ফিরে যেতে চান

ভাষা আন্দোলন  বিশ্বের এক নজীরবিহীন ঘটনা। যার অন্তরনিহিতে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি। রক্তক্ষরণের বিশ্বের এ বিরল ঘটনাটি বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ জুড়ে শুধু মাত্র বাংলাদেশের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে ছিল। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর মহান একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করার পর বিশ্ববাসীর ইতিহাসে রূপান্তরিত হয়েছে। এ আন্দোলনের প্রাণ বিসর্জন শুধুমাত্র ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও  মরণপণ আন্দোলন হয়েছিল  দেশব্যাপি। তার মধ্যে রাজশাহী ছিল আন্দোলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রণক্ষেত্র। আন্দোলনের সূচনা থেকেই রাজশাহীর বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, ছাত্র ও বিভিন্ন পেশার মানুষ সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (তৎকালে মেডিক্যাল স্কুল), পিএন গার্ল্স হাই স্কুল, লোকনাথ উচ্চ বিদ্যালয়, ভুবন মোহন পার্ক ইতিহাস হয়ে আছে। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক সাইদ উদ্দিন আহমদ আন্দোলন ও নির্যাতনের দশক পঞ্চাশের দশক প্রবন্ধে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা থেকে জানা যায়, ভাষা আন্দোলনে প্রথম রক্ত ঝরে রাজশাহীতে এবং প্রথম শহীদ মিনারটিও এখানেই তৈরি হয়। ১৯৪৮ খ্রি. ১১ মার্চ দেশব্যাপী ভাষা দিবস পালন উপলক্ষে রাজশাহী কলেজের ছাত্ররা যে মিছিল বের করে তার ওপর কিছু লোক লাঠি-সোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে নগরীর ফায়ার ব্রিগেডের মোড়ে (তৎকালীন তফজুল মিয়ার মোড়) আহত হন ছাত্র ফেডারেশনের নেতা আব্দুল লতিফ, ব্রতীশ ঘোস, ফজলুর রহমান প্রমুখ। আর প্রথম শহীদ মিনারটি তৈরিহয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির দিবাগত রাতে রাজশাহী কলেজ নিউ হোস্টেল প্রাঙ্গণে।৯৮
ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল মূলত ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে। তবে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের পূর্ব থেকেই নতুন দেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে সচেতন মহলের মধ্যে জল্পনা কল্পনা চলছিল।৯৯ ১৯৪৭ সালের ১৮ মে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান (১৮৮৯-১৯৭৩) হায়দারাবাদে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে বলে ঘোষণা করেন। ঐ সময় তার কোনো প্রতিবাদ না হলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েকদিন পর ১৯৪৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর গণতান্ত্রিক যুবলীগ ও ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিশ বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করার দাবি জানায়।১০০  ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠন পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশ গঠিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর।১০০ রাজশাহীতেও এর শাখা গড়ে উঠেছিল। ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর করাচীতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কার আবরণে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ করা হয়। এ সংবাদে ঢাকার ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং কয়েকটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। এখান থেকে ছাত্রদের ভাষা আন্দোলন শুরু এবং ক্রমশ বিস্ফোরিত হয়ে উঠতে থাকে এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও যুব সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এ পরিষদের আহবানেই ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল ডাক দেয়া হয়। হরতালেই ভাষা আন্দোলনের প্রথম রক্তক্ষরণ ঘটে রাজশাহীতে। রক্তক্ষরণ বলতে আহত হয়ে রক্তাক্ত হওয়া। এ হরতালে বেশ কিছু অধ্যাপক ছাত্রদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। প্রখ্যাত ধ্বনি বিজ্ঞানী মুহম্মদ আব্দুল হাই, প্রখ্যাত পণ্ডিত ও গবেষক ড. মুহম্মদ এনামুল হক, প্রখ্যাত পণ্ডিত ও গবেষক ড. গোলাম মকসুদ হিলালী রাজশাহী কলেজে অধ্যাপনার ফলে এখানকার ভাষা সৈনিকদের তাঁদের নিকট থেকে সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।১০০
১৯৪৮ সালে এখানকার ভাষা আন্দোলন রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীক ছিল। রাজশাহী কলেজের সংগ্রামী ছাত্ররা আন্দোলনের গতিধারা চিহ্নিত করতেন এবং সঠিক নেতৃত্বের দ্বারা ভাষা আন্দোলনে বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হন। রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনের  নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে আতাউর রহমান, মুহম্মদ একরামুল হক ১৯৪৮ সালের শেষের দিকে এবং পরবর্তীতে আবুল কাশেম চৌধুরীও গ্রেফতার হন।১০০ হাবিবুর রহমান শেলী ও মুহম্মদ সুলতান পড়াশোনার জন্য ১৯৪৯ সালে ঢাকায় চলে আসেন। এর ফলে নেতৃত্বে শুন্যতার সৃষ্টি হলেও এস.এ.বারী, গোলাম আরিফ টিপু, আহমদুল্লাহ চৌধুরী, মোহাম্মদ আনসার আলী, মহসীন প্রামানিক, আবুল কালাম চৌধুরী, এস.এম.এ গাফ্ফার, হাবিবুরর রহমান প্রমুখের বলিষ্ঠ ভূমিকায় এ শুন্যতার সমস্যা প্রবল না হয়ে ভাষা আন্দোলনের গতি আরো তীব্র হয়ে ওঠে।   
রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালে গঠিত দিশারী সাহিত্য মজলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ সংগঠনটি দিশারী নামের একটি পত্রিকাও প্রকাশ করতো। রাজশাহী কলেজে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন চলাকালীন কিছু ছাত্র আরবিকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানায়। তারা ১৯৫০ সালের ১৮ জানুয়ারি কলেজের কমনরুমে সভাও করে। এ সভায়  আরবিকে রাষ্ট্রভাষার জন্য আইনসম্মত আন্দোলন চালানোর প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে সফল ভূমিকা পালন করেছিলেন দিশারী সাহিত্য মজলিশ। দিশারী পত্রিকাও ভাষা আন্দোলনের তরুণদের উৎসাহিত করেছিল। রাজশাহী জেলা তমদ্দুন মজলিসের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ আনসার আলী।১০১ 
রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনের গতি ক্রমশ বেগবান হওয়ায় ১৯৪৮ সালে যে সব নেতৃবৃন্দ বিরোধী ছিলেন, চরম পর্যায়ে তাঁরাও বাংলা ভাষার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। তমদ্দুন মজলিশের উদ্যোগে ১৯৫২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে মহানগরীতে ভুবন মোহন পার্কে বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভার সভাপতি মোহম্মদ আনসার আলীর মতে এটাই ছিল ভাষা আন্দোলনের দাবিতে প্রথম জনসভা।১০০ এ জনসভায় তৎকালীন স্থানীয় বিশিষ্ট জননেতা ক্যাপ্টেন শামছুল হক, মোসাদ্দারুল হক প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এ জনসভায় কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। যেমন- বাংলাকে পূর্ব বঙ্গের রাষ্ট্রভাষা করা, আরবি হরফের প্রচলন বন্ধ করা, রাজশাহীতে অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করা এবং বর্তমানে বাজেট অধিবেশনে বিশ্ববিদ্যলয়ের বিলটি সর্বপ্রথম গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ, মধপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলির ওপর সাম্রাজ্যবাদের আক্রমণের তীব্র প্রতিবাদ, কেন্দ্রীয় অর্থ সাহায্য হতে ডিজি স্কুলের সম্প্রসারণ।১০০  এ জনসভার সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং রাজশাহীর জনগণকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। জনসভার জন্য প্রচারিত লিফলেট মুদ্রিত হয়েছিল রাজশাহীর তমোঘ্ন যন্ত্রালয় থেকে।১০০
এরপর রাজশাহীতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল। মাদার বখ্শ (এমএলএ), ক্যাপ্টেন শামছুল হক, অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান (রাজশাহীর প্রাক্তন পৌর চেয়ারম্যান), হবিবুর রহমান, নূরুল ইসলাম (লালমিয়া ব্যবসায়ী), বামপন্থী নেতা আতাউর রহমান, অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু, ডা. মেসবাহুল হক বাচ্চু, সাইদ উদ্দিন আহম্মদ (ব্যবসায়ী), অ্যাডভোকেট মহসিন প্রামানিক, ইয়াসীন আলী, ডা.আব্দুল গফ্ফার, বাবু প্রভাস চন্দ্র লাহিড়ী (প্রাক্তন মন্ত্রী), বিচারপতি মোহাম্মদ আনসার আলী প্রমুখ এ পরিষদের সদস্য ছিলেন।১০১
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজশাহীতেও দিনব্যাপী হরতাল ও বিকেলে ভুবন মোহন পার্কে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। রাজশাহী কলেজের ছাত্র হবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে এ জনসভায় শামসুল হক, আব্দুস সাত্তার, বেগম জাহানারা মান্নান বক্তৃতা করেন। জনসভা চলাকালে অনুষ্ঠান পরিচালক হঠাৎ ঘোষণা করেন, ঢাকায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন ভাষাসৈনিক শহীদ হয়েছেন। সে সময় আব্দুস সাত্তার বক্তৃতা করছিলেন। তিনি আবেগে আগুন ঝরা বক্তব্য শুরু করেন এবং উপস্থিত জনতা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। ঢাকার শহীদদের স্মৃতি রক্ষার জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতেই আন্দোলনরত ছাত্ররা রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেল প্রাঙ্গণে প্রথম শহীদ মিনার তৈরি করেন। এ শহীদ মিনারটি বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার বলে রাজশাহীর ভাষাসৈনিকগণ দাবি করেন। নির্মাণের পূর্বে উক্ত  হোস্টেল প্রাঙ্গণে এক ছাত্র সভায় মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্র এসএমএ গাফ্ফারকে সভাপতি এবং হাবিুবুর রহমান ও গোলাম আরিফ টিপুকে যুগ্ম সম্পাদক করে একটি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এ পরিষদের কর্মকর্তারাই ছাত্র সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর শহীদ মিনারটি নির্মাণ করেছিলেন।১০০
শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও ভাষা আন্দোলনের গতিকে তীব্র করার লক্ষ্যে ২২ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম পরিষদ ভুবন মোহন পার্কে প্রতিবাদ সভা ডাকে। কিন্তু পূর্ব থেকে পুলিশ পার্ক দখলে নেয়ার কারণে সভাটি অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহী কলেজের টেনিস লনে।৯৮ এদিন ছাত্ররা হরতালেরও ডাক দিয়েছিলেন। হরতালে জনগণ ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছিলেন। সমস্ত দোকান, যানবাহন, অফিস সব কিছুই বন্ধ ছিল। মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিল আপামর জনসাধারণ। সমস্ত শহর পোষ্টারে ছেয়ে গিয়েছিল। এরপর ভুবন মোহন পার্কে আর একটি বিশাল জনসভার অনুষ্ঠিত হয়। এ সভার গুরুত্ব অপরিসীম। সভাতে হাজির হয়ে দুজন প্রবীণ মুসলিম লীগ নেতা এমএলএ ও রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান মাদার বখ্শ ও ক্যাপ্টেন শামসুল হক নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করেন। মাদার বখ্শ তাঁর বক্তব্যে বলেন, যদি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া না হয় তবে আমি আইন পরিষদের সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করবো। কয়েক দিন পর তিনি পদত্যাগও করেন। সভায় অংশ গ্রহণের কারণে মাদার বখ্শ, ক্যাপ্টেন শামসুল, মজিবর রহমান, (রাজশাহী পৌরসভার প্রাক্তন  চেয়ারম্যান) ও ১১ জন ছাত্র ৩ মার্চ গ্রেফতার হন। ১৯৫২ সালের ৫ মার্চ আজাদ পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়েছিল।১০০ ১৯৫৩ সালে রাজশাহীতে খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে ভুবন মোহন পার্কে শহীদ মিনার নির্মাণ করে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন করা হয়েছিল। 
ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীতে অনেক মহিলা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে তাঁরা রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন না। যারা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন ড. জাহানারা বেগম বেগু, মনোয়ারা বেগম মনু (মাদার বখশের কন্যা), ডা. মহসিনা বেগম, ফিরোজা বেগম ফুনু, হাফিজা বেগম টুকু, হাসিনা বেগম ডলি, রওশন আরা, খুরশীদা বানু খুকু, আখতার বানু প্রমুখ।৯৯ মহিলা ভাষা সৈনিকরাও ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে মিছিলে ঐ জনসভায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। জাহানারা  বেগম রাজশাহীর প্রথম মহিলা যিনি ভুবন মোহন পার্কে বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা....গানটি গেয়ে ভাষা সৈনিকদের উৎসাহ জুগিয়ে প্রশংসিত হয়েছিলেন।১০০ ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির প্রতিবাদী সভায় মেয়েদেরকে শামিল করার জন্য একটা পাল্কি গাড়িতে মাইকের বদলে চোঙ্গা নিয়ে বেরিয়েছিলেন হাফিজা বেগম টুকু, ফিরোজা বেগম ফুনু, হাসিনা বেগম ডলি, রওশন আরা, খুরশীদা বানু খুক্।ু কিন্তু রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেলের কাছে পুলিশের তাড়া খেয়ে শেখপাড়া হোসেনীগঞ্জ মাদ্রাসা হাই স্কুলের শিক্ষক মৌলভী আতাউর রহমানের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ভুবন মোহন পার্কের জনাকীর্ণ জনসভায় জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন মনোয়ারা ও মহসিনা।৯৮
ভাষা আন্দোলন শুধু রাজশাহী শহরেই সীমাবদ্ধ ছিলনা। জেলার অন্যান্য মহকুমা শহর নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ গ্রামাঞ্চলেও এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল। নমুনাস্বরূপ রাজশাহী জেলার অজগাঁ নাজীপুরের কথা বলা যেতে পারে। ১৯৫২  সালের একুশে ফেব্রুয়ারি এখানকার ছাত্ররা হরতাল ও প্রতিবাদ সভায় মিলিত হয়েছিল। এ সংবাদটি আজাদ পত্রিকায় ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বুধবার ৪র্থ পৃষ্ঠায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের দাবিতে সর্বত্র হরতাল ও জনসভা- শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।  
রাজশাহীর কয়েকজন ভাষা সৈনিক: সমাজ সেবক মাদার বখশ, ক্যাপ্টেন শামসুল হক, জননেতা আতাউর রহমান, শহীদ বীরেন্দ্রনাথ সরকার, মোহম্মদ সুলতান, অধ্যাপক মুহম্মদ একরামুল হক, ডক্টর কাজী আব্দুল মান্নান, ডক্টর আবুল কাশেম চৌধুরী, বিচারপতি হাবিবুর রহমান শেলী, ডা. এমএ লতিফ, বিচারপতি মোহাম্মদ আনসার আলী, অ্যাডভোকেট মহসীন প্রামানিক, নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন আহমদ, অ্যাডভোকেট আবুল কালাম চৌধুরী, লুৎফর রহমান মল্লিক ডলার, ডা. এসএম আব্দুল গাফ্ফার, ডা. মেসবাউল হক, অ্যাডভোকেট মো. আব্বাস আলী, এমএ সাঈদ, অ্যাডভোকেট আহমদ উল্লাহ চৌধুরী, আব্দুল মালেক খান, সাংবাদিক সাইদ উদ্দিন আহমদ, মজিবুর রহমান, ডাক্তার আজিজুল বারী চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সৈয়দ আমীর হোসেন স্পেন, ড. বেগম জাহান আরা, বেগম মনোয়ারা রহমান, ডা. মোহসেনা বেগম, হাফিজা বেগম টুকু, জামাল উদ্দিন আহমদ, লেখক মুহম্মদ শুকুর উদ্দিন ইবনে খৈয়াম, আশরাফুল আবেদিন, মহিউদ্দিন আহমদ, প্রফেসর মোহাম্মদ আবুল হোসেন, অ্যাডভোকেট মো. সমসের উদ্দিন, অ্যাডভোকেট  মোহাম্মদ জিয়ারত উল্লাহ, আব্দুস সাত্তার মাস্টার, মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জী নীলু, ফিরোজা বেগম, হাসিনা বেগম, রওশন আরা, খুরশীদা বেগম, আখতার বানু প্রমুখ। 
২০১৬ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শমসের আলীর নিকট থেকে জানা যায়, তিনিও ভাষা আন্দোলনের মিছিল-সভায় অংশ গ্রহণ করতেন এবং পোস্টারও লাগাতেন। তিনি সে সময় মুসলিম একাডেমির ছাত্র ছিলেন।