ফিরে যেতে চান

১৯৬৯ এর আন্দোলন ছিল জাতীয় স্বাধিকার আদায়ের গণজাগরণ। এ আন্দোলনে প্রধান ভূমিকায় ছিল ছাত্র সমাজ। ছাত্রদের ১১ দফার ভিত্তিতেই দেশব্যাপী গণ আন্দোলনের রূপ নেয়। ছাত্রদের ১১ দফার মধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিও ছিল। এ আন্দোলনের ফলে ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাত সোয়া সাতটায় সামরিক শাসক আয়ুব খানের পতন ঘটে। পালাবদলে আসে আর এক সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান। ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে খ্যাত ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ শিরোনামের মামলা থেকে মুক্তি পান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল সংবর্ধনা সভায় তাঁকে বঙ্গবন্ধু নামে ভূষিত করে।৭২৩

ড. শামসুজ্জোহা গুলিবিদ্ধ স্থানের স্মৃতি ফলক

কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের সঙ্গে ঘটনার এক পর্যায়ে সাধারণ বিক্ষুব্ধ জনতাও অংশ গ্রহণ করে। ফলে রাজশাহীতে ঊনসত্তরের আন্দোলন বিস্ফোরণমুখর গণ আন্দোলনের আকৃতি পায়। এ আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে ফেব্রুয়ারির মাঝ পর্যায়ে আয়ুব খানের পতনের পর । আন্দোলনের চরম পর্যায়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা, রাজশাহী সিটি কলেজের ছাত্র ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা নূরুল ইসলাম খোকা ও রাজশাহী সরকারি হাই মাদ্রাসার ৭ম শ্রেণির ছাত্র আব্দুস সাত্তার শহীদ হন। নূরুল ইসলাম খোকা রাজশাহী সিটি কলেজে পড়ার পূর্বে রাজশাহী সরকারি হাই মাদ্রাসা ও রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তিনি ১৯৬৭ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন।৭২২
রাজশাহীতে ঊনসত্তরের গণআন্দোলন সম্পর্কে বেশ কিছু প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। তার মধ্যে মাহবুব সিদ্দিকী তাঁর শহর রাজশাহী আদিপর্ব (২০১৩) গ্রন্থে ‘১৯৬৯-এর ১১ দফা আন্দোলন শহীদ খোকা, সাত্তার, ড. শামসুজ্জোহা তোমাদের ভুলি নাই’, বরেন্দ্রের বাতিঘর অগ্রগতির ৫ বছর (২০১৩,রাসিক) গ্রন্থে ওয়ালিউর রহমান বাবু লিখেছেন ‘উনসত্তরের গণঅভুত্থানের শহীদ জোহা-নূরুলের মিলিত রক্তের মুক্তধারা’, বায়েজিদ আহমেদ তাঁর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস (১৯৯৩) গ্রন্থে লিখেন ‘আন্দোলন মুখর ক্যাম্পাস’। বায়েজিদ আহমেদের প্রবন্ধে সংক্ষেপে পাকিস্তান আমলে সকল আন্দোলনে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের ভূমিকার সংক্ষেপে ধারাবাহিক বর্ণনা এসেছে। মাহবুব সিদ্দিকীর প্রবন্ধে শহীদ নূরুল ইসলাম খোকার জীবনী ও আন্দোলনমুখর রাজশাহী শহর প্রধান্য পেয়েছে। ওয়ালিউর রহমান বাবুর প্রবন্ধের মূল আলোচনা শহীদ ড. শামসুজ্জোহা। তিন শহীদের জীবন বৃত্তান্তও উঠে এসেছে প্রবন্ধটিতে।
বায়েজিদ আহমেদের প্রবন্ধের তথ্যানুসারে এ আন্দোলনে শহীদ ড. শামসুজ্জোহার সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সকল শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তাঁরা হলেন- ড. মযহারুল ইসলাম, ড. কসিমুদ্দিন মোল্লা, ড. আব্দুল খালেক, ড. আসাদুজ্জামান, ড. নজরুল ইসলাম, ড. আব্দুল মান্নান, ড. সফর আলী আকন্দ, অধ্যাপক হবিবুর রহমান, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ। ১৮ ফেব্রুয়ারি  শহীদ ড. শামসুজ্জোহার গুলিবিদ্ধের সময় আহত ও ইপিআর বাহিনী কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হন শিক্ষক ড. কসিমুদ্দিন মোল্লা, শিক্ষক ড. আব্দুল খালেক, শিক্ষক ড. আব্দুল মান্নান প্রমুখসহ অনেক ছাত্র। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতৃত্বে ছিলেন- আব্দুর রহমান, জালাল উদ্দিন সেলিম, মীর শওকত আলী, মতিউর রহমান, সেকেন্দার আবু জাফর, হামিদুজ্জামান রবি, সর্দার আবুল কাসেম, মুহা. আসাদুজ্জামান, খায়রুল আনাম নোমান, রুহুল আমিন প্রামাণিক, নূরুল ইসলাম ঠাণ্ডু, সুব্রত চৌধুরী প্রমুখ।
ড. জোহা, নূরুল ইসলাম খোকা ও আব্দুস সাত্তারের শহীদ ও রাজশাহীর হৃদয়বিদারক ঘটনা সমগ্র জাতির মনে নব জাগরণ এনে দিয়েছিল। ঢাকার জনতা কারফিউ ভেঙ্গে নেমে আসে রাজপথে। ড. জোহার মৃত্যুর পূর্ব দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী জেলা প্রশাসন অফিস ঘেরাও করার এক পর্যায়ে তাঁদের উপর টিয়ার গ্যাস, লাঠি চার্জ ও গুলি বর্ষণ হয়। তার প্রতিবাদে সন্ধ্যা ৭টায় শহীদুল্লাহ কলা ভবনের সামনে ছাত্র-শিক্ষকের প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় শিক্ষকদের মধ্যে ড. শামসুজ্জোহা, ড. আব্দুল খালেক, আব্দুর রাজ্জাক, আবু সাইয়িদ ও ছাত্রনেতা আব্দুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য দেন। রাতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। পরের দিন ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার জন্য ছাত্ররা অটল থাকে। প্রশাসনিক ভবনের সামনে ড. জোহা ছাত্রদের শান্তিপূর্ণভাবে থাকতে বলেছিলেন। তারপরও যদি লাঠি চার্জ ও গুলি হয় তাহলে তিনিই বুক পেতে নেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।৮৪ শহীদ হয়ে অঙ্গীকার রেখেছিলেন ড. জোহা। সে রাতেই ১৪৪ ধারা জারি হয়। পরের দিন ১৮ ফেব্রুয়ারির সকালে ১৪৪ ধারা ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক রাজপথে শান্তিপূর্ণ মিছিল করার উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাস থেকে মেইন গেটের দিকে এগিয়ে যায়। মিছিল গেট থেকে রাস্তায় নামতেই সেনা কর্মকর্তাসহ ইপিআর বাহিনীর গাড়ি ছুটে আসে। কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটের সঙে কথা বলে শিক্ষকরা ছাত্রদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা কালে হঠাৎ পরিকল্পিত গুলি বর্ষণে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ড. জোহা। এ অবস্থাতেই তাঁকে গাড়িতে উঠিয়ে নেয়া হয়। কয়েকজন শিক্ষককেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল রাজশাহী পৌরসভা ভবনে। সেখানে অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছিল ড. জোহাকে। এক সময় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন এ অকুতোভয় বীর বুদ্ধিজীবী।৮৪ এ নির্মম পরিস্থিতির সৃষ্টির জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর শামসুল হকের সঙ্গে টেলিফোনে গভর্নর মোনায়েম খানের চরম বাকবিতণ্ডতা হয়।৭২২ হাসপাতাল থেকে সন্ধ্যায় তাঁর লাশ গ্রহণ করে বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন উপাচার্য প্রফেসর শামসুল হক। পরের দিন ১৯ ফেব্রুয়ারি হকি গ্রাউন্ডে (বর্তমান সাবাস বাংলাদেশ চত্বর) দুপুরে জানাযা শেষে দাফন করা হয় প্রশাসন ভবনের সামনে।৮৪ ড. জোহাকে কাছ থেকে গুলি করেছিল লে. খাদেম শাহ। এর জন্য লে. খাদেম শাহ এর শাস্তিও হয়েছিল।৭২২  আর সরকার সান্ত্বনাস্বরূপ ড. জোহার পরিবারকে এক লাখ টাকা দেয়ার ঘোষণা দেয়।  
২১ ফেব্রুয়ারি কারফিউ শিথিল হলে রাজপথে বিক্ষুব্ধ জনতার ঢল নামে। মুখে তাঁদের শ্লোগান ছিল ‘জোহা, নুরুল ইসলাম, সাত্তারের রক্ত- বৃথা যেতে দেব না’। এ তিন শহীদের গুলিবিদ্ধ স্থানসমূহ শোকাহত জনতা ফুল দিয়ে ভরিয়ে দেয়।৭২২ ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে খ্যাত ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ শিরোনামের মামলা থেকে মুক্তি পান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল সংবর্ধনা সভায় তাঁকে বঙ্গবন্ধু নামে ভূষিত করে।৭২৩
নূরুল ইসলাম খোকা এ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাহসী ছাত্র নেতা ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারিতে শহীদ আসাদ হত্যার প্রতিবাদে ২৪ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ঢাকার রজপথে গণ অভুত্থান মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূরুল ইসলাম খোকা। এ মিছিলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন স্কুল ছাত্র মতিউর। মতিউরের গুলিবিদ্ধ শরীর নিয়ে জঙ্গী মিছিল করেন নূরুল ইসলাম খোকা। তাঁর সঙে ছিলেন রাজশাহীর জালাল ও আলম। মতিউরের মৃত্যু দারুণভাবে আলোড়িত করে তাঁকে। ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পর প্রায় প্রতিদিনই সকালে জঙ্গি ও সন্ধ্যায় মশাল মিছিল হতো।৭২৪ ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি অবস্থায় হত্যা করা হয় সার্জেন্ট জহুরুল হককে।৭২২ তার প্রতিবাদে ১৫, ১৬ ও ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর মশাল মিছিল আরো ব্যাপকতালাভ করে। এ সব মিছিলের প্রত্যেকটির সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন নূরুল ইসলাম খোকা। তাঁর সঙ্গে থাকতেন জালাল, আলম, সান্ত, ফরহাদ, সামদানীসহ অনেকে। ১৮ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে কয়েকজন বন্ধু নিয়ে বেলা ১০টায় সোনাদিঘি যান খোকা। মিছিলে অংশ নেন। মিছিল ঘুরে আবারো সোনাদিঘির মোড়ে আসে। তখন তাঁরা শুনতে পান  রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে মিছিল করছে এবং গুলি বর্ষণে ছাত্র-শিক্ষক আহত ও নিহত হয়েছে। এ সংবাদ শুনে সোনাদিঘির মিছিল অগ্নিরূপ ধারণ করে। দশটার দিকে ইপিআর বাহিনী রাজশাহী কলেজ ক্যাম্পাসে  প্রবেশ করে ছাত্রদের বেধড়কভাবে পেটানো শুরু করে। কলেজ ক্যাম্পাস থেকে তারা ট্রাকে উঠে সোনাদিঘির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে এলে মিছিলের দ্বারা বাঁধা প্রাপ্ত হয়। বেলা তখন সকাল সাড়ে দশটা মতো। মিছিলের বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা তাঁদের প্রতি ইট ছুঁড়তে থাকে।৭২৪ ইপিআর বাহিনী ও মিছিলের কর্মীদের সঙ্গে ধাওয়া পালটা ধাওয়া চলতে থাকে। এ সময় ইপিআরের দুটি পিকআপ ভ্যান গুলিবিদ্ধ ড. জোহা ও কয়েক জন শিক্ষককে নিয়ে এসে সোনাদিঘির পূর্ব পাশে দাঁড়ায়। ভ্যান থেকে অস্ত্রধারী ইপিআর নেমে ছাত্রসহ সাধারণ মানুষকে লাঠি চার্জ শুরু করে। কয়েকজনকে গ্রেফতার করে পৌরসভা ভবনে নিয়ে যায়। নূরুল ইসলাম খোকা ও মিছিল কর্মীরা তখন সোনাদিঘির পূর্ব ও উত্তর পাশ থেকে  পৌরসভা ভবনের দিকে অবিরতভাবে ইট নিক্ষেপ শুরু করে। সৈনিকরা পৌরসভা ভবনের ছাদে উঠে গুলি চালায়। একটি গুলি নূরুল ইসলাম খোকার মাথা ভেদ করে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে ঊনসত্তরের বীর নূরুল ইসলাম খোকা। সেখানেই তাঁর প্রাণ বিয়োগ ঘটে। ১৮ ফেব্রুয়ারির প্রথম শহীদ তিনিই। তখন সময় পৌঁনে এগারো থেকে এগারোটা। জায়গাটি সোনাদিঘি থেকে সমবায় মার্কেটমুখী রাস্তার টাউন লন্ড্রির সম্মুখভাগ। সোনাদিঘির পাড়ে তখন মসজিদ ছিল না বলে পৌরসভা ভবনের ছাদ থেকে পরিস্থিতির সব কিছু সৈনিকদের নজরে চলে আসে। তারা  শহীদ নূরুল ইসলাম খোকার দেহটাকে পৌরসভা চত্বরে নিয়ে গিয়ে অযত্নে ফেলে রাখে। সৈনিকী তাণ্ডব ও কারফিউ থাকার কারণে কেউ তেমন খোঁজ নেয়ার সুযোগ পায়নি। খোকার পিতা শিরোইল নিবাসী আব্দুল কুদ্দুস রাতে মুচলেকা দিয়ে লাসটা নিয়ে আসে পুলিশ পাহারায়। ঐ রাতেই মহল্লার কয়েকজন ব্যক্তির সহযোগিতায় পুলিশের উপস্থিতিতে টিকাপাড়া গোরস্থানে দাফন করা হয়। এ আন্দোলনের কর্মী বর্তমান গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীসহ তাঁর পরিবারের সদস্যরা দাফনে অংশ গ্রহণ করেন। এ শহীদের পিতা আব্দুল কুদ্দুসকেও ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল পাক বাহিনীর দোসরেরা তুলে নিয়ে যায়। শহীদ সন্তানের মতো দেশকে ভালোবেসে তিনিও শহীদ হন। তাঁর লাশটাও ফেরত দেয়া হয়নি। তাঁর অপরাধ ছিল তিনি শহীদ নূরুল ইসলাম খোকার পিতা আর স্বাধীনতার পক্ষ অবলম্বন।
হৃদয় বিদারক ঘটনার শিকার হয়ে শহীদ হয়েছিলেন আব্দুস সাত্তার। ১৮ ফেব্রুয়ারি নূরুল ইসলাম খোকা শহীদ হওয়ার আগে রাজশাহী কলেজে ইপিআর বাহিনী তাণ্ডব চালানোর পর ট্রাকে উঠে বর্তমান মণিচত্বরের কছে আসতেই ছাত্ররা ইট ছোঁড়া শুরু করেছিল। ছাত্রদের একাংশ মহিলা হোস্টেলের পূর্বপাশে তেতুলতলাসহ রাস্তায় শ্লোগানমুখর হয়ে ওঠে। তাঁদের কয়েক জন আরো পূর্ব দিকে এগিয়ে এসে ইপিআর বাহিনীর দিকে ইট ছুঁড়তে থাকে। ইপিআর বাহিনী প্রথমে টিয়ার শেল ও পরে গুলি চালিয়ে এর জবাব দেয়। তেতুলতলায় গুলিবিদ্ধ হন আব্দুস সাত্তার। সাত্তারের সঙ্গী হয়ে আসা তাঁর বন্ধু মোসলেমও আহত হন। ইপিআর বাহিনী সাত্তারকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসে পৌরসভা ভবন চত্বরে। বুকে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ এ কিশোর সেখানেই পড়ে থাকেন। তারপর পৌরসভার এক পরিচিতি ড্রাইভার তাঁকে কৌশলে সরিয়ে নিয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে বেশ কয়েক ঘণ্টা অচেতন অবস্থায় কেটে যায় সাত্তারের। শরীরের নিচাংশ শক্তিহীন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ ৬ মাস চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকার পর ১৯৬৯ সালের ২৪ আগস্ট পৃথিবী থেকে চির বিদায় নেন এ নিষ্পাপ কিশোর। শহীদ আব্দুস সাত্তার মহানগরীর পাঠানপাড়ায় ১৯৫৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর আব্বা মো. আব্দুল আজিজ ও মা সালেহা খাতুন। চার ভাই ও দু বোনের মধ্যে শহীদ সাত্তার ছিলেন দ্বিতীয়। বড় ভাই আব্দুল আজিজ ছিলেন রাজশাহী কলেজের বিজ্ঞানের ২য় বর্ষের ছাত্র। সেদিন সকালে আব্দুল আজিজ বেরিয়ে পড়েন কলেজে। তাঁরও উদ্দেশ্য ছিল মিছিলে অংশগ্রহণ। তাঁর পিছনে বন্ধু মোসলেমকে নিয়ে কলেজের দিকেই আসছিলেন সাত্তার। তেতুলতলার কাছাকাছি আসতেই গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে যান।