ফিরে যেতে চান

মোহনপুর থানা ও সাঁকোয়া রাজাকার ক্যাম্প অপারেশন: সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঈদ-উল-ফিতরের ৫দিন আগে একই সময়ে মনসুর রহমানের নেতৃত্বে ৩৫ সদস্যের মুক্তিযোদ্ধা দল এবং এমদাদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা মোহনপুর থানার সাঁকোয়া নামক স্থানে রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করে। এতে মোহনপুর থানা দখল হয় ও থানায় বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয়। এদিকে সাঁকোয়া ক্যাম্পে ১২ জন রাজাকার ধরা পড়েছিল এবং ক্যাম্পের অবশিষ্ট রাজাকার, আলবদর, সিএফ নিহত হয়েছিল। জনতার রায়ে ১২ জন রাজাকারের প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল।১০২
দুর্গাপুরে আইচান নদীর যুদ্ধ: পাক সেনারা ১ রমজান দুর্গাপুর থানা এলাকায় অপারেশনে নামলে রাত পোহানোর সঙ্গে সঙ্গেই করিম মোল্লা ও আনিসের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাক সেনাদের উপর আক্রমণ করে এবং ইফতার পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। ইফতারের সময় অঘোষিত যুদ্ধ বিরতির  সময় মুক্তিযোদ্ধারা নৌকাযোগে সরে পড়ে। এ যুদ্ধে একজন মেজরসহ ৫ জন পাক সেনা নিহত হয় । মুক্তিযোদ্ধারা কেউ হতাহত হয়নি।১০২
গোপালপুর রেলক্রসিং ও ময়না গ্রামের যুদ্ধ: যশোর থেকে আগত পাক বাহিনীর একটি দল ঈশ্বরদী বিমান বন্দর যাওয়ার পথে দাশুড়িয়ায় বাধা পেলে ময়না গ্রাম হয়ে ৩০ মার্চ ভোরে গোপালপুর রেলক্রসিংয়ের কাছে পৌঁছে। মুক্তিযোদ্ধারা আগেই খবর পেয়ে রেলক্রসিংয়ে অবস্থান নিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলে এবং সকাল ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। এ যুদ্ধে পাক সেনারা টিকতে না পেরে ময়না গ্রামের দিকে সরে যায়। এ সময় একটি ট্রাক উল্টে নদীতে পড়ে গেলে ৭ জন পাক সেনা মারা যায়। মুক্তিযোদ্ধা ও জনতা সারাদিন গ্রামটিকে ঘিরে রাখে। পাক সেনাদের একটি হেলিকপ্টার ঐ গ্রামের উপর কয়েকবার চক্কর দিয়ে ফিরে যায় । ৩১ মার্চ পাক সেনারা নদী পার হয়ে পালিয়ে যায়। এরপর পাক মেজর রাজা আসলাম ও দুজন সিপাহী গমক্ষেতের মধ্যে জনতার হাতে ধরা পড়ে নিহত হয়।১০২ 
উত্তবঙ্গ চিনি কলে হত্যা: ময়না গ্রামের প্রতিশোধ হিসাবে পাক সেনারা ৫ মে উত্তর বঙ্গ চিনিকলে ৪৬ জনকে হত্যা করে।১০২
ইসলামপুর যুদ্ধ: গোদাগাড়ী থানার সোজা পশ্চিমে নবাবগঞ্জ থানার দক্ষিণে ভারতীয় সীমান্তের কাছে পদ্মা নদীর তীরে মুক্তিযোদ্ধাদের ফরিদপুর ক্যাম্প থেকে উত্তরে অবস্থিত পাক বাহিনীর ইসলামপুর ঘাঁটিতে আক্রমণ চালানো হয়। অনারারী লেফটেন্যান্ট বদিউজ্জামান টুনুর নেতৃত্বে সুবেদার মনোয়ারের অধীনে একটি দল দক্ষিণ দিক থেকে ও নায়েব সুবেদার হাসেমের অধীনে আর একটি দল ভোর রাত ৪টায় আক্রমণ শুরু করে। প্রথম আক্রমণে শত্রু পক্ষ দিশেহারা হয়ে পড়লেও পরে পাল্টপাল্টি আঘাতে পাক সেনাদের মেশিনগানের গোলা বর্ষণে টিকতে না পেরে প্রায় বিজয় মুহুর্তে নিরাপদ স্থানে ফিরে আসে। এ যুদ্ধে শত্রু পক্ষের ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয় এবং ৯জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।১০২  
বাঘার বৈদ্যুতিক টাওয়ার অপারেশন : ২৪ জুলাই মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে বর্তমান বাঘা থানার (সাবেক চারঘাট থানা) বাজুবাঘা-কাকীপাড়া গ্রামে ৬৬ হাজার ভোল্টের ৩টি বৈদ্যুতিক টাওয়ার লাইন উড়িয়ে দেয়া হয়।১০২
আড়ানী রেলওয়ে ব্রিজ অপারেশন: রেলপথে হানাদার বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে দেয়ার উদ্দেশ্যে হাবিলদার মো. রুস্তম আলীর নেতৃত্বে এফএফ গেরিলা ও সাবেক ইপিআর বাহিনীর সদস্যগণ এ অপারেশন চালিয়ে আড়ানী ব্রিজের আংশিক ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হন। এর ফলে রাজশাহী-ঈশ্বরদী ১৫ দিন ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। (তারিখ অজ্ঞাত)১০২
লোকমানপুর চিতলী ফার্ম ট্রেন অপারেশন: ২২ নভেম্বর আজাদ আলী (বীর প্রতীক) ও মোজাম্মেলের নেতৃত্বে এফ এফ গেরিলারা দুদলে বিভক্ত হয়ে এ অপারেশন পরিচালনা করেন। এ অপারেশনে আড়ানী-আব্দুলপুর রেল স্টেশনের মধ্যবর্তী লোকমানপুর ডিনামাইটের দ্বারা বিপুল সংখ্যক পাক সেনা বহনকারী একটি ট্রেন ধ্বংস করা হয়। অনেক পাক সেনা নিহত ও আহত হয়। এ অপারেশনে আজাদ আলীর দুটো আঙ্গুল উড়ে যায়। এ যুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য মো. আজাদ আলী বীর প্রতীক পদবি লাভ করেন।১০২
আলাইপুর বিওপি ক্যাম্প অপারেশন: এমএফ এবং এফএফ গেরিলাদের সমন্বয়ে গঠিত বাহিনী আলাইপুর বিওপি আক্রমণ করেন। সারারাত যুদ্ধ চলার পর পাক বাহিনী ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যায়। যুদ্ধে অনেক পাক সেনা নিহত হয়। (তারিক অজ্ঞাত)১০২
শাহপুর বিওপি ক্যাম্প অপারেশন: ৭ নভেম্বর ইপিআর হাবিলদার সফিউদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা শাহপুর ক্যাম্পে ঝটিকা হামলা চালান। যুদ্ধে পাক বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়।১০২ 
বাউসা হাট ক্যাম্প অপারেশন: মো. আজাদ আলী (বীর প্রতীক) এর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল বিকেল ৩টায় গেরিলা হামলা চালান। এতে ক্যাম্পটি বিধ্বস্থ হয় এবং কয়েক জন রাজাকার নিহত ও ধৃত হয়। অন্যান্যরা পালিয়ে যায়। (তারিখ অজ্ঞাত)১০২
তানোর থানা আক্রমণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্ধার: তানোর থানা অফিসে পাক সেনারা ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। এক সময় সেখানে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বন্দী রাখা হয়। ১৯৭১ সালের অক্টোবরের শেষ কিংবা নভেম্বরের শুরুতেই ৮ কিলোমিটারের বেশি পথ পায়ে হেঁটে গিয়ে তানোর থানা আক্রমণ করে ৪০/৪৫ জন মুক্তিযোদ্ধা। এ যুদ্ধের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা প্রদান করেন সে সময়ের গোদাগাড়ি, পবা, মোহনপুর ও তানোর থানার সমন্বিত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো শফিকুর রহমান রাজা। যুদ্ধে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একজনের নাম এসএম কামরুজ্জামান। বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার দারুশা। তিনি ছিলেন একটা ট্রুপসের কমান্ডার। সেদিন রাতে খাবার আগেই কমান্ডার রাজার নির্দেশ, এখনই তানোর থানা আক্রমণ। না খেয়েই রওনা দেন মুক্তিযোদ্ধারা। রাজার গ্রুপ ভাগের পর দিক নির্দেশনা মোতাবেক ত্রিমুখী আক্রমণ। প্রায় সোয়া ঘণ্টা সম্মুখ যুদ্ধের পর হাই কমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রেনেড থ্রোয়িং। ১৫ মিনিটের গ্রেনেড আক্রমণেই পাকসেনা, রাজাকার, আল বদর থানা ছেড়ে পালিয়ে যায়। জয় বাংলা স্লোগানের সঙ্গে ফায়ার দিতে দিতে থানা দখল করেন মুক্তিযোদ্ধারা। অনেক কষ্টে হাজতের তালা ভেঙে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে উদ্ধার করা হয়। তালা ভাঙ্গতে গিয়ে নিজের গুলিতে মনির নামের এক মুক্তিযোদ্ধা পায়ে আহত হন। যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান পিছনে গুলিবিদ্ধ হন। এ যুদ্ধে কোনো মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হননি। শত্রুপক্ষের নিহতের সংখ্যা ছিল ১৫ জন। এলএমজিসহ ৩টি অস্ত্র পাওয়া যায়। সব কিছু উদ্ধারের পর কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় থানায়।৫২৬
শিতলাই ট্রেনে আক্রমণ: নভেম্বরে মুক্তিযোদ্ধারা শিতলাই স্টেশনের পশ্চিম পাশে কুমড়াপুকুর ব্রিজে চাঁপাই নবাবগঞ্জগামী একটি ট্রেন আক্রমণ করেন রাত সাড়ে দশটায়। রেঞ্জের আওতায় আসার পূর্বে ডেটেনটরে ম্যাচের ফায়ারে আগুন দেয়ার কারণে আক্রমণ লক্ষ্য ভ্রস্ট হয়ে পড়ে। এ আক্রমণে লাইনের লোহা কেটে পড়ে বুলবুল নামের একজন মুক্তিযোদ্ধার তিনটি আঙ্গুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পাক সেনারা নিরাপদে থেকেই ১৫ মিনিট ফায়ার দেয়। মুক্তিযোদ্ধারা তার জবাব না দিয়ে ক্রোলিং করে আখের জমির ভিতর দিয়ে নিরাপদে ফিরে আসেন। রেল লাইনের তিনটি জায়গা উড়ে যাবার কারণে রাজশাহীÑচাঁপাইনবাবগঞ্জ তিনদিন রেল চলাচল বন্ধ ছিল। এ আক্রমণে একটা ট্রুপসের কমান্ডার ছিলেন এসএম কামরুজ্জামান ও ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন এসএম জহিরুল হক।৫২৬
দারুশা রোডের শাইরপুকুরে পাকবাহিনীর ট্রাক আক্রমণ: পবা উপজেলার অন্তর্গত ডাঙ্গেরহাটের ১ কিলোমিটার দূরত্বে শাইরপুকুর। সেখানে একটি বড় বটগাছ। এর ২০ হাত দক্ষিণে এবং সেখান থেকে ১০০ হাত দক্ষিণে আরো একটি মাইন বসিয়ে ট্রাক উড়িয়ে দেয়। এ অপারেশনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন মুক্তিযোদ্ধা গাজিউর রহমান, সাজ্জাদ, ফজলু, লাট্টু, আবুল মাস্টার প্রমুখ। ঘটনার পূর্ব দিন অর্থাৎ ১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের ২টি ট্রুপস ডাংগের হাটে রাত যাপন করেন। ২ ডিসেম্বর রাজশাহী শহর থেকে একটি ট্রাকে ৩ জন পাকিস্তানী সেনাসহ ২০ জন আল বদর এবং একটি বাসে প্রায় ৩০ জন আলবদর-রাজাকার সকাল ১০ টায় কোর্ট স্টেশন হয়ে দারুশা যায়। তখন রাস্তাটি ছিল কাঁচা। তাঁরা একই রাস্তা হয়ে ফিরবে এ পরিকল্পনাই মাইন দুটো রেখে মুক্তিযোদ্ধারা অ্যাম্বুস করে ফাঁকা বিলের খড়ের চকে অপেক্ষা করছিল। তাঁদের প্রত্যাশা সফল হয়েছিল। ফিরতি পথে পাকসেনাদের ট্রাক প্রথম মাইন পার হয়ে দ্বিতীয় মাইনে উঠতে বিস্ফোরণ ঘটে। ট্রাকটি শুন্যে উড়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে। ট্রাকের চাপায় ২ জন পাকসেনাসহ ১০ জন মারা যায়। বাসটি বিপদ সীমানার পিছনে থাকায় কিছু হয়নি। বাসের রাজাকার-আলবদরেরা ডাঙ্গেরহাট গ্রামের রাস্তার পাশের ঘর-বাড়ি-ধানের পালা পুড়িয়ে শহরের দিকে রওনা দেয়। তারা কুলপাড়া ব্রিজ পার হয়ে রাস্তার পাশে কয়েকজন মানুষ দেখতে পায়। তাঁদের ধরে হাত-পা বেঁধে ধানের খড়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করে। তারা লাশ ফেলে চলে গেলে শহীদদের লাশগুলো আত্মীয়-স্বজনেরা নিয়ে যায়। শহীদরা ছিলেন ফজলু, আলেফ, কুদ্দুস, আজমত ও এনতাজের পিতা। মুক্তিযোদ্ধারা খড়ের চক থেকে ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিল।৫২৬
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইসলামপুর ঘাঁটি আক্রমণ: এ যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সিভিল স্টাফ অফিসার মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জামান টুনু। মুক্তিযোদ্ধারা পাক বাহিনী ও রাজাকারদের ভারি অস্ত্রের বারুদের কাছে সফল হতে পারেনি। মোট নয়জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাঁদের দুজনের নাম শহীদ গোলাম মোস্তফা বাঘা ও শহীদ মোস্তাফিজুর রহমান। শহীদ নয় জনের মধ্যে আটজনের লাশ উদ্ধার করতে পেরেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। শহীদ গোলাম মোস্তফা আহত অবস্থায় ধরা পড়েছিলেন। পরের দিন বেয়নট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। সুবেদার ইসমাইলও এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধযাত্রার পয়েন্ট ছিল ফরিদপুর বিওপি। যুদ্ধে পাক সেনারা কিছু কৌশল অবলম্বন করেছিল। যুদ্ধকালীন তারা বাংকারে আলবদরদের রেখে সরে আসে। বাংকারের নিকটবর্তী ছিল ইউনিয়ন কাউন্সিল ভবন। তার ছাদে পাকসেনাদের এইচএমজি সেট করা ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ছিল এসএমজি। হঠাৎ এইচএমজির আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা দিশেহারা হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে হতাহত হয়ে পিছনে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।৫২৭
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চর মোহনপুর গ্রাম আক্রমণ: চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহর আগ্রাসনের মুখে ১০ ডিসেম্বর চর মোহনপুর গ্রামের পাক সেনা ঘাঁটি আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন দলনেতা সুবেদার ইসমাইল হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদ। সেদিন ১০ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা চর বাগডাঙ্গা থেকে চাঁপাই নবাবগঞ্জ অভিমুখে রওনা দিয়ে ১০ মাইল হাঁটার পর পোড়াগাঁর পাশে মহানন্দার তীরে সাহেবের ঘাটে এসে পৌঁছান। নদীর ওপারে নামোশংকরাবাটি গ্রাম। সেখানে ফায়ার দিয়ে জেনে নিয়েছিলেন পাক সেনাদের অবস্থান নেই। সাহেবের ঘাট থেকে এক মাইল পশ্চিমে মোহনপুর ঘাটে আসেন মুক্তিযোদ্ধারা। এখানে এসে জানতে পারেন নদীর ওপারে মোহনপুর গ্রামে পাকসেনাদের ঘাটি আছে। ঘাটের পাশে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর নদী পার হবার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে নৌকায় ওঠেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদের নেতৃত্বাধীন দল। পরে ইপিআর সুবেদার ইসমাইল হোসেন সদলবলে নৌকায় নদী পার হন। নদীতীর থেকে আরো আধ মাইল দূরে চর-মোহনপুর গ্রামে শত্রুদের বাংকার। কিছু দূর অ্যাডভান্সের পর মুক্তিযোদ্ধারা ফায়ার ও দুই ইঞ্জি মটার থেকে সেলিং করেন। কয়েকটি গুলি বিনিময়ের পর শত্রুদের বাংকার দখলে আসে। দুজন রাজাকার ধরা পড়ে। অন্যরা পালিয়ে যায়। সেখানে কোনো পাকসেনা ছিল না। ছিল রাজাকার,আল শামস ও আল বদর।৫২৭
রাজারামপুরের যুদ্ধ: সুবেদার ইসমাইল হোসেনের দল মোহনপুর থেকে টিকারামপুরে চলে আসেন। এ গ্রামে বসেই ১২ ডিসেম্বর রাজশাহী থেকে চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহরের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্নকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ উদ্দেশ্যে তাঁরা তিন মাইল পূর্বে বটতলা হাটের পাশে রাজারামপুর গ্রামে আসেন। পাশেই হাসিনা গার্লস হাই স্কুল। এখানে বিকাল পাঁচটায় পাক সেনারা মটার হামলা শুরু করেন। গোলার আঘাতে স্কুল ভবনের অংশ ভেঙ্গে পড়ে। পাকসেনারা সেলিং করছিল প্রায় দু মাইল দূরের শিয়ালা ক্যাম্প থেকে। মুক্তিযোদ্ধারা বাঁশবাগানের সঙ্গে রাস্তা বরাবর পজিশন গ্রহণ করেন। কিছুক্ষণের মধ্যে বটতলা বরাবর পাকসেনাদের দুটা লরি দেখতে পান। লরি দুটা রেঞ্জের মধ্যে এসে পড়লে মুক্তিযোদ্ধাদের এলএমজি গর্জে ওঠে। লরি দুটার চাকা বার্স্ট হয়ে যায় এবং কয়েকজন পাকাসেনা আহত হয়। তারা পূর্ব-পশ্চিম রাস্তা বরাবর অবস্থান নেয়। মুখোমুখি যুদ্ধ একটানা তিন ঘণ্টা। শিয়ালা ক্যাম্প থেকে উপর দিয়ে আসে সেলিংয়ের গোলা। সেগুলো বাঁশের আগায় আঘাত পেয়ে বার্স্ট হয়ে শুধু বারুদবিহীন টুকরো পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গায়ে। পাকসেনাদের ভারি অস্ত্রের কাছে টিকতে না পেরে অবশেষে রাত আটটার দিকে পিছনে সরে যাবার নির্দেশ দেন সুবেদার ইসমাইল হোসেন। সুবেদার ইসমাইল হোসেনের দল টিকারামপুর গ্রামে ফিরে আসেন।৫২৭ 
৭নং সেক্টরের ৩নং সাব সেক্টর (মহদীপুর সাবসেক্টর) এর শেষ সপ্তাহর যুদ্ধ ও বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: ৭নং সেক্টরের ৩নং সাব সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। এ দলে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কাইউম, লেফটেন্যান্ট রশিদ, লেফটেন্যান্ট আউয়াল, মর্টার প্লাটুন কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মো. নওশের আলী। ৬ ডিসেম্বরের পূর্বে এ দলের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ও অস্ত্র ছিলনা। ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকার স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের পর পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ করার মতো প্রয়োজনীয় বারুদ ও অস্ত্র আসে। ৭ ডিসেম্বর ৩নং সাব সেক্টরের পুরো দল ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর নেতৃত্বে চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহর দখলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। প্রথমে তাঁরা কানসাটের ধোবড়া এলাকার আমবাগানের পাক আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ করে। কিন্তু ক্যাম্পটি ছেড়ে পাক আর্মিরা পূর্বে চলে গিয়েছিল। ৮ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা শিবগঞ্জের প্রধান রাস্তা ধরে এগিয়ে যায় চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহরের উদ্দেশ্যে। ৯/১০ ডিসেম্বর এসে পৌঁছায় মহানন্দা নদীর পশ্চিম তীরে বারোঘরিয়ায়। পাক আর্মিরা তখন শহরের  চারদিকে নদীর ধার ঘেষে শক্ত অবস্থানে। বারোঘরিয়ায় পৌঁছে মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকজন পাক আর্মি ও রাজাকারকে নৌকা যোগে মহানন্দা পার হতে দেখে গুলি ছুড়লে দুই ধার থেকে তুমুল বেগে গুলি বষর্ণ শুরু করে পাক আর্মিরা। উভয় পক্ষের গুলি ও মর্টার সেল নিক্ষেপ চলে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে পাকিস্তানী আর্মির একটি দল চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহরের উত্তর দিক থেকে নৌকায় মহানন্দা পার হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করার চেষ্টা করলে তাঁদের প্রতিরোধ করে লেফটেন্যান্ট রশিদের নেতৃত্বাধীন একটি দল। এ যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১৩ ডিসেম্বর ভোরে নদী পার হয়ে শহর দখল। এ উদ্দেশ্যে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে ১৮/২০ জনের একটি দল বারোঘরিয়া থেকে আরো দক্ষিণে গিয়ে নদী পার হয়। দলে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মো. নওশের আলী। নদী পার হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা রেহাইচরে উঠেন। চর থেকে দুপুরে তাঁরা গ্রামে পৌঁছান। গ্রামের মানুষ তাদের গরু জবাই করে খাওয়ান। দুপুরের খাবারের পর ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নওশের আলীকে বারঘরিয়া ফিরে গিয়ে আর্টলারী গানগুলো আমবাগানে পজিশন করার নির্দেশ দেন। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর পরের দিন ১৪ ডিসেম্বরের ভোরে লেফটেন্যান্ট কাইউমকে পুরো দল নিয়ে এখানে পৌঁছানোরও নির্দেশ দেন। নির্দেশের পর তিনি মেজর গিয়াসের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। মুক্তিযোদ্ধা মো. নওশের আলী নির্দেশ মোতাবেক বারোঘরিয়া যান। কাজ সেরে সন্ধ্যায় ফিরে আসেন নওশের আলী। মেজর গিয়াসের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ফিরে আসেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরও। দুজনে একটি ঘরে ম্যাপ নিয়ে বসে যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে করতে রাত কাটিয়ে দেন। 
১৪ ডিসেম্বর খুব ভোরে লেফটেন্যান্ট কাইউম তার দল নিয়ে পৌঁছে যান। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর দুজন সেকশন কমান্ডারসহ নওশের আলীকে পাক আর্মিদের বাংকার চিহ্নিত করে আর্টলারী গান থেকে রেঞ্জিংয়ের নির্দেশ দেন। নওশের আলীরা তিনজন বেরিয়ে যান পাক আর্মি বাংকারের খোঁজে। তাঁদের প্রতি নির্দেশ ছিল স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা না নেয়ার। কিন্তু আলাউদ্দিন নামের ১০/১২ বছরের তেজস্বী এক বালক সহযোগিতার জন্য স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসে। মো.নওশের আলীর অপর দুই সঙ্গী তাঁর দিকে বন্দুক তাক করলেও সে সাহসের সঙ্গে বলেছিল, আপনাদের কোনোভয় নেই। আমি আপনাদের এমন নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাব, সেখান থেকে আপনারা বাংকার দেখতে পেলেও পাক আর্মিরা আপনাদের দেখতে পাবেনা। তাঁকে বিশ্বাস করে ফলোআপ করেন নওশের আলীরা এবং তাঁর কথা মতো জায়গা পায়। তখন পাশের একটা বিল্ডিংয়ে অবস্থান নিয়ে তাঁরা ওয়্যারলেসে আর্টলারীম্যানদের বাংকারের অবস্থান জানাতেই বাংকার থেকে কিছু দূরে একটা শেল পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বাংকার থেকে শুরু হয় পাক আর্মিদের গুলি বর্ষণ। তখন কিছুটা অবস্থান পরিবর্তন করে আবারও শেল নিক্ষেপের নির্দেশ প্রদান করা হয়। দ্বিতীয় শেল পড়ে প্রথম বাংকারের ২০/২৫ গজ সিমানার মধ্যে। হিসেব মিলে যাবার কারণে মো. নওশের আলীরা আনন্দিত হন। সকালে কুয়াশা খুব ঘন ছিল। দৃষ্টি বেশি দূরে দেয়ার সুযোগ ছিলনা। মো.নওশের আলীরা অবস্থান ছেড়ে কিছু দূর যেতেই ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের দেখা পান। জাহাঙ্গীর ওদের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। তিনি পুরো দলকে তিন ভাগ করে মূল দলের সরাসরি নেতৃত্বে থাকেন। সঙ্গে নেন নওশের আলীকেও। মূল রাস্তা ধরে এগিয়ে গিয়ে তাঁরা বাংকারে গুলি বর্ষণ শুরু করে। শেলও চলে। এ সময়ে একজন গিয়ে বাংকারে গ্রেনেড ছুড়তেই ছিন্ন ভিন্ন  হয়ে পড়ে বাংকার। প্রথম বাংকার দখলের পর মুক্তিযোদ্ধারা বীর দর্পে এগিয়ে যায়। একের পর এক বাংকার দখলের সঙ্গে সামনে এগিয়ে  যান ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর । তখনই পাকিস্তানী আর্মির একটি গুলি মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের কপাল ভেদ করে। সঙ্গেই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলী। তিনি ওয়্যারলেসে ঘোষণা দেন, ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর ইজ সিরিয়াসলি য়ুনডেড। পরে সহকর্মীরা তাঁকে জানিয়েছিলেন, আসলে ওয়্যারলেসের ঘোষণা ছিল, টাইগার আর নেই। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের কোড নেম ছিল টাইগার। বাংলা মায়ের সত্যিকারের এ অকুতোভয় সন্তানের কপালের গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গেই মুখ দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত ঝরা শুরু করে। সে সময় কি যেন বলতে গিয়ে পারেননি। হয়তো সঙ্গীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার? নাকি অকুতভয়ে সামনে চলার? 
নওশের আলীরা মাতৃভূমির জন্য নিবেদিত বীরের নিথর দেহটাকে সেখান থেকে নিয়ে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ঐ জায়গাটা ছিল বর্তমান মহানন্দা নদীর উপরে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতুর কিছুটা উত্তরে। নওশের আলীরা কোনোএকটা অচিন জায়গায় লাশটা রেখে বারোঘরিয়া ফিরে যান। সেখান থেকেই গুলি বর্ষণ চলতে থাকে। এক সময় খবর পান, পাক আর্মিরা চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহর ছেড়ে রাজশাহীমুখী হয়েছে। চাঁপাই নবাবগঞ্জ নিবাসী (বর্তমান মহিষবাথান, রাজশাহী কোর্ট) ৪নং সাব সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদের নিকট থেকে জানা যায়, পরের দিন ১৫ ডিসেম্বর ৪ নং সাব সেক্টরের এক দল মুক্তিযোদ্ধা শিবতলাই একটা নিচু মতো জায়গায় শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের লাশ দেখতে পান। ৪নং সাব সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নদী পার করে। সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে ৭নং সেক্টর কমান্ডার মেজর নজমুল হকের পাশেই বীরকে সমাহিত করা হয়।৬৮৩
রেহাইচর পাকসেনাদের ঘাটি আক্রমণ ও বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের লাশ: ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর সংঘর্ষ বেঁধে গেলে সুবেদার ইসমাইল হোসেনের নেতৃত্বাধীন দল খুব ভোরে টিকারামপুর হতে চাঁপাই নবাবগঞ্জ অভিমুখে অ্যাডভান্স শুরু করেন। তাঁর অধীনে কয়েকটি প্লাটুনের অন্তত পাঁচশ জন মুক্তিযোদ্ধা। একটা প্লাটুনের কমান্ডার ছিলেন মো. আব্দুস সামাদ। রেহাইচরে আসতেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। দু’ইঞ্চির মর্টার থেকে গোলা ছুড়েই পাক বাহিনীকে ঘায়েল করেন মুক্তিযোদ্ধারা। ক্রোলিংয়ের মাধ্যমেই অ্যাডভান্স। ১৫ ডিসেম্বর রেহাইচর ঘাঁটি আক্রমণ করতেই পালিয়ে যায় পাকসেনারা। বাঙ্কারে ফেলে যাওয়া প্রচুর অস্ত্র, গোলা বারুদ ও খাদ্য সামগ্রী পান মুক্তিযোদ্ধারা। ঘাঁটি দখলের পর শহরমুখী অ্যাডভান্স। শিবতলা নামক স্থানে পৌঁছেই চমকে ওঠেন মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁরা দেখতে পান সিঅ্যান্ডবি ঘাটের কাছে বটগাছের পাশে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের লাশ। কপালে গুলির আঘাত। ১৪ ডিসেম্বর শত্রুপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধে তাদের বাংকার দখল করে নিয়েছিলেন তিনি। সেখানেই গুলিবিদ্ধ হন।
ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের লাশ নদীর ওপারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ মহান বীরের মৃত্যুতে মুক্তিযোদ্ধাদের মনের শোক প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। শিবতলা গ্রামের পূর্ব-পশ্চিম বরাবর রাস্তায় অবস্থান নেন মুক্তিযোদ্ধারা। সে সময় পাকিস্তানী পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি দল ইয়া আলি ইয়া আলি বলে চিৎকার দিয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসে। মুক্তিযোদ্ধাদের রেঞ্জের মধ্যে প্রবেশ করতেই  ৮ জন লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। অন্যরা পিছনে ফিরে দৌড় দেয়। এর কিছুক্ষণ পর পাক সেনাদের মটার সেলের আক্রমণ শুরু হয়। ঐ সেলের গোলাই কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হন। নবাবগঞ্জ কলেজের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের মর্টার পার্টির সবাই শহীদ হন। যুদ্ধরত অভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যের জন্য গ্রামের মানুষ এগিয়ে আসেন। কিন্তু মর্টার পার্টি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হওয়ায় কোণঠাসা হয়ে পড়েন মুক্তিযোদ্ধারা। এ অবস্থায় বিকেল চারটায় মেজর গিয়াস ওয়্যারলেসের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সরে আসার নির্দেশ পাঠান। অবশেষে অভুক্ত অবস্থাতেই সন্ধ্যার সময় টিকারামপুর ফিরে আসেন মুক্তিযোদ্ধারা। তখন তাঁরা প্রায় সপ্তাহ খানেক থেকে গোসলহীন ও অভুক্ত। স্থানীয় গ্রামবাসীর সহযোগিতায় তাঁরা কিছু খেতে পান। পরের দিন ১৬ ডিসেম্বর যখন পুনরায় শহর আক্রমণের পরিকল্পনা করেন, তখন খবর আসে পাক সেনারা আত্মসমর্পণ করেছে।৫২৭
রানীনগরের যুদ্ধ (নওগাঁ): রানীনগর শত্রুমুক্ত করার উদ্দেশ্যে চণ্ডিপুর গ্রামে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। পরিকল্পনায় অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম রাঙ্গা, রঞ্জু, হারুন, দুলু, সোলেমান, রাজ্জাক, নইবর, আজিজার ঠান্ডু। অ্যাকশন শুরু হয় ৯ ডিসেম্বর ভোর ৮টায়। পরিকল্পনা মাফিক মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অ্যাকশনে আসেন মালেক বাহিনী, হক বাহিনী ও কমিউনিস্ট গেরিলারা। রেলক্রসিংয়ের ঘুমটি ঘর থেকে বাজারের দিকে আহমদের বাড়ির দোতলায় রাজাকার ক্যাম্প। স্টেশনের প্লাটফর্মে পাকিস্তানী মিলিশিয়াদের বাংকার।
মুক্তিযোদ্ধারা পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে অগ্রসর হন। রেলক্রসিং ও ঘুমটি ঘর থেকে রাজাকার ক্যাম্পে গুলি শুরু করলে স্টেশন প্লাটফর্মের বাংকার থেকে পাকিস্তানী মিলিশিয়ারা গুলি বর্ষণ আরম্ভ করে। মুক্তিযোদ্ধারা তখন ঘুমটি ঘরের পাশে ইট সাজিয়ে সেভিং পজিশন নিয়ে আক্রমণ করে। পাকিস্তানী মিলিশিয়ারা তখন থানার দিকে পালিয়ে যায়। এরপর আত্রাই থেকে আসা পাকবাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধের লক্ষ্যে ডেটোনেটর ও আরো কিছু উপকরণ ব্যবহার করে রেললাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তাঁরা পরবর্তী কৌশল নির্ধারণের জন্য আলোচনায় বসেন। আমজাদ মিয়ার বাড়ির পাশে আমতলার এ সভায় অংশ গ্রহণ করেন ইব্রাহিম, তকিম, কামরুল, রাজ্জাক, সোলেমান, সমসের, আক্কাসসহ আরো কয়েকজন। পরে যোগ দেন নুরুল ইসলাম ও দুলু। সিদ্ধান্ত মোতাবেক পরের দিন ১০ ডিসেম্বর ভোরেই পাকসেনা ও রাজাকারদের উপর গুলি ও গ্রেনেড আক্রমণ স্কুল ও থানায়। অ্যাকশনের সময় নুরুল ইসলাম রাঙা আহত হন। অবশেষে পাকসেনারা সান্তাহারের দিকে পালিয়ে যায়। স্কুলে থাকা রাজাকারেরা আত্মসমর্পণ করে। রাণীনগর শত্রু মুক্ত হয়।৫২৮