ফিরে যেতে চান

রাজশাহী ওয়াসা গঠনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সিটি কর্পেরেশন থেকে পৃথক করা হয়। রাজশাহী সিটি কর্পেরেশনের পানি শাখার জনবল নিয়েই ওয়াসা পৃথক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১ আগস্ট ২০১০ তারিখে যাত্রা আরম্ভ করে। ১০ মার্চ ২০১১ তারিখে সপুরার আহম্মদনগরে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে রাজশাহী ওয়াসা একটি স্বতন্ত্র কার্যালয় উদ্বোধন করেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন৬৩৩। ৩১ জুলাই ২০১১ ওয়াসার নিকট পানি সরবরাহের সার্বিক ব্যবস্থাপনা আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। নগর ভবনের সরিৎ দত্ত গুপ্ত নগর সভা কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর পত্রে স্বাক্ষর করেন  রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও রাজশাহী ওয়াসার প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউল হক।৬৭৮ 

 গোরহাঙ্গা (বর্তমান শহীদ কামারুজ্জামান চত্বর) থেকে সাহেব বাজার রাস্তা নির্মাণকালে ইন্দারাটি ভাঙ্গা পড়ে (ছবি-২০১১)

মিউনিসিপ্যালিটির পানি সরবরাহ ব্যবস্থার পূর্বে পানীয় ও গৃহস্থালীর কাজে শহরবাসীর জলের উৎস ছিল পদ্মা নদী, পুকুর, ইন্দারা, কুয়া। শহরও ছিল পুকুরময়। পুরাতন নগর ভবনের সীমানাভুক্ত সোনাদিঘিও ছিল মধ্য শহরের অন্যতম জলধাত্রী। সোনাদিঘি এখনও জলাচ্ছন্ন হলেও পূর্বের অবস্থায় নেই। তার জলও ব্যবহার হয় না। তবে মহানগরীর ইতিহাসে সোনাদিঘি ইতোমধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। তার নামানুসারে তার পূর্ব পাশের এরাকার নাম হয়েছে সোনাদিঘির মোড়। তার পূর্ব পাশ ঘেঁষে গড়ে উঠেছে মসজিদ ও বইপাড়াসমেত সুরম্য বাজার। 
ক্রমশ আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ ও জনসংখ্যা সম্প্রসারণের কারণে মহানগরীর সে সব দানশীল পুকুর-জরাশয় ক্রমশ ভরাট হয়ে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। ২০০০ সালের ওয়ার্ড পরিসংখ্যান অনুসারে রাজশাহী মহানগরীর পুকুরের সংখ্যা ছিল ৭২৮টি। ২০১১ সালের ওয়ার্ড পরিসংখ্যানে পাওয়া যায় ৪১২টি। রাজশাহী সিটি কর্পেরেশনের উপরোক্ত ২০০০ ও ২০১১ সালের ওয়ার্ড পরিসংখ্যানকে আদর্শ জরিপ হিসেবে দাবি করা যায় না। কারণ মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহকারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাঁদের দ্বারা জরিপ করা হয়েছে। তবুও এ জরিপে মহানগরীর জলাশয়সমূহের একটা চিত্র উঠে এসেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জয়যাত্রায় মানুষের বাঁচার উপকরণগুলো সহজলভ্যতার ফলশ্রুতিতে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় পদ্মার জল মহানগরবাসী শোধনের পর পান করে।

 হেতমখাঁয় পুনরায় নির্মিত মহারাণী হেমন্ত কুমারী পানি শোধনাগার ও ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন-উদ্বোধনের শিলালিপি।

ঢপকল

রাজশাহী পৌরসভা কর্তৃক সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সূচনা হয় ১৯৩৭ সালে। পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান ছিলেন রায় ডি এন দাস গুপ্ত বাহাদুর (১৯৩৪-১৯৩৯)। তিনি শহরবাসীর জন্য সুপেয় পানি সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে রাজশাহীর প্রাচীন জনকল্যাণ সংগঠন রাজশাহী এসোসিয়েশনের সহযোগিতা ছিল। তবে অবদানের শীর্ষে অবস্থান করছেন পুঠিয়ার মহারানী হেমন্ত কুমারী। রাজশাহী এসোসিয়েশনের সভ্যবৃন্দ তাঁকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্যের জন্য অনুরোধ করেন। মানব কল্যাণ্যের কথা ভেবে এসোসিয়েশনের অনুরোধ উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি এ মহিয়সীর। শহরব্যাপী পানির কল স্থাপনের জন্য তিনি ৬৫ হাজার টাকা পৌরসভাকে দান করেন। পৌরসভা ও দানকৃত অর্থ খরচে মহারানী হেমন্ত কুমারীর নামানুসারে ১৯৩৭ সালের ১৪ আগস্ট হেতমখাঁয়ে রাজশাহী জেলা বোর্ড দানকৃত জমিতে (রাজশাহী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড পূর্বপাশ সংলগ্ন) স্থাপিত হয় মহারানী হেমন্ত কুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস। এতে ব্যয় হয়েছিল ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৮৫ টাকা।৩ মানব কল্যাণমূলক মহৎকার্যের সাক্ষ্যস্বরূপ স্থাপনাটি সংশোধিত হয়ে আজও সে নামেই টিকে আছে।
সে সময় ওয়াটার ওয়ার্কসের সুপেয় জল শহরবাসীর কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকার রাস্তার পাশে পাশে স্থাপন করা হয়েছিল সিমেন্টের তৈরি বৃহৎ আকারের শতাধিক ওয়াটার রিজার্ভার। যা ঢপকল নামে সুপরিচিত। গোলাকৃতির ঢপকলগুলো উচ্চতায় যেমন দীর্ঘ, পরিধিতেও তেমন মোটা। এর নিম্নদেশে ট্যাপের মতোই ছোট নলের সাহায্যে পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা আছে। তৎকালে পাইপ লাইন ও পাম্প স্থাপন কাজে যে ফিটিংগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলো ছিল বেশ উন্নত মানের। পাইপ লাইনে ব্যবহৃত উপকরণগুলো ছিল পিতলের। জল সরবরাহের পাইপগুলো ছিল কাস্ট আয়রনের। এগুলো ছিল ইংল্যান্ডের তৈরি। কালের দাবি অনুসারে ঢপকল স্থাপনা এখন অতীত বা ইতিহাসের অধ্যায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতা এবং মানুষের সুবিধা ও রুচির পরিবর্তনের ফলে পানি সরবরাহ ব্যবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। ১৬ মার্চ ২০০৩ এর হিসেব অনুসারে ঢপকলের সংখ্যা ছিল ৯৯টি। ২৫ নভেম্বর ২০১০ তারিখের রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের পানি শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে ঢপকলের সংখ্যা পাওয়া যায় ৪৮ টি। এর মধ্যে ১৩ টি নিস্ক্রিয় ছিল। পরবর্তীতে রাস্তা সংস্কারের কারণে আরো কয়েকটি ঢপকল ভাঙ্গা পড়ে। মিশন মোড়ের ঢপকলটি ২০১৫ সালের শেষের দিকে রাস্তা প্রশস্তকরণের জন্য কাজলার হেরিটেজ: বাংলাদেশের ইতিহাসের আর্কাইভসে স্থানান্তর করা হয়।
২০০৩ সালের ১৬ মার্চ  রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের পানি শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে মহানগরবাসীর প্রতিদিন পানির চাহিদা ১০৩ মিলিয়ন লিটার। কর্পোরেশনের পানির লাইন দ্বারা চাহিদার ৪৫ মিলিয়ন লিটার পূরণ হতো। বাকি অংশ পূরণ হতো নলকূপ, পুকুর, নদী প্রভৃতির মাধ্যমে। কর্পোরেশনের পাইপ লাইন ছিল ২৪৮ কিলোমিটার, পানি উৎপাদিত নলকূপের সংখ্যা ৪৫টি, হস্তচালিত নলকূপের সংখ্যা ৪৭৫০টি (সাধারণ ৪৫০০টি ও তারাপাম্প ২৫০টি), স্ট্যান্ডপোস্ট ৭৫০টি, ওয়াটার রিজার্ভার ৯৯টি। ১৩ ডিসেম্বর ২০০৫ তারিখে প্রাপ্ত তথ্য হিসেবে মহানগরবাসীর মোট পানি চাহিদার ৭৩ শতাংশ পূরণ করা হতো পাইপ লাইনের মাধ্যমে এবং অবশিষ্ট ২৭ শতাংশ পূরণ করা হতো হস্তচালিত নলকূপের মাধ্যমে। পানি সরবরাহের পাইপ লাইন ৪১৫ কিলোমিটার, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের সংখ্যা ৩টি, পানি উৎপাদিত নলকূপ ৫২ টি ও হস্তচালিত নলকূপ ৫৫০০টি।
পানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরো আধুনিক ও উন্নীতকরণের জন্য পানি বিশুদ্ধকরণ প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়। এ প্রকল্পের ১ম ফেজে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টসহ বেশ কিছু পানি উৎপাদিত নলকূপ স্থাপন করা হয়।
১৯৯৬ সালের জুলাই মাসে মহানগরীর রামচন্দ্রপুর, শ্রীরামপুর (রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার ভিতরে) ও শালবাগানে মোট ৩টি ওয়াটারট্রিটন্টে প্ল্যান্ট নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয় এবং ২০০২ সালে শেষ হয়। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। এতে ব্যয় হয় ১৮ কোটি টাকা। ২০০৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁইয়া কর্তৃক রামচন্দ্রপুর ওয়াটারট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট উদ্বোধনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ওয়াটারট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টগুলো আর কাজে আসছেনা।
পানি বিশুদ্ধকরণ প্রকল্প ২য় ফেজ: পানি বিশুদ্ধকরণ প্রকল্প ২য় ফেজের বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয় ১ জুলাই ২০০৫ তারিখে। এতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৪০ কোটি টাকা। মেয়র মো. মিজানুর রহমান মিনু এমপি ১ জুলাই ২০০৫ তারিখ সকালে হেতেম খাঁর মহারাণী হেমন্ত কুমারী ওয়াটার ওয়াকর্স প্রাঙ্গণেই মহারাণী হেমন্ত কুমারী নামে পানি শোধনাগারের ভিত্তি স্থাপন করে প্রকল্পের ২য় ফেজের কাজ শুরু করেন।১৭১ বলা যায় মহারাণী হেমন্ত কুমারীর অবদানকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যেই ওয়াটার ওয়ার্কসের পরিবর্তে একই নামে পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হয়। এর নির্মাণ ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩ কোটি টাকা। দ্বিতীয় ফেজে মোট পানি শোধনাগার স্থাপন করা হচ্ছে দুটি। আর একটি স্থাপন করা হয় মহানগরীর পূর্ব এলাকার সাতবাড়িয়ায়। এছাড়া ২য় ফেজে আরো ১৫টি পানি উৎপাদন কেন্দ্র ও ২১৫ কিলোমিটার পাইপ লাইন স্থাপন করা হয়।১৭১  সাতবাড়িয়ার শ্যামপুরে দু ইউনিট বিশিষ্ট পানি শোধনাগারের নাম রাখা হয় শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান পানি শোধনাগার। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ২ মার্চ ২০১১ তারিখে ৮ একর জমির উপর প্রথম উইনিটের উদ্বোধন করেন। পদ্মার পানি শোধন করে মহানগরবাসীকে আর্সেনিক মুক্ত পানি সরবরাহের উদ্দেশ্যে এ শোধনাগারটি নির্মাণ করা হয়।৭৩৮ তবে পদ্মায় চর পড়ে যাওয়ার কারণে পানি না পাওয়ায় এক বছর পরই শোধনাগারটি বন্ধ হয়ে যায়।৭৩৯
ওভারহেড পানির ট্যাংক: মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় বেশ উঁচু বিশালাকৃতির কয়েকটি ওভারহেড পানির ট্যাংক দেখা যায়। মহানগরবাসীর পানি সরবরাহ দেয়ার উদ্দেশ্যেই ট্যাংকগুলো স্থাপন করা হয়েছিল। দেশ স্বাধীনের পূর্বে ও পরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ৫টি ট্যাংক নির্মাণের পর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (তৎকালে পৌরসভা) নিকট হস্তান্তর করেছিল। ২টি ট্যাংক ডাচ সরকারের অর্থ ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল।৪৭ ট্যাংকগুলোর পানি ধারণ ক্ষমতা কম হওয়ার কারণে যথাযথভাবে ব্যবহার হতো না। ১৯৯০ সালের পর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন উৎপাদিত নলকূপের মাধ্যমে পানি  উত্তোলন আরম্ভ করলে ট্যাংকগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৩ সালে বর্তমান নগর ভবন চত্বরের পশ্চিমাংশে অবস্থিত ট্যাংকটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। এর পানি ধারণ ক্ষমতা ছিল দেড় লাখ গ্যালন।

শালবাগানে রাজশাহী ওয়াসা অফিস ও তার দক্ষিণ পাশ সংলগ্ন পানির ট্যাংক