ফিরে যেতে চান

জাতীয় স্বার্থে এ দেশের মানুষ যত ইতিহাস রচনা করেছে, তার প্রতি ঘটনাতেই রাজশাহী মহনগরী সাহসী ভূমিকায় অটল থেকেছে। এ কথায় সত্য, বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জন ও যে কোনো অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ, প্রতিবাদ ও সংগ্রাম গড়ে তোলায় এখানকার মানুষের বৈশিষ্ট্য। জাতির শ্রেষ্ঠ ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধ, যার ভিত্তি ভাষা আন্দোলন; সেই আন্দোলন থেকে পরবর্তীতে পাক শাসক গোষ্ঠীর শোষণ-নিপীড়ন আর অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে যতগুলো আন্দোলন  গড়ে উঠেছে তার কোনোটাতেই এ মহানগরী পিছিয়ে ছিল না। দেখা যায় ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র লড়াই শুরু হয়েছিল বৃহত্তর রাজশাহীর রহনপুরে (বর্তমানে চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার অন্তর্গত)। এ বিষয়ে মনসুর আহমদ খান সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী গ্রন্থের ৬৮ পৃষ্ঠায় মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসির মন্তব্যে উল্লেখ আছে, ৭১ সালের ২৩ মার্চ একজন পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে কয়েকজন সৈন্য রহনপুর ইপিআর ক্যাম্পে সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে গেলে বাঙ্গালী সৈন্যরা পাঞ্জাবী সৈন্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। পরদিন ২৪ মার্চ একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে কয়েকজন সৈন্য ঘটনা তদন্ত করতে গেলে  বাঙ্গালী হাবিলদার আক্কাস পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনকে গুলি করে হত্যা করেন। ২৩ মার্চের গুলিবর্ষণ ও ২৪ মার্চের পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই শুরু করে মুক্তি পাগল বাঙ্গালী। (মেজর রফিকুল ইসরাম পিএসসির মন্তব্যটি ২০ জুলাই ১৯৯৩ তারিখের আসলাম সরকার সম্পাদিত সাপ্তাহিক দুনিয়ায় প্রকাশিত হয়)১০৩
মনসুর আহমদ খান সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী গ্রন্থের ৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে ১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারি মাসে বিআটি, রাজশাহীতে (বর্তমান রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্ররা বাংলাদেশ স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন। এ পতাকার ডিজাইন করেছিলেন এখানকারই প্রাক্তন ছাত্র কাইয়ুম ও আকরামুজ্জামান। 
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে শুরু হলেও এ দেশের মানুষ তার পূর্বেই মানসিকভাবে আলাদা হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৭০ সালের  সাধারণ নির্বাচনের বিজয় তারই ফলশ্রুতি। পাক শাসকগোষ্ঠীর গণতন্ত্র ও এ দেশের মানুষের প্রতি যে বিন্দু মাত্র ভক্তি ও ভালবাসা ছিল না তা এ নির্বাচনের ফলাফল থেকেই স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ সামরিক প্রেসিডেন্ট লে. জে. ইয়াহিয়া খান ও মার্চে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ঘোষণা করার পরপরই বাংলাদেশের তৎকালে পূর্ব পাকিস্তানের সমগ্র মানুষ জ্বলে উঠেছিল। বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল রাজশাহীতেও। 
১ মার্চ দুপুরে রাজশাহী কলেজে খুরশিদ বিন আলমের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল কুদ্দুস (সাবেক প্রতিমন্ত্রী) ঐ সভায় ভাষণ দেন। এছাড়া ছাত্রলীগ নেতা আব্দুস সামাদ, মাহাফুজুর রহমান খান, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হাবিবুর রহমান টুকু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সভায় একটি ছোট পাকিস্তানী পতাকায় আগুন লাগানো হয়। খুরশিদ আলম কলেজ অফিসের ছাদে উঠে পাকিস্তানী পতাকাটিতে আগুন লাগান। সভা শেষে কোর্ট অভিমুখে মিছিল বের হয়। ঐ মিছিল বেতার কেন্দ্র, এসপি অফিস, ডিসি অফিস, জজ কোর্টের পাতাকাতে আগুন ধরায়। ঐ দিন রাজশাহী কলেজের ঐ সভায় এক দফা স্বাধীনতার দাবি করা হয়।১৯১
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বদলীয় ছাত্র সমাজ ১ মার্চ হতে ৩ মার্চ ক্যাম্পাসে ও শহরে জঙ্গী মিছিল বের করেছিল। ৩ মার্চ হরতাল ও মিছিলের শহরে পরিণত হয়েছিল রাজশাহী। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোর্ট পর্যন্ত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিলের প্রতিবাদে গর্জন উঠেছিল মিছিলে মিছিলে। পুলিশ লাঠি চার্জ, টিয়ার গ্যাস ও গুলি নিক্ষেপ করে মিছিলে বর্বরতা চালায়। বেলা সাড়ে এগারটার দিকে মালোপাড়া টেলিফোন ভবনের ওপর থেকে বিক্ষোভ মিছিলে গুলিবর্ষণ করে বাটার মোড়ে একজন ছাত্রকে হত্যা করে।১১৮ এর ফলে রাজশাহীর ছাত্র, বুদ্ধিজীবীসহ সর্ব পেশার মানুষ আরো অশান্ত হয়ে ওঠেন। পাক বাহিনী সান্ধ্য আইন জারি করেছিল এবং ১২ ঘণ্টার সময় দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হল ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। উপাচার্য এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে অপসারিত হন।১১৯ ৫ মার্চ গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ভুবনমোহন পার্কে আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ সভা করে।১০৩ এদিন পাকসেনারা সাহেব বাজারের শাকসবজি লুট করে নিয়ে যায়। ৮ মার্চ ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা মিয়াপাড়াস্থ সাধারণ গ্রন্থাগারের চত্বরে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য যোদ্ধা বাছাই কর্মসূচি শুরু করে এবং যুবকরা দলে দলে যোগ দেন। এর নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মালেক চৌধুরী।১০২ ১০ মার্চ রাজশাহী শহর থেকে সান্ধ্য আইন তুলে নেয়া হয়।১০৩ ১১ মার্চ ভুবন মোহন পার্কের জনসভায় এএইচএম কামারুজ্জামান ভাষণ দেন। ১২ মার্চ ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুসহ অন্যান্য শিল্পীরা স্বাধীনতার স্বপক্ষে রাজশাহীর বিভিন্ন রাস্তায় গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন। এদিন রাতে বোমা বানানোর রসদ সংগ্রহের জন্য কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সায়েন্স ল্যাবরেটরি লুট হয়।১০২ ১৩ মার্চ জনতার আন্দোলন আরো জোরদার হয়ে ওঠে। ১৪,১৫ ও ১৬ মার্চ সাংস্কৃতিক কর্মীরা মাঠে নামে এবং শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে পথে পথে, উন্মুক্ত মঞ্চে, ট্রাকযোগে দেশাত্মবোধক গান, গণসংগীত, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ১৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রামে পরিষদ গঠন করা হয়। এর আহবায়ক হয়েছিলেন আব্দুল কুদ্দুস ও শরিফ উদ্দিন। এদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ রাজশাহী মহানগরীতে উদ্দীপনামূলক গণসংগীতের আয়োজন করে। ১৮ মার্চ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র কর্মীদের দ্বারা বানানো বোমা পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ১৯ মার্চ ভাটাপাড়া লক্ষ্মীপুরে গঠন করা হয় মহিলা সংগ্রাম পরিষদ। এদিনই গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ২০ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার প্রতিবাদে মহানগরীতে কালো পতাকা উড়ানো হয়। ২১ মার্চ মহানগরীতে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছোট ছোট ইউনিট গঠন করে সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু করার উদ্দেশ্যে যুবকদের একত্রিক করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ২২ মার্চ থেকে প্রকাশ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ আরম্ভ হয় এবং রাতে একটি স্কুলের সায়েন্স ল্যাবরেটরি লুট হয়। ২৩ মার্চ পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দ্বিবসে শহরের হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ দিবস হিসেবে পালন করে। হাবিলদার আতাউর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ লাইনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।১০৩  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী কলেজ,তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান,  রাজশাহী ও রাজশাহী কোর্টেও পতাকা উত্তোলন করা হয়। এদিন মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর হোসেন, ডা. আব্দুল মান্নান, মাহফুজুর রহমান খান, আব্দুল মান্নান প্রমুখের নেতৃত্বে নগরীতে ছাত্র-যুবকের সমন্বয়ে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। ২৪ মার্চ সেনাবাহিনীর টহলের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর টহল চলে মহল্লায় মহল্লায়। ২৫ মার্চ মিছিল ও দিবাগত রাতে ভুবন  মোহন পার্কে পাক শাসকদের বিরুদ্ধে রক্ত কথা বলে নাটক মঞ্চস্থ হয়।  (মুনসুর রহমান খান সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের রাজশাহী গ্রন্থে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে ভুবন মোহন পার্কে অনুষ্ঠিত নাটকটির নাম রক্ত কথা বলে উল্লেখ থাকলেও রাজশাহী বিভাগীয় মুক্তিযোদ্ধা প্রতিনিধি সমাবেশ ২০০৩ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় নাটকটি রক্তের রঙ লাল নামে উল্লেখ আছে) এটি রচনা করেন প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব ও চলচ্চিত্র শিল্পী আতাউর রহমান। রচনায় সহযোগিতা ও পরিচালনা করেন আনোয়ারুল ইসলাম। রাজশাহীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বিশিষ্ট কবি, গীতিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মুস্তাফিজুর রহমান গামার গৌরবজনক অবদান প্রশংসার দাবি রাখে। তারপর ঢাকার মত এখানেও হত্যাযজ্ঞে নেমে পড়ে পাক সামরিক বাহিনী। মেজর আসলামের ২৫ পাঞ্জাব ব্যাটেলিয়ন রাজশাহীতে অবস্থান করছিল।১১৯ তাদের গণ হত্যায় শহীদ হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈশ প্রহরী আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগ নেতা এমএনএ নজমুল হক সরকার, শহর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ হাফিজ সাত্তার, অ্যাডভোকেট বীরেন সরকার, সেলিমউজ্জামান ও ওয়াসিমউজ্জামান দুই ভাই, হাসানুজ্জামান খোকা, সাইদুর রহমান মিনা, অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদীর ভাই আব্দুল হক, ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী খন্দকার আলী আফজাল ও তার ভগ্নিপতি রেভিনিউ অফিসার দেওয়ান সিদ্দিক হোসেন। 
রাজশাহী শহরে ইপিআর সেক্টর সদর দপ্তর ছিল। এর কর্মকর্তারা ছিল সবাই পশ্চিম পাকিস্তানী। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে এখানে বাঙ্গালি ইপিআর জোয়ান বাড়ানো হলেও তাঁদের নিরস্ত্র করে রাখা হয়েছিল। ২৫ মার্চ খান সেনারা পুলিশকে অস্ত্র জমা দানের জন্য চাপ দিলেও ডিআইজি মামুন মাহমুদ এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। ২৬ মার্চ পাক বাহিনী তাঁকে চিরদিনের জন্য ধরে নিয়ে যায়। পুলিশ বাহিনী পুলিশ লাইনের চারিদিকে বাংকার তৈরি করে সতর্ক প্রহরা বসায়। শত শত স্বেচ্ছাসেবী যুবক খবর পেয়ে তাঁদের সহযোগিতায় ছুটে যায় পুলিশ লাইনে। ঐ দিন রাজশাহীর রেডিও কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে জনগণ কলকাতা বেতার কেন্দ্রের ওপর নির্ভর হয়ে পড়েন।  সেখান থেকে বার বার প্রচার করা হচ্ছিল বাংলাদেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ঐ দিন সকালে নওগাঁর ইপিআর অস্ত্রাগারে স্বাধীন বাংলার পাতাকা উত্তোলন করা হয় এবং রাজশাহীতে মুক্তিবাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতা বয়তুল্লাহ ও আব্দুল জলিল, সামরিক অফিসার মেজর নজমুল ও ক্যাপ্টেন গিয়াস এর নেতৃত্ব দেন। নওগাঁয় পাকিস্তানী এসডিও ও ইপিআরদের  গ্রেফতার করা হয়েছিল।১১৯ উত্তেজিত জনতা পথে পথে বেরিকেড তৈরি করে পাক সেনাদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়। পাকসেনারা এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে কয়েকজনকে হতাহত করেও বেরিকেড নির্মাণ বন্ধ করতে পারেনি। ২৭ মার্চ শহরে মানুষের প্রতিবাদের ঝড় নামে। তাঁরা অস্ত্রের জন্য পুলিশ লাইনে ছুটে যায়। পাক বাহিনী পুলিশ লাইন আক্রমণ করে এবং ২৪ ঘন্টা যুদ্ধের পর ২৮ মার্চ পুলিশ লাইনের পতন ঘটে। এতে বহু বাঙ্গালি পুলিশ শহীদ হন।
এদিকে ২৭ মার্চ রাজশাহীর মীরগঞ্জে বাংলাদেশের পাতাকা উড়ান (ইপিআর) সুবেদার সিরাজ উদ্দিন। তিনি চারঘাট কোম্পানি হেড কোয়ার্টারে এসে পোঁছালে দেশি জোয়ানরা তাঁর সঙ্গে যোগদান করেন। এ সময় সারদা ক্যাডেট কলেজের অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রশীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্বে এগিয়ে আসেন। সারদা পুলিশ ট্রেনিং কলেজের ক্যাডেটরাও তাঁদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসেন। সুবেদার মনোহর আলীও তার সঙ্গে যোগ দেন।১১৯ পাক আর্মি ঐ দিন জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ হাফিজ আব্দুস সাত্তারকে দিনের বেলায় বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্মম অত্যাচার চালিয়ে হত্যা করে। জনাব সাত্তার ছিলেন অবাঙ্গালি। সন্ধ্যার আগে রাস্তায় বেরিকেড দেবার সময় পাকবাহিনী ঝাটু নামের এক রিক্সা চালককে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। পাক আর্মিরা তখন গির্জার পাশ থেকে পুলিশ লাইনের দিকে এগিয়ে আসছিল। পাক সরকারের নির্দেশে ঐ দিনই লাইসেন্সকৃত বন্দুক জমাদান শুরু হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় জমা  দেয়ার পথে সাহসী যুবকেরা এসব বন্দুক কেড়ে নিয়েছিল যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য। বন্দুক কাড়াকাড়ির নেতৃত্বে ছিলেন সৈয়দ সারোয়ার হোসেন, ডা. শাফিক প্রমুখ। 
২৮ মার্চ পাক আর্মি ও পুলিশের যুদ্ধ চলাকালে পুলিশ লাইনের পার্শ্ববর্তী এলাকা বুলনপুর, ভেড়িপাড়াসহ কোর্ট এলাকা ও নগরীর সাধারণ মানুষ খাদ্যসহ পুলিশকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে। কোর্ট বাজারের ডাক্তার গাফ্ফারের বাড়িকে হেড কোয়ার্টার বানিয়ে ঐ অঞ্চলের মানুষ সংগঠিত হন ও বিভিন্ন তৎপরতা আরম্ভ করেন। নগরীর পূর্বাঞ্চলে তালাইমারী মহল্লায় জেবের মিয়ার নেতৃত্বে স্থানীয় জনগণ ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেন। শেখের চক ও আলুপট্টি এলাকায় সূর্যশিখা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর কার্যালয়ে ও হেতমখাঁয়ে মুসলিম হাই স্কুলের ভিতরে একটি কেন্দ্র স্থাপিত হয়। এভাবে নগরীর সর্বত্র কারো না কারো নেতৃত্বে যুদ্ধেচ্ছুক যুব শ্রেণি ঐক্যবদ্ধ হয়। 
৩১ মার্চ রাজশাহী-নওগাঁর ইপিআর এর ৭নং উইং এর সহকারী উইং কমান্ডার ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী, ৭নং উইংয়ে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার মেজর নজমুল হক এক কোম্পানি ইপিআর নিয়ে রাজশাহী পোঁছে নগরীর উত্তরে নওহাটায় অবস্থান গ্রহণ করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৫০০ জন ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও ছাত্রদের সমন্বিত একদল মুক্তিযোদ্ধা নগরীর অদূরে পশ্চিম এসে পৌঁছে। সারদা ক্যাডেট কলেজে কর্মরত ক্যাপ্টেন রশিদের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা পূর্ব দিক থেকে রাজশাহী নগরীর দিকে অগ্রসর হন। এ ঘটনার ফলে প্রতিরোধ যুদ্ধের গতি সঞ্চারিত হয়। ঐ দিন রাতেই আলোচনার মাধ্যমে ক্যাপ্টেন গিয়াস রাজশাহীর প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। 
১ এপ্রিল পর্যন্ত পুলিশ, আনসার, দু-একজন প্রাক্তন সৈন্য, ইউওটিসি ও মুজাহিদ ট্রেনিং প্রাপ্তদের সহযোগিতায় প্রতিরোধ যুদ্ধ, চোরাগুপ্ত হামলা ও রাস্তার বেরিকেড সৃষ্টি করা হয়। পুলিশ লাইনের পতনের দিনই কোর্ট এলাকায় বশড়ি ইটভাটার কাছে সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কমান্ডার হারুন উর রশিদের নেতৃত্বে পাক সেনাদের একটি টহল দলে আক্রমণ করা হয়। এতে একজন পান সেনা নিহত ও কয়েকজন আহত হয়। সম্ভবত রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ধে পাক সেনার মৃত্যু এটাই প্রথম। 
২ এপ্রিল ভোরে ক্যাপ্টেন গিয়াসের নেতৃত্বে নগরীর পশ্চিম দিক থেকে একদল মুক্তিযোদ্ধা কাঠালবাড়িয়া আমবাগান এলাকায় প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করে অবস্থান নেয়। ক্যাপ্টেন রশিদের নেতৃত্বেও একদল মুক্তিযোদ্ধা পূর্ব দিকে ভদ্রা এলাকায় অবস্থান নেয়। ক্যাপ্টেন রশিদের নেতৃত্বাধীন ইপিআর সুবেদার লস্করের নেতৃত্বে তার বাহিনী পূর্ব দিক থেকে নগরীতে ঢুকে পড়লেও পরে ফিরে যায় হর্টিকালচারের পাশে জেবের মিয়ার ইটভাটার কাছে। এদিকে ঢাকা থেকে আগত পাকিস্তানী যুদ্ধ বিমান হামলা চালিয়ে বেসামরিক লোককে হত্যা ও ঘর-বাড়ি ধ্বংস করে। কেন্দ্রীয় কারাগারও আক্রান্ত হয়। এর ফলে বন্দিরা লকআপে না গিয়ে সবাই ৩ এপ্রিল জেল ভেঙ্গে পালিয়ে যায়। এ সময় কারা রক্ষীদের গুলিতে ১৪ জন কয়েদি মৃত্যুবরণ করেন। 
এরপর ক্যাপ্টেন গিয়াস একদল সৈন্য সমেত বগুড়ার দিকে ও মেজর নজমুল রাজশাহীর দিকে এগিয়ে আসেন। অবশ্য ইতোমধ্যে বগুড়ায় ছাত্র-জনতা দেশীয় অস্ত্র দ্বারা খান সেনাদের পরাস্ত করে বগুড়া দখল করে নেয়।  এরপর পুনরায় ক্যাপ্টেন গিয়াস রাজশাহী অভিমুখে অগ্রসরমান মূল দলের সঙ্গে যোগ দেন। গিয়াসের নেতৃত্বে ইপিআর, আনসার, পুলিশ, ছাত্র ও বিভিন্ন পেশার মানুষ মিলে এক হাজার সৈন্য এবং সারদা হয়ে এক হাজার সৈন্য ২ এপ্রিল রাজশাহী শহরের উপকন্ঠে সমবেত হয়।১১৯ 
৩ এপ্রিল বিএসএফ’র লে. কর্নেল সেন ও মেজর ত্রিবেদী ক্যাপ্টেন গিয়াসের সঙ্গে দেখা করেন। ক্যাপ্টেন গিয়াস রাজশাহী শত্রুমুক্ত করার জন্য তাঁদের নিকট প্রয়োজনীয় সাহায্য চেয়ে না পেয়ে  অবশেষে পরিকল্পনা মাফিক ৬ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬-৭টার দিকে শত্রুদের ওপর প্রবল আক্রমণ করেন।১২০ অদম্য সাহসের মধ্য দিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা লড়াইয়ের পর রাজশাহী শত্রুমুক্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা শহরের চতুর্দিকে তাঁদের প্রতিরক্ষা তৈরি করে। এ যুদ্ধে কিছু পাক সেনা নিহত হয় ও ৩০/৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। মুক্তিযোদ্ধারা রাজশাহী পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার থেকে প্রায় তিন হাজার অস্ত্র ও তিন লাখ গুলি উদ্ধার করে। শহরের লোকের মধ্যে উল্লাস দেখা যায়। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত পাক বাহিনী নগরীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান ছিল।১০২ কিন্তু প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে তাঁরা ছাউনিতে পশ্চাদপসরণ করে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করে। তারা বিমান হামলাও আরম্ভ করে। মুক্তিযোদ্ধারা ৭-১০ এপ্রিল ৩০০/৪০০ গজের মধ্যে পাক সেনা ছাউনির চতুর্দিকে ঘিরে ফেলে। এতে পাক সেনাদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে এবং সে এলাকার বিহারীদের বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র বিতরণ করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরিতে সাহায্যের নির্র্দেশ দেয়।১২০ তার পূর্ব থেকেই বিহারী কলোনীর বিহারীরা পাক বাহিনীর ছত্র ছায়ায় ঐ এলাকায় বসবাসকারী ও পথচারীর অনেককে নৃশংসভাবে হত্যা করে।১২০ 
৮ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টায় ডাকবাংলায় (বর্তমান আরএমপি হেড কোয়ার্টার) আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল হাদীকে আহবায়ক করে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। এ সভায় মো. আব্দুল হাদী, ক্যাপ্টেন গিয়াস, মোস্তাফিজুর রহমান খান, মাহতাব উদ্দিন, শফিকুর রহমান রাজা, মহসীন আলী, সাইদুর রহমান, ডা. টুকু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় নির্বাচিত এমএনএ এএইচএম কামারুজ্জামান হেনা কৌশলগত কারণে কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। 
ক্যাপ্টেন গিয়াসের নির্দেশে গণবাহিনী প্রধান মাহতাব উদ্দিন ও শফিকুর রহমান রাজা তাঁকে রাজশাহীতে আনার জন্য ভারত গমন করেন। তারা মুর্শিদাবাদ প্রশাসনের সহযোগিতায় ১২ এপ্রিল বিকেলে সাজসরঞ্জামসহ বিবিসির রিপোর্টারদের রাজশাহী নিয়ে আসেন। তাঁরা মিশন হাসপাতালের এক সময়ের সহকারী ভারতীয় হাই কমিশনারের বাসভবনে অবস্থান করেন এবং কাঠালবাড়িয়া আমবাগানের পাশে প্রাইমারি স্কুলে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের কোয়ার্টারে ক্যাপ্টেন গিয়াসের সাক্ষাৎ নেন এবং বেশ কিছু চিত্র ভিডিওতে ধারণ করেন।১০২ মুক্তিযোদ্ধারা যখন পাক সেনা ছাউনি দখলের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত তখন ১০ এপ্রিল পাক সেনাদের দুই ডিভিশন সৈন্য হেলিকপ্টার, স্টিমার ও ফেরির মাধ্যমে নগরবাড়ী ঘাটে অবতরণ করে। খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা অংশ বাধা দেয়ার জন্য নগরবাড়ী অভিমুখে রওনা দেন। তারা ১১ ও ১২ এপ্রিল পাবনার মুলাডুলী, রাজশাহীর সারদা রোডের মোড় ও শহরের অনতিদূরে কয়েকটি প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করেও টিকতে পারেননি। সারদার কাছে তুমুল যুদ্ধে কোম্পানি কমান্ডার এবি সিদ্দিকিসহ (সারদা ক্যাডেট কলেজের অধ্যাপক) বেশ কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। (শহীদ এবি সিদ্দিকিকে বীর বিক্রম উপাধিতে ভূূষিত করা হয়।)
১৩ এপ্রিল ভোরে পাক সেনারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পৌঁছে আর্টলারী ফায়ার ও জংগী বিমানের গোলা বর্ষণ অব্যাহত রাখে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা, জিন্নাহ্ ও অন্যান্য আবাসিক হল, বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব ও অতিথি ভবন দখল করে নেয়। ধ্বংস করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার। হাবিব ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, ল্যাবরেটরি প্রভৃতিতে লুটতরাজ চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে তারা আশেপাশের এলাকাতেও হত্যা ও নির্যাতন আরম্ভ করে। ঐ দিন বিমান হামলায় মুসলিম হাই স্কুলে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের হেড কোয়ার্টার তছনছ হয়ে যায়। ১৪ এপ্রিল রাত দুটার দিকে পাক গোলন্দাজ বাহিনী বৃষ্টির মত গোলা বর্ষণ শুরু করে ও ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে তাদের এক ডিভিশন সৈন্য মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রচণ্ড আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা বিছিন্ন হয়ে পড়ে এবং ক্যাপ্টেন গিয়াসের নেতৃত্বে মূল দলটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে সরে আসতে বাধ্য হয়। এর ফলে রাজশাহী শহর পাক সেনাদের দখলে চলে যায়। স্থানীয় বিহারীদের সহযোগিতায় পাক বাহিনী নগরীতে হত্যা, ধর্ষণ, লুট, আগুন জ্বালানোসহ ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। বেলা প্রায় দুটার দিকে ক্যাপ্টেন গিয়াস তাঁর সাথীদের মধ্যে ৩০০ জনকে খুঁজে পান। তাঁদের নিয়েই তিনি রাজশাহী শহর থেকে ১৮ মাইল পশ্চিমে ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ১২ মাইল পূর্বে গোদাগাড়ী নামক জায়গায় পুনরায়  প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করেন। এখান থেকে ১৫ এপ্রিল ও ১৬ এপ্রিল নূরুল ইসলাম নামে একজন ছাত্র মুক্তিযোদ্ধাসহ ক্যাপ্টেন গিয়াস মুর্শিদাবাদের জেলা প্রশাসক ও বিএসএফ এর সঙ্গে দেখা করেও সাহায্য পাননি। ১৭ থেকে ২০ এপ্রিল পাক সেনারা জঙ্গী বিমানের মাধ্যমে গোদাগাড়ী মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে গোলাবর্ষণ করে। এর ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের লোকজন পালিয়ে যায়। ২১ এপ্রিল খুব ভোর থেকে পাক সেনারা প্রবল গোলা বর্ষণ আরম্ভ করে। এর ফলে বেলা ১০টার দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের গোদাগাড়ী প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেঙ্গে পড়ে। পাক সেনারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর দখল করে নেয়। ইপিআরের ২টা স্পিডবোটে সমস্ত গোলা বারুদসহ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ক্যাপ্টেন গিয়াস পদ্মা নদীর চরে আশ্রয় গ্রহণ করেন।১২০ এদিকে ক্যাপ্টেন রশিদ চারঘাট এলাকা থেকে তাঁর দল নিয়ে পদ্মা অতিক্রম করে ভারত সীমান্তে আশ্রয় নেয়।১১৯ কেবল চর ছাড়া রাজশাহী, চাঁপাইনাববগঞ্জসহ সমগ্র এলাকা পাক সেনাদের দখলভুক্ত হয়ে যায়।
এদিকে মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধ সুষ্ঠু ও সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালনার জন বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে। রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া ও দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে ৭নং সেক্টর গঠিত হয়। এ সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়েছিল লে. কর্নেল নুরুজ্জামানকে। এ সেক্টরকে ৯টি সাব সেক্টরে বিভক্ত করে ৯ জন সাব সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়েছিল।১১৯