকারের পুত্র মো. শামসুল আলম ১৯৭১ সালে রাজশাহী কলেজের বি.কম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তিনিসহ আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন। তাঁদের এ বীরত্বপূর্ণ কার্যক্রম সম্পর্কিত তথ্য পাক বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায়। তাই তাঁরা আত্মগোপনে রাত কাটাতেন। পাক বাহিনী এ সংবাদও জেনে ফেলে। তারা ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর দিবাগত রাত ২/৩ টার দিকে হড়গ্রাম ও হড়গ্রাম নতুনপাড়া থেকে ১০ জনকে ধরে নিয়ে যায়। হড়গ্রামের শাজাহানের বাড়ি থেকে তাঁর পুত্র সুরুজ্জামানসহ মো. শামসুল আলমকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলে। ধৃত অন্য ৮ জনের মধ্যে ৭ জনের নাম জানা যায়। তাঁরা হলেন- হাড়ুপুরের কেরানি হাজির পুত্র হেলেন, হড়গ্রাম নতুনপাড়ার আবু তালেব, হড়গ্রাম নতুনপাড়ার সাইদুর রহমান, হড়গ্রাম নতুনপাড়ার মুক্তিযোদ্ধা এমদাদ ও এমরানের পিতা ইয়ার মোহাম্মদ, বুলনপুরের গিয়াস, হড়গ্রাম মুন্সিপাড়ার সানাউল্লাহ, মো. শামসুল আলমের ভাই মো. তৌহিদুল আলম বাদল। ১০ জনের মধ্যে মো. তৌহিদুল আলম বাদলকে হড়গ্রাম বাজারে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। সানাউল্লাহ (পরে ডা. সানাউল্লাহ) ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর ফিরে আসেন। সানাউল্লাহর তথ্যানুসারে ১৩ ডিসেম্বরই মো. শামসুল আলমসহ ৮ জনকে জোহা হলে হত্যা করা হয়েছিল।
এ ৮ জন শহীদের মধ্যে আবু তালেব ও সাইদুর গ্রেনেডসহ ধরা পড়েছিলেন। পুত্র এমদাদ ও এমরানকে না পেয়ে পিতা ইয়ার মোহাম্মদকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। মো. শামসুল আলমকে বাড়িতে না পেয়ে তাঁর ভাই মো. তৌহিদুল আলম বাদলকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মো. শামসুল আলমকে পেয়ে মো. তৌহিদুল আলম বাদলকে ছেড়ে দেয়া হয়।৭৪০