ফিরে যেতে চান

সাব সেক্টর ও সাব সেক্টর কমান্ডার

সাব সেক্টর     -    সাব সেক্টর কমান্ডার
লালগোলা               -      মেজর গিয়াস উদ্দিন
মেহেদীপুর     -    ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর
হামজাপুর        -    ক্যাপ্টেন ইদ্রিস
ভোলাহাট        -    লে. রফিকুল ইসলাম
মালন        -    একজন সুবেদার মেজর
লেখাপড়া        -    মেজর রশিদ
তপন        -    একজন সুবেদার 
ঠোকরাবাড়ি    -    সুবেদার মোয়াজ্জেম
আঙ্গিনাবাদ    -    একজন সুবেদার
মনসুর আহমদ খান সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী (১৯৯৪) গ্রন্থে ওয়াহিদা আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী শিরোনাম প্রবন্ধে ৭ নং সেক্টরের উপরোক্ত ৯টি সাব সেক্টর ও সাব সেক্টর কমান্ডারদের নাম পাওয়া যায়। আবার ২০০৪ সালে মুক্তযুদ্ধ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস ৭নং সেক্টর গ্রন্থে এ সব নামের মধ্যে কিছু অমিল লক্ষ্য  করা যায়। এ গ্রন্থের তথ্য অনুসারে সাব সেক্টরসমূহ:
    
 
সাব সেক্টর       -     সাব সেক্টর কমান্ডার
    মালঞ্চ           -     সুবেদার মেজর মুজিব
    তপন             -     মেজর নাজমুল হক। পরে একজন সুবেদার।
    মেহেদীপুর       -     ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। পরে সুবেদার ইলিয়াস। 
    ভোলাহাট        -     লে. রফিকুল ইসলাম।
    হামজাপুর        -     ক্যাপ্টেন ইদ্রিস আলী খান।
    আঙ্গিনাবাদ       -     সুবেদার মোয়াজ্জেম হোসেন।
    ঠোকরাবাড়ি      -     সুবেদার মোয়াজ্জেম হোসেন।
    লালগোলা         -     মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী।
    শেখপাড়া        -     ক্যাপ্টেন আব্দুর রশিদ।
এ সাব সেক্টরগুলো ব্যতীত স্থানীয় পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্নভাবে রাজশাহীতে মুক্তিযুদ্ধ করেন। 
২৯ এপ্রিল দিবাগত রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র আসাদ আহমদ বায়রনের নেতৃত্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানপুরে এক গেরিলা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে নাম না জানা মাত্র এগার বছরের এক কিশোরের দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করে বীরত্বের পরিচয় দেয়। রাত সাড়ে ন’টার দিকে দুর্লভপুর গেরিলা শিবির থেকে বায়রনের নেতৃত্বে একদল বাহিনী নৌকায় যাত্রা আরম্ভ করে। রাত পৌঁনে এগারটায় কানপুরের নিকট পৌঁছে একটা আখক্ষেতে নৌকা বেঁধে ঐ দুঃসাহসী কিশোরের পথ নির্দেশনায় এক বুক পানি ভেঙ্গে যাত্রা আরম্ভ করেছিল। একটা আমবাগানে পৌঁছতেই শিবগঞ্জ ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাক সেনারা গোলাগুলি শুরু করে। বাগানের মধ্যে দায়িত্ব বন্টন করে দেয়া হয়েছিল। এরপর কাছে নিয়ে গিয়ে পাঞ্জাবী ও রাজাকারদের ট্রেঞ্চ ও বাংকারগুলো দেখিয়ে দিয়ে নিজেই ক্রলিং করে পাহারারত রাজাকারকে গলা টিপে হত্যা করে অস্ত্র কেড়ে নিয়েছিল এ কিশোরটি। দলীয় নেতার নির্দেশ মত পাঞ্জাবী বাংকারে গ্রেনেড চার্জ করেছিল গেরিলারা। প্রচণ্ড বিস্ফোরণের সংগে সংগে বাংকার ধ্বসে পড়ে এবং অবস্থানরত (ঘুমন্ত) তিনজন পাঞ্জাবীই প্রাণ হারিয়েছিল। পাশের বাংকারে গ্রেনেড চার্জের ফলে চারজন রাজাকার মারা পড়ে। পর্শ্ববর্তী এক বাড়ি থেকে দুজন রাজাকার ও তিনজন দালাল পাঞ্জাবীদের কাছে খবর দেবার উদ্দেশ্যে পালানোর পথে গেরিলাদের লক্ষ্য অভ্রষ্ট গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে পাঞ্জাবীরা খবর পেয়ে এক কোম্পানী সেনা ও রাজাকার নিয়ে আক্রমণের জন্য রওনা হয়। আখ ক্ষেতে রেখে আসা নৌকার পাহাররত গেরিলারা গুলি ছুড়ে এ পাঞ্জাবী কোম্পানিকে প্রচণ্ডভাবে ঘাবড়ে দেয়। তারা ভালভাবে কিছু বোঝার পূর্বেই গেরিলা মুক্তিবাহিনী নৌকায় ফিরে আসে। ফলে বায়রনের নেতৃত্বে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের কানপুর অপারেশন সফল হয়। এ অপারেশনে মুক্তিযোদ্ধারা একটি এলএমজি, দুটি চীনা স্বয়ংক্রিয় রাইফেলসহ বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করেছিল।১০৩  
১০ মে নায়েব সুবেদার মুবাশ্বেরুলের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল চাটঘাট থানা রেড করেন। এতে মিলিশিয়াসহ ১০ জন পাক সেনা নিহত হয় ও ৭ জন  আহত হয়। 
১৩ মে হাবিলদার খন্দকার আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে এক সেকশন মুক্তিযোদ্ধা সারদা পিটিসির পাকসেনা ঘাঁটি আক্রমণ করে ৬ জন পাক সেনাকে হত্যা করে। 
১ জুন পাক কর্তৃপক্ষ রাজশাহী শহরে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় খোলার নির্দেশ জারি করেছিল। ১ জুলাই শিক্ষকদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দেয়া হয়। ক্লাস শুরু হয়েছিল ২ আগস্ট। ২৩ জুন মুক্তিযোদ্ধারা প্রথম গ্রেনেড হামলা করেছিল। ফলে পাওয়ার হাউজের প্রচুর ক্ষতি হয়েছিল এবং শহরে দুদিন বিদ্যুৎ ছিলনা। মো. আব্দুল গফুরের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল এ হামলা চালায়।১০৩ 
সুবেদার মেজর মজিদের নেতৃত্বে ১০ আগস্ট পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর শিবগঞ্জ থানার কলাবাড়ীতে যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে ৬৪ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশগ্রহণ করেছিল। সুবেদার মেজর মজিদ তাঁর দলকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ভোর সাড়ে পাঁচটায় পাক সেনাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং দেড় ঘণ্টা গুলি বিনিময়ের পর কলাবাড়ী মুক্তি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে।১১৯
২২ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধারা রাজশাহী জেলার চারঘাট থানার অন্তর্ভুক্ত পাকঘাঁটি মীরগঞ্জ বিওপি আক্রমণ করলে পাক সেনাদের পাল্টা আক্রমণে পিছু হটে আসে। ২৩ আগস্ট ক্যাপ্টেন ইদ্রিস ও সুবেদার মেজর মজিদ যৌথভাবে পাক বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি কানসাট আক্রমণ করেন। পাক বাহিনীর প্রতিরোধ আক্রমণে মুক্তি বাহিনী ঐ দিন কানসাট থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। 
২৬ আগস্ট পুনরায় কানসাটে যুদ্ধ হয়। প্রথমে মুক্তি বাহিনীর তীব্র আক্রমণে পাকসেনারা কানসাট ছেড়ে দেয়। কিন্তু পরক্ষণেই তারা পাল্টা আক্রমণ  ও প্রচণ্ডভাবে গোলাবর্ষণ করে। এ গোলার আঘাতে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেপ্টেম্বর মাসে ৭নং সেক্টরের প্রতিটি সাবসেক্টরেই পাকসেনাদের ওপর মুক্তিযোদ্ধারা অবিরামভাবে আক্রমণ চালান। 
৭ অক্টোবর রাজশাহী মহানগরীর কুঞ্জ মোহন মৈত্রের বাড়ির বৃহত্তর রাজাকার ঘাঁটি ও মোসলেম সাহেবের বাড়ির আলবদরের দপ্তর ধ্বংস করার জন্য বীরাঙ্গনা শওকত আরা একটি অভিযান চালিয়েছিলেন। এ সাহসী নারী পরিকল্পনা মাফিক একটি ২৪ ইঞ্চি টিনের ট্যাংকে ৪টি এন্টি ট্যাংক মাইন, এক্সপ্লোসিভ ও ৪টি এসএমজি, বেশ কিছু গ্রেনেড ও কারবাইনের ম্যাগজিন ভর্তি করে একটি রিক্সা শহরে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার পরিকল্পনা সফল হতে পারেনি।১০৩ তবে এ ঘটনার ভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। যা এ অধ্যায়ের মুক্তিযোদ্ধা আলী মনসুরের পাণ্ডুলিপি শিরোনামে আলোচনা করা হয়েছে।
১৪ অক্টোবর মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে পাকসেনা ও রাজাকারদের সংঘর্ষে একজন পাক মেজরসহ ৩০জন শত্রু সৈন্য নিহত হয়।১১৯  ২২ নভেম্বর শাহপুর গড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাক সেনাদের যুদ্ধ শুরু হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় শাহপুর গড়ের যুদ্ধই ছিল সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। পাক বাহিনীর আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিল এবং শাহপুর গড় ছেড়ে তাঁরা দলাদলিতে চলে এসেছিল এবং অনেকে নদী অতিক্রম করে আলীনগরেও চলে গিয়েছিল। পরের দিন মুক্তিযোদ্ধারা শাহপুর গড় পুনর্দখলের অভিযান আরম্ভ করে। পরিকল্পনা অনুসারে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মেহেদীপুর থেকে তাঁর বাহিনী নিয়ে এসে শাহপুর গড় আক্রমণ করেন। লে. রফিক, নজরুল, আলতাফ, ওয়াশিল এ আক্রমণে অংশ গ্রহণ করেন। প্রায়  দেড় ঘণ্টা যুদ্ধ চলার পর পাকসেনারা শাহপুর গড় ছেড়ে বিষ্ণুপুর ও কসবা এলাকায় পালিয়ে যায়। সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল নুরুজ্জামান এ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। এরপর আলীনগর ব্রিজের কাছে আক্রমণ চালালে পাঁচ পাকসেনা নিহত হয়। এছাড়া মো. রফিকের নেতৃত্বে আমবাগানে পাকসেনাদের ঘাঁটিতে আক্রমণ চালালে বহু পাকসেনা হতাহত হয় ও একজন পাক মেজর ধরা পড়ে। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা সুলতান শহীদ হন। ২৭ নভেম্বর ক্যাপ্টেন গিয়াসের নির্দেশে মুক্তি বাহিনীর ৫টি কোম্পানি পাকসেনাদের শক্ত ঘাঁটি পোড়াগ্রাম আক্রমণ করে। দীর্ঘ স্থায়ী এ সংঘর্ষে ৩০ জন পাকসেনা ও ৫০ জন রাজাকার নিহত হয় এবং পাকসেনারা শেষ পর্যন্ত চাঁপাই নবাবগঞ্জে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। ১০ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিযোদ্ধারা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওপর ব্যাপক হামলা আরম্ভ করে এবং এখানেই এক যুদ্ধে ১৪ ডিসেম্বর বীর শ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর শহীদ হন। এ দিনই চাঁপাইনবাবগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়। ১৫ ডিসেম্বর সম্মিলিত মুক্তি বাহিনী ও মিত্রবাহিনী রাজশাহী প্রবেশ করলে পাক সেনারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। বস্তুত ১৬ ডিসেম্বর রাজশাহী পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে পুরো সেক্টর এলাকা মুক্ত হয়।১১৯ ১৭ডিসেম্বর সকালে শহরের বিভিন্ন এলাকা ও আশেপাশে মোতায়েনকৃত পাক সেনারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসে। ১৮ ডিসেম্বর খুব ভোরে পাক সেনারা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে নাটোর চলে যায় এবং সেখানে বিকেলে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করে। পাকসেনারা ছেড়ে যাবার পর ১৮ ডিসেম্বর মুক্তি বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে জোহা হলে অবস্থান নেয় ও ক্যাপ্টেন গিয়াস বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন।১২১    
রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বদিউজজামান টুনু ও নূর হামীম রিজভীকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
রাজশাহী বিভাগীয় মুক্তিযোদ্ধা প্রতিনিধি সমাবেশ ২০০৩ স্মরণিকা থেকে জানা যায়, ১৬ ডিসেম্বর রাজশাহী শহর শত্রুমুক্ত হলেও চাঁপাই নবাবগঞ্জের দিক থেকে ৪নং সাব সেক্টর কমান্ডর মেজর গিয়াস ১৭ ডিসেম্বর রাজশাহী এসে পৌঁছান। ১৮ ডিসেম্বর শহরবাসী মাদ্রাসা ময়দানে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা প্রদান করেন। উত্তরাঞ্চলে অবস্থানরত পাক সেনারা ২০ ডিসেম্বর নাটোরে সমবেত হয়ে মিত্র বাহিনীর কাছে আত্ম সমর্পণ করে।